ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেছে। সময়ের প্রলেপ ক্ষতে কিছুটা হলেও পলেস্তারা লাগায়, কিন্তু দাগ কি আর পুরোপুরি মোছে? গ্রামের সেই উত্তাল দিনগুলো এখন মুরুব্বিদের গল্প আর চায়ের দোকানের আড্ডায় সীমাবদ্ধ। ডুকরে ওঠা কান্নার বদলে এখন সেখানে গুমোট শান্তি বিরাজ করে। গঞ্জের চশমা চোখে দিয়ে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকানো শিশিরের অনুপস্থিতি আজ আর কাউকে চমকে দেয় না, তবে বিকেলের পড়ন্ত রোদে যখন স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বাজে, তখন পুরনো বটতলার দিকে তাকালে এখনো অনেকের বুকটা হু হু করে ওঠে।
মানুষ অভ্যাসের দাস। তারা ভুলে গেছে হাড়হিম করা রাতের চিৎকার, ভুলে গেছে মকবুল জমিদারের সেই ত্রাসের রাজত্ব। কিন্তু যারা হারিয়েছে, তারা কি আর ভুলতে পারে? বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার পর গ্রামে এখন ভয়ের শাসন নেই। সাধারণ মানুষেরা বুক ফুলিয়ে কথা বলে।
অরুনিমা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত, গম্ভীর। ওর প্রতিটি কাজ শান্তকে ঘিরে। প্রণয়ের অনুপস্থিতিতে সে নিজেকে একজন দৃঢ় মা হিসেবে গড়ে তুলেছে।
সময় বহমান নদীর মতো। নদীর ওপর দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে যায়, কিন্তু নিচের পলিগুলো আগের মতোই থিতু হয়ে থাকে। এই গ্রামের মানুষের স্মৃতিও ঠিক তেমনি। উপরে স্বাভাবিক জীবনের স্রোত, আর গভীরে জমাট বাঁধা একরাশ ইতিহাস।
শান্ত এখন স্কুলে যায়। ওর চোখেমুখে প্রণয়ের সেই প্রখর বুদ্ধি আর দৃঢ়তার ছাপ স্পষ্ট। মাঝেমধ্যে ও বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে অরুনিমা উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকায়। ও জানে, পাঁচটা বছর খুব দীর্ঘ সময় নয় আবার খুব ছোটও নয়। দেখতে দেখতে তো কেটেও যাচ্ছে!
ইয়াসিফ আর গ্রামে আগের মতো যাতায়াত করে না। অপরাধবোধ তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তবুও সে দূর থেকে সকলের খোঁজ নেয়। মৃন্ময়ী মাঝেমধ্যে এসে অরুনিমার হাতটা শক্ত করে ধরে। কোনো কথা হয় না ওদের মাঝে, শুধু অনুভবের বিনিময় ঘটে। দুজনেই জানে, ওদের এই শান্তিটুকু কেনা হয়েছে একজনের ত্যাগের বিনিময়ে।
প্রণয় কিংবা শিশিরের শুন্যতা ওরা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, এই গ্রামের প্রতিটা ধূলিকণায় তারা রয়ে গেছে অঘোষিত কিংবদন্তি হয়ে। মানুষ তাদের ভুলে যাওয়ার ভান করে ঠিকই, কিন্তু আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “এমন মানুষ আর এই তল্লাটে আসবে না।”
সময় যেন রওশন আরার ওপর কিছুটা সদয় হয়েছে। যে মানুষটা একসময় বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে ছিল, আজ তিনি বেশ সুস্থ। শুধু সুস্থ বললে ভুল হবে, শরীরের জড়তা কাটিয়ে তিনি এখন ঘরের কাজও সামলান। উঠোনে রোদে বসেন, পাড়ার লোকজনের সাথে দু-দণ্ড কথা বলেন। কিন্তু নিজের শরীরের ক্ষত সারলেও চোখের সামনের জ্যান্ত ক্ষতটা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ইদানীং তিনি মৃন্ময়ীকে একটু গুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মা হিসেবে মেয়ের এই ছন্নছাড়া জীবন আর সইতে পারছেন না। কিন্তু মৃন্ময়ী... ও যেন জীবন্ত পাথর। মেয়েটাকে শাসন করবেন নাকি সোহাগ, সেই ভাষা রওশন আরা খুঁজে পান না। মৃন্ময়ী এখন যা বলে, যা করে; তার কোনো আগামাথা নেই। মাঝরাতে জানলার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার কখনো ভর দুপুরে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে থাকে। আগে মেয়েটা ছিল অভিমানী আর জেদি, কিন্তু এখন অজানা জগতে হারিয়ে গেছে। রওশন আরা ওর চুলে তেল দিয়ে দিতে গেলে ও বাঁধা দেয় না, আবার হাসেও না। শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। মা হয়ে তার বুঝতে অসুবিধা হয় না, সবকিছু সামলে মেয়ের ভেতরটা আগেই অবশ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু শিশিরের এই পরিণতির পর সেই অবশ ভাবটা ওর পুরো অস্তিত্বকে গিলে খেয়েছে। ও এখন রক্ত-মাংসের মানুষ ঠিকই, কিন্তু ভেতরটা নিথর মরুভূমি। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করেন, “শরীরের অসুখ তো সারল, কিন্তু মনের এই পচন আমি থামাব কেমনে? মেয়েটা যে আমার জ্যান্ত লাশ হইয়া গেল!”
তাই নিজের শরীরটা একটু টানটান হতেই মেয়ের ছন্নছাড়া জীবনটা তার চোখে বিঁধছে কাঁটার মতো। সেদিন বিকেলে বারান্দায় বসে মৃন্ময়ীর চুলে বিলি কাটতে কাটতে তিনি কথাটা পেড়েই ফেললেন, “মা রে, শরীরটা তো আমার একরকম সারল। আল্লায় তো আমারে খাড়া করাইছে। কিন্তু তরে দেখলে যে আমার কলিজাটা শুকায়া যায়। এমনে জ্যান্ত লাশ হইয়া আর কতদিন থাকবি?”
মৃন্ময়ী জানলার বাইরের আমগাছটার দিকে তাকিয়ে ছিল। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল, “আছি তো মা। খাইতেছি, ঘুমাইতেছি। আর কেমনে থাকব?”
তিনি মেয়ের কাঁধে একটা হাত রেখে মিনতি ভরা সুরে বললেন, “শোন মা, জীবনটা তো থাইমা থাকে না। তরে নিয়া আমি একটু সচ্ছল হইতে চাই। পাড়ার কালু মাতব্বরের ভাগ্নেটা তোরে পছন্দ করছে। ছেলেটা ভালো, শহরে ছোটখাটো একটা কাজ করে। তোরে তারা ঘরে তুলতে চায়। আমি কি কথা আগামু? বিয়েশাদী না করলে এই একলা জীবনে শান্তি পাবি কই?”
মৃন্ময়ী মায়ের দিকে এক পলক তাকাল। চোখের মণি দুটো স্থির, যেন গভীর কুয়াশায় ঢাকা। ঠোঁটের কোণে মরা হাসি ফুটে উঠল। ধরা গলায় বলল, “বিয়া দিয়া কারে সুখী করবা মা? যে নিজেরেই চিনে না, তারে দিয়া অন্যের ঘর হইব? আমার শান্তি তো অনেক আগেই পুইড়া গেছে। আমারে নিয়া আর স্বপ্ন দেইখো না।”
তিনি দমলেন না। জেদের সুরে বললেন, “তোর তো কোনো দোষ নাই মা! দোষ তো ওই শয়তানগো ছিল। তুই কেন আজীবন সাজা কাটবি? একটা ঘর-সংসার হইলে সব ভুইলা যাবি।”
মৃন্ময়ী আবার জানলার দিকে মুখ ফেরাল। ধীর লয়ে উত্তর দিল, “ভুলতে পারা তো নেয়ামত মা। আল্লায় আমারে সেই নেয়ামত দেয় নাই। আমারে যেমনে আছাল অবস্থা থেইকা অবশ বানাইয়া দিছে, অমনেই থাকতে দাও। মাঝখান থেইকা আরেকটা মানুষের জীবন কেন নষ্ট করবা?”
রওশন আরা আর কথা বাড়াতে পারেন না। মেয়ের নিস্পৃহ উত্তরের আড়ালে যে কী পরিমাণ পাথর চাপা কষ্ট লুকানো, তা বুঝতে পেরে তার বুকটা আবার হু হু করে উঠল।
ঠিক একই সময়ে গ্রামের অন্য প্রান্তে তাহের আকন্দের বাড়ির চিত্রটাও খুব একটা ভিন্ন নয়। ইয়াসিফের অবস্থাও শোচনীয়। সে এখন ছায়ার মতো এক অস্তিত্ব, যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। তাহের আকন্দ আর রাবেয়া শত চেষ্টা করেও ছেলেকে আগের সেই প্রাণচঞ্চলতায় ফিরিয়ে আনতে পারছেন না। ইয়াসিফ এখন বাড়িতে থাকতেই চায় না। অপরাধবোধ, প্রণয়-শিশিরের স্মৃতির ভার সে বইতে পারে না। মাসখানেক পর পর হঠাৎ একদিন সন্ধ্যায় ঝড়ের মতো উদয় হয়। এক ঘণ্টা চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকে, মায়ের হাতের দু-এক লোকমা খেয়ে আবার নিরুদ্দেশে পা বাড়ায়। বাবা অনেকবার হাত ধরে আটকাতে চেয়েছেন, কিন্তু ছেলের চোখের উদাসীন চাহনি দেখে তার বুক কেঁপে ওঠে।
সেদিন বিকেলে তাহের আকন্দ নিজেই হাজির হলেন রওশন আরার উঠোনে। অনেকক্ষণ ইতস্তত করার পর তিনি আসল কথাটি পাড়লেন। রওশন আরা পাটি বিছিয়ে দিলেন, তাহের আকন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসলেন। ধীর গলায় বললেন, “ভাবী, আমি আসছি একটা অসমাপ্ত হিসাব মিলাইতে। আমাগো পোলা-মাইয়া দুজনেই তো জ্যান্ত লাশ হইয়া গেছে। ময়ূরী মা জননী চইলা গেছে, সেই শূন্যস্থান তো পূরণ হওয়ার না। কিন্তু মৃন্ময়ী তো আছে। এই দুইটা খণ্ডিত জীবন কি জোড়া লাগানো যায় না?”
রওশন আরা অবাক হয়ে তাকালেন। তাহের আকন্দ বলতে থাকলেন, “ইয়াসিফ কাউরে সহ্য করতে পারে না, কারো লগে কথা কয় না। কিন্তু আমি জানি, মৃন্ময়ীর সামনে দাঁড়াইলে ওর ভেতরের পিশাচটা হয়তো একটু শান্ত হইব। ওরা দুইজন তো একই আগুনের সাক্ষী। একজন আরেকজনের ক্ষত চিনে। ওরা যদি একে অপরের পরিপূরক হইয়া নিজেদের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে, তবে সমস্যা কোথায় ভাবী? আমরা বুড়া মানুষ, মইরা গেলে এই দুইটারে আগলাইব কে?”
রওশন আরার চোখে পানি টলমল করে উঠল। তিনি মৃদুস্বরে বললেন, “ভাইজান, আপনার প্রস্তাব তো মন্দ না। কিন্তু মৃন্ময়ী কি রাজী হইব? ও তো নিজেরেই চেনে না এখন। নিজের থেকে পলায়ে আছে।”
তাহের আকন্দ দৃঢ় গলায় বললেন, “ওগো পলায়ন থামাইতে হইলে ওগো মুখোমুখি করতে হইব। ইয়াসিফ আজ আসব বাড়িতে। আপনি মৃন্ময়ীরে নিয়া আইসেন। দেখা যাক, দুইটা ভাঙা আয়না মিইলা একটা আস্ত ছবি বানানো যায় কিনা।”
মৃন্ময়ী ঘরের ভেতর থেকে সব শুনছিল। ওর বুকটা ধক করে উঠল। ইয়াসিফ? যে মানুষটা বোনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সাক্ষী? তার সাথে ঘর করা কি সম্ভব? নাকি এই অভিন্ন যন্ত্রণাই হবে তাদের একমাত্র মিলনের ভাষা?
তাহের আকন্দ যখন ইয়াসিফের সামনে প্রস্তাবটা রাখলেন, ইয়াসিফ যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার পাথুরে চোখে অবিশ্বাসের বিদ্যুৎ খেলে গেল। অস্ফুট স্বরে বলল, “মৃন্ময়ী? আব্বা, আপনে কি পাগল হইলেন? এই কথা তো ভাবনাতে আনাও পাপ!”
ইয়াসিফের মনে পড়ে গেল সেই বিভীষিকাময় দিনটার কথা। শিশিরের জন্য মৃন্ময়ীর আর্তনাদ, বিধ্বস্ত চেহারা। ইয়াসিফ নিজেকে দোষী ভাবে কারণ সে সেই ধ্বংসের সাক্ষী। মৃন্ময়ীর সামনে দাঁড়ালে সে নিজের পরাজয় আর ব্যর্থতা ছাড়া কিছুই খুঁজে পায় না। এই মেয়েটাকে নিজের ঘরনি হিসেবে ভাববে, এটা তার কাছে অকল্পনীয় মনে হলো।
কিন্তু বাবা-মায়ের জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হলো। একদিন বিকেলে নদীর পাড়ে, দুজন দেখা করল। দুজন মানুষের মাঝে অনেকটা দূরত্ব, দূরত্বটুকু বিষাদ দিয়ে ঠাসা। ইয়াসিফ গলা পরিষ্কার করে শান্ত কণ্ঠে ডাকল, “মৃন্ময়ী।”
মৃন্ময়ী ফিরল না। শুধু ঘাড় সামান্য হেলিয়ে বুঝাল, ও শুনছে। ইয়াসিফ কয়েক কদম এগিয়ে বলল, “সবাই কী বলতেছে শুনছ তো?”
মৃন্ময়ী বাতাসের দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল, “হুম।”
“তোমার কী মতামত? তুমি কি এই পাগলামিতে রাজী?”
“আপনে জানেন না?”
ইয়াসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানি। তারপরেও মৃন্ময়ী... আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। বলো, তুমি কি চাও?”
মৃন্ময়ী একদৃষ্টে ইয়াসিফের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “চাওয়ার মতো কিছু তো আমার অবশিষ্ট নাই ইয়াসিফ ভাই। দুইটা ভাঙা নৌকা কি একসাথ হইয়া এই গাঙ পার হইতে পারব? একে অপরের জখমগুলা খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা ছাড়া কেউ কাউরে শান্তি দিতে পারুম না। আপনে কি সেই বিষ হজম করতে পারবেন? আমি পারব না।”
ইয়াসিফ দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। একসময় বিড়বিড় করে বলল, “বিষ তো আমরা আমাগো রক্তে বইয়া বেড়াইতেছি মৃন্ময়ী। এই বিষ দিয়া কি আর সংসার হয়?”
মৃন্ময়ী সরাসরি ইয়াসিফের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো আর্তি নেই, নেই কোনো ভবিষ্যতের হাতছানি। ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “বিয়া তো হয় দুইটা জ্যান্ত মানুষের মধ্যে। দুইটা মরা মানুষ এক লগে থাকলে কি তারে সংসার কয়? আমি রাজি হইতে পারুম না। আমাদের এই মৃত সত্তাগুলারে নিয়া একলা থাকাই ভালো। মিছা মিথ্যে একসাথ হইয়া লাভ কী? আমরা তো একে অপরের ক্ষতগুলা প্রতিদিন নতুন কইরা খুঁচায়া তুলব।”
ইয়াসিফ মাথা নাড়ল। তার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি দেখা দিল; যাতে কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল প্রাপ্তি। সে বলল, “হুম। আমাগো আব্বা-আম্মারা ভালো চায় ঠিকই, কিন্তু তারা বোঝে না যে কিছু আয়না একবার ভাঙলে তারে আর জোড়া লাগানো যায় না। জোড়া লাগাইতে গেলে খালি হাত রক্তারক্তি হয়।” ইয়াসিফ মৃন্ময়ীর থেকে কয়েক কদম দূরে সরে গিয়ে বলল, “আমি কাল সকালেই গ্রাম ছাড়তেছি। কবে আসি কিংবা আর আসবো কিনা তার ঠিক নেই। আব্বা-আম্মার কথায় কষ্ট পেও না। ভালো থেকো।”
মৃন্ময়ী কোনো কথা বলল না। ও আবার নদীর ধাবমান স্রোতের দিকে মুখ ফেরাল। মনে হলো, জীবনটা তো নদীর মতোই। বয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তলার পলিগুলো কখনো নড়াচড়া করে না। বিকেলের মরা আলোয় দেখা গেল দুটো আলাদা অবয়ব দুই দিকে হেঁটে যাচ্ছে। মাঝখানে পড়ে রইল বিশাল শূন্যতা। তারা রাজী হতে পারল না কোনো মিথ্যে সুখের অভিনয়ে। নিজেদের মৃত সত্তাকেই আঁকড়ে ধরল, কারণ এই যন্ত্রণাটুকুই এখন তাদের একমাত্র ব্যক্তিগত সম্পদ।
.
কারাগারের চার দেওয়ালের ভেতরে সময় যেন মন্থর গতির বিষাক্ত নদী। বাইরে ঋতু বদলায়, ক্যালেন্ডারের পাতা ওড়ে, কিন্তু প্রণয় এহসানের জীবনে রয়ে গেছে শুধু ধূসর রঙ। জেলের ভেতরে সে এখন নিভৃতচারী মানুষ। কয়েদিদের ভিড়ে থেকেও সে একা। জেলের ছোট পাঠাগারটা এখন তার ধ্যান-জ্ঞান। পুরোনো ছেঁড়া বইগুলোর পাতায় সে মুক্তি খোঁজে, আর কয়েদিদের অক্ষরজ্ঞান দান করে কাটে দিন। তার সেই ক্ষুরধার বুদ্ধি শান্ত হয়েছে, কিন্তু চোখের প্রখর জ্যোতি এক বিন্দুও কমেনি।
মাসে একবার অরুনিমা আসে। জেলগেটের সেই লোহার জালের ওপারে অরুনিমার মুখটা দেখলে প্রণয়ের মনে হয়, পৃথিবীটা এখনো সুন্দর! অরুনিমা এখন আর কাঁদে না। ওর দৃষ্টিতে ইস্পাতকঠিন ধৈর্য। ও নিয়ম করে প্রণয়ের জন্য রান্না করে নিয়ে আসে, যদিও কড়াকড়ি নিয়মে সবটা ভেতরে যায় না।
অরুনিমা কখনও শান্তকে সাথে আনে না। প্রণয় প্রথম প্রথম খুব চাইত একবার ছেলেকে দেখতে, কিন্তু অরুনিমা দৃঢ়ভাবে বাঁধা দিয়েছে। ও চায় না ছেলের শৈশবের স্মৃতিতে এই উঁচু দেয়াল, কাঁটাতার আর বাবার হাতকড়া পরা হাতগুলো গেঁথে থাকুক। ও চায় শান্ত জানুক বাবা দূর দেশে এক মহৎ কাজে গেছে। সেদিনও দেখা করার সময় প্রণয় জালের ওপার থেকে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, “অরু, শান্তর খবর কী? ও কি এখনো আমার ছিঁড়ে যাওয়া শার্টের সুতোটা জমাইয়া রাখছে?”
অরুনিমা ম্লান হাসল। জালের ওপর হাত রেখে বলল, “শান্ত বড় হচ্ছে প্রণয়। তোমার মতোই জেদী। ইদানীং খুব বায়না ধরে বাবার কাছে যাবে। আমি ওরে বলছি তোমার বাবা আকাশের নক্ষত্র গুনতে গেছে, যেদিন গোনা শেষ হবে সেদিন ফিরবে।”
প্রণয় ভেজা গলায় বলল, “ওরে এখানে আইনো না অরু। ওরে এই লোহার গন্ধ নিয়া বড় হইতে দিয়ো না। ও যেন শুধু সবুজ ঘাস আর খোলা আকাশ দেখে। ও কি পড়াশোনায় মন দেয়?”
“মন দেয় না মানে? সারাদিন বই নিয়া পইড়া থাকে। তোমার মতো বড় হইতে চায়। মাঝেমধ্যে তোমার ডায়েরিটা নিয়া নিঝুম হইয়া বসে থাকে। ওর চোখের চাহনি দেখলে আমার ভয় লাগে প্রণয়, অবিকল তোমার মতো!”
প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শান্তর কথা ভাবতে ভাবতে অন্ধকারের দিকে তাকাল। তার হাতে এখন কোনো অস্ত্র নেই, বুকে নেই প্রতিশোধের আগুন। আছে শুধু অতল প্রতীক্ষা। নিচু স্বরে বলল, “অরু, আর কয়টা বছর তো কাইটা যাবেই। আমি যখন ফিরব, তখন শান্ত হয়তো আমায় চিনতে পারবে না। কিন্তু তুমি ওরে বইলো, ওর বাপ খুনি ছিল না। ওর বাপ ছিল এক অভিশপ্ত ইতিহাসের অবসানকারী।”
অরুনিমা আঁচলে চোখ মুছে বলল, “তুমি ফিরে এসো, আমাদের ঘরটা এখনো তোমার অপেক্ষায় অগোছালো হয়ে আছে।” ঘণ্টা বেজে উঠে। সময় শেষ। অরুনিমা উঠে দাঁড়াল। প্রণয় জালের ওপাশ থেকে হাত বাড়িয়ে বাতাসের স্পর্শ নিতে চাইল। অরুনিমা চলে যাচ্ছে, প্রণয় সেদিকে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না সে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। জেলের নিস্তব্ধতায় শুধু একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়, প্রতীক্ষা!
.
ক্যালেন্ডারের পাতা একে একে খসে পড়েছে, কিন্তু অপেক্ষার প্রহর ফুরোচ্ছিল না। অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল। পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার এক কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের বিশাল লোহার গেটটি খোলার নির্দেশ এল।
সকালটা ছিল মায়া মায়া। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের প্রথম আলো যখন জেলগেটের চূড়ায় এসে পড়ল, তখন বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ে অদ্ভুত উত্তেজনা। অরুনিমা আজ লাল রঙের একটা শাড়ি পরেছে, যে রঙটা প্রণয়ের খুব প্রিয়। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় বারো বছরের শান্ত। শান্তর চোখেমুখে গম্ভীর কৌতূহল। চেয়ারম্যান সাহেব বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছেন, আজ তার চোখেও তৃপ্তির ঝিলিক। পাশে সাদা পোশাকে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মৃন্ময়ী। ও আর আগের মতো ছটফটে নেই, তবে পাথুরে চোখের কোণে আজ এক চিলতে আর্দ্রতা। সবাই গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ভারী লোহার গেটটি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। ভেতর থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলেন একজন দীর্ঘকায় মানুষ। মানুষটা শুকিয়ে গেছে, গালের হাড় ভেঙ্গে হাড্ডি বেরিয়ে গেছে, কিন্তু চিরচেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর চোয়ালের দৃঢ়তা এক বিন্দুও কমেনি। পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা। প্রণয় বাইরে পা রাখতেই থমকে দাঁড়াল। মুক্ত আকাশ আর সকালের হিমেল হাওয়া তার ফুসফুস ভরে নিল। দৃষ্টি আটকে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মানুষের ওপর। অরুনিমা এক পা এগিয়ে গিয়ে ডাকল, “প্রণয়!”
প্রণয় হাসল। ম্লান, বিজয়ী হাসি। এমন সময় ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল দুজন যুবক। ইয়াসিফ আর তাহমিদ। ইয়াসিফ এগিয়ে এলো, তাহমিদও এল। সে প্রণয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আমরা আর দূরে থাকতে পারলাম না ভাই।” প্রণয় দুই ভাইকে দুহাত দিয়ে জাপটে ধরল। এই সুন্দর সকালে বুক ভরে রক্তের ঘ্রান নিল। অরুনিমা শান্তর পিঠে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, “যাও শান্ত, তোমার বাবার কাছে যাও।”
শান্ত ধীর পায়ে প্রণয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাবার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। প্রণয় হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে পড়ল। তার দুহাত বাড়িয়ে দিল শান্তর দিকে। কাঁপা গলায় বলল, “তোর নক্ষত্র গোনা শেষ হইছে বাপ?”
শান্ত দেরি করল না। দৌড়ে গিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। পাঁচ বছরের জমানো সব হাহাকার এক মুহূর্তে এক আলিঙ্গনে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। অরুনিমা পাশেই দাঁড়িয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিল। ইয়াসিফ আর তাহমিদ দেখল, একজন বাবা আর ছেলের এই পুনর্মিলন; এটা একটা অভিশপ্ত রক্তের দায়মুক্তির দলিল। গাড়িতে ওঠার সময়ও শান্ত প্রণয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল, যেন ছেড়ে দিলেই আবার বাবা নক্ষত্র গুনতে হারিয়ে যাবে। প্রণয় জেলখানা থেকে আজ মুক্ত পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই মানুষগুলোর ভালোবাসার শিকলে তাকে আজীবন বন্দি থাকতে হবে।
প্রণয় যখন গ্রামের সীমানায় পা রাখল, ধুলোবালিমাখা মেঠো পথটা আজ নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। গ্রামবাসী আগে থেকেই খবর পেয়েছিল। রাস্তার দুধারে মানুষের ভিড়, হাতে বুনো ফুলের মালা চোখে পরম শ্রদ্ধা। যে মানুষটা নিঃশব্দে ঘাতক হয়ে এসেছিল, আজ সে বিজয়ী বীরের বেশে ঘরে ফিরছে। কারো মনে আর ভয় নেই, আছে কেবল কৃতজ্ঞতা। জেলফেরত একজন আসামীকে সমাজ যেভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, প্রণয়ের ক্ষেত্রে ঘটল তার উল্টো; মানুষ তাকে বরণ করে নিল পরম আত্মীয়ের মতো।
প্রণয়ের দুপাশে ছায়ার মতো হাঁটছে ইয়াসিফ আর তাহমিদ। ইয়াসিফ দীর্ঘ দুবছর পর এই মাটির গন্ধ নিল। গ্রাম ছেড়ে পালানোর যে দহন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল, আজ প্রণয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সেই অপরাধবোধ কিছুটা হলেও প্রশমিত হলো। আর তাহমিদ? সে তো পাঁচটা বছর পর নিজের শেকড়ে ফিরল।
সালেহা বেগমের গল্পটা অবশ্য একটু ভিন্ন। আজ থেকে প্রায় দুবছর আগেই তিনি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। বিগত কয়েক বছরের গ্লানি আর কারাজীবনের একাকীত্ব তার শরীরকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা আর মানসিক অবসাদ এতটাই কাবু করেছিল যে, আদালত মানবিক দিক বিবেচনা করে তার সাজার মেয়াদ কমিয়ে মুক্তি দেয়। মুক্তি পেলেও তিনি এই গ্রামে ফিরে আসার সাহস পাননি। তাহমিদ বড় ছেলে হিসেবে মাকে আগলে রেখেছে। শহরের নিভৃত কোণে মা আর ছেলে এখন শান্তিময় জীবন কাটায়। সালেহা বেগম এখন সারাদিন তসবিহ পাঠ করেন আর মাঝেমাঝে জানলার বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের না করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত খোঁজেন।
গ্রামের মাঝখান দিয়ে হাঁটার সময় সবার নজর কাড়ল বিশাল অট্টালিকা, জমিদার বাড়ি। একসময় যে বাড়ির দাপটে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খেত, আজ সেই বাড়িটি নিথর কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল সদর দরজায় ঝুলছে প্রকাণ্ড মরিচা ধরা তালা। জানলার কাঁচগুলো ভাঙা, কার্নিশে জমেছে শ্যাওলা আর পরগাছা। বাড়ির ভেতরে কোনো মানুষের পদচিহ্ন নেই, আছে শুধু একরাশ অন্ধকার আর হাহাকার। প্রণয় তালাবদ্ধ বাড়ির সামনে থামল। এক সময় এই বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা আর্তনাদ তাকে ঘুমোতে দিত না। আজ সেই বাড়িটা মৃত। তালাবদ্ধ ওই কপাটগুলো এক অভিশপ্ত বংশের চূড়ান্ত পতনের দলিল। প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নিল। অতীতের সেই জঞ্জাল তালাবদ্ধই থাক।
অরুনিমা আর শান্ত অপেক্ষা করছে পুরোনো ভিটেয়। সেখানে কোনো জমিদারি নেই, আছে এক বুক ভালোবাসা আর পরম শান্তি।
গ্রামের রাতগুলোও আগের মতো গা ছমছমে নয়। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর জোনাকির আলোয় শান্ত মায়া ছড়িয়ে আছে চারদিকে। প্রণয় আর অরুনিমা তাদের ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। মাথার ওপর খোলা আকাশ। অরুনিমা প্রণয়ের হাতের তালু নিজের দুহাতে ঘষছে, বিশ্বাস করতে চাইছে এই রক্ত-মাংসের মানুষটা আসলেও ফিরে এসেছে। প্রণয় উদাস চোখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। অরুনিমা ফিসফিস করে বলল, “অনেক কষ্ট করলা তাই না? পাঁচটা বছর নিজের ভেতর একাই একটা যুদ্ধ চালাইয়া গেলা। শরীরটা তো এক্কেবারে শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেছে।”
প্রণয় অরুনিমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তার চোখের কোণে জমানো ক্লান্তিগুলো এই ম্লান হাসিতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে অরুনিমার হাতটা একটু জোরে চেপে ধরে বলল, “কষ্ট তো তুমিও কম করো নাই অরু। আমার কষ্টের চেয়ে তোমার এই তিল তিল করে অপেক্ষা করাটা অনেক বেশি কঠিন ছিল।”
অরুনিমা মাথাটা প্রণয়ের কাঁধে রাখল। ওর চোখের জল গড়িয়ে প্রণয়ের পাঞ্জাবি ভিজিয়ে দিচ্ছে। কাঁপা গলায় বলল, “মাঝেমধ্যে রাতে ভয় লাগত প্রণয়। মনে হইতো, সবই কি স্বপ্ন? তুমি কি আসলেও ফিরবা? শান্ত যখন তোমার কথা জিজ্ঞেস করতো, তখন বুকটা ফাইটা যাইত।”
প্রণয় আকাশের ওই সুদূর নক্ষত্রটার দিকে আঙুল তুলল। তার কণ্ঠে নির্লিপ্ততা, যেন বহু শতাব্দী ধরে একা বয়ে চলা এক ক্লান্ত যাত্রীর দীর্ঘশ্বাস। অরুনিমার হাতের তালুতে নিজের আঙুলগুলো আলতো করে ডুবিয়ে দিয়ে সে বিড়বিড় করল, “দেখো অরু, ওই নক্ষত্রটা যেমন মহাকালের শূন্যতায় একা জ্বলে, আমিও তো এতদিন ওমনি এক নিঃসঙ্গ দহনে পুড়েছি। চারপাশের সেই বিষাক্ত ধোঁয়া আজ শেষমেশ থিতু হয়েছে। এখন শুধু একটা গভীর, অতল স্পর্শের শান্তি দরকার।”
রাতের নিস্তব্ধতা আরও ঘনীভূত হয়ে নামল। অরুনিমা কথা বলল না, শুধু প্রণয়ের বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিল। দীর্ঘ বছরের ব্যবধান, সেই হাড়হিম করা শীত আর লোনা জলের স্মৃতিগুলো এক নিমিষেই বিলীন হয়ে যেতে চাইল। পৃথিবীর সব কোলাহল, অতীতের সব আর্তনাদ আজ এই অন্ধকার ঘরে এসে স্তব্ধ হয়ে গেছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকারা একনাগাড়ে ডেকে চলেছে। বছরান্ত ধরে চলা দীর্ঘ জ্যামিতিক ব্যবধান আজ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। এই নৈঃশব্দ্যের মাঝে তারা একে অপরে খুঁজে নিল সেই হারানো প্রশান্তি, যা পাওয়ার জন্য একজন দহন সয়েছে আর অন্যজন বয়ে চলেছে অপেক্ষার পাহাড়।
.
জেলে কাটানো দীর্ঘ সময়টা প্রণয় কেবল দেয়াল গুনে কাটায়নি, সে এঁকেছে আগামীর মানচিত্র। যে গ্রামকে সে শৃঙ্খলমুক্ত করেছে, সেই গ্রামকে এখন আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। ফেরার পর থেকেই কাজে নেমে পড়েছে। প্রথম উদ্যোগ হিসেবে গড়ে তুলল ‘শিশির স্মৃতি সবুজ সংঘ’। শিশিরের অকাল আত্মত্যাগ যেন গ্রামের তরুণদের মাঝে এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে, এটাই তার লক্ষ্য। এই সংঘের মাধ্যমে গ্রামের পাঠাগার, নৈশ বিদ্যালয় আর খেলাধুলার তদারকি শুরু হলো।
ইয়াসিফ এখন প্রণয়ের সাথেই আছে। প্রণয় তাকে নিজের ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছে, কিন্তু মাঝেমধ্যেই বাঁধ সাধেন তাহের আকন্দ। বৃদ্ধ বয়সে ছেলের প্রতি তার শাসন আর বাৎসল্য যেন একটু বেশিই উথলে ওঠে। আজ দুপুরে হাঁপাতে হাঁপাতে প্রণয়ের কাছে এসে ধপ করে বসে পড়ল ইয়াসিফ। বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে ভাই, মানুষ এত জ্বালায় কেন? তুমি আর তোমার চাচা, দুইজনের অত্যাচারে তো আমি পাগল হইয়া যাচ্ছি! আব্বা তো সারাদিন খালি তক্কে তক্কে থাকে আমি কই যাই, কী করি।”
প্রণয় মুচকি হাসল। ইয়াসিফের কাঁধে হাত রেখে টিপ্পনী কাটল, “সবই তো বুঝলাম রে ভাই, কিন্তু তুই কি সারাজীবন পলাতক আসামি হইয়াই থাকবি? বিয়েশাদী করবি না? বয়স তো কম হইলো না!”
“না ভাই, কোনো ইচ্ছে নেই। বিয়াশাদী আমারে দিয়া হবে না।”
“ইচ্ছে নাই নাকি অন্য কোনো সমস্যা? খুইলা বল তো দেখি।”
ইয়াসিফ উদাস চোখে জানলার বাইরের বটগাছটার দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল, “সমস্যাই বটে। আমারে ময়ূরীকে আইনা দেন। তারে ছাড়া অন্য কাউরে ওই জায়গায় বসাইতে পারি না আমি।”
“পাগল কোথাকার! মৃন্ময়ী তো আছে! ওরে কি তোর চোখে পড়ে না?”
“আচ্ছা দেখা যাক। কোনো একদিন হয়তো ভাগ্যের ফেরে বিয়াটা কইরাই ফেলব।”
একই দৃশ্য চলছে অরুনিমার ঘরেও। মৃন্ময়ী আনাজ কুটছিল। অরুনিমা ওর পাশে বসে চুলে বিলি কাটতে কাটতে প্রস্তাবটা পরল। মৃন্ময়ী আগে থেকেই জানত কী কথা আসছে। ও মুখ বাঁকিয়ে অভিমানের সুরে বলল, “কী গো আপা, তুমিও কি আমারে পর কইরা দিতে চাচ্ছ? আমি তোমার কাছে কাছে আছি, তা কি তোমার ভালো লাগছে না?”
“আরে পাগলী, পর করতে যামু কেন? তোর একটা নিজের ঘর হোক, সংসার হোক—ষ, সেটা কি আমি চাইব না? আর কতদিন এমনে একলা থাকবি?”
“যখন বিয়ের বয়স হবে, তখন করব। এখন আমার ওইসব শখ নাই।”
“আর কত বয়স লাগবে তোর? এখনই ভরা যৌবন তোর!”
মৃন্ময়ী শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “উঁহু, এখন না। বয়সটা আগে পঞ্চাশ বছর হোক, চুলে পাক ধরুক তখন দেখা যাবে। তার আগে আমারে নিয়া টানাটানি বন্ধ করো তো আপা!”
অরুনিমা বসে বসে কপাল চাপড়ায়। ভাসা ভাসা কথাবার্তা, অস্থির ভঙ্গি... কবে স্থির হবে কে জানে? এভাবেই দিন গড়াচ্ছে। কখনো রোদেলা দুপুরে ‘সবুজ সংঘের’ মাঠে ছেলেদের কোলাহল, কখনো নিঝুম রাতে অরুনিমার পাশে প্রণয়ের প্রশান্তির ঘুম।
গ্রামের মেঠো পথ এখন আর আগের মতো রক্তিম বা আতঙ্কিত নয়। জমিদারের বন্ধ অট্টালিকার সামনে এখন বুনো ঘাস আর লতাগুল্মের রাজত্ব। মানুষ ওই বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটার সময় আর ভয় পায় না, বরং এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে, অধর্মের শেষ এইভাবেই হয়।
দিন গড়াচ্ছে আপন গতিতে। ইয়াসিফ আর মৃন্ময়ী এখনো যে যার জেদে অটল। ইয়াসিফ মাঝেমধ্যে বাপের অত্যাচারে গ্রাম ছেড়ে পলায়ন করে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে প্রণয়ের কাঁধেই মাথা রাখে। মৃন্ময়ীও অরুনিমার ছায়া হয়ে আছে। পঞ্চাশ বছর হওয়ার সেই হাস্যকর অজুহাত দিয়ে সে আসলে নিজের একাকীত্বকে আড়াল করে রাখে, তবে গ্রামের উৎসবে-পার্বণে যখন ইয়াসিফ আর মৃন্ময়ীর চোখাচোখি হয়, তখন সেই দৃষ্টিতে কোনো ঘৃণা থাকে না; থাকে সহমর্মিতা। হয়তো কোনো এক ঝোড়ো বিকেলে তাদের এই মৌনতা ভেঙে যাবে।
শান্তর চোখে আগামীর স্বপ্ন। সে তার বাবার বিগত বছরের মরিচা ধরা চাবিটা দিয়ে নিজের মনের নতুন দরজা খুলেছে। প্রণয় এখন আর শুধু ওর বাবা নয়, সে গোটা গ্রামের জীবন্ত ইতিহাস।
এক পড়ন্ত বিকেলে প্রণয় আর অরুনিমা নদীর ঘাটে এসে বসে। যে ঘাটে বিচ্ছেদের সুর ছিল, সেখানে এখন জোয়ারের শব্দ। প্রণয় অরুনিমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলে, “জানো অরু, জীবনটা বড় অদ্ভুত। মনে হইছিল সব শেষ। অথচ আজ মনে হচ্ছে, আসল জীবনটা তো আজই শুরু হইলো।”
অরুনিমা হাসে। সেই হাসিতে মলিনতা নেই। ও জানে, ক্ষতগুলো পুরোপুরি মোছেনি ঠিকই কিন্তু ক্ষতের ওপর এখন পলেস্তারা পড়েছে। জীবন তো এভাবেই কাটে; ভালো আর মন্দের দোলাচলে, অতীত আর বর্তমানের সন্ধিক্ষণে। নদীর ওপার থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। গ্রামের আকাশে জোনাকিরা উড়তে শুরু করেছে। প্রণয় অরুনিমার হাত ধরে ধীর পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। তাদের পেছনে পড়ে থাকে ফেলে আসা দীর্ঘশ্বাস, আর সামনে পড়ে থাকে এক বুক শান্ত নীল আকাশ।