অন্ধকার আমবাগানের জরাজীর্ণ মন্দির প্রাঙ্গণ এখন বিভীষিকাময় নাট্যমঞ্চ। একদিকে মরণকামড় খাওয়া আহত বাঘের মতো তাওহীদ মাটিতে লুটিয়ে আছে, একহাত গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড়। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অরুনিমা, মৃন্ময়ী আর পিস্তল হাতে তাহমিদ। তখনই ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বের হয়ে এলেন প্রণয় আর তার কবজায় থাকা বিধ্বস্ত মকবুল রহমান। তিনি তাওহীদকে ওই অবস্থায় দেখে চিৎকার করে উঠলেন, “তাওহীদ! আমার বাজান!”
প্রণয় মকবুল রহমানকে একটা ধাক্কা দিয়ে সামনে ফেলে দিল। অরুনিমা আর মৃন্ময়ী অবাক হয়ে দেখল, মকবুল রহমানের ঘাতক হিসেবে খোদ প্রণয়কে। অরুনিমা অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি এইখানে?”
প্রণয় অরুনিমার দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসল, “তোমারে একলা এই পাপের ভার নিতে দিতাম না অরুনিমা। এই জমিদার বংশের শিকড় উপড়ে ফেলার পরিকল্পনা তো আমি অনেক আগেই শুরু করছিলাম।”
মৃন্ময়ী কুড়ালটা শক্ত করে ধরে বলল, “তারমানে আপনিই তাহমিদ ভাইরে এইখানে পাঠাইছেন?”
প্রণয় মাথা নাড়ল। সে নিষ্ঠুর বিচারকের মতো সবার মাঝখানে দাঁড়াল। তাহমিদের দিকে তাকাল, “তাহমিদ ভাই, বাপ-ভাইকে এই অবস্থায় দেখে তোমার আফসোস হচ্ছে?”
তাহমিদ পিস্তলটা নামিয়ে একরাশ ঘৃণা নিয়ে বাবার দিকে তাকাল, “না ভাই। আমি চাই এই লোকটা নিজের চোখে দেখুক সে কী কী হারাইছে। উনি বাবা হওয়ার যোগ্য না।”
সেই মুহূর্তে বনের সরু পথ দিয়ে ঢুকল ইয়াসিফ। আলগোছে অন্ধকারে পথ হাতড়াতে হাতড়াতে অবশেষে তাহমিদের একটা ম্যাসেজ পেয়ে এখান পর্যন্ত আসতে সক্ষম হয়েছে। বুনো লতাপাতা হাত দিয়ে সরিয়ে যখন সামনে তাকাল, রক্ত হিম হয়ে গেল। রক্তের নেশা এত প্রগাঢ় হতে পারে? বুঝতে অসুবিধা হলো না, এটা জ্যান্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে প্রস্তুত করল চরম সত্যের মুখোমুখি হতে। চিৎকার করে উঠল, “প্রণয়! আমি জানি তুমি কেন এই জায়গাটা বেছে নিয়েছ! এইবার আর আইন নিজের হাতে নিও না।”
প্রণয় ইয়াসিফের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “আইন তো জমিদারদের পকেট থেকে বের করছি। অরুনিমা যখন নদীতে ঝাঁপ দিল, আইন কোথায় ছিল? শিশিররে যখন পুড়াইয়া মারা হইলো, আইন কই ছিল? মৃন্ময়ীরে মাইরা আত্মহত্যার নাটক সাজানো হলো, তখন আইন কই ছিল? আইন নাই। আমার পুরো পরিবার যখন ধ্বংস করেছে তখন তোমাদের সুশীল আইন কোথায় ছিল? আজ প্রকৃতি নিজেই আইন-আদালত সাজাইছে।”
প্রণয়ের মুখ থেকে বের হওয়া কথাগুলো এক একটা বোমার মতো ফাটছিল নির্জন মন্দির প্রাঙ্গণে। অরুনিমা স্তব্ধ হয়ে গেল। হাতের ধারালো দা-টা ঘাসের ওপর পড়ে গেল ভোঁতা শব্দে। টলতে টলতে প্রণয়ের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে এখন তাওহীদের প্রতি ঘৃণার চেয়েও বড় বিস্ময় আর আতঙ্ক। ও হাপিত্যেশ করে প্রণয়ের শার্টের কলার চেপে ধরল। কাঁপাকাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “প্রণয়! তুমি এসব কী বলতেছ? পলাশ তালুকদার তোমার বাবা? তুমি তো কোনোদিন বলো নাই! তুমি তো কপালপুরের মাস্টার হিসেবে এই গ্রামে আসছিলা। তুমি এই আবোল-তাবোল কথা কেন বলতেছ? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল?”
প্রণয় অরুনিমার অস্থির হাতজোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিল। স্পর্শ অস্বাভাবিক শীতল। খুব শান্ত আর ভারী গলায় বলল, “শান্ত হও অরু। অনেক কাহিনী আছে যা তুমি জানো না। এই যে মকবুল রহমান জমিদার সেজে বসে আছে, উনি আসলে একজন স্বনামধন্য খুনি। আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে এই মন্দিরের পেছনেই ছিল আমাদের তালুকদার বাড়ি। এই লোকটা ক্ষমতার লোভে আমাদের সাজানো বাড়িটায় আগুন লাগাইয়া দিছিল। আমার মা-বাবা, আমার ছোট্ট বোনটা... সবাই ওই আগুনে কয়লা হইয়া গেছিল। আমাকে আর আমার ভাইকে নিয়ে চাচা কোনোমতে জান নিয়া পালাইছিল। আমি এসব জানতাম না। বছর দশেক আগে চাচা মারা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল। আমার বয়স তখন দুই আর আমার ভাইয়ের পাঁচ। মাত্র, চিন্তা করতে পারো?”
ওরা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল। প্রণয় মকবুল রহমানের দিকে একবার ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আবার অরুনিমার দিকে ফিরল, “এরা শুধু তোমার জীবনটাই নষ্ট করে নাই, এরা আমার অস্তিত্বই মিটায়া দিছিল। আমি এই গ্রামে মাস্টার হইয়া আসছিলাম এদের শিকড় কাটতে। তুমি তো তাওহীদের কাছে বলি হইছিলা, কিন্তু আমি তিলে তিলে চব্বিশ বছর ধইরা পুড়ছি। তাও সবকিছু ক্ষমা করে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। দেখো বাঁচতে শিখেও গিয়েছিলাম। তুমি, শান্ত... এইতো আমি! এইতো আমার জীবন! ভেবেছিলাম এদের পাপাচারে আর দৃষ্টি রাখব না। কিন্তু পারলাম না। ওরা একেরপর এক, কতকগুলো মানুষকে শেষ করল দেখেছ? শেষমেষ আমি বুঝলাম, এদের জ্যান্ত কবর না দিলে আমার মা-বাবার আত্মা শান্তি পাবে না।”
অরুনিমা অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। যাকে উদ্ধারকর্তা ভেবেছিল, সে আসলে নিজেও এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল এতদিন! মকবুল রহমান তখনো মাটির ওপর হামাগুড়ি দিচ্ছেন। বিড়বিড় করে বলছেন, “তোমার বড় ভাই? তুমি চিনো ওরে?”
প্রণয় ক্রুর হেসে তাহমিদের দিকে ইশারা করল, “আমার ভাই তো আপনার কোলেই বড় হইছে চাচা। সে আপনার নামমাত্র বড় ছেলে তাহমিদ। আপনার স্ত্রীর সন্তান হচ্ছিল না বলে আমার ভাইরে চুরি করে নিয়া আসছিলেন নিজের বংশের বাতি জ্বালাইতে। ভাবছিলেন প্রতীক বড় হইয়া আপনার পাপের রাজত্ব সামলাইব? কিন্তু দেখছেন তো, রক্ত ঠিকই রক্তের টান চিন্না নিছে। চাচা? আমি ঠিক বলছি? ভুল হলে শুধরে দিয়েন। চাচার মুখে শোনা কাহিনী তো!”
তাহমিদের হাতের পিস্তলটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মকবুল রহমানের দিকে তাকাল। তারমানে, যার জন্য সে আজীবন অপরাধবোধে ভুগেছে, সেই লোকটাই তার পরিবারের ঘাতক? পুরো আমবাগানটা মৃতপুরীর মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তাহমিদ অস্ফুট স্বরে বলল, “না এটা হইতে পারে না! এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা আমার সাথে? এটা কি সত্যি? কে বলবে আমারে?”
প্রণয় ম্লান হেসে বলল, “রক্তের টান লুকানো যায় না ভাই। তাই তো আজ তুমি নিজের অজান্তেই আমার সাথে হাত মিলাইছো। এই জানোয়ারটা কেবল আমাকে এতিম করে নাই, সে তোমারে দিয়া নিজের পরিবারের খুনিরে আব্বা ডাকাইছে।”
মকবুল রহমান পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন, “মিছা কথা! সব মিছা কথা!”
“চুপ। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য আপনে সব করেছেন। তাওহীদ তো একটা বিকৃত জানোয়ার, আর আপনে তারচেয়েও বড় শয়তান। আজ চব্বিশ বছর পর আমি আমার ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, আর আপনি আপনার নিজের তৈরি করা নরকে।”
তাহমিদ ওরফে প্রতীক শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। দুচোখ বেয়ে নোনতা জল গড়িয়ে পড়ছে। চেনা পৃথিবীটা এক নিমিষেই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। প্রণয় এগিয়ে গিয়ে ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখল। ভাইয়ের ভেঙে পড়া রূপ দেখে প্রণয়ের পাথুরে চোখেও আজ জল। নিচু স্বরে বলল, “জানি, সত্যটা মেনে নেওয়া কঠিন। মকবুল রহমান কেবল খুনি নন, উনি চতুর জাদুকর। কিন্তু তোমার মা তোমারে খুব মায়া করত। আর সেই মায়ার কাছেই আমি বারবার হেরে গেছি।”
প্রতীক ঝাপসা চোখে প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “আগে বলো নাই কেন ভাই? কেন এত বছর আমারে এই নরকে ফেলে রাখলা?”
প্রণয় ম্লান হেসে আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে রাতের কালো ফিকে হতে শুরু করেছে। বলল, “কেমনে বলতাম রে? যারে তুমি মা ডাকো, উনার জন্য তো কোনোদিন প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হতে পারিনি। উনি জমিদার গিন্নি হতে পারেন, কিন্তু একজন পবিত্র হৃদয়ের মানুষ। সে তোমারে নিজের পেটের ছেলের চেয়েও বেশি আগলে রাখছেন। আমি বারবার তোমারে নিতে আসছি কিন্তু যখন দেখছি তুমি নিশ্চিন্তে মায়ের আঁচলের তলায় তখন আমি ফিরে গেছি। একজন মমতাময়ী মায়ের কোল থেকে কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমার ছিল না।” প্রণয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরও বলল, “দশ বছর আগে যখন চাচা সব বলে গেলেন, আমি এই গ্রামে মাস্টার হয়ে এলাম। অনেকবার চেয়েছিলাম এদের সব জ্বালিয়ে দিতে, কিন্তু যখন দেখতাম তুমি তোমার মায়ের জন্য পাগল, তখন আমি থমকে যেতাম। মায়ের চোখের পানির কথা ভেবেই আমি এদের পাপ মুখ বুজে সহ্য করেছি। ভেবেছিলাম, হয়তো একদিন তোমারে সত্যিটা বলবো আর তোমারে এই অন্ধকার থেকে বের করে নিয়ে যাব। কিন্তু তাওহীদ পশুত্বের সব সীমা পার করে দিল!”
মকবুল রহমান মাটিতে পড়ে থেকে হাহাকার করে বলার চেষ্টা করছেন, “তাহমিদ বিশ্বাস কর বাবা, আমি তোরে ভালোবাসছি! আমি তোরে আমার রাজপুত্র বানাইছি!”
সে ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিল, “যে রাজপুত্র তার মা-বাবার লাশের ওপর সিংহাসন গড়ে, সেই রাজত্বে আমি থুতু দেই।”
প্রণয় আর প্রতীক দুই ভাই আজ চব্বিশ বছরের ব্যবধানে পৈশাচিক প্রতিহিংসার মঞ্চে এক হয়েছে। দুজনেই তাওহীদের দিকে এগিয়ে গেল। তাওহীদ যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। প্রতীক তার বুট জুতোটা তাওহীদের আহত হাতের ওপর থেকে সরিয়ে সজোরে ওর গলার ওপর চেপে ধরল। তাওহীদ খাবি খেতে শুরু করল, চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। প্রণয় ঠান্ডা গলায় বলল, “বল তাওহীদ, এখন তোর সাথে কী করা উচিত? যে জীবন তুই ধ্বংস করছিস, তার কি কোনো মাফ আছে? চব্বিশ বছর আগে আমাদের পরিবারটা যেমন তোদের পায়ের তলায় পিষ্ট হইছিল, আজ দেখ তোদের অহংকার কেমনে ধুলোয় মিশতেছে।”
ঠিক তখনই কুড়ালটা ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাঘিনীর মতো সামনে এগিয়ে এল মৃন্ময়ী। চোখমুখ রাগে লাল হয়ে গেছে, শরীর কাঁপছে। ও প্রতীক আর প্রণয়কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ওরা কিছুটা অবাক হয়ে সরে দাঁড়াল। মৃন্ময়ী তাওহীদের শার্টের কলার ধরে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করাল। তাওহীদ টলছিল, কিন্তু মৃন্ময়ী ছাড়ল না। ও প্রথম থাপ্পড়টা কষাল তাওহীদের বাম গালে, “এটা জমিদারের ছেলে হওয়ার অহংকারের জন্য, যে ক্ষমতার দাপটে তুই মানুষরে কুত্তা ভাবতি!” তাওহীদ সামলে ওঠার আগেই মৃন্ময়ী দ্বিতীয় থাপ্পড়টা দিল, “এইটা অরুনিমা আপার জন্য! যারে তুই ভালোবাসার নাটক কইরা বিক্রি করতে চাইছিলি, যারে তুই মরতে বাধ্য করছিলি!”
তৃতীয় থাপ্পড়টা আরও জোরালো। মৃন্ময়ীর হাত লাল হয়ে গেছে ব্যথায়, কিন্তু ও থামল না। উন্মাদের মত বলল, “এইটা তার জন্য যে মানুষটা তোর পাপের প্রতিবাদ করছিল বইলা তুই তারে জ্যান্ত পুড়াইয়া মারলি! তোরে কি বাঘে মারবে জানোয়ার? তোরে তো পিপঁড়ায় খাবে!” মৃন্ময়ী তাওহীদের দুই গালে এলোপাতাড়ি চড় মারতে শুরু করল আর পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, “এইটা শিশিরের শেষ নিঃশ্বাসের জন্য! এইটা আমার বোনের খুনি হওয়ার জন্য! এইটা গ্রামের প্রতিটা মানুষের ভয়ের জন্য!”
তাওহীদ মৃন্ময়ীর পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। মৃন্ময়ী হাপাতে হাপাতে তাওহীদের মুখের ওপর থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বলল, “তোর মরণ হলে তো মাটিও তোরে জায়গা দিবে না রে পিশাচ।”
মকবুল রহমান নিজের চোখের সামনে নিজের ছেলের এই বেইজ্জতি আর পতন দেখে চিৎকার করে উঠলেন। প্রণয় তার বুকে লাথি মেরে ফেলে দিল।
মৃন্ময়ীর হাতের চড় থাপ্পড় খেয়ে তাওহীদ যখন প্রায় অর্ধমৃত অবস্থায় মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, তখন অরুনিমা এগিয়ে এল। ওর চলাফেরায় কেবল নিরেট পাথুরে শীতলতা। মৃন্ময়ী সরে দাঁড়াল, জায়গা করে দিল অরুনিমাকে; যার জীবনের প্রতিটা বাঁকে তাওহীদ বিষ ঢেলে দিয়েছিল। অরুনিমা তাওহীদের সামনে স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর পরম মমতায় ওর আলুলায়িত চুলগুলো হাত দিয়ে একপাশে সরিয়ে দিয়ে তাওহীদের সেই ঘৃণ্য কপালে নিজের হাতের ধারালো দা-টা স্পর্শ করাল। দা-এর ঠান্ডা লোহার ছোঁয়া লাগতেই তাওহীদ যন্ত্রণার মাঝেও একবার শিউরে উঠল। অরুনিমা কোনো কথা বলল না, একে একে তাওহীদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গভীর ক্ষত তৈরি করতে লাগল। না, প্রাণ কেড়ে নেওয়ার জন্য নয় বরং তিলে তিলে যন্ত্রণার স্বাদ বোঝানোর জন্য। অরুনিমার মাথায় তখন ঘুরছিল সেই রাতের কথা, যখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে তাওহীদ সমাজ আর কলঙ্কের ভয় দেখিয়ে ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। মনে পড়ছিল কোলের নিষ্পাপ শিশুর কথা, যাকে জন্ম দিয়েও লোকচক্ষুর অন্তরালে বন্দি জীবন কাটাচ্ছিল। অরুনিমা তাওহীদের চুলের মুঠি ধরে মুখটা মাটির সাথে ঘষতে শুরু করল। ঠিক সেইভাবে যেভাবে তাওহীদ একদিন ওর সম্মান ধুলোয় মিশিয়েছিল। একপর্যায়ে তাওহীদকে টেনে তুলে ভাঙা মন্দিরের পিলারের সাথে হেলান দিয়ে বসাল। তাওহীদ যখন যন্ত্রণায় আর্তনাদ করার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে, অরুনিমা তখন তার বুকের বাম পাশে দা-এর অগ্রভাগটা চেপে ধরল। মনে করিয়ে দিতে চাইল, একটা মানুষের হৃদয় ভাঙলে কেমন লাগে। অরুনিমার নীরব রুদ্রমূর্তি দেখে সেখানে উপস্থিত প্রণয়, প্রতীক কিংবা ইয়াসিফ; কারো সাহস হলো না তাকে থামানোর। একজন নারীর মাতৃত্ব আর সতীত্বের অবমাননার বিচার আজ কোনো আদালত নয়, আজ প্রকৃতির বিচারে অরুনিমা নিজেই করছে।
ইয়াসিফ এতক্ষন দাঁড়িয়ে বীভৎস বিচারের সাক্ষী হচ্ছিল। এবার এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে ক্রোধ নেই। সে তাওহীদের ঝাপসা হয়ে আসা চোখের সামনে ঝুঁকে বসল। বলতে শুরু করল, কীভাবে তাওহীদকে খুনের জাল বুনেছিল। ময়ূরীর হত্যা, জহির মোল্লার খুন, তাকে আঘাত; সবকিছুর প্রতিশোধ নিতে ইয়াসিফও কোপ মারার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, এই শয়তান গুলোকে নিজে শাস্তি দিতে পারল না।
সব শুনে প্রণয় এগিয়ে এল। তার হাতে ধরা ছিল একটা প্রাচীন ধারালো অস্ত্র। মকবুল রহমান ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। প্রণয় তার সামনে দাঁড়িয়ে পৈশাচিক হাসি হাসল। অস্ত্রটা উঁচিয়ে বলল, “না, আপনাকে আমি মারব না। মরলে তো আপনি মুক্তি পেয়ে যাবেন। আমি চাই আপনি বেঁচে থাকুন, কিন্তু সেই বেঁচে থাকা হবে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। আপনি সারাজীবন পঙ্গু হয়ে ওই ভিটার দিকে তাকিয়ে কাঁদবেন যেখান থেকে আপনি তালুকদার বংশকে উচ্ছেদ করেছিলেন।”
প্রণয় চরম নিষ্ঠুরতায় মকবুল রহমানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পঙ্গুত্ব নিশ্চিত করার জন্য সে তার শরীরের স্নায়ু আর হাড়ের ওপর নিপুণভাবে আঘাত করল। আমবাগান চিরে মকবুল রহমানের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ আকাশে ছড়িয়ে পড়ল। উপস্থিত সবাই দাঁতে দাঁত চেপে বীভৎসতা দেখল। কেউ এক পা এগিয়ে এল না তাকে বাঁচাতে। তাদের মনে তখন চব্বিশ বছর আগে পুড়ে মরা সেই পরিবার, ময়ূরী, জহির মোল্লা আর শিশিরের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। অন্ধকারের পর্দা সরে গিয়ে পুব আকাশে লালাভ আভা দেখা দিচ্ছে। আর সেই নির্জনতা চিরে বহু দূর থেকে ভেসে এল পুলিশের সাইরেনের শব্দ। অনিন্দিতা রায় ফোর্স নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছেন।