প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ১৩

🟢

বাইরে থেকে সেই গম্ভীর এবং হিমশীতল কণ্ঠস্বর আবার ধ্বনিত হলো যেন অন্ধকার নিজেই কথা বলছে, “থাম তাওহীদ! পাপের ঘড়া পূর্ণ হতে আর এক কদম বাকি। ওই মেয়েটাকে ছোঁয়ার আগে নিজের পরিণতির কথা একবার ভাব।”

তাওহীদ ভয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “কে? সামনে আয়! সাহস থাকলে সামনে এসে কথা বল!”

অন্ধকার থেকে ক্রুর হাসি ভেসে এল। সেই কণ্ঠস্বর আবার বলল, “আজ আমি আসব না। আজ শুধু তোর ভয়টা দেখতে আসছি। তুই যারে মাটি চাপা দিয়া ভাবছিলি সব শেষ, সে আজ তোর চারপাশটা ঘিরে ধরছে। খুব শীঘ্রই তোর জন্য একটা বিশেষ উপহারের ব্যবস্থা করা হইছে। ততক্ষণ এই পাপের বোঝা বয়ে বেড়া।”

কথাটা শেষ হতেই বাইরের ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কারো দ্রুত চলে যাওয়ার শব্দ পাওয়া গেল। তাওহীদ কাঁপা হাতে টর্চ জ্বেলে দরজার দিকে দৌড়ে গেল, কিন্তু সেখানে কেউ নেই। শুধু গেটের পাশে পড়ে আছে তার আরেকটা লোকের নিথর দেহ। তাওহীদের বুকের ভেতরটা তখন ধড়ফড় করছে। সে বুঝতে পারল, অদৃশ্য আততায়ী তাকে এখনই মারবে না; সে তাকে তিলে তিলে যন্ত্রণায় দগ্ধ করে মারতে চায়। মৃন্ময়ী মেঝেতে পড়ে হাঁপাচ্ছে, আর শিশির অস্ফুট স্বরে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছে। তাওহীদ ফিরে এসে আবার মৃন্ময়ীর দিকে হাত বাড়াতে গেল, কিন্তু তার হাত কাঁপছে। ওই কণ্ঠস্বরের ভয় হাড়ের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে তার বেঁচে থাকা লোকজনকে চিৎকার করে বলল, “সবগুলারে পাহারা দে! আমি একটু আসতাছি। কেউ যেন নড়াচড়া না করে!”

তাওহীদ ঘর থেকে বেরিয়ে টলতে টলতে বাইরের খোলা বাতাসে এল। তার মাথায় ঘুরছে সেই চিরকুট আর অরুনিমার স্মৃতি।

অনিন্দিতা রায় চেয়ারম্যান বাড়ি এসে পৌঁছালেন। তখন প্রায় ভোর। উঠোনে পা দিতেই দেখলেন চেয়ারম্যান আর তার স্ত্রী বিধ্বস্ত অবস্থায় বারান্দায় বসে আছেন। বর্তমান পরিস্থিতির চাপ তাদের ভেতরটা খোকলা করে দিয়েছে। অনিন্দিতা সরাসরি তাদের সামনে এসে দাড়াল। কোনো ভূমিকা না করেই তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব, আপনার মেয়ে অরুনিমার ব্যাপারে আমার কিছু জরুরি তথ্য লাগবে। কেন সে নদীতে গিয়ে আত্মহত্যা করেছিল? পুলিশ ফাইলে অনেক কিছুই অস্পষ্ট।”

চেয়ারম্যান মুখ তুলে তাকালেন। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেল। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “ম্যাডাম, ওই অভিশপ্ত দিনের কথা আর মনে করাবেন না। আমাগো আদরের মাইয়াটা কেন এমন করল, তা আমরা শত চেষ্টা করেও জানতে পারিনি।”

অনিন্দিতা সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “অরুনিমার সাথে জমিদার বাড়ির তাওহীদের কোনো সম্পর্ক ছিল? আপনারা কি জানতেন যে অরুনিমা তাওহীদকে ভালোবাসত?”

এই প্রশ্নটা শুনতেই অরুনিমার মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, “না ম্যাডাম, আমরা কিছুই জানি না। অরুনিমা কাউরে কিছু বলে নাই। আমাগো সামনে কোনোদিন কোনো ছেলের কথা মুখে আনেনি। কিন্তু ওই ঘটনার কিছুদিন আগে থাইকা ও একদম মনমরা হইয়া থাকতো। কারো সাথেই কথাবার্তা বলত না। সারাদিন ঘরের কোণায় বইসা কী যেন ভাবত।”

অনিন্দিতা নিজের নোটবুকে টুকে নিল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “ও কি ওই সময় কোনো চিঠি লিখে গেছিল? বা কোনো চিরকুট?”

চেয়ারম্যান সাহেব মাথা নাড়লেন, “না। আমরা ঘরবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজছি, কিচ্ছু পাই নাই। শুধু দেখতাম ও মাঝে মাঝে কাঁদত। আমরা জিজ্ঞেস করলে বলত মাথাব্যথা করতেছে। আমরা ভাবছিলাম হয়তো পড়ার চাপ-টাপ। জানলে কি আর মাইয়াডারে চোখের আড়াল করি?”

অনিন্দিতা লক্ষ্য করল, চেয়ারম্যান তাওহীদের নাম শুনেই অস্বস্তিতে পড়ছেন। তিনি চাপ দিয়ে বললেন, “তাওহীদ কি আপনাদের বাড়িতে আসত? বা অরুনিমার সাথে বাইরে দেখা করত?”

চেয়ারম্যানের স্ত্রী এবার ডুকরে উঠলেন, “তাওহীদ তো জমিদার বাড়ির পোলা, গ্রামের সবার লগে ওর খাতির। কিন্তু অরুনিমার লগে ওর কোনো কথা হইছে বইলা আমাদের মনে পড়ে না। তবে অরুনিমা মরার দিন সকালে ওকে খুব অস্থির দেখছিলাম। আমাগো বাড়িতে বারবার আসছিল।”

অনিন্দিতা রায় বুঝতে অসুবিধা হলো না, অরুনিমা বড় কোনো গোপন সত্য নিয়ে মারা গেছে বা গায়েব হয়েছে। সে চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনার মেয়েকে আপনারা যতটা সহজ ভাবছেন, ঘটনা হয়তো তারচেয়েও অনেক বেশি জটিল। আমি অরুনিমার ঘরটা একবার তল্লাশি করতে চাই। আপনাদের লুকানো কোনো তথ্য যদি পরে আমার হাতে আসে, তবে সেটা ভালো হবে না।”

অনিন্দিতা রায় সময় নষ্ট করল না। চেয়ারম্যানের স্ত্রীর দেখানো পথ ধরে তিনি অরুনিমার ঘরে ঢুকলেন। ঘরটা ধুলোর আস্তরণে ঢাকা থাকলেও আসবাবপত্রগুলো এখনো আগের মতোই সাজানো। তিনি ঘরের প্রতিটি কোণা, পুরনো বইয়ের তাক আর আলমারি খুঁটিয়ে দেখলেন। কিন্তু প্রকাশ্যে তেমন কিছু নজরে এল না। তবে তার তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না জানালার পাশে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট কাঠের বাক্স। সেটা সংগ্রহ করে তিনি চেয়ারম্যান দম্পতিকে বিদায় জানিয়ে থানার দিকে রওনা দিলেন। তার মনে হচ্ছে, অরুনিমার মনমরা থাকা আর তাওহীদের বারবার চেয়ারম্যান বাড়িতে আসার পেছনে কোন না কোন যোগসূত্র রয়েছে।

এদিকে ইটভাটায় চরম অস্থিরতা। তাওহীদ বাইরে থেকে কিছুক্ষণ পায়চারি করে নিজের ভয়টা কাটানোর চেষ্টা করল। নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছে, নিশ্চয়ই কেউ তাকে ভয় দেখানোর জন্য নাটক করছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে আবার সেই অন্ধকার ঘরটার দিকে পা বাড়াল যেখানে তার শিকারগুলো রয়েছে। তাওহীদ ঘরে ঢুকেই কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, “ওই! তোরা এখনো মুখ খুলবি না?”

কিন্তু ঘরের ভেতর পা দিতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। টর্চের আলো ফেলতেই সে দেখল শিশির রক্তাক্ত অবস্থায় এক কোণায় পড়ে আছে কিন্তু তাহমিদ যে খুঁটির সাথে বাধা ছিল, সেই খুঁটিটা খালি! বাঁধন ছেঁড়া দড়িগুলো মেঝেতে পড়ে আছে। তাওহীদ পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, “ভাই কই? এই! আমার ভাই গেল কোথায়?”

তাওহীদ উন্মত্তের মতো ঘরটা তন্নতন্ন করে খুঁজল। ইট স্তূপের আড়ালে, অন্ধকার কোণায় কোথাও তাহমিদের চিহ্ন নেই। হঠাৎ তাওহীদের মাথায় বজ্রপাতের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল। একটু আগে একটা কণ্ঠস্বর তাকে শাসিয়ে গেল, পাথরটা ওপর থেকে পড়ল আর এখন তাহমিদের উধাও হয়ে যাওয়া! তাওহীদের দুচোখ বিস্ময় আর রাগে বড় বড় হয়ে গেল। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “তাহমিদ! তারমানে একটু আগে ওই কণ্ঠস্বর আমার আপন ভাইজানের ছিল? ওই আমারে ভয় দেখাইয়া গেল? এই গুটিবাজি তাহমিদ করতেছে?”

তাহমিদ কোনোভাবে নিজের বাঁধন খুলে ফেলেছে এবং অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। অথবা, তাহমিদই সেই ‘অদৃশ্য আততায়ী’ সেজে তাকে ঘোল খাওয়াচ্ছে। নিজের আপন ভাইয়ের এই বিশ্বাসঘাতকতা তাওহীদকে আরও হিংস্র করে তুলল। সে পৈশাচিক চিৎকার করে বলল, “তাহমিদ! তুই আমার ভাই হইয়া আমার পিঠে ছুরি মারলি? বের হ! সাহস থাকলে সামনে আয়। তোরে আমি জ্যান্ত মাটির নিচে পুইড়া দিমু!”

মৃন্ময়ী আর শিশির অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, তাওহীদ নিজের সাথেই লড়ছে। ভয়ের চেয়েও প্রতিহিংসা তাওহীদকে অন্ধ করে দিচ্ছে। আচমকা সে ঘরের ভেতর উন্মাদের মতো হাসতে লাগল। ধীর পায়ে আবার মৃন্ময়ীর দিকে এগিয়ে গেল। মৃন্ময়ী ভয়ে দেয়ালের সাথে সেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাওহীদ ওর চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টানে মাঝখানে নিয়ে এল। তাওহীদ মৃন্ময়ীর মুখের ওপর নিশ্বাস ফেলে বিকৃত স্বরে বলল, “তাহলে গুজবটা মিছা না? আমার বড় ভাইজান তাহমিদ যে তোরে মনে মনে ভালোবাসত, সেইটা তো আজ হাতেনাতে প্রমাণ হইয়া গেল! শয়তানটা নিজের ভাইরে ধোঁকা দিয়া তোরে বাঁচাইতে আসছিল?”

মৃন্ময়ী ব্যথায় কুকড়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “ওনারে এই জঘন্য কাজের মধ্যে টানিস না। সে তো মানুষের মতো মানুষ, তোর মতো জানোয়ার না।”

তাওহীদ পৈশাচিক হাসল। মৃন্ময়ীর চিবুকটা জোরে চেপে ধরে বলল, “ঠিক আছে চল! ভাই যখন তোরে এতই ভালোবাসে, তখন তোরে তো হাতছাড়া করা যায় না। তোরে নিজের বউ বানায়া ঘরে তুলুম। তারপর সারাজীবন তাহমিদ আর মাস্টার দেখুক যে মৃন্ময়ী কার চরণে পইড়া থাকে। এরচেয়ে বড় প্রতিশোধ আর কী হইতে পারে?”

শিশির রক্তমাখা মুখে চিৎকার করে উঠল, “তাওহীদ!”

বিজ্ঞাপন

তাওহীদ এক লাথিতে শিশিরকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “চুপ কর মাস্টার! আজ রাতেই কাজটা শেষ করুম। কাজী ডাকার দরকার নাই, আমি নিজেই কাজী।”

মৃন্ময়ী আর্তনাদ করে বলল, “আমি মইরা যাব, তাও তোর মতো জানোয়ারকে বিয়া করব না।”

তাওহীদ ভ্রুক্ষেপ করল না। এক হাতে মৃন্ময়ীর হাত ধরে রেখে তার লোকদের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল, “আশপাশে দেখ, কোনো লাল কাপড় পাওয়া যায় কিনা। ছিঁড়া হোক বা যেমনেই হোক একটা লাল কাপড় জোগাড় কর।”

লোকটা ভয়ে ভয়ে দৌড়ে গেল এবং পাশের পরিত্যক্ত ঘর থেকে এক টুকরো রক্তবর্ণের পুরনো চাদর ছিঁড়ে নিয়ে এল। কাপড়টা ধুলোবালি মাখা। তাওহীদ সেটা মৃন্ময়ীর সামনে দোলাতে দোলাতে বলল, “জমিদার বংশের পোলা যখন কিছু চায়, তখন তা ছিনায়া নিতে জানে।”

তাওহীদ যখন দাঁতে দাঁত চেপে মৃন্ময়ীর মাথায় সেই ধুলোবালি মাখা লাল কাপড়টা জোর করে জড়িয়ে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। এই চরম মুহূর্তে বাঁধা পেয়ে তাওহীদ বিকট একটা গালি দিয়ে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে আব্বা লেখা দেখে তার বিরক্তি চরমে পৌঁছাল। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে জমিদার মকবুল রহমানের আতঙ্কিত ও উত্তেজিত গলা শোনা গেল, “তাওহীদ! তুই এই মুহূর্তে যেখানেই থাকোস, জলদি বাড়িতে আয়।”

তাওহীদ চেঁচিয়ে উঠল, “আব্বা! আমি একটা জরুরি কাজে আছি। এই সময় ডাইকেন না তো!”

মকবুল রহমান গর্জিয়ে উঠলেন, “তোর জরুরি কাজ চুলোয় যাক!”

ফোনটা কেটে গেল। তাওহীদ রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতের ফোনটা ইটের দেয়ালে আছড়ে মারল। ফোনটা চুরমার হয়ে গেল। সে মৃন্ময়ীর দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে গজগজ করতে করতে বলল, “তোর কপাল ভালো মৃন্ময়ী। যমদূতের হাত থিকা আজ বেঁচে গেলি। কিন্তু মনে রাখিস তাওহীদ যা ধরে, তা ছাড়ে না।”

সে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দিকে ফিরে কর্কশ গলায় নির্দেশ দিল, “এই দুইটারে আবার শক্ত কইরা বাঁধ। আর শুন, খবরদার! এই ঘর থিকা যেন একটা আওয়াজও বাইরে না যায়। আমি বাড়ি থিকা ঘুরে আসি, তারপর হিসাব শেষ করুম। আর ওই তাহমিদরে যদি দেখস, তবে ওরেও বান্ধবি। ওরে আমি নিজের হাতে শিক্ষা দিমু।”

তাওহীদ বেরিয়ে যাওয়ার সময় মৃন্ময়ীকে একটা হিংস্র ধাক্কা দিল। মৃন্ময়ী দেয়ালে আঘাত পেয়ে আর্তনাদ করে উঠল। ওরা বেরোতেই ইটভাটার প্রকোষ্ঠে মরণপণ নিস্তব্ধতা নেমে এল। কেবল দূরে তাওহীদের জিপ স্টার্ট দেওয়ার শব্দটুকু মিলিয়ে গেল। মৃন্ময়ী মেঝের ওপর পড়ে হাঁপাচ্ছিল। ও উঠে বসার চেষ্টা করল। পুরো শরীর ব্যথায় অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু চোখের সামনে শিশিরের রক্তাক্ত দেহটা দেখে নিজের যন্ত্রণা ভুলে গেল। শিশির দেয়াল ঘেঁষে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে। তার সাদা পাঞ্জাবিটা রক্তের নকশায় চেনা যাচ্ছে না। চোখ দুটো আধবোজা, মুখ দিয়ে অনবরত নোনা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মৃন্ময়ী শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ঘষটে ঘষটে শিশিরের একদম কাছে এগিয়ে এল। নিজের হাত দুটো পেছনে শক্ত করে বাঁধা, কিন্তু তাতে কী? ও শিশিরের কষ্ট সহ্য করতে পারছে না। অস্ফুট স্বরে ডাকল, “শোনেন, আমার দিকে তাকান।”

শিশির চোখ মেলল। মৃন্ময়ীর চোখের জল আর ডুকরে ওঠা কান্না দেখে ঠোঁটের কোণে একচিলতে করুণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন, “মৃন্ময়ী তুমি ঠিক আছ?”

মৃন্ময়ী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। নিজের বাঁধন খোলার সাধ্য নেই, তাই নিজের শরীরটা একটু বাঁকিয়ে শিশিরের মুখের কাছে নিয়ে এল। হাত পেছনে থাকায় ও নিজের কনুই দিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে শিশিরের গাল আর ঠোঁট বেয়ে পড়া গাঢ় রক্তটুকু মোছানোর চেষ্টা করতে লাগল। পরনের কাপড় আর কনুইয়ের ঘষায় শিশিরের ক্ষততে লাগছে, তবুও মৃন্ময়ীর এই আকুতি দেখে শিশির স্থির হয়ে রইল। মৃন্ময়ী ধরা গলায় বলল, “আমার জন্য আপনার আজ এই দশা। আপনি কেন আসলেন ওই শয়তানটার সামনে? ও একটা জানোয়ার।”

শিশির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অস্পষ্ট স্বরে বললেন, “মরতে তো একদিন হবেই মৃন্ময়ী। কিন্তু তোমার সম্মানের ওপর আঁচড় লাগতে দিব না।”

মৃন্ময়ী বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “তাহমিদ ভাই কোথায় গেল? সে কি সত্যিই এসব করছে?” শিশির কিছু বলতে চাইল, কিন্তু যন্ত্রণায় কপাল কুঁচকে এল। এই অন্ধকার ঘরে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মৃন্ময়ীর এই সামান্য হাতের স্পর্শ আর মমতা শিশিরের কাছে তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ওষুধ বলে মনে হচ্ছিল। মৃন্ময়ী ধরা গলায় পুনরায় বলল, “আমরা কি কোনোদিন এই নরক থিকা বের হইতে পারব না? এখানকার আওয়াজও কারো কানে যাইব না। আমাদের কি কেউ বাঁচাইতে আইব না? আমার ভয় লাগতাছে। ওরা আবার আইলে আমরা আর বাঁচতে পারমু না।”

শিশির যন্ত্রণায় চোখ বুজে ছিল। তাওহীদের রডের আঘাতে সারা শরীর ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে, বিশেষ করে হাত দুটো রক্তাক্ত হয়ে একদম অবশ হয়ে আছে। রক্তাক্ত হাত তাই ওরা বাঁধার প্রয়োজনবোধ করেনি।

মৃন্ময়ীর কান্নার শব্দে শিশির কাঁপতে থাকা ডান হাতটা তুলল। হাত বাড়িয়ে মৃন্ময়ীকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিল। অস্ফুট স্বরে বললেন, “সাহস হারাইয়ো না। যে অন্ধকার ঘনায়, সে আবার চলেও যায়। আল্লাহ সহায় থাকলে কেউ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবে না।”

বলতে বলতেই শিশির তাঁর অবশ হয়ে আসা আঙুলগুলো দিয়ে মৃন্ময়ীর পেছনে থাকা হাতের বাঁধনটা অনুভব করার চেষ্টা করল। বাঁধনটা খুব শক্ত ছিল। তার হাতের কাটা ক্ষতগুলো থেকে আবার রক্ত চুইয়ে পড়তে তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সে সেই দড়ির প্যাঁচগুলো খুলে দিল। মৃন্ময়ী বিদ্যুৎবেগে হাত সামনে নিয়ে এসে শিশিরের রক্তাক্ত হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। ডুকরে উঠে বলল, “আপনার হাত ফেটে রক্ত বের হইতেছে! আপনি আমার লাইগা এত কষ্ট কেন করতেছেন?”

শিশির ম্লান হাসল। ঘামে ভেজা কপালে চুলের কয়েকটা গোছা লেপ্টে আছে। খুব নিচু স্বরে বলল, “নিজের কষ্টের চেয়ে তোমার মুক্তিটা বেশি দরকার ছিল।” মৃন্ময়ীর চোখজোড়া অশ্রুতে টইটুম্বর হয়ে গেল।

.

জমিদার বাড়িতে থমথমে পরিবেশ। মকবুল রহমান অস্থিরভাবে পায়চারি করছেষ। তাওহীদ ঘরে ঢোকা মাত্রই তিনি মেসেজটা দেখালেন। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে আসা খুদেবার্তা জ্বলজ্বল করছে, “তাওহীদকে আমি কিছুই করব না, কিন্তু একটা শর্ত আছে। শর্তটা স্বয়ং জমিদার মশাইকে পালন করতে হবে। একজনকে খুন করতে হবে, আগামীকাল। কখন, কোথায় সেটা আমি সময়মতো জানিয়ে দেব।”

তাওহীদ মেসেজটা পড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। উদ্ধত গলায় বলল, “আব্বা, এইসব ফালতু মেসেজে আপনি ডরান? কে এই পাগল যে জমিদারে হুকুম দিতাছে? আমি এসবরে ডরাই না। ওই শয়তানরে সামনে পাইলে আমি নিজেই শেষ করুম।”

মকবুল রহমান দাঁতে দাঁত চেপে তর্জনী উঁচিয়ে বললেন, “তুই চুপ কর! পরিস্থিতি তুই বুঝতাছোস না। পুলিশ কমিশনার ফোন দিছে, অনিন্দিতা রায় আমাগো ফাইল খুইলা বসছে। এই খুনি যা করতেছে তাতে আমরা মরুম। আমি প্রস্তাবে রাজি। যারে মারতে কয় কাল তারেই মারুম, কিন্তু পুলিশের এই গেরো আর লাশের মিছিল থেকে মুক্তি চাই। তাড়াতাড়ি এই আপদ নিরসন করা লাগব।”

তাওহীদ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল, “আব্বা, একটা কথা কই। আমি ঠিক করছি মৃন্ময়ীরে আমি বিয়া করমু।”

ছেলের কথা শুনে মকবুল রহমান থমকে দাঁড়ালেন। তাওহীদ এবার সাহস সঞ্চয় করে তাহমিদের ঘটনাও বলতে শুরু করল। কথাটা শেষ করার সাথে সাথে ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে একটা প্রচণ্ড শব্দের প্রতিধ্বনি হলো। মকবুল রহমান সজোরে তাওহীদের গালে এক চটকানা বসিয়ে দিলেন। থাপ্পড়ের চোটে তাওহীদ টাল সামলাতে না পেরে সোফার ওপর গিয়ে পড়ল। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “হারামজাদা! বাড়িতে আগুন লাগছে আর তুই আসছোস বিয়া করতে? একদিকে পুলিশ ফাঁস বুনতাছে, আরেকদিকে আমার ব্যবসা ডুবছে। সব তোর এই বদমায়েশির লাইগা! জমিদার বংশ কি শেষমেশ ওই জহির মোল্লার মাইয়ার আঁচলে মুখ লুকাইবো? ছিঃ! ওরা দুইটা তোর কাছে না? যা গিয়া আগুন লাগায়ে দে। মাইরালা দুইটারে, ব্যস কিচ্ছা খতম। না থাকল মাথা, আর না থাকল মাথাব্যাথা।

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প