প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ৯

🟢

আলিফ তাওহীদকে বাড়ি নিয়ে এলো। তাওহীদের অবস্থা শোচনীয়। সালেহা দেখেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। মকবুল রহমান এসে দেখলেন, ছেলের শ্বাসের ওঠানামা এখনও অনিয়মিত, চোখেমুখে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। শরীরের কোথাও কোথাও রক্ত শুকিয়ে জামাট বেঁধে গেছে। তাওহীদ কোনো কথা বলতে পারছে না, সেই শক্তি নেই তার। আততায়ীর পরিচয় বা উদ্দেশ্য, কিছুই সে বলতে পারল না। লোকটা কয়েক বছর আগের কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলছিল। কিন্তু সেই ঘটনাটা কি? তাওহীদ চেষ্টা করেও কিছু মনে করতে পারল না। ডাক্তার এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গেলেন। বললেন, “পুরোপুরি সুস্থ হতে অন্তত দু’দিন সময় লাগবে।”

এই সুযোগে মকবুল রহমান কাজে নেমে গেলেন। ছেলেকে বোঝালেন, “হামলাকারী যে হোক না কেন, ইয়াসিফকে এই কেসটায় ফাঁসিয়ে দেওয়া উচিত। আমাদের সুবিধা তখনই হবে, যখন একজন একজন করে প্রতিপক্ষ কমবে। ইয়াসিফ কিন্তু তক্কে তক্কে আছে, ব্যাটার বুদ্ধি রগে রগে। যখন যা খুশি তাই করতে পারে।”

তাওহীদ ভাবল, হ্যাঁ সময় এখন তাদেরই পক্ষে। বাবার কথায় রাজি হয়ে গেল। পুলিশ তার বয়ান নিল। সেইদিনই ইয়াসিফকে গ্রেপ্তার করা হলো। কারণ হিসেবে বলা হলো, তাওহীদের উপর হামলার ঘটনার সাথে তার জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাহের আকন্দ যতোই প্রতিবাদ করতে চাইলেন, আর কোনো কার্যকর উপায় হাতে ছিল না। ইয়াসিফও প্রতিরক্ষা করার চেষ্টা করল না। সে ভালো করেই জানে, এখানে কোনো কথা বলার লাভ নেই। জমিদার বেশ চালাক! তার সাথে তারই মত করে খেলতে হবে। এমন লোকের সামনে সরল হয়ে দাঁড়ালে নিজেরই ক্ষতি হবে। সময় এবং সুযোগ দুটোকেই নিজের আয়ত্তে আনতে হবে। তার আগে বরং একটু জেলের হাওয়া খেয়ে আসা যাক! ওই চার দেয়ালের ভেতর বসে মাথার বুদ্ধিতে শান দেওয়া যাবে। অপরাধীদের সাথে দিন কাটিয়ে মানুষ চিনতে শেখা যাবে; কে কীভাবে ভাবে, কে কোথায় দুর্বল, কে কাকে ভয় পায়! অভিজ্ঞতা না নিলে লড়াই জেতা যায় না, এই সত্যটা ইয়াসিফ খুব ভালো করেই জানে।

এতদিনে এত ঘটনা ঘটে গেল, এই সবের মাঝে তাওহীদের সঙ্গে ইয়াসিফের মুখোমুখি দেখা হয়নি। আজ হলো, হঠাৎ করেই। আকন্দ বাড়ির সামনের ভিড়ের মধ্যে মানুষ কৌতূহলী চোখে তাকিয়েছিল। ইয়াসিফ তখন পুলিশের মাঝখানে। হাতে হাতকড়া পড়ানো, দুই হাত সামনের দিকে বাঁধা। তাকে জিপে তোলার আগ মুহূর্তে ভিড় ঠেলে তাওহীদকে আসতে দেখা গেল। চোখাচোখি হতেই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু স্থির হয়ে গেল। তাওহীদ এগিয়ে এলো। তার চোখে জয়ীর দম্ভ। ঠোঁটের কোণে বক্র হাসি যেন বলছে, “দেখলি? শেষমেশ তোকে এখানে এনেই ছাড়লাম।”

ইয়াসিফ অলক্ষ্যে সামান্য এগিয়ে এলো। দুই হাত একসাথে বাঁধা থাকায় সে মুষ্টি করতে পারল না, কিন্তু কনুইটা তুলতে পারল। প্রচণ্ড জোরে কনুই চালিয়ে দিল তাওহীদের মুখের দিকে। আচমকা আঘাতে তাওহীদ সামলে নিতে পারল না। নাকের পাশটা ফেটে গেল, মুখ বেঁকে গেল যন্ত্রণায়। ভিড়ের মধ্যে হৈচৈ পড়ে গেল। পুলিশ তৎক্ষণাৎ ইয়াসিফকে টেনে ধরল, দু’জন কনস্টেবল শক্ত করে চেপে ধরল তার কাঁধ। তাওহীদ চিৎকার করে উঠল। ইয়াসিফ পুলিশের ধরে রাখা অবস্থাতেই তাকাল তার দিকে। নিজের ভেতর জমে থাকা আগুনটা আর চেপে রাখা গেল না। কোন বাঁধা নিষেধ মানল না। কনুইয়ের আঘাতে তাওহীদ যখন সামলে উঠতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ইয়াসিফ শরীরটা নিচু করে পা দিয়ে আঘাত করল। প্রথম লাথিটা পড়ল তাওহীদের হাঁটুর একটু ওপরে। আকস্মিক যন্ত্রণায় তাওহীদের পা বেঁকে গেল, সে এক কদম পেছনে হোঁচট খেল। চিৎকারটা গলার ভেতরেই আটকে গেল। দ্বিতীয় লাথিটা আরও নির্মম ছিল। সরাসরি পেটের নিচে। নিঃশ্বাস আটকে এলো তাওহীদের। মুখ দিয়ে একটা অস্পষ্ট গোঙানি বেরিয়ে এলো। আবারও হইচই পড়ে গেল, “আরে ধরো! কি করছেটা কি?”

পুলিশ আর ঝুঁকি নিল না। তিনজন মিলে ইয়াসিফকে টেনে জিপে তুলল। একজন কনস্টেবল রাগে চেঁচিয়ে উঠল, “এই! খবরদার। বেশি বাড়বাড়ি করার চেষ্টা করলে কিন্তু এক্কেরে খুনের দায়ে সারাজীবনের লাইগ্যা হাজতে হান্দাইয়া দিমু।”

ইয়াসিফ কর্ণকুহরে কোন কথাই প্রবেশ করছিল না। সে রীতিমতো রাগে কাঁপছিল। বুক উঠানামা করছে দ্রুত। তাওহীদের দিকে শেষবারের মতো তাকাল। তাওহীদ মাটিতে আধা বসা অবস্থায় পড়ে আছে। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকলেও জেদের আগুনটা নিভেনি। দাঁতে দাঁত চেপে বলার চেষ্টা করল, “তোকে আমি দেখে নিব।”

হাতকড়ার শিকলটা ঝনঝন করে উঠল। ইয়াসিফ থমকাল। পুলিশ টান দিচ্ছিল, তবুও সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। নিরপেক্ষ শীতল গলায় বলল, “যে দায় জেল খাটতে হচ্ছে, সেই দায়ের সামান্য শোধ দিলাম। এরপর তুই আর আমাকে দেখার সুযোগ পাবি না। কসম, সেদিন রাতে যদি আমি থাকতাম তোকে লা’শ বানিয়ে ক্ষান্ত হতাম। যতদিন আমি আটকে আছি, মনে রাখিস তোর হায়াত ততদিনই। বেঁচে নে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নে… আমি আসছি, শুয়োরের বাচ্চা।”

এইবার তাওহীদ উঠে দাঁড়াল। ব্যথায় শরীর কাঁপছে। তবুও দম্ভ-অহংকারে বুক চাপড়ে চেঁচিয়ে উঠল, “আমাকে ভয় দেখাস? আমাকে?”

ইয়াসিফ আর কিছু বলল না। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি খেলল মাত্র। তারপর পুলিশের টানে ঘুরে গেল সে। জিপের দরজা বন্ধ হলো শব্দ করে।

.

তাওহীদ গ্রামে ফেরার পর রশিদ একাই ছিল। ইয়াসিফ আটক; এই খবরে জমিদার পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, রশিদকে দ্রুত গ্রামে ফিরিয়ে আনতে হবে। কিন্তু ফোনে তাকে পাওয়া গেল না। একবার, দু’বার... শেষমেশ গ্রাম থেকে একটা ছেলেকে পাঠানো হলো। ঠিকানা অনুযায়ী ছেলেটা পৌঁছাল বিকালে। ভেতর থেকে কেমন এক চাপা গন্ধ ভেসে আসছে। দরজাটা আধখোলা। সাহস করে ভেতরে পা রাখতেই চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল। রশিদ কোথায়? এ তো রশিদের লা’শ। শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে মোচড়ানো। দু’হাত ছড়িয়ে, আঙুলগুলো শক্ত হয়ে মুঠো পাকানো। চোখজোড়া আধখোলা, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শূন্যের দিকে। ঠোঁট ফেটে গেছে, দাঁতের ফাঁকে শুকনো রক্ত জমে কালচে হয়ে আছে। গলার চারপাশে গভীর দাগ। যেন তার পেঁচিয়ে ধরা হয়েছিল। নখের আঁচড়, রক্তজমাট ক্ষত স্পষ্ট। বুকের উপর আর পেটজুড়ে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। কোথাও ছুরির কোপ, কোথাও ভোঁতা কিছুর আঘাত। জামাকাপড় ছিঁড়ে গেছে, রক্তে ভিজে শক্ত হয়ে মেঝের সাথে লেপ্টে আছে। ঘরের দেয়ালে রক্ত ছিটকে লেগে আছে। বোঝা যাচ্ছে, প্রাণপণে বাঁচার চেষ্টা করেছিল রশিদ। সেই চেষ্টার শেষটা হয়েছে ভয়াবহভাবে। লা’শটার পাশেই ভাঁজ করা একটা চিরকুট। রক্তে ভেজা হলেও লেখাটা স্পষ্ট, “হু ইজ দ্যা নেক্সট টার্গেট?”

ছেলেটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। কোনোরকম খবর ফোন করে খবর দিতে পারল।

রশিদকে শুধু হত্যাই করা হয়নি, তার মৃ’ত্যুর সাথে নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে। পুলিশি রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় উঠে এলো সেই ভয়াবহ সত্য। তাকে মা’রার পরেও শরীরের উপর একের পর এক আঘাত করা হয়েছে। ক্ষতগুলোর গভীরতা আর সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, এটা শুধুমাত্র রাগের বিস্ফোরণ নয়। এটা বিকৃত আনন্দ। ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে তদন্তকারীদের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। একাধিক অফিসার একই কথায় একমত হন, “খু’নি মানসিকভাবে স্থিত নয়। এটা পরিকল্পিত প্রতিশোধ এবং তাতে মিশে আছে সাইকোটিক প্রবণতা।”

শত্রু যে রশিদের উপর চড়াও হতে পারে, এটা কল্পনাতেও আসেনি কারো। হিসেব অনুযায়ী পরের নিশানা নির্ধারিত। কেউ নিশ্চিত নয়, কে নিরাপদ আর কে পরবর্তী শিকার? গ্রামেজুড়ে আতঙ্ক নেমে এসেছে। প্রতিটি ঘরে রাতে দরজা-জানালা আগেভাগেই বন্ধ হচ্ছে। জমিদার বাড়িতে পুলিশি পাহারা বসেছে কড়াভাবে। রাতদিন মিলিয়ে টহল চলছে। তবুও মকবুল রহমানের কপালের ভাঁজ সোজা হচ্ছে না। এত বড় শত্রু! এত নিখুঁতভাবে একের পর এক আঘাত করছে, কিন্তু কে?

ইয়াসিফ সন্দেহের তালিকায় ছিল ঠিকই, কিন্তু সে এখন জেলের চার দেয়ালের ভেতর। কীভাবে সম্ভব? এই প্রশ্নটাই তাওহীদের মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। অন্যদের মতো সে হইচই করছে না বরং অস্বাভাবিক রকম ঠান্ডা মাথায় বসে ঘটনাগুলো মেলাচ্ছে। ময়ূরী, রাজিব, রশিদ; সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। কিন্তু যোগসূত্রটা কোথায়?

হঠাৎ করেই কয়েক বছর আগের একটা নাম বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে গেল, অরুনিমা… কিন্তু ও তো বেঁচে নেই। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালিন্দী নদীতে ডুবে আত্মহ’ত্যা করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, অরুনিমা আর তাওহীদের মধ্যেকার বিষয়টা তো কারো জানার কথা নয়। এত বছর পর হঠাৎ করে সেই অধ্যায় কেন ফিরে আসবে?

তাওহীদের কপালে ঘাম জমল। তাহলে কে? মস্তিষ্কের অন্ধকার কোণে আরেকটা নাম নড়ে উঠল, শিশির। সে কি কোনোভাবে বোনের মৃত্যুর পেছনের সত্যটা জেনে গেছে? এই প্রতিশোধের আগুন কি তার ভেতরেই এতদিন জ্বলছিল?

পরদিন সকালবেলা কাউকে কিছু না বলেই তাওহীদ শিশিরকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। এখন চেয়ারম্যান বাড়ি গিয়ে তাকে খোঁজা বোকামি। তাই উদ্দেশ্যহীনভাবেই বাজারে খুঁজল, কোথাও দেখল না। বিরক্তি আর অস্থিরতা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে দক্ষিণ দিকের পুকুরপাড়ে এসে থামল। পুকুরপাড়টা তখন নিস্তব্ধ। সকালের রোদটা পানির ওপর পড়ে ঝিলমিল করছে। দূরে কয়েকটা শালিক ডাকছে, বাতাসে কচুরিপানার কাঁচা গন্ধ। পুকুরের ধারে একা বসে আছে মৃন্ময়ী। পা দুটো পানিতে ডুবিয়ে, ছোট ছোট ঢিল তুলে নিয়ে পানিতে ছুড়ছে। ঢিল পড়লেই টুপটাপ শব্দ হচ্ছে, তারপর গোল হয়ে ছড়িয়ে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। ওকে দেখে তাওহীদের মাথার ভেতরের ঘুমন্ত শয়তানটা নড়ে উঠল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, পদচারণা ইচ্ছে করেই চাপা রাখল। পেছন থেকে বলল, “কি সুন্দরী, কার জন্য অপেক্ষা করছো?”

মৃন্ময়ী একটুও চমকাল না। তাওহীদ বিড়ালের মতো নিঃশব্দে এলেও পানিতে তার অবয়ব ধরা পড়ে গেছে। না তাকিয়েই ও আরেকটা ঢিল ছুঁড়ে দিল। টুপ করে শব্দ হলো। বলল, “আপনার জন্য নয়, নিশ্চিত থাকুন।”

বিজ্ঞাপন

তাওহীদ হেসে উঠল। হাসিটা কানে ঠেকার মতো। সে আরও কাছে এগিয়ে এসে বক্র সুরে বলল, “আহা, আমার জন্য একটু অপেক্ষা করলে কি হয়?”

মৃন্ময়ীর ঘুরে সরু দৃষ্টিতে তাকাল, “সোজা কথা বলুন, এখনও বেঁচে আছেন আপনে? আপনের না মরে যাওয়ার কথা ছিল।”

তাওহীদ ভুরু কুঁচকে ফেলল, “আমারে মারা এত সহজ?”

মৃন্ময়ী ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, “সহজ না? ইয়াসিফ ভাই তো সেদিন রাস্তায় ফেলে মারল। হাতকড়া পড়ানো না থাকলে নির্ঘাত মেরেই ফেলত। তারপর আরেকদিন রাতে কে যেন আপনার উপর আক্রমণ করল। এগুলো কী? আদর-আপ্যায়ন করে বসিয়ে খাওয়ানো?” মৃন্ময়ীর ঠোঁটে হাসি খেলল। হাসিটা তাওহীদের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মৃন্ময়ী আবার বলল, “আচ্ছা, আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা তো খুন হচ্ছে। শুনলাম, পরবর্তীতে নাকি আপনি মরবেন? আপনার চল্লিশায় বিরিয়ানি দিয়েন কিন্তু। শুধু শুধু দু’টো জিলাপি দিয়ে দায় খালাস কইরেন না। আমার জিলাপি পছন্দ না।”

তাওহীদ নিজেকে সামলাতে পারল না। খপ করে মৃন্ময়ীর হাত চেপে ধরল, “খুব শখ বিরিয়ানির?”

মৃন্ময়ী নিজের হাতের দিকে তাকাল। চোখ তুলে ঠান্ডা স্বরে বলল, “যা বলার মুখে বলেন। হাতটা ছেড়ে দেন।”

পরের মুহূর্তেই ও জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু তাওহীদ ছাড়ার পাত্র নয়। ক্ষণিকের মধ্যেই সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক হাত বাড়িয়ে মৃন্ময়ীর থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরল। আঙুলের চাপে চোয়াল কেঁপে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, “এত দেমাগ আয় কইত্তে? তোর বোনের কথা মনে আছিল না? শইল্যের এই দেমাগের কারণেই মা* মরছে। তুইও মরবি।”

মৃন্ময়ীর মুখটা ব্যথায় টানটান হয়ে গেল। তবুও চোখ নামাল না। ঠোঁটের কোণে একফোঁটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। স্পষ্ট স্বরে বলল, “আপনে মারবেন? আপনে নিজেই তো মরবেন।”

এই কথাটুকুই যথেষ্ট ছিল তাওহীদের পায়ের রক্ত মাথায় উঠাতে‌। তার আঙ্গুল আরও শক্ত হয়ে চেপে বসল‌। মৃন্ময়ীর নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। তাওহীদ মুখটা কাছে নিয়ে এলো, “বুঝোস না কার সামনে কথা কইতেছস? বেশি বাড় বাড়লে এই পুকুরেই তোর লাশ ভাসবে।”

“হাত সরান।”

মুহূর্তের ভেতর তাওহীদের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। মৃন্ময়ীর চোখে ভয় না দেখে, স্থির ঘৃণা দেখে সে ক্ষণিক থমকাল। ঠিক তখনই মাথায় আরেকটা নাম খচ করে উঠল, শিশির। সে থুতনির চাপটা সামান্য ঢিলে দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “এই দেমাগটা ওই শিশির শিখাইছে? দিনে দিনে তোর বাড়িতে যাতায়াত বাড়ছে শুনি। খুব দরদ দেখায় না?”

“তার নাম আপনের নোংরা মুখে মানায় না।”

ব্যস, তাওহীদের ভেতরের সন্দেহ আরও পাকাপোক্ত হয়ে গেল। ওকে ছেড়ে দিয়ে এক পা পেছনে সরে এসে আঙুল তুলে বলল, “আমি জানতাম। ওই শিশির সবের মূলে। ওই সব করতাছে না?”

মৃন্ময়ী সোজাসুজি তাকাল, “আপনি ভুল মানুষরে ভাবতেছেন।”

তাওহীদ হুঙ্কার ছাড়ল, “ভুল না। যদি এইসব কাণ্ডের পেছনে ওই শিশিরের হাত থাকে, তাইলে মনে রাখিস তোর আগে ওর গলায় দড়ি পড়বে।”

এই কথা বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল। মৃন্ময়ী আর কিছু বলার সুযোগ পেল না। তাওহীদ চোখের আড়াল হতেই ও নিজেও অস্থির ভাবে দৌড়াতে শুরু করল। উদ্দেশ্য, চেয়ারম্যান বাড়ি। শিশিরকে সাবধান করতে হবে। নরপিশাচদের নজর পড়েছে তার উপর!

বাড়ি এসে শিশিরকে পাওয়া গেল না। চেয়ারম্যানের সাথে পাশের গ্রামে গেছে একটা সালিশে। আগামীকাল সকাল সকাল আসবে।

.

এই রাতটাও অভিশপ্ত হয়ে উঠল। উক্ত ঘটনা এবং তাওহীদের সঙ্গে জড়িত আরও দু’জন, মোহন আর পারভেজ; দু’জনকেই খু’ন করা হলো।

ভোরের আলো ফুটতেই প্রথমে পাওয়া গেল মোহনের লা’শ। গ্রামের বাইরে পুরোনো ইটভাটার ধ্বংসস্তূপের পাশে পড়েছিল। তার হাত-পা অস্বাভাবিক কোণে বাঁকানো। গায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। বুকের ওপর কাঁদায় ভেজা ফতুয়ার পকেটে র’ক্তে লেখা একটাই বার্তা, “খু’নি শুধু খু’ন করেই ক্ষ্যান্ত হচ্ছে না, সময়ের তালে ওদের নিয়ে খেলেছে।”

পারভেজের লা’শ মিলল ঘণ্টাখানেক পরে। গ্রামের পাশের শুকনো খালের ধারে। তার অবস্থাও একই। শরীরজুড়ে আঘাতের দাগ, মুখটা বিকৃত হয়ে গেছে। চোখ দুটো খোলা, স্থির, শূন্যে তাকিয়ে আছে। তার পাশে আরেকটা বার্তা পাওয়া গেল, “চূড়ান্ত হিসেবের সময় ঘনিয়ে আসছে। আর মাত্র একজন! তারপর...”

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প