প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ৮

🟢

সকাল থেকেই তাওহীদ একনাগাড়ে রাজিবকে ফোন করছে। কিন্তু ওপাশে নিরুত্তর। ফোনটা বাজে, তারপর কেটে যায়। যে পঞ্চাশ হাজার টাকা বাবার হাতে পৌঁছানোর কথা ছিল, সেটাও এখনও পৌঁছায় নাই।

যেখানে এখন তাওহীদ রয়েছে, সেখানে রশিদও এসে উঠেছে। ঢাকা শহরে খরচের শেষ নেই। দু’জনের থাকা-খাওয়া, চলাফেরায় খরচ তো হবেই। তাওহীদ আগে থেকেই উড়ানো স্বভাবের ছেলে, দৈন্যতা তার পোষায় না। হাতে টান পড়তেই তাই মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। সকালে বাবাকে সে কথাটা বলতেই তিনি নির্লিপ্ত গলায় বলে দিয়েছেন, “রাজিবের কাছে তো টাকা আছে। ওকে ফোন দে, নিয়ে নে।”

সেই থেকে এখন বিকাল পর্যন্ত তাওহীদের ফোন থামছে না। কিন্তু রাজিব যেন হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেছে। বাকি বন্ধুদের কাছেও ফোন দিয়েছে তাওহীদ। কেউ কিছু জানে না। আজ সকালে জুয়ার আসর বসেছিল, সেখানেও রাজিব যায়নি। এতদিনে এই প্রথম! এখানেই তাওহীদের মনের ভেতর সন্দেহটা দানা বাঁধল। কিছুক্ষণ বাদে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে সেটা নিশ্চিত ধারণায় রূপ নিল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “শালা, এত টাকা একসাথে দেখে লোভ সামলাইতে পারেনি। নিশ্চয়ই টাকা নিয়ে পালাইছে।”

রাগে সে রীতিমতো কাঁপছিল। রশিদ ভয় পেয়ে গেল, সে শান্ত করার চেষ্টা করল তাওহীদকে। তাওহীদ এক ঝটকায় হাত সরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আরেক বিশ্বস্ত বন্ধু মোহনের নম্বর ডায়াল করল। নিচু গলায় বলল, “শোন, আমি না থাকায় কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তুই এখনই রাজীবের বাড়িতে যা। খবর নে। আর শালা কু’ত্তার বাচ্চাটারে যেদিকেই পাবি, কে’টে টু’করা টুকরা করে ফেলবি।”

আদেশ পেতে দেরি, কিন্তু কার্যসম্পাদনে কোনো দেরি নেই। মোহন সঙ্গে দু’তিনজন লোক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সোজা গেল রাজিবের বাড়িতে। টিনের ঘর, জীর্ণশীর্ণ কাঠের দরজায় ধাক্কা পড়তেই ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। রাজিবের ছোট ভাই সজিব দরজায় এসে দাঁড়াতেই মোহন ওর শার্টের কলার ঝাঁকিয়ে টেনে এনে বলল, “ভালোয় ভালোয় কইয়া দে, তোর ভাই কই?”

সজিব ভয়ে শুকনো ঢোঁক গিলল। মোহনের সঙ্গের আরেকজনও মারকুটে ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো। চেঁচামেচির আওয়াজ এর ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রাজিবের মা। এই ছেলেগুলোকে চেনেন তিনি। রাজিব সবসময় এদের সাথেই চলাফেরা করে। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এলো, “ওয় কি করছে বাবা?” বলেই দুই হাত জোড় করলেন তিনি, “ওয় তো তোমগো বন্ধু। কাইল রাইতে বাড়িতে আয় নাই। ভাবছি তোমগো লগেই আছে। আজকে সকালেও তো আয় নাই।”

“এসব নাটকের কথা শুনতে চাইতেছি না খালা। সত্যি করে কন, রাজিব কই?”

তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, “আমার পোলাডা কই গেছে বাবা?”

মোহন বিরক্ত হয়ে গেল। বাকিদের চোখের নির্দয় দৃষ্টি সরু হয়ে এল। মোহন গলা নামিয়ে হুমকির সুরে বলল, “খেয়াল কইরা কথা কইবা খালা। রাজিব যদি কোনো চালাকি কইরা থাকে, তাইলে তার দায় তোমরা এড়াইতে পারবা না।” এক পা এগিয়ে এসে আঙুল তুলে সজীবের দিকে দৃষ্টি তাক করে বলল, “ওরে পাইলে কইয়া দিস, টাকা নিয়া পালাইলে বাঁচবার চান্স নাই। আর তোরা যদি কিছু লুকাস, তাইলে এই ঘর জ্বালায় দিয়া পঞ্চাশ হাজার টাকা উসুল করুম। কথা যেন মাথায় থাকে।”

মোহন সজীবের মাথায় দু’বার টোকা দিল তারপর বেরিয়ে গেল।

দু’দিন ধরে রাজিবের খোঁজ চলল। থানায় সাধারণ ডায়েরি থেকে কেস ফাইল হলো। জমিদারের লোকজন ছড়িয়ে দিল, “রাজিব বিশ্বাসঘাতকতা করে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে। কেউ তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কারিত হবে।” গ্রামের মানুষ খুব একটা পাত্তা দিল না। জমিদারের টাকা, জমিদারের লোকদের ঝামেলা, ওরা যা করছে করুক। সবাই নিজের মতো করে বাঁচতে ব্যস্ত।

তৃতীয় দিন, সকালবেলা। জমিদার বাড়ির কাজের মেয়েটা ঝাঁটা হাতে বাড়ির পেছনের জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়েছিল। বর্ষার পরে আগাছা বেড়ে গিয়েছিল অনেকটা। ঝোপের ভেতর ঢুকতেই সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। একটা পঁচা উটকো গন্ধ। কোনো জন্তু-জানোয়ার মরে পড়ে আছে বোধহয়। মেয়েটা নাক চেপে আরেকটু এগোতেই চোখে পড়ল মাটির উপর উল্টে থাকা একটা কাপড়ের স্তুপ। কাপড়টা কাদায় মাখামাখি। পাশে জমাট বাঁধা কালচে দাগ। তার পা দুটো আর এগোল না। ঝাঁটাটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল, “আল্লাহ গো! এইডা কী?”

চিৎকার শুনে বাড়ির ভেতর থেকে দু’জন ছুটে এলো। তারপর আরেকজন। ঝোপের ভেতর উঁকি দিতেই সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। সেখানে পড়ে আছে একটা র’ক্তাক্ত দেহ। ইতোমধ্যে মাটিচাপায় পিষ্ট হয়েছে। মুখটা পাশ ফিরিয়ে রাখা। খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল, “জমিদার বাড়ির পেছনে লাশ পাওয়া গেছে!”

কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এলো। জঙ্গল ঘিরে ফেলা হলো। তারা নিশ্চিত করল, ওটা রাজিবের লা’শ এবং পঞ্চাশ হাজার টাকাও পাশেই পড়ে আছে।

লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করতে লাগল। খবরটা যখন তাওহীদের কানে পৌঁছাল, সে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না। মুখের রঙ বদলে গেল। বুকের ভেতর কোথাও একটা অজানা শীতল স্রোত বয়ে গেল। আরো ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে পুলিশ লা’শের পাশে একটা চিরকুট পেয়েছে। র’ক্ত আর কাদায় ভিজে গেছে অর্ধেকটা। তবুও পড়া যায়। চিরকুটে বড় বড় অক্ষরে লেখা, “পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়েছে। ভেবে দেখ, এই পাপের কাজে লিপ্ত কে কে? কী… নিজের নামটা মাথায় আসলো তো? তো আর কি? ইউ আর দ্য নেক্সট টার্গেট। কারণ সময় গেলে আর সাধন হয় না।”

তাওহীদ ভয় পেয়ে গেল। অস্থির ভাবে ঘরজুড়ে পায়চারি করতে লাগল। কে এই খু’নি? ওদেরকে কেন টার্গেট করছে? তবে কি ইয়াসিফ? আপাতদৃষ্টিতে তার নাম ছাড়া কারো নাম তাওহীদের মাথায় এলো না।

.

মৃন্ময়ী লাশ দেখতে এসেছিল। ভিড়ের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন এই দৃশ্যটার জন্য ও বহুদিন ধরেই প্রস্তুত ছিল। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ ওকে দেখতে পেয়ে শিশির এগিয়ে এলো। কোনোদিকে না তাকিয়ে একপ্রকার হাত ধরে জোর করেই মৃন্ময়ীকে টেনে নিয়ে গেল একটু আড়ালে। মৃন্ময়ী হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “কি সমস্যা আপনার?”

শিশির চাপা গলায় বলল, “তুমি এখানে কি করছো? বাড়ি যাও।”

মৃন্ময়ী ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল, “বাড়ি থেকেই এসেছি। দেখতে এসেছি শয়তানের করুন পরিণতি। আমার বাপ–বোনের মৃত্যুর জন্য ওরাই দায়ী। ওরাই।”

শিশির মৃদুভাষী হলো, “আমি জানি। কিন্তু…”

কথাটা শেষ করতে দিল না মৃন্ময়ী। জ্বলে উঠল। তিক্ত হেসে বলল, “জানেন তো কি করেছেন? কিছু করতে পেরেছেন? সেই তো, চুপচাপ মুখ বুঁজে আছেন।” শিশির কিছু বলার আগেই মৃন্ময়ী ফের বলে উঠল,

“আমি সেই সাহসী মানুষটাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, যে এই কাজটা করেছে।”

শিশির থ বনে গেল, “কি করতে বলছো তুমি আমাকে?”

খুরধার কণ্ঠস্বরে মৃন্ময়ী বলল, “কিচ্ছু করতে হবে না আপনার। কার্য শুরু হয়ে গেছে।” চোখ তুলে ভিড়ের দিকে তাকাল ও, “সে কি লিখেছে, শুনেছেন না? এই নোংরা কিটগুলো নিশ্চয়ই তাকেও কোনো না কোনোভাবে আঘাত করেছে।”

শিশির মৃন্ময়ীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মৃন্ময়ী আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না। ভিড়ের ফাঁক গলে দ্রুত বাড়ির দিকে পা বাড়াল। পেছন থেকে শিশির ডেকে উঠল, “শোনো, দাঁড়াও!”

মৃন্ময়ী থামল। ঘুরে তাকাল। এক হাতে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে বলল, “শুনব না আপনার কথা।”

শিশির হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন?”

মৃন্ময়ীর অধরে কঠিন হাসির রেখা ফুটে উঠল, “আমার ইচ্ছে।” এইটুকু বলেই ও ঘুরল, আর পেছনে তাকাল না। পরক্ষণেই ভিড়ের কোলাহলে মিলিয়ে গেল। শিশির দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ আটকে রইল মৃন্ময়ীর যাওয়ার পানে। এই মেয়েটা এমন কেন? সবসময় এমন নির্লিপ্ত, এমন ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব নিয়ে চলে কেন? কাউকে কাছে আসতে দেয় না,ৎব্যথা পেলে আড়াল করে রাখে। কেন? কষ্টকে শক্ত করে বুকে বেঁধে প্রতিদিন নিজেকেই পোড়াচ্ছে। ও কি কোনোদিন বুঝবে না, সব লড়াই একা লড়তে নেই?

শিশির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মৃন্ময়ী চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ করেই একটা পুরোনো দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠল। তখন সবকিছু এত জটিল ছিল না। তখন মৃন্ময়ী আর ময়ূরীকে সে পড়াত। উঠোনের এক কোণে পাটিতে বসত দু’জন। মৃন্ময়ীর চোখেমুখে পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহের ছাপ স্পষ্ট ছিল। খাতার পাতায় অঙ্ক দেখলেই মৃন্ময়ীর ভুরু জোড়া কুঁচকে যেত। শিশির হাসতে হাসতে বলেছিল, “এইটা কি হচ্ছে? আগেই মুখ বাঁকাচ্ছ কেন?”

মৃন্ময়ী খাতা ঠেলে দিয়ে বলেছিল, “ভালো লাগে না। আমি অঙ্ক পছন্দ করি না।”

বিজ্ঞাপন

শিশির ভান করে গম্ভীর হয়ে উঠেছিল, “তাহলে কি পছন্দ করো?”

“কি না বলেন, কাকে!” মৃন্ময়ীর ঠোঁটে দুষ্টু হাসি।

শিশির ভুরু কুঁচকে বলেছিল, “চাচাকে বলতে হবে।”

মৃন্ময়ী একটুও বিচলিত না হয়ে চুলগুলো আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলেছিল, “বলুন। আমি ভয় পাই নাকি? আর…” একটু থেমে চোখ তুলে তাকিয়ে যোগ করেছিল, “বললে আপনারই ক্ষতি।”

শিশির অবাক হয়ে বলেছিল, “আমার?”

“হুম।”

“কি ক্ষতি হবে?”

মৃন্ময়ী হেসে ফেলেছিল, “বোকা নাকি! বুঝলেন না?”

“বোঝাও!”

ও তখন ইচ্ছে করেই লম্বা করে নিঃশ্বাস ফেলেছিল, “আহারে! যে এত বড় বড় অঙ্ক এক চুটকিতেই সমাধান করতে পারে, সে এই সহজ ধাঁধাটুকু মেলাতে পারছে না। বড়ই আশ্চর্য হলাম।”

সেদিন তৎক্ষণাৎ শিশির কিছুই বুঝতে পারেনি। কথাগুলোকে সে তখন নিছকই মৃন্ময়ীর চঞ্চলতা ভেবেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অকারণে চোখে চোখ পড়ে যাওয়া, হঠাৎ চুপ করে যাওয়ায় শিশির বুঝল সে একা নয়। মৃন্ময়ীর দৃষ্টির আড়ালেও লুকিয়ে আছে মনের ভাষা। এক বিকেলে পড়া শেষে ময়ূরী যখন আড়াল হয়েছিল তখন সে কথাটা তুলল। স্বাভাবিকভাবেই বলেছিল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

মৃন্ময়ী খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলেছিল, “করেন। এত ভণিতা কেন?”

শিশির গম্ভীর ভঙ্গিতে বলেছিল, “তুমি কি শুধু আমাকে জ্বালাতন করতেই এসব বলো, না…” কথাটা মাঝপথে থামিয়ে তাকিয়েছিল ওর চোখের দিকে, “না এর বাইরে আর কিছু আছে?”

মৃন্ময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর খাতাটা বন্ধ করে ফেলল। চোখ নামিয়ে বলেছিল, “আপনি কি চান, এর বাইরে কিছু থাকুক?”

শিশির মনে মনে পুলকিত হয়েছিল। সোজাসাপটা বলেছিল, “আমি চাই।”

মৃন্ময়ী ওর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছিল, “মানুষ চাইলেই কি সব পায় নাকি?” এটুকু বলেই উঠে দৌড়েছিল। মুখে স্বীকার না করলেও অন্তরে যে স্বীকারোক্তি দিয়েছে তা শিশিরের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তারপর চলছে তো চলছেই।

.

রাজিবের মৃত্যুর ঘটনাটাকে নিজের পক্ষে ঘুরিয়ে নেওয়ার সুযোগ মকবুল রহমান হাতছাড়া করলেন না একদমই। সরাসরি থানায় গিয়ে ইয়াসিফের নামে অভিযোগ দাখিল করলেন। আগের শত্রুতার কথা জুড়ে দিয়ে নতুন কেস ফাইল করালেন। ইয়াসিফ যখন খবরটা জানালো, সে একটুও বিচলিত হলো না। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিস্তেজ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল, “হ্যাঁ, তো প্রমাণ করুন।”

কিন্তু তাহের আকন্দ চুপ করে থাকার মানুষ নন। ছেলের নামে মিথ্যে অভিযোগ শুনে তিনি রীতিমতো ফেটে পড়লেন। থানায় দাঁড়িয়েই জোর গলায় প্রতিবাদ করলেন, “এই মামলা সাজানো। প্রমাণ ছাড়া আমার পোলারে ফাঁসাইতে পারব না।” এই ঘটনায় জমিদারের সাথে তার ছোটোখাটো দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল।

চেয়ারম্যানের ডাকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার মুখে সালিশি বসলো। ইউনিয়ন ঘরের সামনের খোলা জায়গায় চেয়ার পাতা হয়েছে। চারপাশে গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছে। চেয়ারম্যান গলা খাঁকারি দিয়ে কথা শুরু করলেন। বললেন, গ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হোক, এটা কেউ চায় না। আইন তার নিজের পথে চলবে, কিন্তু গ্রামে আগুন লাগানো যাবে না। তাহলে সবাই পুড়বে। মকবুল রহমান চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল। সে বলল, “আইন চলুক। কিন্তু রাজিব আমার লোক। ওর লা’শ পাওয়া গেল, তার দায় কার?”

তাহের আকন্দ উঠে দাঁড়িয়ে শক্ত গলায় বললেন, “আপনের লোক বলেই কি সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাবেন? প্রমাণ আছে? আমার পোলারে ফাঁসাতে চান কেন?”

চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল। কেউ কেউ চেয়ারম্যানের দিকে তাকিয়ে আছে, তিনি কী বলেন দেখার জন্য। চেয়ারম্যান হাত তুলে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। বললেন, “এইসব কথা থানায় হবে। এখানে কেউ কাউকে দোষারোপ করবেন না।”

জমিদার এবার একটু সামনে ঝুঁকে পড়ল। হুমকি স্বরে বললেন, “গ্রামে যদি শান্তি চান, তাহলে কিছু মানুষের লাগাম টানেষ। বেশি কথা ভালো না।”

তাহের আকন্দ শীতল গলায় জবাব দিলেন, “ভয় দেখায়া গ্রাম চালানোর দিন শেষ, জমিদার সাহেব।”

চেয়ারম্যান বুঝলেন, সালিশি আর এগোনো যাবে না। তিনি দ্রুত কথা শেষ করার চেষ্টা করলেন। বললেন, “আজকের মতো এখানেই শেষ। আইন যা করার করবে। কেউ যেন আইন নিজের হাতে না তুলে নেয়।” সেই রাতে তিনি জমিদারের সাথে বসলেন। ইয়াসিফের মত ছেলেটাকে কেন তিনি সবকিছুতে অভিযুক্ত করছেন, তার কারণ জানতে হবে।

.

সেই রাতে ঘটলো আরেক কাহিনী। তাওহীদ গ্রামে আসছিল। পুরো ঘটনা নিজেকে খুটিয়ে দেখতে হবে। পাশের সরু রাস্তা ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। চারপাশ নির্জন, নিরিবিলি। রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে বলে মানুষজনের আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। দূরে কেবল দু–একটা কুকুরের ডাক আর বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ। হঠাৎ করেই পেছন দিক থেকে বিকট শব্দ তুলে একটা বাইক এসে তাকে সজোরে ধাক্কা দিল। তাওহীদ সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেল। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েই রাগে চিৎকার করে উঠল, “কে রে শা’লা, দেখে বাইক চালাতে পারিস না? চোখ কি হাতে নিয়ে হাঁটিস নাকি?”

বাইকে যে ছিল সে নেমে এল। অন্ধকারে তার অবয়বটা একটা ছায়ামূর্তির মতো লাগছিল। তাওহীদ চোখ কুঁচকে তাকাল কিন্তু লোকটা কে, তা কিছুতেই ঠাওর করতে পারল না। হঠাৎই কিছু বোঝার আগেই মাথায় এসে পড়ল এক প্রচণ্ড আঘাত। চোখের সামনে ঝলকানি খেলল, কান ঝাঁঝরা হয়ে গেল। তাওহীদ ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কাঁপা গলায় বলে উঠল, “কে রে ভাই?”

লোকটা কোনো উত্তর দিল না। নির্বিকারভাবে একের পর এক লাথি আর ঘুসি বসাতে লাগল। মারতে মারতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলল, “তোর যম। আজকে তোকে বাগে পেয়েছি, এত সহজে ছাড়ব না।”

ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে তাওহীদ আবার বলল, “কে ভাই তুমি?”

“বললাম না, তোর য’ম!”

এরপর আর কোনো কথা নয়। তাওহীদকে কথা বলার বা সামলে ওঠার একফোঁটা সুযোগও দিল না সে। এলোপাথাড়ি মারতেই লাগল। তাওহীদ পাল্টা কোনো আঘাত করতে পারল না। রাস্তায় পড়ে পড়ে নিঃশব্দে মার খেতে লাগল। মারতে মারতে হঠাৎই লোকটার মনে পড়ে গেল কয়েক বছর আগের সেই রাত। দুঃস্বপ্নের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রিয়তমার বীভৎস মুখখানি। বুকের ভেতরের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটল। সে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ে পরিণত হলো। অন্ধ রাগে তাওহীদের নাকে, চোখে, মুখে একের পর এক ঘুসি বসিয়ে অবশেষে থামল সে। তাওহীদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ক্ষীপ্র স্বরে বলল, “ভাগ্যিস পরিকল্পনা করে আসিনি। তাহলে তুই আজকেই শেষ হয়ে যাইতি। হাতে কিছু নাই। না হইলে গলা কা’ইটা দিয়া যাইতাম। তোর সাত পুরুষের ভাগ্য, আজকে বেঁচে গেছিস। ছেড়ে দিলাম তোকে। বেঁচে থাক। আরো মানুষের প্রতিশোধ নেওয়া বাকি আছে তো। সব আমি নিলে চলবে? আমারটা আজকে হয়ে গেল। বাকিটা কারো জন্য অবশিষ্ট রইলো।”

সে ঘুরে দাঁড়াল। বাইকের কাছে গিয়ে এক ঝাঁকিতে স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের গর্জনে নিস্তব্ধ রাতটা কেঁপে উঠল। যেতে যেতে একবার পেছন ফিরে তাকাল সে। রাস্তায় পড়ে থাকা তাওহীদ তখন ব্যথায় কুঁকড়ে আছে। শরীর নড়ার শক্তিও নেই। তা দেখে আগন্তুকের মনটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।

এদিকে তাওহীদ একদমই কথা বলার অবস্থায় নেই। শুধু বড় বড় শ্বাস ফেলছে। মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। কোনোমতে কাঁপা হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিন ঝাপসা হয়ে আসছে, তবুও আলিফের নামটা খুঁজে পেল। কল দিল। ফোন ধরতেই কোনরকম নিজের অবস্থান জানিয়ে দিল।

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প