থানার ভেতর অনিন্দিতা রায় অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন। কোনোকিছুর সমাধান তো হচ্ছেই না, উল্টো সব ভজগট পাকিয়ে যাচ্ছে। একের পর এক খু’ন, চিরকুট রহস্য আর এখন চেয়ারম্যানের ছেলের নিখোঁজ হওয়া, পরিস্থিতি একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তারমধ্যে উপরমহলের চাপ তো রয়েছেই। এমন সময় ইয়াসিফের উকিল জামিনের কাগজ নিয়ে হাজির হলেন। এখানকার অফিসার ফাইলটা দেখে গম্ভীর গলায় বললেন, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু ইয়াসিফের বিরুদ্ধে এখনও ইনভেস্টিগেশন শেষ হয়নি। এই মুহূর্তে ওকে ছাড়া কি ঠিক হবে?”
উকিল সাহেব বিনয়ের সহিত বললেন, “স্যার ইয়াসিফের বিরুদ্ধে আপনারা কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে পারেননি। কোর্ট সবদিক বিবেচনা করেই জামিন মঞ্জুর করেছে। আজ যেহেতু সরকারি দপ্তরের অনেক কাজ বাকি, তাই সব ফর্মালিটি শেষ করে সে আজ আর বের হতে পারবে না; কাল নাগাদ সে থানা থেকে বের হবে।”
অনিন্দিতাও তার মেলালেন। তাছাড়া ইয়াসিফকে তারও দরকার, কিছু কথাবার্তা বলতে হবে। সময় সুযোগ কিছুই হচ্ছে না। অফিসার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আছে। কাল পর্যন্ত ও আমাদের হেফাজতেই থাকছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, ও বের হওয়ার পর যেন গ্রাম ছেড়ে পালানোর চেষ্টা না করে। ওর ওপর কড়া নজরদারি থাকবে।” উকিল চলে যাওয়ার পর অনিন্দিতা লকআপের দিকে তাকালেন। ইয়াসিফ লোহার শিকের ওপাশে শান্ত হয়ে চুপচাপ বসে আছে। তার চেহারায় মোটেও কোনো উদ্বেগ নেই বরং গভীর রহস্য খেলা করছে। সে জানে, বাইরে এখন পৈশাচিক খেলা চলছে। তাওহীদ তার সীমা লঙ্ঘন করেছে। অফিসার সবদিক পর্যবেক্ষণ করে লকআপের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, “কাল দুপুরে আপনি মুক্ত হচ্ছেন ইয়াসিফ সাহেব। কিন্তু মনে রাখবেন, জেলের বাইরে পা রাখলেই আপনার আসল পরীক্ষা শুরু। আমি জানি আপনি অনেক কিছু লুকিয়ে যাচ্ছেন।”
ইয়াসিফ মুখ তুলে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। সে শুধু অস্ফুট স্বরে বলল, “স্যার কাল দুপুর পর্যন্ত অনেক সময়। এই সময়ের মধ্যে গ্রামের মানচিত্র হয়তো অনেকখানি বদলে যাবে। আপনি বরং আপনার ইনভেস্টিগেশনে নজর দিন।”
অনিন্দিতা চমকে তাকাল। ইয়াসিফ কি তবে সব জানে? গ্রামের মানচিত্র বদলে যাবে মানে কি বোঝাল?
অনিন্দিতা রায় লকআপের শিকের ওপর হাত রাখল। তার চোখ দুটো ইয়াসিফের মনের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছে। তিনি গলাটা একটু নামিয়ে বললেন, “শোনো ইয়াসিফ সাহেব, কাল তুমি ছাড়া পেয়ে যাচ্ছো, কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমাকে দাও যা আমি আজজও মেলাতে পারছি না। এই যে একে একে খুনগুলো হচ্ছে রাজিব, রশিদ, মোহন, পারভেজ আর সবশেষ শফিক এদের প্রত্যেকের খুনের একটা যোগসূত্র আছে। তুমি কি সত্যিই কিছু জানেন না? নাকি সব জেনেও এই রক্তবন্যা উপভোগ করছ?”
ইয়াসিফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীর পায়ে শিকের একদম কাছে এগিয়ে এল। তার চোখের মণি দুটো স্থির। সে নিচু স্বরে বলল, “প্রতিশোধ তো সবাই নিতে চায়। কিন্তু এই যে খুনি যে কায়দায় খেলছে, সেটা প্রতিশোধের চেয়েও বেশি কিছু। এটা একটা বিচারের মত লাগছে। ময়ূরীর খুনের বিচার আইন করতে পারবে না। পারলেও তা আমাদের কারোরই মনপূত হবে না। কেউ একজন আছে, যে নিজ হাতে সেই দায়িত্ব তুলে নিয়েছে।”
অনিন্দিতা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “তুমি কি সন্দেহ করছেন কেউ এই কাজটা তোমার হয়ে করে দিচ্ছে?”
ইয়াসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ চিন্তিত। ভেতরে এখন তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ঝড় চলছে। মনে মনে ভাবছে, “কে এই ব্যক্তি? আমি জেলে বসে যখন ময়ূরীর অপমানের শোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করছি, তখন বাইরে অন্য কেউ আমার কাজটা করে দিচ্ছে কেন? আমার তো কাউকে দেওয়ার মতো এত টাকা নেই, আর এমন বিশ্বস্ত লোকও তো নেই যে জান বাজি রেখে জমিদার বংশের সাথে পাল্লা দেবে। তবে কি শিশির? না, সে কেনো করবে? এত সাহস আছে? আমি তো চেয়েছিলাম নিজের হাতে ওদের শেষ করতে, কিন্তু এই খুনি তো আমাকে সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না। সে কি তবে আমার চেয়েও বেশি কিছু হারিয়েছে?”
এতটা মরিয়া হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার ঠ্যাকা কার পড়েছে? কে সে যে ছায়ার মতো লেগে আছে তাওহীদের পেছনে? সে অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আমি শুধু এইটুকু জানি খুনি যেই হোক না কেন, সে খুব পেশাদার। সে খুনের পর চিরকুট রেখে যাচ্ছে, চিহ্ন রেখে যাচ্ছে। সে আসলে ভয় দেখাচ্ছে না, সে জমিদার বাড়ির দম্ভটাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। আপনি যদি সত্যিই ওকে ধরতে চান, তবে তাওহীদের পিছে নজর রাখুন। খুনি ওর কাছে পৌঁছাতে বেশি দেরি করবে না।”
অনিন্দিতা রায়ের খটকা আরও বাড়ল। ইয়াসিফের গলার স্বরে ভয়ের চেয়ে বেশি বিস্ময় কাজ করছে। তিনি বুঝতে পারলেন, ইয়াসিফ নিজেও জানে না এই তৃতীয় পক্ষটা কে। অনিন্দিতা কনস্টেবলকে ইশারা করে বললেন, “ঠিক আছে, ইয়াসিফ। কাল পর্যন্ত এখানে থাকো। তবে মনে রাখবে, কাল বের হওয়ার পর যদি কোনো অঘটন ঘটে, তবে প্রশাসন সবার আগে তোমাকেই ধরবে।”
অনিন্দিতা চলে যাওয়ার পর ইয়াসিফ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “কে তুমি? আমার হয়ে কাজটা কেন সহজ করে দিচ্ছ? নাকি তুমিও আমার মতোই কোনো এক ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এক নামহীন আর্তনাদ?”
ইন্সপেক্টর অনিন্দিতা রায় সার্কেল এসপি (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) শাকিল আহমেদ, অত্যন্ত ঝানু অফিসার তার সাথে গোপন আলোচনায় বসলেন। শাকিল আহমেদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা ফাইল দেখছিলেন। অনিন্দিতা সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “স্যার, পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। জহির মোল্লার মেয়ে আর চেয়ারম্যানের ছেলে নিখোঁজ। ওদিকে তাওহীদের বন্ধু শফিকের লাশ পাওয়া গেছে।”
শাকিল আহমেদ চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তীক্ষ্ণ চোখে অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিস অনিন্দিতা আমরা কি কোনো ভুল করছি? খুনি যেভাবে একে একে জমিদার বাড়ির ঘনিষ্ঠদের শেষ করছে, তাতে পরিষ্কার যে সে কোনো একটা সিরিয়াল মেইনটেইন করছে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ইয়াসিফ এই খুনি নয়। খুনি অন্য কেউ, যে পুলিশকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ইয়াসিফকে ব্যবহার করছে অথবা ইয়াসিফের আড়ালে নিজেকে লুকাচ্ছে।”
অনিন্দিতা নিচু স্বরে বললেন, “আমারও তাই মনে হয় স্যার। ইয়াসিফ নিজেও আজ আমাকে জিজ্ঞেস করছিল এই খুনিটা কে হতে পারে। তার চোখেমুখে আমি বিভ্রান্তি দেখেছি।”
শাকিল আহমেদ টেবিলের ওপর ম্যাপটা বিছিয়ে দিলেন। তারপর আঙুল দিয়ে একটা বিশেষ জায়গায় টোকা দিয়ে বললেন, “শোনো অনিন্দিতা, আমরা একটা গোপন পরিকল্পনা করব।” বলেই তিনি রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসলেন। অতঃপর তারা যা পরিকল্পনা করল তার মূলভাব হচ্ছে, জমিদার আর তার লোকেরা যেন কোনোভাবেই টের না পায় যে পুলিশ মুভ করছে। তারা জানবে, পুলিশ তদন্তে স্থবির হয়ে আছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে জাল বিছানো হবে। সকালের আগে আমি ওই রহস্যময় খুনি আর অপহৃত মৃন্ময়ীদের হদিস চায় তারা। অনিন্দিতা স্যালুট দিয়ে বললেন, “ইয়েস স্যার। পরিকল্পনা একদম নিখুঁত। আমি এখনই তৈরি হচ্ছি।”
শাকিল আহমেদ জানালার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “হারাধনের ছেলেরা একে একে কমছে, দেখা যাক শেষ ছেলেটা কে হয়!”
.
ইটভাটার গুমোট পরিবেশে এখন আতঙ্কের রাজত্ব। শফিকের খুনের খবরটা যখন তাওহীদের কানে পৌঁছাল, মুহূর্তে তার ভেতরের জানোয়ারটা শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে, কপালে রাগের রগগুলো ফুলে ফেঁপে নীল হয়ে আছে। মৃন্ময়ীর জ্ঞান ফেরানোর নির্দেশ দিয়ে সে পাশের রুমে গিয়েছিল, কিন্তু শফিকের খবর পেয়ে সে আবার উন্মত্তের মতো ফিরে এল যেখানে শিশির আর তাহমিদ মুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। তাওহীদ এখন আর মানুষ নেই, পাগলা কুত্তার মতো আচরণ করছে। সে শিশিরের দিকে এগিয়ে গেল। তার হাতে একটা লোহার রড, যা সে মাটির ওপর দিয়ে টেনে আনছে। ঘর্ষণের কর্কশ শব্দে শিশিরের হাড় হিম হয়ে এল। তাওহীদ হঠাৎ নিচু হয়ে শিশিরের মুখ থেকে কাপড়টা হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল। হিসহিসিয়ে গর্জে উঠল, “এই মাস্টার! আমার বন্ধুগুলা একে একে খুন হইতেছে আর তুই এখানে বইসা তামাশা দেখতাছস? রাজিব, রশিদ, মোহন, অহন শফিকরেও যমদূত মাইরা রাইখা গেছে। তুই জানোস ওইটা কে? বল কুত্তা, কে খুন করতেছে আমার লোকজনরে?”
শিশির যন্ত্রণায় গোঙাতে গোঙাতে বলল, “আমি... আমি জানি না। আমি তো এখানেই...”
তাওহীদ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে লোহার রড দিয়ে সজোরে শিশিরের পায়ে একটা বাড়ি মারল। হাড় ভাঙার মড়মড় শব্দ আর শিশিরের গগণবিদারী চিৎকার ইটভাটার দেয়ালগুলোতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এল। তাহমিদ পাশে বসে ছটফট করছে, কিন্তু তার মুখ বাঁধা থাকায় সে শুধু গোঙাতে পারছে। তাওহীদ শিশিরের চুল মুঠি করে ধরে তার মুখটা নিজের মুখের কাছে নিয়ে এল। তার গরম নিঃশ্বাস শিশিরের নাকে লাগছে। সে চেঁচিয়ে বলল, “মিছা কথা কবি না! জহির মোল্লার মাইয়া কি তরে কিছু কইছে? ওরে কি কেউ পাহারা দিতাছে? এইটা কি ইয়াসিফের কাম? নাকি তুই নিজে কোনো চাল চালছস? বল! নইলে আজ তোরে আমি জ্যান্ত এই ইটের চুলায় পুইড়া মারুম!”
শিশির ব্যথায় নীল হয়ে কাঁপছে। সে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “আমি সত্যিই জানি না তাওহীদ। কিন্তু পাপ কখনো চাপা থাকে না, তোর পাপের সাজা শুরু হইছে...”
“পাপের সাজা? আমারে তুই নীতিবাক্য শুনাস!” বলেই তাওহীদ আবার চড়াও হলো শিশিরের ওপর। একের পর এক কিল-ঘুষি আর লাথি। শিশিরের সাদা পাঞ্জাবি জবজবে লাল। তাওহীদ যেন আজ খুন না করে থামবে না। সে পকেট থেকে ছুরিটা বের করে শিশিরের গলার কাছে ধরল, “শেষবার জিগাইতাছি, ওই খুনিটা কে? যে চিরকুট রাইখা যাইতেছে সে কার লোক? বল, নইলে তোর এই আলগা বীরত্ব আজ এইখানেই শেষ কইরা দিমু!”
পাশের রুম থেকে তখন মৃন্ময়ীর গোঙানি শোনা যাচ্ছে। ওর জ্ঞান ফিরতে শুরু করেছে। তাওহীদ দাঁতে দাঁত চেপে পাশের রুমের দিকে ইশারা করল। তার চোখে খুনের নেশা। সে গর্জে উঠে তার সাথের একটা লোককে বলল, “যা! ওই মাইয়ার জ্ঞান ফিরছে। ওরে টানতে টানতে এইখানে নিয়া আয়। ও দেখুক ওর মাস্টার সাহেবের কি হাল করতেছি!”
লোকটি দ্রুত গিয়ে মৃন্ময়ীকে নিয়ে এল। মৃন্ময়ীর মাথা ঝিমঝিম করছে, রক্ত আর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। ও যখন ঝাপসা চোখে সামনে তাকাল, কলিজাটা শুকিয়ে গেল। ওর পরম শ্রদ্ধার মানুষ, সহজ-সরল সেই মানুষটা রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন। তাওহীদ মৃন্ময়ীর চুল মুঠো করে ধরল। তাকে বাধ্য করল শিশিরের ক্ষতবিক্ষত শরীরের দিকে তাকাতে। তাওহীদ পৈশাচিক হেসে বলল, “কী রে? খুব তো তেজ দেখাইতি। দেখ, তোর মাস্টারের কী দশা করছি! অহন তুই ওরে বল, ও যেন মুখ খোলে। কে আমার লোকগুলারে মারতাছে? এইটা কি তোর কোনো চাল? বল!”
মৃন্ময়ী কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “ওনারে ছাইড়া দেন ! ওনি কিচ্ছু জানেন না। ওনার গায়ে আর হাত তুইলেন না, দোহাই লাগে!”
তাওহীদ একটা জ্বলন্ত সিগারেট শিশিরের কাঁধের ক্ষতে চেপে ধরল। শিশির যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বেঁকে উঠল, কিন্তু ফের মুখ বাঁধা থাকায় সেই চিৎকারটা কেবল ভুতুড়ে গোঙানি হয়ে রয়ে গেল। তাওহীদ মৃন্ময়ীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে এল, “অরে বলতে বল! না হয় আজ তোর চোখের সামনেই ওর জান কোরবান কইরা দিমু। মাস্টাররে বাঁচাইতে চাইলে সত্যিটা বল। ওই খুনিটা কে? ইয়াসিফের লোক? নাকি জহির মোল্লা মরার আগে কোনো গুন্ডা পালছিল তোর লাইগা?”
মৃন্ময়ী আর্তনাদ করে উঠল, “আমি জানি না! খোদার কসম, আমি কিচ্ছু জানি না! আমরা কেমনে জানমু বাইরে কী হইতেছে?”
তাওহীদ আরও হিংস্র হয়ে উঠল। সে শিশিরের ওপর আবার রড দিয়ে আঘাত করতে করতে বলল, “জানস না? আচ্ছা, তাইলে দেখ কেমনে তোর মাস্টারের হাড়গুলা একটা একটা কইরা ভাঙি। তুই যত দেরি করবি, এই হারামি তত বেশি কষ্ট পাইব!”
তাহমিদ পাশের খুঁটির সাথে বাঁধা অবস্থায় পাগলের মতো মাথা কুটছে। সে বলতে চাইছে সেই রিভলভার নিয়ে এসেছিল, কিন্তু তাকে তো এককোণে ফেলে রেখেছে। মৃন্ময়ী চিৎকার করে বলল, “ওনারে মাইরেন না! আপনি যা চান আমি তাই করুম, তাও ওনারে আর মাইরেন না!”
তাওহীদ থামল না। সে আজ পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছে। সে মৃন্ময়ীকে ধাক্কা দিয়ে শিশিরের গায়ের ওপর ফেলে দিল। তারপর তার লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তৈরি হ। যদি এর মধ্যে কেউ মুখ না খোলে, তবে আজ এই ইটভাটা হবে এদের কবরস্থান। মাস্টার মুখ খুলব না, আর তুইও তেজ দেখাইতেছস? আচ্ছা, তাইলে তেজটা একটু ভাইঙা দেখি।”
বলেই তাওহীদ মৃন্ময়ীর চুলের মুঠি শক্ত করে ধরল। মৃন্ময়ী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে সজোরে টান দিয়ে নিজের দিকে নিয়ে এল। মৃন্ময়ী ব্যথায় চিৎকার করে উঠল, “ছাড়! আমার গায়ে হাত দিবি না! খোদার গজব পড়ব তোর ওপর!”
তাওহীদ পৈশাচিক হাসল। সে মৃন্ময়ীর থুতনিটা কামড়ে ধরার মতো করে চেপে ধরল, “খোদার গজব? গজব তো আইজ তোর ওপর নামব। অনেক শখ ছিল না এই মাস্টারের লগে ঘোরার? অহন দেখ, তোর এই মাস্টার কেমনে চেয়ে চেয়ে দেখে আমি তোর সাথে কী করি।”
তাওহীদ হিংস্রভাবে মৃন্ময়ীর শাড়ির আঁচল টেনে ধরল। মৃন্ময়ী দুই হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু তাওহীদের পৈশাচিক শক্তির সামনে ও খড়কুটোর মতো অসহায়। তাওহীদ ওকে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালে চেপে ধরল এবং তার গলার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে হিশহিশিয়ে বলল, “আইজ কেউ তোরে বাঁচাইতে আইব না। আইজ শুধু তুই আর আমি।”
শিশির এই দৃশ্য দেখে উন্মাদ হয়ে উঠল। সে শিকল ছেঁড়ার জন্য এমনভাবে হেঁচকা টান দিল যে তার কবজির চামড়া ছিঁড়ে রক্ত ছুটতে শুরু করল। সে মুখ বাঁধা অবস্থায় গোঙাতে গোঙাতে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আর্তনাদ কেবল ঘরের গুমোট বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো। তাহমিদ ছটফট করছিল, নিজের আপন ভাইয়ের এই বীভৎস রূপ সে সহ্য করতে পারছে না। এদিকে তাওহীদ মৃন্ময়ীর মুখটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে তার ওপর আরও চড়াও হওয়ার চেষ্টা করল। মৃন্ময়ী সর্বশক্তি দিয়ে তাওহীদের হাতে কামড় বসিয়ে দিল। তাওহীদ ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠল, “হারামজাদি! এত বড় সাহস তোর?”
সে মেজাজ হারিয়ে মৃন্ময়ীকে একটা সজোরে থাপ্পড় মারল। মৃন্ময়ী মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তাওহীদ এবার তার গায়ের চাদরটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে মৃন্ময়ীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইটভাটার ছাদের ওপর থেকে একটা ভারী পাথর নিচে এসে পড়ল। পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। তাওহীদ থমকে দাঁড়াল। বাইরে থেকে গম্ভীর অতিপ্রাকৃত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হারাধনের একটি ছেলে, সময় ফুরালো তার। পাপের পাল্লা ভারী হলো, সাজা পাবে এবার!”
তাওহীদ চমকে উঠে দরজার দিকে তাকাল।
.
থানায় বসে অনিন্দিতা রায় পুরনো ধুলোবালি মাখা ফাইলগুলো একের পর এক উল্টে যাচ্ছিলেন। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, বর্তমানের এই খুনের মিছিলের সূত্রপাত অনেক আগে হয়েছে। হঠাৎ একটা ফাইলে তার চোখ আটকে গেল, অরুনিমা নিখোঁজ ও মৃত্যু সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্ট।
ফাইলের ভেতরে থাকা সাক্ষ্যপ্রমাণের পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে অনিন্দিতা থমকাল। সেখানে গ্রামের এক সাধারণ মানুষের জবানবন্দি লেখা আছে। তাতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, “অরুনিমার সাথে জমিদার বাড়ির ছোট ছেলে তাওহীদের দীর্ঘদিনের একটা সম্পর্ক ছিল বলে ধারণা করা হয়।” শুধু তাই নয়, অরুনিমার মৃত্যুর পর লাশ শনাক্তকরণ নিয়েও এক ধরণের অস্পষ্টতা ছিল রিপোর্টে। তড়িঘড়ি করে মামলাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল। অনিন্দিতার কপালে ভাঁজ পড়ল। তিনি আর দেরি করলেন না। নিজের রিভলভারটা চেক করে কোমরে গুঁজলেন। কনস্টেবলকে চিৎকার করে ডাকলেন, “গাড়ি বের করো! এখনই আমাদের অরুনিমাদের বাড়িতে যেতে হবে। আর শোনো, ওই গ্রামের ডাক্তারকে খবর দাও যিনি অরুনিমার ডেথ সার্টিফিকেট লিখেছিলেন। আমার মনে হচ্ছে অরুনিমা মারা যায়নি।”
অনিন্দিতার জিপ ঝড়ের গতিতে গ্রামের মেঠো পথ চিরে ছুটে চলছে। অরুনিমা যদি বেঁচে থাকে, তবে এই খুনের হোতা কে?