প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ১৬

🟢

মৃন্ময়ী বিছানায় শুয়ে থাকলেও দুচোখে ঘুম নেই। পাশের টুলে রওশন আরা ক্লান্তিতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। মাকে ফাঁকি দিয়ে মৃন্ময়ী নিঃশব্দে বিছানা থেকে নামল। সারা শরীর ব্যথায় টনটন করছে, ব্যান্ডেজ করা জায়গাগুলো দিয়ে বিরামহীন জ্বালা পোড়া হচ্ছে। সবকিছু পেরিয়ে ওর চেতনার গভীরে অন্য আগুন জ্বলছে। যখনই চোখ বুজছে, শিশিরের সেই যন্ত্রণাদায়ক মুখটা ভেসে উঠছে। আগুনের লেলিহান শিখার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রক্তাক্ত মানুষটা আর্তনাদ করে বলছে, “তুমি বেঁচে থাকো মৃন্ময়ী, অনেক বছর বেঁচে থাকো।”

ও মায়ের দিকে একবার তাকাল। শোকাতুর মা ঘুমিয়ে নেই, যেন যন্ত্রণায় মূর্ছা গেছেন। মৃন্ময়ী পা টিপে টিপে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল। করিডোরে দু-একজন নার্সের চোখ ফাঁকি দিতে পারল। পুলিশ কনস্টেবলেরা তন্দ্রাচ্ছন্ন। মৃন্ময়ী জানে না ও কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে তাওহীদকে খুঁজে পাবে। কিন্তু ওর ভেতরের অদৃশ্য শক্তি ওকে চালিত করছে। ও জানে, এই অন্ধকারের কোথাও না কোথাও সেই জানোয়ারটা লুকিয়ে আছে। অবশ পা দুটো আজ পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। প্রতিটা পদক্ষেপে ও কেবল শিশিরের পোড়া গন্ধ পাচ্ছে।

হাসপাতালের গেট পার হয়ে সে যখন পিচঢালা অন্ধকার রাস্তায় পা রাখল, তখন ও কোনো সাধারণ গ্রাম্য মেয়ে নয়; ও উদ্দেশ্যহীন অথচ ধাবমান প্রতিহিংসা। হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু চোখে যে ঘৃণা জমা হয়েছে, তা যে কোনো অস্ত্রের চেয়েও ধারালো। মৃন্ময়ী বিড়বিড় করে বলল, “আপনি আমারে বাঁচাইয়া দিয়া গেছেন। এই জীবন দিয়া আমি কী করব যদি ওই পিশাচটা বুক ফুলাইয়া হাঁটে? আজ রাতে ওর নিশ্বাস আমি থামাব, নাইলে আমার নিশ্বাস মিছা হইয়া যাইব।”

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ও ধীরপায়ে জমিদার বাড়ির রাস্তার দিকে এগোতে লাগল। মৃন্ময়ী জানে না অরুনিমাও একই পথে এগোচ্ছে, ও জানে না মকবুল রহমান কুড়াল হাতে নিজের ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কেবল জানে, আজ রাতে হিসেব মেলাতে হবে।

.

তাওহীদ আর একমুহূর্ত দেরি করল না। বাবার হাতের সেই ভয়ংকর কুড়াল আর চোখেমুখের উন্মাদনা দেখে তার মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই আমবাগান আর জারুল গাছের তলা আজ তাদের কারোর জন্যই নিরাপদ নয়। একটা অদৃশ্য মরণফাঁদ তাদের ঘিরে ধরেছে। সে বাইকটা ওখানেই ফেলে রেখে জঙ্গলের ঝোপঝাড় মাড়িয়ে অন্ধের মতো দৌড়াতে শুরু করল। ডালপালা মুখ আঁচড়ে দিচ্ছে, কাঁটায় পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যাচ্ছে কিন্তু তাওহীদের সেদিকে খেয়াল নেই। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, পালাতে হবে। এই অন্ধকার গ্রাম, পুলিশ-প্রশাসন আর এই রহস্যময় খুনি থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হবে। হন্যে হয়ে ছুটতে ছুটতে সে যখন বাগানের শেষ প্রান্তে একটা পুরনো ভাঙা মন্দিরের কাছে পৌঁছাল, তখন হঠাৎ গতি থমকে গেল। সামনের ছায়া থেকে ধীরপায়ে এক নারী মূর্তি বেরিয়ে এল।

তাওহীদ হাপাচ্ছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে চোখ বড় বড় করে সেই মূর্তির দিকে তাকাল। চাঁদের ম্লান আলো যখন সেই নারীর মুখের ওপর পড়ল, তাওহীদ আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে গেল। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল এই নিমিষেই। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর চুলগুলো আলুলায়িত, পরনের শাড়িটা ধুলো আর কাঁদার মাখামাখি আর হাতে একখানা ধারালো দা। তাওহীদ অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে উঠল, “অ... অরুনিমা? তুমি? তুমি তো মইরা গেছ! তুমি এইখানে কীভাবে?”

সে ভাবল হয়তো অরুনিমার আত্মা হয়ত! কণ্ঠস্বর বুজে এল, তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। সেই নারী মূর্তিটি এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে। অরুনিমার চিরচেনা মায়াবী মুখটা আজ এক রণচণ্ডীর রূপ নিয়েছে। অরুনিমা শীতল গলায় বলল, “মরি নাই। তোর মরণ চাক্ষুষ দেখার লাইগা আমি জ্যান্ত লাশ হইয়া বাঁইচা আছি। আজ আমার ভাইরে তুই যে আগুনে পুড়াইছস, সেই আগুনের বদলা আমি নিতে আসছি।”

তাওহীদ আর্তনাদ করে পেছন ফিরতে চাইল, কিন্তু দেখল তার পালানোর সব পথ বন্ধ। অরুনিমার হাতের অস্ত্রটা অন্ধকারের মাঝে বিষাক্ত সাপের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। তাওহীদের মনে হচ্ছে সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। যে মেয়েটাকে সে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল, সেই মেয়েটা আজ তার সামনে সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাওহীদ ঘামতে ঘামতে তোতলা গলায় বলল, “অরুনিমা... তুমি? না না, তুমি তো নাই। তুমি তো ভূত! তুমি আমার সামনে আসলা ক্যামনে?”

ও পৈশাচিক হেসে শান্ত গলায় বলল, “তুই ভাবছিলি নদীতে ঝাঁপ দিলেই অরুনিমা শেষ? নদীর স্রোত আমারে ফিরাইয়া দিছে। তোরে নরকে পাঠানোর আগ পর্যন্ত আমার মরণ নাই।”

তাওহীদ পালানোর জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। সে মিনতি করার সুরে বলল, “অরুনিমা, আমি ভুল করছি। আমি তোমারে বিয়া করছি না? আমি সব স্বীকার করুম।”

অরুনিমা খিলখিল করে হাসল। তবে সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না, ছিল কেবল হাড়হিম করা ঘৃণা। বলল, “করুণা? তুই এখনও করুণা করোস আমারে? যখন আমার পেটের বাচ্চাডারে মারতে চাইছিলি, তখন তোর দয়া লাগে নাই? যখন আমার ভাইডারে পুড়াইয়া মারলি, তখন তোর বাঁচার কথা মনে ছিল না?”

তাওহীদ চিৎকার করে উঠল, “আমি মারি নাই! শিশির নিজে মরছে!”

অরুনিমা ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল, “চুপ কর জানোয়ার! তোর মুখে আমার ভাইয়ের নাম নিবি না। টাকা আর ক্ষমতা দিয়া তুই সব কিন্না নিবি তাইনা? দেখি, নে। আজ তুই একা তাওহীদ, এক্কেরে একা!” অরুনিমা দা-টা উঁচু করে ধরল। চোখে এখন আগুনের শিখা। হিসহিস করে বলল, “তুই আমারে বিক্রি করতে চাইছিলি না? আজ দেখ, নিজেরে বাঁচানোর লাইগা তুই ভিখারির মতো আমার পায়ে পড়ছস। যে নদীর পাড়ে তুই আমারে মরতে পাঠাইছিলি, আজ সেই নদীর পাড়েই তোর কবর খুঁড়ব আমি।”

অরুনিমা যে আজ কোনো দয়া দেখাবে না, তা তাওহীদ ভালো করেই বুঝল। সে জানপ্রাণ দিয়ে উল্টো দিকে দৌড় দিতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে আরেকজন রক্তমাখা নারী মূর্তি বেরিয়ে এল। সে আর কেউ নয়, মৃন্ময়ী।

অন্ধকারের বুক চিরে মৃন্ময়ী যখন টলতে টলতে সেই জরাজীর্ণ মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন সম্মুখের দৃশ্য দেখে ও পাথরের মতো জমে গেল। একদিকে মৃত্যুভয়ে কুঁকড়ে থাকা তাওহীদ, আর তার সামনে উদ্যত অস্ত্র হাতে এক নারী। চাঁদের আলো যখন সেই নারীর মুখে এসে পড়ল, মৃন্ময়ীর মনে হলো হৃদপিণ্ড থমকে গেছে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অস্পষ্ট গলায়, এক বুক বিস্ময় আর হাহাকার নিয়ে ও অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আপা? অরুনিমা আপা? তুমি... তুমি সত্যি?”

অরুনিমা তখন তাওহীদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। মৃন্ময়ীর কণ্ঠস্বর শুনে সামান্য মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। ওর সেই রণচণ্ডী চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল, কিন্তু হাতের অস্ত্রটা নামল না। মৃন্ময়ী এক পা এক পা করে এগিয়ে এল। সারা শরীরে কাঁপন ধরেছে। ও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “আপা, আমরা তো ভাবছিলাম তুমি আর নাই! ওই নদীর পাড়ে কত খুঁজছি তোমারে। মানুষে কইত তুমি না কি আর ফিরবা না। তুমি সত্যি বাইচ্চা আছো? তুমি জানো, তোমার ভাই তোমারে কত খুঁজছে?”

মৃন্ময়ী ভাইয়ের কথা বলতেই অরুনিমার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ও দাঁতে দাঁত চেপে তাওহীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “বাইচ্চা ছিলাম মৃন্ময়ী, কেবল এই দিনটার লাইগা। কিন্তু দেখ, আমার ভাইডারে এই জানোয়ারটা জ্যান্ত পুড়াইয়া দিল! আমি ওরে খুঁজতে খুঁজতে গ্রামে ফিরলাম, আর ফিরেই পাইলাম আমার ভাইয়ের পোড়া ছাই!”

মৃন্ময়ী অবাক হয়ে দেখছিল সেই শান্ত, মায়াবী অরুনিমা আপাকে, যে একসময় ওদের গান শেখাত, গল্প শোনাত। এই দীর্ঘ কয়েক বছরে অরুনিমা আপা মরেনি ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে থাকা সাধারণ সেই মেয়েটা মরে গিয়ে একটা প্রতিশোধের আগুন জন্ম নিয়েছে। তাওহীদ এই সুযোগে নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করে চিৎকার করল, “মৃন্ময়ী! ওরে থামা! ও পাগল হইয়া গেছে! ও আমারে মাইরা ফেলব!”

মৃন্ময়ী তাওহীদের দিকে এক পলক তাকাল। ও অরুনিমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আপা, শিশির মরার আগে আমারে কইছিল বিচারের কথা। এই পিশাচের বিচার কোন আদালত করবে? তাই আজ আমি এসেছি। এই পিশাচের বিচার খোদ খোদা আমার হাতেই লিখে রাখছে।”

মৃন্ময়ী এতক্ষণ চাদরের নিচে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছিল। অরুনিমার তীব্র প্রতিহিংসার আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে ধীরহাতে বের করে আনল ভারী কুড়ালটি। ওটা হাতে নিয়ে মৃন্ময়ী যখন তাওহীদের দিকে এক পা এগোল, তখন তাওহীদের গলার স্বর আটকে গেল। তার সামনে এখন একজন নয়, দুজন প্রতিহিংসাপরায়ণ নারী। একজন যাকে সে মৃত ভেবেছিল, আর অন্যজন যাকে সে ছাই করতে চেয়েছিল। অরুনিমা আর মৃন্ময়ী দুদিক থেকে তাওহীদকে ঘিরে ধরল। তাওহীদ দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “না! আমারে ছাইড়া দাও, আমি সব দিয়া দিমু!”

অরুনিমা দা-টা তাওহীদের গলায় ছোঁয়াতে উদ্যত হতেই মৃন্ময়ী কুড়ালটা উঁচিয়ে ধরল। তৎক্ষণাৎ নিস্তব্ধ রাত চিরে একটা গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো। গুলিটা সরাসরি এসে লাগল তাওহীদের হাতে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অরুনিমা আর মৃন্ময়ী চমকে গিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকাল। গাছের ঘন ছায়া মাড়িয়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে এল দীর্ঘদেহী যুবক। তার পরনের শার্ট ছিঁড়ে রক্তাক্ত, কপালে চোটের দাগ, হাতে ধরা পিস্তল। সে আর কেউ নয়, তাহমিদ। মৃন্ময়ী বিস্ময়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “তাহমিদ ভাই! আপনে?”

তাহমিদ ধপধপে সাদা দাঁত বের করে এক ক্রুর হাসি হাসল। সে পিস্তলটা তাওহীদের দিকে তাক করে শান্ত গলায় বলল, “আমি উধাও হই নাই। আমি তো কেবল আমার শিকারের জন্য জাল পেতেছিলাম।”

তাওহীদ যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলল, “ভাই... তুমি আমারে মারবা? আমি তোমার নিজের ভাই!”

তাহমিদ এক পা এগিয়ে তাওহীদের আহত হাতের ওপর বুট জুতো দিয়ে সজোরে চাপ দিল। তাওহীদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল। তাহমিদ বলল, “ভাই?”

বিজ্ঞাপন

অন্ধকার বাগানে তিন জোড়া চোখ তাওহীদের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করার জন্য স্থির হয়ে আছে।

.

ইয়াসিফ নিজ মস্তিষ্কে পুরনো স্মৃতির জট খোলার চেষ্টা করছে। ছয় বছর আগে। তখন ইয়াসিফ আর প্রণয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। প্রণয় এই গ্রামের ছিল না তবে যাতায়াত ছিল এখানে। মাস্টার হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত ছিল। একবার গ্রামের এক চায়ের দোকানে বসে প্রণয় হুট করেই বলেছিল, “ইয়াসিফ, দুনিয়ায় আসল বিচার আইন করে না রে। আসল বিচার করে প্রকৃতি, আর প্রকৃতির হাত হয়ে মাঝেমাঝে সাধারণ মানুষকেও অস্ত্র ধরতে হয়। কেউ যদি আমার আপনজনের গায়ে হাত দেয়, আমি তারে এমনভাবে মারব যে সে বুঝতেই পারব না কে মারছে। এটাই পারফেক্ট মার্ডার।”

ইয়াসিফ এটাকে নিছক আড্ডা ভেবে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সেই পুরনো কথাগুলো তীরের মতো মাথায় বিঁধছে। হঠাৎ মনে পড়ল, জমিদার বাড়ির এবং এই বংশের প্রতি প্রণয়ের ঘৃণা রয়েছে। ভাসা ভাসা শুনেছিল, জমিদার বাড়ি নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল, সেখানে একজন সাক্ষী হিসেবে প্রণয়ের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের নাম জড়িয়েছিল যাকে জমিদাররা গুম করে ফেলেছিল। তারমানে প্রণয়? প্রতিশোধের আগুন বুকে পুষে রেখেছে? প্রণয় নিজে সামনে আসেনি, বরং অদৃশ্য মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জমিদার পরিবারকে ভেতর থেকে টুকরো টুকরো করে ফেলছে। ইয়াসিফ দ্রুত বাইক স্টার্ট দিল।

.

আমবাগানের কিনারে মকবুল রহম হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তখনই অন্ধকারের আড়াল থেকে ধীরলয়ে হেঁটে এল প্রণয়। তার পরনে খুব সাধারণ পোশাক। এই বিভীষিকাময় রাতে তাকে দেখে মকবুল রহমান যেন আকাশ থেকে পড়লেন। চোখ কচলে তাকিয়ে বললেন, “আরে... তুমি? প্রণয় না? কত বছর পর দেখলাম! কই ছিলা বাবা এতদিন?”

প্রণয় ঠোঁটের কোণে চিকন হাসি ফুটিয়ে বলল, “চাচা, আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেই ফিরে এলাম। কিন্তু আপনি এখানে এত রাতে? হাতে কি? কোনো সমস্যা? আপনি তো কাঁপছেন।”

মকবুল রহমান আমতা আমতা করে অস্ত্রটা লুকানোর চেষ্টা করলেন। তিনি কি বলবেন যে তিনি নিজের ছেলেকে খুন করতে এসেছেন? থতমত খেয়ে বললেন, “না মানে বাবা... ওই চোর-ছ্যাঁচোড় ধরতে আসছিলাম। গ্রামটা তো সুবিধার না।”

প্রণয় সব বুঝেও কিছু বোঝেনি এমনভাবে জোর খাটিয়ে বলল, “রাতের বেলা এই শ্মশানঘাটের পথে চোর ধরতে আসা আপনার বয়সে সাজে না চাচা। চলুন, আমি বাইকে করে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।”

মকবুল রহমানের তখন না করার উপায় ছিল না। তিনি কাঁপাকাঁপা শরীরে প্রণয়ের বাইকের পেছনে গিয়ে বসলেন। বাইক স্টার্ট দিয়ে প্রণয় খুব সহজ গলায় বলল, “চাচা, গ্রামে তো আজ অনেক কিছু ঘটে গেল। আপনার বাড়িও নাকি পুলিশ ঘেরাও করছে? এসব কিসের আলামত?”

মকবুল রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “সব অভিশাপ বাপু, সব! শকুনের নজর লাগছে আমার সংসারে। বুঝছো বাবা, জহির মোল্লার ওই চরিত্রহীন মাইয়াগুলার জন্যই আজ আমার সোনার সংসারে আগুন লাগছে।”

বাইকের গতি বাড়িয়ে প্রণয় বলল, “তাই? জহির চাচার মেয়েদের দোষ?”

“আরে ওই কুলাঙ্গার মেয়েই তো সব নষ্টের মূল! নিজের ইজ্জত খুয়াইয়া মরছে, আর এখন আমার ছেলেটার পিছে পুলিশ লাগছে। মরা মেয়েমানুষের অভিশাপ বড় বিষ বাবা।”

প্রণয় ঠান্ডা গলায় বলল, “অভিশাপ তো লাগবেই চাচা। একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন ছারখার করে দিলেন। একটা ছেলেকে জ্যান্ত পুড়িয়ে কয়লা বানালেন, প্রকৃতি কি এত সহজে ছেড়ে দেবে? আপনি পলাশ তালুকদারকে যেভাবে শেষ করেছিলেন, আজ ঠিক সেভাবেই আপনার নিজের বংশ প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। হিসাবটা কি মিলছে চাচা?”

মকবুল রহমানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পলাশ তালুকদারের কথা এই ছেলে জানল কীভাবে? তিনি ভয়ে ভয়ে বললেন, “তুমি... তুমি এসব কী বলতেছ বাবা? আমি তো ভালো চাউর দিছি তোমারে।”

প্রণয় বাইকটা এক ঝটকায় বনের নির্জন প্রান্তে থামিয়ে দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে মকবুল রহমানের চোখের দিকে তাকাল। ফিসফিস করে বলল, “পলাশ তালুকদার আমার বাবা। তার ভিটা দখল করতে গিয়ে তাকে সপরিবারে পুড়িয়েছিলেন, মনে আছে? প্রতীক তালুকদার আর আমি কেবল আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। হা হা হা।”

মকবুল রহমান বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পেছাতে লাগলেন। প্রণয় বাইক থেকে নেমে ধীর পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে যাওয়া মকবুল রহমানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বনের নিস্তব্ধতা চিরে তার প্রতিটি কদমের শব্দ তার কানে যমদূতের ঘণ্টার মতো বাজছে। তিনি দুহাত জোড় করে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “বাবা... আমারে ছাইড়া দাও... আমি তোমারে সব জমি ফিরাইয়া দিমু। আমারে মারিও না বাবা!”

প্রণয় কোনো কথা না বলে নিচু হয়ে মকবুল রহমানের কলার খামচে ধরল। হ্যাঁচকা টানে তাকে মাটি থেকে তুলে সোজা করে দাঁড় করাল। পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে খুব যত্ন নিয়ে মকবুল রহমানের ঘামে ভেজা কপাল মুছে দিল, ঠিক যেভাবে কেউ তার প্রিয় পোষা প্রাণীকে আদর করে। ফিসফিস করে বলল, “উঠুন চাচা। এত তাড়াতাড়ি হাঁপিয়ে পড়লে চলবে? আপনার জন্য আমি অনেকগুলো দিন অপেক্ষা করছি। অত সহজে মারব কেন? আপনি তো আমার তৈরি করা এই বিশাল থিয়েটারের প্রধান দর্শক।”

মকবুল রহমান দাঁত কপাটি লেগে অস্ফুট স্বরে বললেন, “খু... খু... খুনগুলো কি তুমি করছো?”

প্রণয় শব্দ করে হাসল। মকবুল রহমানের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “হুম। আমিই করেছি। আপনার নাট্যমঞ্চে নাটক করেছি। আপনার কি আনন্দ হচ্ছে না চাচা?”

মকবুল রহমান ডুকরে কেঁদে উঠলেন। প্রণয় তার চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল, যাতে তিনি নড়তে না পারেন। বলল, “কাঁদবেন না চাচা, সিনেমা তো সবে শুরু। আপনার ড্রয়ার থেকে পিস্তলটা কে সরিয়েছিল জানেন? আপনার নিজের ছোট ছেলে তাহমিদ। সে আপনার পাপের সাক্ষী হতে চায়নি, সে চেয়েছে আপনার পাপের অন্ত করতে। আমি ওকে শিখিয়েছি, পিতাকে বাঁচাতে হলে পিতাকেই ধ্বংস করতে হয়।”

প্রণয় মকবুল রহমানের পিঠে হাত রেখে তাকে ঠেলতে ঠেলতে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। বনবিড়ালের ডাক আর ঝিঁঝিঁ পোকার গুঞ্জনের মাঝে প্রণয়ের কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। বলতে লাগল, “যে আগুনের শিখায় আমার বাবা-মা পুড়েছিল, সেই আগুন আমি আজ আপনার কলিজায় জ্বালাব। আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে এখনই মেরে ফেলব? না। আমি আপনাকে টেনে নিয়ে যাব সেই ভাঙা মন্দিরের সামনে, যেখানে আপনার ছেলে তাওহীদ এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছে। আপনি নিজের চোখে দেখবেন আপনার বংশের সূর্য কীভাবে অস্ত যায়।”

মকবুল রহমান অবশ হয়ে গেলেন। তার সামনে অন্ধকার বনটা যেন বিশাল একটা হাঁ করা মুখ, যা তাকে গিলে খাওয়ার জন্য তৈরি। প্রণয় তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল সেই বধ্যভূমির দিকে, যেখানে অরুনিমা, মৃন্ময়ী আর তাহমিদ তাদের চূড়ান্ত শিকারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। অথচ তিনি বারবার বলছেন, “আমারে ছাইড়া দাও! আমি তোর পায়ে পড়ি বাবা, আমারে ছাইড়া দাও!”

প্রণয় বরফশীতল গলায় বলল, “ছাড়ার জন্য তো আপনারে ধরি নাই চাচা। পলাশ তালুকদারও আপনার পায়ে ধইরা ওইদিন আর্তনাদ করছিল, মনে আছে? আপনি তো ছাড়েন নাই। আগুনে পোড়ার সময় মানুষ যখন চিৎকার করে, সেই শব্দটা যে কত করুণ, সেটা তো আপনি ভালোই জানেন।”

মকবুল রহমান এবার হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়লেন, “ওইডা একটা ভুল ছিল বাবা।”

“চলুন চাচা। দেরি করা যাবে না। সূর্য ওঠার আগেই আপনার সোনার ছেলের সাথে আপনার দেখা হওয়া দরকার। বাপ-বেটায় মিলে আজ নরকের টিকিট কাটবেন, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হইতে পারে?”

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প