মকবুল রহমানের হৃৎস্পন্দন প্রতিটা সেকেন্ডের সাথে বাড়ছে। ফোনটা তার হাতের তালুতে বারবার কেঁপে উঠছে। সেই অপরিচিত নাম্বার থেকে একের পর এক খুদেবার্তা আসতে শুরু করেছে, ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য মায়াজালে কেউ তাকে আটকে ফেলেছে। নতুন মেসেজ এল: “সামনে যে সরু কালভার্টটা দেখছেন, ওটা পার হয়ে বামে মোড় নিন। খবরদার, পিছু ফিরবেন না। আমার চোখ আপনার ওপরেই আছে।”
মকবুল রহমান ঘামতে ঘামতে কালভার্টটা পার হলেন। চারপাশ এতই নিস্তব্ধ যে নিজের পায়ের শব্দেই তিনি চমকে উঠছেন। কিছুদূর যেতেই আবার ফোনটা বেজে উঠল। এবারের ইন্সট্রাকশন আরও সুনির্দিষ্ট: “ডানদিকের ওই জরাজীর্ণ আমবাগানটার ভেতরে ঢোকেন। বাগানের মাঝখানে একটা ভাঙা ভিটা আছে, সেখানে গিয়া দাঁড়ান।”
জমিদার মনে মনে ভাবছেন, কে এই লোক? সে কি তবে এই অন্ধকারের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে আছে? পিস্তলটা ড্রয়ারে না পেয়ে তার ভেতরটা বারবার কুঁকড়ে যাচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে, কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছেন না তো? কিন্তু খুনি যে শর্ত দিয়েছে, ছেলের জীবন বাঁচাতে হলে তাকে আজ খুনি হতেই হবে। বাগানের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। বুনো লতাপাতা তার পাঞ্জাবিতে আটকে যাচ্ছে। ঠিক তখনই স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল: “থামুন। ভিটার ওপর একটা ছালা দিয়ে ঢাকা বস্তু রাখা আছে। ওটা খোলেন। ওইখানে আপনার আজকের শিকারের নাম আর অস্ত্র আছে। দেরি করবেন না, সময় বয়ে যাচ্ছে।”
মকবুল রহমান থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সেই ছালাটার দিকে হাত বাড়ালেন। তার সারা শরীর কু ডাকছে। এই অদৃশ্য নির্দেশের শেষ কোথায়? কার নাম লেখা আছে ওই কাগজে?
.
হাসপাতালের সাদা দেোয়াল আর ফিনাইলের কটু গন্ধের মাঝে মৃন্ময়ীর যখন জ্ঞান ফিরল, তখন অনেক রাত। জ্ঞান ফিরতেই ও ভয়ার্ত গলায় চিৎকার করে উঠল, “আগুন আগুন!”
বেডের পাশে বসে থাকা অনিন্দিতা রায় দ্রুত মৃন্ময়ীর হাত ধরলেন। তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটোয় কোমলতা। তিনি শান্ত গলায় বললেন, “শান্ত হও মৃন্ময়ী। আমি অনিন্দিতা রায়, পুলিশ অফিসার। তুমি এখন নিরাপদ।”
মৃন্ময়ী কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তারপর অনিন্দিতার হাত খামচে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। ওর সেই কান্নায় আর্তনাদ আর শিশিরের শেষ স্মৃতিটুকু মিশে ছিল। অনিন্দিতা ওকে কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার সময় দিল, তারপর হাতে একটা নোটবুক নিয়ে বলল, “মৃন্ময়ী, তোমার সাথে যা হয়েছে তা আমি জানি। কিন্তু আমার বয়ান দরকার। ওই ইটভাটায় ঠিক কী ঘটেছিল? তাওহীদ কেন তোমাদের আটকে রেখেছিল?”
মৃন্ময়ী ভেজা গলায় অস্ফুট স্বরে সব বলতে শুরু করল। তাওহীদের কুপ্রস্তাব, শিশিরের উপর অমানুষিক নির্যাতন। শিশিরের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে ও বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। বলল, “উনি নিজের জীবন দিয়া আমারে বাঁচাইছে। ওনার সারা শরীর রক্তে মাখা ছিল, হাতগুলা কাটা ছিল... তাও উনি আমারে জানালার বাইরে ঠেল্লা দিছে। উনি পুইড়া মরছে, আমার চোখের সামনে!”
অনিন্দিতা চোয়াল শক্ত করে সব লিখে নিচ্ছিল। মৃন্ময়ী হঠাৎ করে শিউরে উঠল। বলল, “আরেকটা কথা। তাওহীদ খুব ভয়ঙ্কর। ও ওর নিজের ভাই তাহমিদরেও ছাড়ে নাই। তাহমিদ ভাই আমাদের বাঁচাইতে চাইছিল বইলা তাওহীদ ওনারে মারধর করছে আর একটা ঘরে শক্ত কইরা বাইন্ধা রাখছে। তারপর উনি হঠাৎ উধাও হইয়া গেল।”
অনিন্দিতা রায় উঠে দাঁড়াল। জমিদার বাড়ির ভেতরে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, রীতিমতো একটা টর্চার সেল চলছে। তাহমিদ যদি এখনো বেঁচে থাকে, তবে তাকে উদ্ধার করা আর তাওহীদকে গ্রেফতার করার এটাই মোক্ষম সুযোগ। অনিন্দিতা রায় আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। কেবিন থেকে বেরিয়ে করিডোরে দাঁড়ানো সাব-ইন্সপেক্টর রকিবুলকে কড়া গলায় নির্দেশ দিলেন, “রকিবুল, ফোর্স রেডি করো। এখনই আমাদের জমিদার বাড়িতে রেইড দিতে হবে। আমাদের প্রাইমারি টার্গেট তাওহীদ। ওকে যেখান থেকে পারো খুঁজে বের করো। আর হ্যাঁ, তাহমিদ উধাও বলে খবর পেয়েছি। ওকে খুঁজে বের করা চাই-ই চাই। কুইক!”
রকিবুল স্যালুট দিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। পুরো হাসপাতাল এলাকায় পুলিশের তৎপরতা বেড়ে গেল। অনিন্দিতা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর কেবিনে ঢুকল ইয়াসিফ। মৃন্ময়ী তখনো ঘোরের মধ্যে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। ইয়াসিফকে দেখে ধরা গলায় বলল, “সব তো হারাইলাম। উনারেও বাঁচাইতে পারলাম না।”
ইয়াসিফ মৃন্ময়ীর বিছানার পাশে রাখা টুলে বসল। তার মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর। নিচুস্বরে বলল, “শান্ত হও মৃন্ময়ী। যে গেছে তারে তো ফেরানো যাবে না, কিন্তু যে অপরাধ করছে তার সাজা তো পেতেই হবে। এই সবকিছুর শেষ আজকেই হবে।”
মৃন্ময়ী তার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে করতেছে এসব? তাওহীদরে বাঁচায়ে রাখছে কেন?”
ইয়াসিফ জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল, “তাওহীদ তো একটা খুঁটি মাত্র। আমি বোধহয় বুঝতে পারছি কে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। খুন-খারাবি, একের পর এক খেলা সাজানো, সবকিছুই একজনেরই নিখুঁত পরিকল্পনা।”
মৃন্ময়ী অস্থির হয়ে উঠল। ইয়াসিফের হাত চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, “কে সে?”
ইয়াসিফ আলতো করে মৃন্ময়ীর হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগোতে এগোতে শুধু বলল, “এখনই বলব না। সময় খুব কম। আমি আসছি, তুমি সাবধানে থাকো।” কথাটা বলেই ইয়াসিফ দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। মৃন্ময়ী স্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল বিছানায়। ইয়াসিফ তবে কী জানে? কার কথা সে ইঙ্গিত করল? আর সে নিজেই বা এই রাতে কোথায় গেল?
.
চেয়ারম্যান বাড়ি শোকের মাতম শেষে নিস্তব্ধ হাহাকার পাথর হয়ে জমে আছে। উঠোনে একসময় গ্রামের মানুষের আনাগোনা ছিল, আজ সেখানে কেবল কান্নার গোঙানি। চেয়ারম্যান বারান্দার খুঁটি ধরে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন। তার সমস্ত দম্ভ, সমস্ত প্রভাব আজ মাটির সাথে মিশে গেছে। বছরখানেক আগে তার কলিজার টুকরা অরুনিমা গেল। লোকে কইলো অপঘাত, আত্মহত্যা! আর আজ শেষ ভরসা শিশিরও চইলা গেল? বাড়ির কর্ত্রী পাগলের মতো সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর অরুনিমা ও শিশিরের ছোটবেলার জিনিসপত্রগুলো বুকে জড়িয়ে ধরছেন। চিৎকার করে বলছেন, “কার অভিশাপ লাগল আমার ঘরে? আমার বুকের ধনগুলারে কে মারতাছে?”
গ্রামের মহিলারা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কার সাধ্য সেই শোক থামায়? অরুনিমা ছিল এই বাড়ির প্রাণ, ওর অকাল মৃত্যুতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, তা শিশিরের আদর্শ আর সেবায় কোনোমতে ঢাকা পড়েছিল। কিন্তু বছরখানেকের ব্যবধানে জমিদার বাড়ির পৈশাচিকতায় সেই দুই ভাইবোনই আজ নেই। চেয়ারম্যান সাহেবের আফসোসের সীমা নেই।
.
অরুনিমা আর অরুনিমা নেই, সে এক জ্যান্ত চণ্ডী। রাতের আঁধারে জঙ্গল চিরে ও যখন এগোচ্ছিল তখন চোখেমুখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল প্রতিশোধের আদিম তৃষ্ণা। আজ প্রণয় বাড়িতে নেই, এই সুযোগটাকেই কাজে লাগিয়েছে। শান্তর জ্বরের ঘোরে কান্নার শব্দ তার কানে বাজছিল, কিন্তু অরুনিমা বরাবরই পাষাণ। পাশের বাড়ির মহিলার কাছে শান্তকে গছিয়ে দিয়ে সে যখন ঘর থেকে বের হয়েছে, হাতে ধরা ছিল সেই ধারাল অস্ত্রটা যেটা দিয়ে আজ জমিদার বংশের পাপের চ্যাপ্টার শেষ করবে। অরুনিমার আলুলায়িত চুলগুলো বাতাসের ঝাপটায় উড়ছে, পরনের শাড়িটা কোমরে শক্ত করে গিঁট দেওয়া। তার রণংদেহী রূপ দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে শ্মশানকালী জেগে উঠেছে। বনফুলের কাঁটা তার পায়ে বিঁধছে, শাড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে লতাপাতায়, কিন্তু ওর লক্ষ্য স্থির। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলছে, “তাওহীদ! তুই ভাবছস অরুনিমা মইরা গেছে? আমি মরি নাই রে জানোয়ার! আমি তোর যম হইয়া ফিরছি। আমার ভাইরে যে আগুনে পুড়াইছস, সেই আগুনের শিখা নিয়া তোর বুকে কামড় দিমু আজ। আজ রাইতে তোর পালানোর পথ নাই।”
অন্ধকারে চোখজোড়া বাঘিনীর মতো জ্বলছে। অরুনিমা জানে, আজ হয়তো ও নিজেও বাঁচবে না কিন্তু তাওহীদকে না মেরে আজ সূর্যোদয় হতে দেবে না। জমিদার বাড়ির সিংহদরজাটা অদূরে আবছা দেখা গেল, অরুনিমার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল ক্রুর হাসি। হাতের ছুরিটা চাঁদের আলোয় একবার ঝিলিক দিয়ে উঠল। যেন বলছে, “রক্ত চাই, অনেক রক্ত।”
জমিদার বাড়ির অন্দরমহল যখন পৈশাচিক খেলায় মত্ত, তখন সেই নিস্তব্ধ রাত চিরে সালেহা বেগম এসে পৌঁছালেন থানায়। সারা জীবনের আভিজাত্য আর পর্দার আড়াল সরিয়ে এই মাঝরাতে এসেছেন এক চরম সত্যের বোঝা বইতে না পেরে।
অনিন্দিতা রায় তখন বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সালেহা বেগমকে এই অবস্থায় দেখে তিনি অবাক হলেন। সালেহা বেগম কোনো ভনিতা না করে সরাসরি অনিন্দিতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বর কাঁপছে। তিনি বললেন, “ম্যাডাম, আপনি বিকেলে যে আংটিটা আমার ছেলেকে দেখাইছিলেন, সেটা আমি আড়াল থেকে দেখছি। ওই আংটিটা আমার। বহু বছর আগে আমার আলমারি থেকে ওটা হারায়া গেছিল। আমি ভেবেছিলাম কোনো কাজের লোক হয়তো অভাবের তাড়নায় চুরি করছে, তাই কাউকে কিছু বলি নাই। কিন্তু আজ বুঝতে পারতেছি, চোর আমার ঘরেই ছিল।”
অনিন্দিতা স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আমার গুণধর ছেলে তাওহীদ ওইটা সরাইছিল। সে যে অরুনিমার সর্বনাশ করার লাইগা আমারই আংটি ব্যবহার করব, এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। নিজের পেটের ছেলের পাপ করছে ম্যাডাম। ওই আংটিরে একটা মেয়ের মৃত্যুর কারণ বানাইছে।” তারপর তিনি অনিন্দিতার হাত ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন, “ম্যাডাম, আমার ছেলেরে আপনি শাস্তি দেন। ও মানুষ না, ও একটা জানোয়ার। ওরে না আটকালে এই গ্রাম শ্মশান হইয়া যাইব। আমি আর মা হইয়া ওর পাপের বোঝা বইতে পারতাছি না।”
সালেহা বেগমের এই স্বীকারোক্তি অনিন্দিতার মামলার শেষ খুঁটিটাও গেঁথে দিল। আংটিটা যে তাওহীদেরই ছিল, তার অকাট্য প্রমাণ এখন পুলিশের হাতে। অনিন্দিতা রকিবুলকে ইশারা করে বললেন, “সালেহা বেগমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করো আর আমরা বেরোচ্ছি জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। আজ রাতেই সব মুখোশ খুলবে।”
.
মকবুল রহমান কাঁপাকাঁপা হাতে সেই ময়লা ছালাটা সরিয়ে দিলেন। নিচে রাখা একটি বস্তু দেখে তাঁর রক্ত হিম হয়ে গেল। সেখানে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই বরং পড়ে আছে একটা দীর্ঘ, ধারালো কুড়াল যার ফলাটা চাঁদের আলোয় চকচক করছে। কুড়ালের হাতলে লেগে থাকা কালচে দাগগুলো বলে দিচ্ছে, এটি এর আগেও রক্ত দেখেছে। কুড়ালের ঠিক নিচেই পড়ে আছে একটা চিরকুট। মকবুল রহমান ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে সেই চিরকুটের লেখাগুলোর ওপর চোখ বুলালেন,
“আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আপনি সেই ব্যক্তিকে শেষ করবেন। দরকার পড়লে আপনার নিজের রক্ত দিয়ে সেই পাপ ধুয়ে ফেলুন। এই কুড়াল দিয়ে তার কলিজা ফালাফালা করবেন ঠিক যেভাবে আপনি একদিন পলাশ তালুকদারের ভিটা দখল করেছিলেন। মনে রাখবেন, কাল সকালে যদি এই ব্যক্তির লাশ না পাওয়া যায়, তবে তার বদলে আপনার কবরের মাটি খোঁড়া হবে।”
মকবুল রহমান নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। চিরকুটের প্রতিটি শব্দ তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। নিজের রক্ত দিয়ে পাপ ধুয়ে ফেলা? পলাশ তালুকদারের ভিটা? তার কথা কেউ কীভাবে জানবে? তিনি তো পলাশ তালুকদারের বংশ নির্বংশ করে ওই জায়গা-জমি, বাড়ি-ঘর দখল করেছিলেন। যাকে খুন করতে বলা হচ্ছে, সে লোক কে? তিনি ওই বিশাল কুড়ালটার দিকে তাকালেন। খুনি এমনভাবে চাল চেলেছে যে, মকবুল রহমান যদি লোকটাকে না মারে, তবে তাকে মরতে হবে। অন্ধকারের মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক তীব্র হয়ে উঠল। মনে হলো যেন কোনো অদৃশ্য আত্মা তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছে, “দেরি করবেন না জমিদার মশাই, সময় বয়ে যাচ্ছে।”
মকবুল রহমান কুড়ালটা শক্ত করে ধরলেন। হাতের তালু ঘামে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আসছে। তিনি টলতে টলতে নির্দেশিত জায়গার দিকে এগোতে লাগলেন। আমবাগানের শেষ প্রান্তে, পুরনো সেই বিশাল জারুল গাছটার নিচে একটা আবছা ছায়া দেখা যাচ্ছে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখলেন, সেখানে একটা মোটরসাইকেল দাঁড় করানো, আর তার ওপর হেলান দিয়ে বসে আছে এক যুবক। যুবকটি অন্ধকারের দিকে মুখ করে বসে কী যেন একটা ভাবছে। এটাই সেই শিকার। একে শেষ করলেই তিনি মুক্তি পাবেন, রক্ষা পাবে তার জীবন। তিনি নিঃশব্দে পা ফেলে এগোতে লাগলেন। হাতের কুড়ালটা উঁচিয়ে ধরলেন। পৈশাচিক উন্মাদনা তার রক্তে খেলা করছে। ঠিক পেছন থেকে কোপটা দেওয়ার জন্য যখন তিনি লক্ষ্যস্থির করলেন, তখনই বাইকে বসা ছেলেটি হঠাৎ ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসল এবং মুখ ঘোরালো। চাঁদের একফালি ম্লান আলো এসে পড়ল ছেলেটির মুখে। মকবুল রহমানের হাতের কুড়ালটা মাঝ আকাশেই থেমে গেল। তার সারা শরীর জমে পাথর হয়ে গেল। বাইকের ওপর বসে থাকা ছেলেটি আর কেউ নয়, তাওহীদ! তাওহীদ নিজের বাবাকে কুড়াল হাতে যমের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। চোখদুটো কপালে উঠে গেছে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “আব্বা! আপনি এখানে? এই রাইতে কুড়াল হাতে এইখানে কী করেন?”
মকবুল রহমানের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। তার চোখের সামনে তখন নিজের রক্ত, নিজের উত্তরাধিকার। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, “তুই? তুই এইখানে কী করস? তোরে মারতে পাঠাইছে আমারে?”
তাওহীদ আরও অবাক হয়ে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল, “মানে? আমারে মারবেন মানে? আমারে তো মেসেজ দিয়া এইখানে ডাকছে আপনারে বাঁচাইতে! কইছে আপনি বিপদে পড়ছেন!”
ওদের বুঝতে অসুবিধা হলো না, অদৃশ্য সেই মাস্টারমাইন্ড এক ভয়ানক মরণফাঁদ পেতেছে। পিতা আর পুত্রকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রক্তক্ষয়ী খেলার শেষ অংকে। বরং খোদ পিতাকেই দিয়েছে নিজের সন্তানকে বলি দেওয়ার হুকুম। তিনি আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন, “পালা পালা, তুই পালা। অনেক দূর চইলা যা।”