প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ১৮

🟢

অনিন্দিতা রায়ের নির্দেশে কনস্টেবলেরা মকবুল রহমান আর তাওহীদকে স্ট্রেচারে তুলল। দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক; মকবুল রহমানের জ্ঞান নেই বললেই চলে আর তাওহীদ যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। তাদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো। জমিদার বাড়ির প্রতাপ আজ আক্ষরিক অর্থেই ধুলোয় মিশে বিদায় নিল।

প্রণয় ধীরপায়ে অনিন্দিতা রায়ের সামনে এসে নিজের হাত দুটো বাড়িয়ে দিল। তার চোখেমুখে প্রশান্তি খেলছে, যেন চব্বিশ বছরের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রার অবসান ঘটেছে। অনিন্দিতা রায় হ্যান্ডকাফটা পরানোর আগে কিছুক্ষণ প্রণয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে কঠোরতা থাকলেও কোথাও যেন বিষণ্ণতাও মিশে ছিল। নিচু স্বরে বললেন, “এতদূর কেন গেলেন? আইনকে তো একটা সুযোগ দিতে পারতেন।”

প্রণয় ম্লান হাসল, “আইন তো অন্ধ ছিল ম্যাডাম। যে আগুনে আমার শৈশব পুড়ছে, সেই আগুনের তাপ আপনার আইন কোনোদিন সহ্য করতে পারত না।”

অনিন্দিতা রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “একবারও কি স্ত্রী আর অবুঝ সন্তানের কথা ভাবলেন না? ওদের ভবিষ্যৎ আপনি অন্ধকার করে দিলেন।”

অরুনিমা পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিল। প্রণয় উত্তর দেওয়ার আগেই হঠাৎ বাগানের সরু পথ দিয়ে একজন লোক ছোট একটা শিশুকে কোলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ল। লোকটা ওদের পরিচিত, তাদের কাছেই শান্তকে রেখে এসেছিল। কোল থেকে নামিয়ে দিতেই শান্ত ছোট ছোট পা ফেলে দৌড়ে এল। চারপাশের পুলিশ, রক্ত আর বিশৃঙ্খলা বোঝার মতো বয়স ওর হয়নি। ও শুধু চেনে ওর বাবাকে।

“বাবা! ও বাবা!” বলে এক দৌড়ে প্রণয়কে জড়িয়ে ধরল। প্রণয় হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল। দুহাতে তখন হ্যান্ডকাফ পরানো হয়ে গেছে। লোহার শেকলের শব্দ ছাপিয়ে শান্তর খিলখিল হাসি আর বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ার দৃশ্যটা উপস্থিত প্রতিটা মানুষের বুকে তীরের মতো বিঁধল। প্রণয় হ্যান্ডকাফ পরা হাত দুটো দিয়েই শান্তকে বুকের মাঝে জাপটে ধরল। লোহার শেকলের ঝনঝনানি শব্দটা শান্তর কানে পৌঁছাল না, ও কেবল বাবার চেনা ঘ্রাণটুকু শুষে নিতে চাইল বড় বড় চোখ করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, তুমি কাল কেন আসোনি? তুমি এখন কোথায় যাও বাবা?”

প্রণয়ের গলাটা ধরে এল। সে শান্তর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “বাবা অনেক দূরে একটা কাজে যাচ্ছি সোনা। যদি আমি আর কখনো ফিরে না আসি, তবে মায়ের কাছে একদম লক্ষ্মী ছেলের মতো থেকো। মাকে কখনো একা রেখো না।”

“কেন আসবে না? আমি একা থাকব কেন? মা তো অনেক বকে, তুমি না থাকলে মা আমাকে মারবে!”

প্রণয় হেসে অরুনিমার দিকে তাকাল। তারপর শান্তকে বলল, “আমি মাকে বলে দিচ্ছি, মা আর কোনোদিন তোমায় বকবে না। বড় হয়ে যখন দুনিয়া দেখতে শিখবে, তখন বুঝবে তোমার বাবা কেন হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মরণ হলেও কাজ বেঁচে থাকে বাবা। তুমি বড় হয়ে মানুষের মত মানুষ হইয়ো, কারও উপর অন্যায় হতে দিও না।”

শান্ত কথাগুলোর গূঢ় অর্থ বুঝল না, শুধু বাবার চোখের পানি মুছে দিয়ে আবার বুকে মুখ লুকাল। প্রণয় অরুনিমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। অরুনিমা যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছে। ও কাঁদতে কাঁদতে পাশে বসে বলল, “আমার কী হবে? আমাকে কে দেখবে? তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার আর কে আছে? তুমি চইলা গেলে আমি তো এইবার সত্যি ভেসে যাব।”

প্রণয় মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “না অরু, ভেসে যাওয়া এত সহজ নয়। তোমার জন্য তোমার বাবা আছেন। ফিরে যাও বাবার কাছে। শান্তকে নিয়ে ওই বাড়িতেই থাকো, ওইটাই এখন তোমাদের নিরাপদ আশ্রয়।”

অরুনিমা চিৎকার করে উঠল, “আমি এই অভিশপ্ত গ্রামে থাকব না। তুমি ছাড়া আমার কেউ নাই, কোনো ঘর নাই!”

প্রণয় শান্ত গলায় বলল, “ঘর মানুষে না, মনে থাকে। আজ থেকে তোমার বাবার বাড়িই তোমার ঘর। শান্তর ভবিষ্যতের কথা ভাবো। আমার জন্য অপেক্ষা কোরো না, আমার জীবনটা অনেক আগেই এই বনের অন্ধকারে হারায়া গেছে। তুমি শুধু শান্তরে একটা সুন্দর সকাল দিও।”

অনিন্দিতা রায় আর সময় দিলেন না। ঘড়ির কাঁটা আর আইনের বাধ্যবাধকতা কোনো আবেগকেই চেনে না। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে কনস্টেবলদের ইশারা করলেন, “নিয়ে যাও।”

একটা নির্দেশে পৃথিবীটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। প্রণয়কে উঠে দাঁড়াতে হলো। কিন্তু শান্ত? ও তো অবুঝ। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে বাবার শার্টের খুঁটটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যেন ওটাই জীবনের শেষ অবলম্বন। প্রণয় যতবার পা বাড়াতে যায়, শান্তর ছোট্ট হাতের টান তাকে স্থবির করে দেয়। লোহার হ্যান্ডকাফটা শান্তর হাতে ঘষা খাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে ওর খেয়াল নেই।

প্রণয় নিচু হয়ে শান্তর হাত দুটো নিজের হাত থেকে আলাদা করতে চাইল। কিন্তু এই বাঁধন ছাড়া কি এত সহজ? ওর শিশুমন নেতিবাচক কিছু বুঝে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, “না, বাবা তুমি যাবে না। তুমি গেলেই মা কাঁদবে, তুমি চলো আমাদের সাথে।”

প্রণয় দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলালো। এই বাঁধন ছিঁড়তে না পারলে সে কোনোদিন ন্যায়ের পথে নিজের সাজা গ্রহণ করতে পারবে না। অরুনিমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাল। অরুনিমা টলতে টলতে এগিয়ে এল। জোর করে শান্তকে টেনে নিল। শান্ত চিৎকার করে হাত-পা ছুড়তে লাগল। নখ দিয়ে প্রণয়ের শার্টে আঁচড় কাটল। প্রণয় যখন পুলিশের গাড়ির পা-দানিতে পা রাখল, শেষবারের মতো পেছন ফিরে তাকাল। দেখল, শান্তর মুঠোয় রয়ে গেছে তার শার্টের ছিঁড়ে যাওয়া ছোট্ট অংশ। হয়ত ওই অংশটুকুই এখন ওদের সম্পর্কের শেষ যোগসূত্র!

গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা অরুনিমার বুকে এসে বিঁধল। জিপটা যখন ধুলো উড়িয়ে চলতে শুরু করল, শান্ত তখনো অরুনিমার কোল থেকে ছিটকে বেরিয়ে ধুলোমাখা রাস্তার ওপর দৌড়াতে লাগল, “বাবা, ও বাবা, যেও না!”

বিজ্ঞাপন

অনিন্দিতা রায় আয়নায় সেই দৃশ্য দেখেও মুখ ঘুরিয়ে নিল। এই অন্ধকার রাতের পর যে সকাল এল, তা আলোর চেয়েও বেশি রক্ত আর অশ্রু দিয়ে ভেজা।

.

ভোরের আলো যত পরিষ্কার হচ্ছে, গত রাতের বীভৎস সত্যগুলো গ্রামের মানুষের মুখে মুখে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। মকবুল রহমান আর তাওহীদের পৈশাচিক রূপ কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এইবার তাদের মনে ভয়ের বদলে ঘৃণা আর ক্ষোভের জোয়ার উপচে পড়ল। সবাই বিচার চাচ্ছিল, “এই জানোয়ারগুলার মরণ হইলেই গ্রাম পবিত্র হইব! জ্যান্ত পুড়াইয়া মারছিল মাস্টারেরে, এখন নিজেরা তিল তিল কইরা নরক ভোগ করুক।”

সাধারণ যে গ্রামবাসী গতকাল পর্যন্ত জমিদারের সামনে ভয়ে তটস্থ থাকত, আজ তারাই তাদের থুতু ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করল।

অরুনিমা যখন শান্তর হাত ধরে চেয়ারম্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন চেয়ারম্যান এক নিমেষেই দশ বছর বুড়িয়ে গেলেন। নিজের আদরের মেয়েকে মৃত জেনে এতদিন তিনি যে শোক বয়ে বেড়িয়েছেন, আজ তাকে জ্যান্ত সামনে দেখে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেললেন। কিন্তু মেয়ের চোখের পাথুরে চাহনি আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট শান্তকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। অরুনিমা শুধু বলল, “বাবা, আমি ফিরে আসছি। কিন্তু আমার ঘর নেই, প্রণয় নেই, কেউ নেই।”

চেয়ারম্যান এগিয়ে গেলেন। কাঁপাকাঁপা হাতে শান্তকে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “মা রে, প্রণয়রে আমি আবার ফিরাই আনব। তোরে কথা দিতেছি। তুই আর আমাগোরে ছাইড়া যাইস না মা। আয়, ঘরে আয়।” অরুনিমা কি করবে? শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নদীর হাড়হিম করা স্রোত আর মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসার মুহূর্তটা গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সেদিন রাতে তাওহীদের অপমানে আর কলঙ্কের বোঝা সইতে না পেরে ও যখন নদীর উত্তাল ঢেউয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল, তখন কেবল মনে হয়েছিল সব যন্ত্রণার অবসান হতে যাচ্ছে। পানির অতল গহ্বর ওকে টেনে নিচ্ছিল, ফুসফুস ফেটে যাচ্ছিল বাতাসের অভাবে। চেতনার শেষ বিন্দুতে ও শুধু দেখেছিল অন্ধকারের মাঝেও কিছু একটা তার দিকে ধেয়ে আসছে। অরুনিমা নদীর মাঝস্রোতে তলিয়ে যাচ্ছিল, প্রণয় নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মরণফাঁদে। আবছা মনে পড়ে, একজোড়া শক্ত হাত তাকে টেনে ধরল। যখন দেহটা নিস্তেজ হয়ে আসছিল, তখন কেউ একজন ওকে তীরের ঘাসে শুইয়ে দিয়ে পেটে চাপ দিচ্ছিল। জ্ঞান ফেরার পর দেখেছিল ভিজে সপসপে প্রণয়কে। অতঃপর প্রণয় ওকে সুস্থ করে তুলেছিল, অনাগত সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছিল। সেদিন নদী অরুনিমাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রণয় ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিল নতুন সত্তা হিসেবে। এখন কোথায় সেই প্রণয়? অরুনিমা বিড়বিড় করে বলল, “তুমি সেদিন কেন বাঁচাইছিলা? একা থাকার যন্ত্রণার চেয়ে তো ওই নদীই ভালো ছিল।”

বিচার হয়েছে ঠিকই তবে মৃন্ময়ী আর ইয়াসিফ আজ বড় বেশি রিক্ত। সত্য জয়ী হয়েছে, কিন্তু এই সত্যের দাম দিতে গিয়ে ওরা হারিয়েছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে। মৃন্ময়ী টলতে টলতে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে যায়। পাশাপাশি দুটো করব; একটা বাবার, অন্যটা আদরের বোনের। ঘাসগুলো শিশিরে ভেজা। মৃন্ময়ী কবরের পাশে বসে মাটির ওপর হাত রাখল। ফিসফিস করে বলল, “আব্বা, বুনু... তোমরা কি দেখতে পারতেছ? আজ ওই জানোয়ারদের বিচার হইছে। কিন্তু এই বিচার দিয়া আমি কী করুম? এই বাড়ি, এই জগত আমার কাছে এখন শ্মশান। তোমরা আমারে আর মারে একলা রাইখা গেলা ক্যান?”

মৃন্ময়ী শিশিরের কবরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে চায়, কিন্তু পারল না। বুক ফেটে আসে কান্নায়। শিশিরের দগ্ধ দেহের স্মৃতি তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল। মনে মনে বলল, “আপনি আমারে বাঁচাইয়া দিয়া গেছেন ঠিকই, কিন্তু আমার জীবন তো আপনার সাথেই ওই আগুনে পুড়ে ছাই হইয়া গেছে। মানুষের আত্মা সাথে না থাকলে সেই বাইচ্চা থাকায় কি লাভ?”

রওশান আরা মৃন্ময়ীকে আগলে রাখেন। তিনি কাঁদেন না। কাঁদলে এই মেয়েটা যে একেবারেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।

সবাই যখন কিছু না কিছু পেল কিংবা হারাল, তাহমিদ ওরফে প্রতীক তখন দাঁড়িয়ে রইল অথৈ সাগরের মোহনায়। তার প্রাপ্তি আর হারানোর হিসেবটা বড্ড গোলমেলে। সে ফিরে পেয়েছে তার প্রকৃত পরিচয়, পেয়েছে ভাইকে; কিন্তু বিনিময়ে হারিয়েছে অস্তিত্বের কতকগুলো বছর। তদন্ত আর আইনি প্রক্রিয়ার মাঝে তাহমিদকে এখন অভিশপ্ত জমিদার বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে।

সালেহা বেগম সবটা শুনে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন। ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারান। সেই থেকে তার অবস্থা শোচনীয়। জ্ঞান ফিরছে আর ‘তাহমিদ’ বলে ডুকরে উঠছেন। ওই নারীর মাতৃত্বের কাছে প্রতীক পরাজিত। ঘৃণা থাকলেও সে মমতাময়ী মাকে ফেলে যেতে পারছে না।

তাহমিদ বারান্দার খুঁটি ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে প্রশ্ন জাগে, সে কি আসলেই নির্দোষ? পাপীর ছায়ায় থেকে সে কি অজান্তেই পাপের ভাগীদার হয়নি? তাওহীদের অনেক অন্যায় জেনেও আড়াল করেছে, জমিদারের ক্ষমতার দাপট ভোগ করেছে। আজ আইনি খাতায় সে হয়তো রাজসাক্ষী, কিন্তু নিজের বিবেকের আদালতে সেও তো অপরাধী। তার উল্লাস নেই, বিজয় নেই। সে কেবল জীবন্ত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদার, যে নিজের ঘর খুঁজতে গিয়ে এক বিশাল শ্মশানের হদিস পেয়েছে।

.

অনিন্দিতা রায়ের বিশেষ অনুমতিতে মকবুল রহমানকে গ্রেফতারের আগে সালেহা বেগম দেখা করার সুযোগ পেলেন। দীর্ঘ অনেকগুলো বছরের দাম্পত্য, আভিজাত্য আর মিথ্যে মোহের বিষাদময় সমাপ্তি দেখতে তিনি আজ এখানে। লোকটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে, কিন্তু সালেহার চোখে কোনো পানি নেই, নেই কোনো মায়া। তিনি স্থির দৃষ্টিতে স্বামীর পানে চেয়ে রইলেন, এই চাউনিতে সব ঘৃণা আর জমাটবদ্ধ অপমান উগরে দিচ্ছেন। মকবুল রহমান অস্ফুট স্বরে কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু সালেহা সেই সুযোগ দিল না। তিনি আঁচলের তলা থেকে বের করে আনলেন হারানো পিস্তলটি যেটা তাহমিদ নয়, খোদ সালেহা বেগমই নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এই আগ্নেয়াস্ত্রই হবে এই অভিশপ্ত বংশের শেষ বিচারের হাতিয়ার। কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রিগার চাপলেন। ঠাস! একটামাত্র গুলিতে ত্রিশ বছরের ঘাতক, এক মিথ্যাবাদী আর লোভী পিশাচের ইহলীলার অবসান ঘটল। মকবুল রহমানের নিথর দেহটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গুলির শব্দে পুলিশ ছুটে এল। অনিন্দিতা রায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন এই শান্ত রণচণ্ডী নারীর দিকে। সালেহা বেগম পিস্তলটা ফেলে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখেমুখে পরম তৃপ্তির আভা খেলছে।

তাকেও গ্রেফতার করা হলো। তাহমিদ চাইল এই খুনের দায় নিতে, মায়ের ঋণ শোধ করতে। সালেহা বেগম ম্লান হেসে তাহমিদের মাথায় হাত রেখে ধীর গলায় বললেন, “আমারে ক্ষমা কর বাবা। আমি তোমার লাইগা এতদিন কিছু করতে পারিনি। তোমার শৈশব চুরি হইছে আমার চোখের সামনে, অথচ আমি অন্ধ সাজছিলাম। আজ এই পিশাচটারে শেষ কইরা আমি নিজের কলঙ্ক মুছলাম। তুমি খুশি হইছো তো বাবা? আমারে মাফ কইরা দিও। তোর এই মা তোরে নিজের পেটের ছেলের চেয়েও বেশি ভালোবাসছে।”

তাহমিদ অশ্রুসজল চোখে চেয়ে রইল মহীয়সী নারীর দিকে, যে নিজের হাতে সব ধ্বংস করে তাকে কলঙ্কমুক্ত পৃথিবী উপহার দিয়ে গেলেন। আইনের চোখে এটা অপরাধ, কিন্তু নৈতিকতার বিচারে এক জননীর প্রায়শ্চিত্ত।

.

অবশেষে বিচারের দিন এলো। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে দুই মেরুর দুই মানুষ। একদিকে বিধ্বস্ত তাওহীদ রহমান; অন্যদিকে শান্ত, অবিচল মুখে দাঁড়িয়ে আছে প্রণয় এহসান। বিজ্ঞ বিচারক তার চশমাটা ঠিক করে মামলার চূড়ান্ত রায় পড়া শুরু করলেন,

“এই মামলার নথিপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আসামী তাওহীদ রহমান ক্ষমতার দম্ভে একেরপর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সে কেবল শিশির আহমেদকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারেনি, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে এবং একটি গোটা জনপদকে ভয়ে তটস্থ রেখেছে। তার কৃতকর্ম সভ্য সমাজের জন্য ভয়াবহ এবং কলঙ্কিত দৃষ্টান্ত। আসামী তাওহীদ রহমান: ময়ূরীকে ধর্ষন এবং খুন, শিশির আহমেদের হত্যাকাণ্ড এবং অরুনিমার ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের দায়ে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ৩৭৬ ধারা মোতাবেক আসামীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো। আগামী কার্যদিবসে আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার আদেশ দেওয়া হলো।

অন্যদিকে, আসামী প্রণয় এহসান ন্যায়বিচার না পেয়ে প্রতিহিংসার পথে হেঁটেছেন। চব্বিশ বছর আগে তার পরিবারের ওপর হওয়া অন্যায়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অমানবিক। কিন্তু আইন কাউকে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য নিজের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয় না। আসামী প্রণয় অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুনের ষড়যন্ত্র সাজিয়েছেন এবং একাধিক খুনের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকেছেন। যদিও তার প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু একাধিক খুনের ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড হওয়া এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অপরাধে তাকেও ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। দণ্ডবিধির ৩০২ এবং ১২০-বি ধারা মোতাবেক আসামী প্রণয় এহসানকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো।” রায় ঘোষণা শেষে বিচারক তার কলমের নিব ভেঙে ফেললেন।

রায়ের শব্দটা আদালত কক্ষে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। অরুনিমা পেছনের বেঞ্চে বসে শান্তকে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। প্রণয় ঘাড় ঘুরিয়ে অরুনিমার দিকে তাকাল। তার শূন্য দৃষ্টি অরুনিমার কানে কানে শুধু একটা কথা বলে গেল, “শান্তকে আকাশ দেখতে শিখিও অরু, মাটির দিকে তাকিয়ে যেন ও কোনোদিন রক্ত না দেখে।”

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প