যখন ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে তখন ফের অনিন্দিতা রায় জমিদার বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ালেন। তাওহীদ বাবার সাথে তর্কের পর রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু অনিন্দিতাকে দেখে পথ আটকে গেল। পেছনে মকবুল রহমান সাহেবও ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। অনিন্দিতা সোজা তাওহীদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অরুনিমার সাথে আপনার ঠিক কী ধরনের সম্পর্ক ছিল তাওহীদ? আপনি নাকি প্রায়ই চেয়ারম্যান বাড়ি যেতেন?”
তাওহীদ সামলে নিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল, “আমরা কলেজে একসাথে পড়তাম, সেই সূত্রে সামান্য জানাশোনা ছিল। একই গ্রামের মেয়ে, বিপদে-আপদে খোঁজখবর নিতাম এর বাইরে কিছু না।”
অনিন্দিতা পকেট থেকে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেটে থাকা একটা সোনার আংটি বের করে তাওহীদের সামনে ধরলেন। শীতল গলায় বললেন, “এই আংটিটা অরুনিমার ঘরের একটা গোপন বাক্স থেকে পাওয়া গেছে। এটা কি আপনি চেনেন?”
তাওহীদ মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বলল, “এইসব সস্তা আংটি বাজারে হাজারটা পাওয়া যায়। অরুনিমার মতো মেয়ের ঘরে কার আংটি থাকবে না থাকবে, তা আমি কেমনে জানব? ওই মেয়ের চরিত্র ভালো ছিল না। কার সাথে কখন কোথায় ঘুরত তার কোনো ঠিক ছিল না। মরার আগে হয়তো কোনো প্রেমিকের স্মৃতি রাইখা গেছে।”
এমন কুরুচিপূর্ণ কথায় অনিন্দিতার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, “মৃত মানুষকে নিয়ে এসব বলতে আপনার বাঁধে না? যাইহোক, এবার আসল কথায় আসি। নিখোঁজ শিশির আর মৃন্ময়ী কোথায়? আপনি কি জানেন তারা গত সন্ধ্যা থেকে গায়েব?”
তাওহীদ একটা নাটকীয় কাশি দিয়ে সোফার ওপর বসে পড়ল। সে কপালে হাত দিয়ে দুর্বল গলায় বলল, “ম্যাডাম, কাল রাত থিকা আমার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। আমি শরীর নিয়া বিছানা থিকা উঠতে পারতাছি না, আর আপনি আসছেন জহির মোল্লার মাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করতে? আমি কি এলাকায় পাহারাদারি করি নাকি যে কে কোথায় গেল তার হিসাব রাখুম?”
মকবুল রহমান পাশ থেকে সায় দিয়ে বললেন, “জি ম্যাডাম, ছেলেটা আমার সারা রাত জ্বরে পুড়তাছে। ও এসবের কিছুই জানে না।”
অনিন্দিতার মনে হলো, তাওহীদ ডাহা মিথ্যে বলছে। চোখেমুখে মোটেও জ্বরের ঘোর নেই। তবুও তিনি মুচকি হেসে বললেন, “জ্বর যখন উঠেছে, তখন সাবধানে থাকবেন তাওহীদ সাহেব। কারণ জ্বর বাড়লে মানুষ অনেক সময় প্রলাপ বকে সত্য কথা বলে দেয়। আমি আজই আবার আসছি।”
.
গ্রামের সেই বীভৎসতা থেকে অনেক দূরে, অন্য গ্রামের আরেক প্রান্তের ছোট ঘর। জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের ধূসর আলো সবে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। গত তিনটে দিন প্রণয় আর অরুনিমার ওপর দিয়ে ঝড় গেছে। শান্ত গত তিন দিন ধরে তীব্র জ্বরে পুড়ছে। গ্রামে যাওয়ার সব পরিকল্পনা বাতিল করে দিয়ে দুজনেই ছেলের শিয়রে বসে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছে। আজ শেষ রাতে শান্তর শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে, জ্বরটা একটু ইস্তফা দিয়েছে। টানা জাগরণে অরুনিমা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, শান্তর পাশে মাথা রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। শান্তও ঘুমোচ্ছে, তবে জ্বরের ঘোরে থেকে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠছে। প্রণয় তাই ঘুমানোর সাহস পায়নি; সে একদৃষ্টিতে ছেলের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ঠিক এমন সময় নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় মৃদু কিন্তু দৃঢ় আওয়াজ হলো, “ঠক, ঠক, ঠক।”
প্রণয় চমকে উঠল। এই সাতসকালে কে আসতে পারে? সে অত্যন্ত সন্তর্পণে শান্তর পাশ থেকে উঠে গিয়ে দরজা খুলল। দরজার ওপাশে একজন দাঁড়িয়েছিল, যার সাথে কয়েক মুহূর্ত খুব নিচু স্বরে কথা হলো।
প্রণয় ঘরে ফিরে এল। অরুনিমার কাঁধে হাত দিয়ে আলতো করে ডেকে তুলল। অরুনিমা ধড়ফড় করে উঠে বসেই আগে শান্তর কপালে হাত দিল। তারপর প্রণয়ের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “জ্বর কি আবার বাড়ছে?”
প্রণয় বলল, “না, জ্বর আগের চেয়ে কম। শোনো অরু, আমার একটা বিশেষ কাজ আছে। আমি একটু আসছি। তুমি শান্তর কাছে থাকো। ও উঠলে যেন ভয় না পায়। আর শোনো একদম রাগারাগী করবে না।”
অরুনিমা অবাক হয়ে প্রণয়ের হাত ধরল, চোখেমুখে দুশ্চিন্তা। ও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? এই ভোরে কই যাচ্ছ? কে এসেছে দরজায়?”
প্রণয় জ্যাকেটটা গায়ে চাপাতে চাপাতে শুধু বলল, “এসে সব বলছি। তুমি শুধু ছেলেটাকে সামলাও।” অরুনিমা কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই প্রণয় দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তাওহীদ যখন ইটভাটায় ফিরে এল, তখন তার দুচোখে খুনের নেশা আর অপমানের জ্বালা। বাপের হাতের ওই চড়টা ভেতরের শেষ মনুষ্যত্বটুকুও পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। সে চেয়েছিল মৃন্ময়ীকে জ্যান্ত কবরে রেখে সারাজীবন নিজের পায়ের তলায় দাসী বানিয়ে রাখবে, ওর তেজ ভাঙবে। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। পুলিশ কমিশনার আর অনিন্দিতা রায় যেভাবে পেছনে লেগেছে, তাতে এই দুজনকে বাঁচিয়ে রাখা মানে নিজের ফাঁসির দড়ি নিজে বোনা। সে হনহন করে সেই অন্ধকার ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখল শিশির আর মৃন্ময়ী দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে নিথর হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ ধকল আর রক্তক্ষরণে তারা তখন প্রায় বেহুঁশ। তাওহীদ তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত থমকাল। মনে একটা আফসোস খচখচ করে উঠল। বিড়বিড় করে বলল, “শখ ছিল তোরে খুবলানোর। তোরে এইভাবে ছাই বানায়া দিমু ভাবি নাই। আমার বাপে আমার গায়ে হাত তুলছে তোর লাইগা। তোরা থাকলে আমার বিপদ।”
সে আর এক সেকেন্ড দেরি করল না। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের ইশারা করতেই তারা কেরোসিনের ড্রাম নিয়ে হাজির হলো। তাওহীদ নিজে হাতে কেরোসিন ঢালতে শুরু করল। শিশির আর মৃন্ময়ীর অবশ শরীরের ওপর, দড়ির ওপর। তেলের উগ্র গন্ধে পুরো ঘরটা ভারী হয়ে উঠল তবুও ওদের জ্ঞান ফিরল না। তাওহীদ পকেট থেকে দিয়াশলাই বের করল। একটা কাঠি জ্বালিয়ে সেটার শিখার দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসল। ভাবল, “মৃন্ময়ীর মতো অনেক মেয়ে আসবে। কিন্তু তাওহীদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা আগে দরকার।”
জ্বলন্ত কাঠিটা সে তেলের স্রোতের ওপর ছুড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে “হুঁ হুঁ” করে আগুন জ্বলে উঠল। শুকনো কাঠ আর কেরোসিনের ছোঁয়ায় আগুনের লেলিহান শিখা ঘরের ছাদে গিয়ে ঠেকল। ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। তাওহীদ তৃপ্তির চোখে সেই অগ্নিকুণ্ডের দিকে তাকিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা দিল। পেছন থেকে শিশিরের অস্ফুট গোঙানি ভেসে আসলেও তাওহীদ ফিরে তাকাল না। সে দ্রুত পায়ে জিপে গিয়ে বসল। জিপে উঠে আয়েশ করে সিগারেট ধরাল। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা গালটা একবার দেখে নিয়ে সে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। মৃন্ময়ীর জন্য তার মনে যে সামান্য খচখচানি ছিল, সেটা মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে ধোঁয়া ছেড়ে বললল, “আরে, ভাত ছিটালে যেমন কাকের অভাব হয় না, টাকা ছিটালে সেরকম নারীর অভাব হয় না। এই অজপাড়াগাঁয়ের একটা মাইয়া মরলে দুনিয়া কি থেমে যাবে নাকি? শহরে গেলেই তো আশেপাশে কত্ত! কত মৃন্ময়ী লাইনে দাঁড়াবে।”
তাওহীদের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে তো আর আজকের খেলোয়াড় নয়। নারী বশীকরণে সে বরাবরই ওস্তাদ। কত মেয়ে যে তার মিষ্টি কথার জালে আর ক্ষমতার দাপটে ধরা দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। হঠাৎ মনে পড়ে গেল অরুনিমার কথা। বিড়বিড় করে বলল, “অরুনিমা, ওহ অরুনিমা। মাই লাভ, মাই সুইটহার্ট! বশীকরণে তাওহীদরে হারায় কার সাধ্য! ওই তেজস্বিনী অরুনিমাকেও তো একবার কব্জা কইরা বিয়া করছিলাম। তবে তার কপাল খারাপ ছিল বইলা সে নাই।” নিজের সাফল্যের কথা ভেবে তাওহীদ বেশ চনমনে বোধ করল। তার কাছে ক্ষমতা আর টাকাই হলো আসল কথা। টাকা থাকলে আইন পকেটে থাকে, আর নারী থাকে পায়ের নিচে।
জিপের জানালার বাইরে দিয়ে দ্রুতবেগে চলে যাওয়া গাছপালার দিকে তাকিয়ে তাওহীদ পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবতে লাগল। অরুনিমার কথা মনে পড়তেই মেজাজটা আবার একটু খিঁচড়ে গেল। মেয়েটা দেখতে মন্দ ছিল না, বেশ মায়াবী ছিল। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হলো তখন, যখন মাঝখান থেকে অরুনিমা পেট বাঁধিয়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিল। তাওহীদ নিজেকে একটা বিশ্রী গালি দিল, “আরে বাপু, আমার কি তখন সময় বাচ্চার দায়িত্ব নেওয়ার? আমি কি সংসার করার লাইগা বিয়া করছি নাকি? ভাবছিলাম দু’দিন মজা করুম, তারপর ব্যস! তা না, মেয়ে তো একেবারে ঘরনী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।”
অরুনিমা যখন জেদ ধরল সে এই বাচ্চা নষ্ট করবে না, তখন তাওহীদ বাধ্য হয়েই কঠিন ভাষায় বলেছিল, “এইসব ঝামেলা পালার সময় আমার নাই। সোজা যাও, এবোরশন করো।”
কিন্তু অরুনিমা তো নাছোড়বান্দা। দিনরাত শুধু কান্নাকাটি আর অনুনয়-বিনয়। বিরক্ত হয়ে সেদিন তাওহীদ সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছিল, “শোনো, তোমারে আমি বউ হিসেবে কিছুতেই সমাজে স্বীকৃতি দিতে পারুম না। তারচেয়ে একটা বুদ্ধি দেই চলো তোমারে দূরে কোথাও বিক্রি কইরা দিয়া আসি। ওতে আমারও কিছু লাভ হইব, আর তোমারও একটা ব্যবস্থা হইব।”
কথাটা শুনে অরুনিমা ঘৃণায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দই উচ্চারণ করতে পেরেছিল, “ছিঃ!”
তাওহীদ হেসে বলেছিল, “এতই যদি সতী-সাবিত্রী হও, তবে যাও গিয়া পেছনের নদীতে ঝাঁপ দিয়া মরো। আপদ বিদায় করো!” অরুনিমা সত্যি সত্যিই কালিন্দী নদীতে ডুবে মরে ঝামেলা চুকিয়েছিল। এইমুহূর্তে তাওহীদ তৃপ্তির ঢেকুর তুলল।
.
বদ্ধ কুঠুরিতে বাতাসের অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। আগুনের প্রচণ্ড উত্তাপ আর কেরোসিনের ঝাজালো গন্ধে মৃন্ময়ী আর শিশিরের অচেতনপ্রায় মস্তিস্কে চাবুক পড়ল। প্রথমে চোখ মেলল শিশির। চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে রক্ত হিম হয়ে গেল। তাওহীদ নিশ্চয়ই তাদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার চূড়ান্ত ব্যবস্থা করে গেছে। আগুনের তাপে মৃন্ময়ীও ছটফট করে আর্তনাদ করে উঠল। আগুনের দেওয়াল তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরছে। দরজার সামনে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে, ওদিক দিয়ে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। একমাত্র ভরসা ওপরের দিকে থাকা ছোট একটা ভাঙা জানালা, যা মাটি থেকে বেশ উঁচুতে। শিশির নিজের রক্তাক্ত, কাটাছেঁড়া হাতের যন্ত্রণাকে তুচ্ছ করে মৃন্ময়ীর হাত ধরে টেনে তুলল। তার আঙুলগুলো থেকে তখনো রক্ত চুইয়ে পড়ছে, আগুনের তাপে সেই ক্ষতগুলোও জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। উন্মাদের মতো চিৎকার করে বলল, “মৃন্ময়ী! ওঠো! আমাদের বের হতে হবে। তুমি আমার কাঁধে পা দাও!”
মৃন্ময়ী ধোঁয়ায় কাশতে কাশতে বলল, “আপনের হাত দিয়া রক্ত পড়তাছে! আপনি পারবেন না। আপনি আগে যান!”
“তর্ক করার সময় নাই মৃন্ময়ী! আমি যা বলছি সেটা শোনো।” শিশির তার রক্তাক্ত দুই হাত এক করে জানালার নিচে শক্ত করে ধরল। যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল হাড়গুলোও যেন চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। মৃন্ময়ী অশ্রুভেজা চোখে শিশিরের রক্তাক্ত হাতের ওপর ভর দিয়ে আর কাঁধে পা দিয়ে জানালার কাছে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা করল। শিশিরের পিঠ আর কাঁধের ক্ষতগুলোয় যখন মৃন্ময়ীর পায়ের চাপ পড়ছিল তখন ব্যথায় শিশিরের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসছিল, কিন্তু হাত নড়ল না। সে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে মৃন্ময়ীকে ওপরে ঠেলে দিল। মৃন্ময়ী জানালার কার্নিশটা ধরতে পারল। শিশির মরণপণ শক্তিতে তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “বাইরের দিকে লাফ দাও! জলদি!”
মৃন্ময়ী কোনোমতে জানালার সরু গলে বাইরে গড়িয়ে পড়ল। বাইরে পড়েই ভেতরের দিকে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “আপনের হাত দেন, আমার হাত ধরেন।” কিন্তু ভেতরে আগুনের তান্ডব তখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। ছাদের পুরনো কাঠ মড়মড় করে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। আগুনের সেই নরককুণ্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শিশির ম্লান হাসল, তার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। তার রক্তাক্ত আঙুলগুলো জানালার কার্নিশ ছোঁয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ওপর থেকে এক বিকট শব্দ হলো। ইটভাটার পুরনো ছাদের বিশাল একটা কাঠের বিম আর জ্বলন্ত ইটের স্তূপ প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ল জানালার সামনে।
ধুলো আর আগুনের ফুলকিতে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। মৃন্ময়ী আতঙ্কে পিছিয়ে গেল। আগুনের সেই দেওয়াল আর ভেঙে পড়া ধ্বংসস্তূপের কারণে শিশিরের জানালার কাছে আসার শেষ পথটুকুও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। মৃন্ময়ী জানালার ওপাশে হাত বাড়িয়ে পাথর সরাতে চাইল, কিন্তু আগুনের তাপে কাছে ঘেঁষতে পারল না। ভেতরের সেই দাউদাউ আগুনের লাল আভার মাঝখানে শিশিরের অবয়বটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। দেওয়াল ধরে কোনোমতে দাঁড়িয়ে কেবল শান্ত গলায় বলল, “মৃন্ময়ী তুমি পালাও। অনেক দূর চইলা যাও। আমার সময় শেষ।”
মৃন্ময়ী আর্তনাদ করে উঠল কিন্তু ভেতর থেকে আর কোনো উত্তর এল না। শুধু ছাদ ভেঙে পড়ার আরও কয়েকটা শব্দ আর আগুনের পৈশাচিক গর্জন শোনা গেল। শিশিরের সেই রক্তাক্ত অবয়বটা ধীরে ধীরে আগুনের লেলিহান শিখার আড়ালে হারিয়ে গেল। যে মানুষটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে মৃন্ময়ীকে আগলে রেখেছিল, সে নিজেই সেই আগুনের যজ্ঞে উৎসর্গ হয়ে গেল।
মৃন্ময়ী পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, চিরচেনা সেই মানুষটাকে...
ইয়াসিফ থানার যাবতীয় ফর্মালিটিজ শেষ করে ফিরছিল। হঠাৎ ডানদিকের নির্জন দিগন্তে আকাশের বুক চিরে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে সে থমকে দাঁড়াল। ওই তো ইটভাটা! কিছু একটা ঘটেছে বুঝতে পেরে সে আর দেরি করল না, উন্মাদের মতো দৌড় দিল আগুনের উৎসের দিকে। কাছে পৌঁছাতেই বীভৎস দৃশ্য তার চোখে পড়ল। জ্বলন্ত ঘরটার সামনে একজন মেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করছে। চারপাশে আর কেউ নেই, কেবল আগুনের গগনবিদারী গর্জন। ইয়াসিফ দ্রুত কাছে গিয়ে দেখল মেয়েটি আর কেউ নয়, মৃন্ময়ী। সারা শরীর ধুলো আর রক্তে মাখা, চোখ দুটো অপার্থিব যন্ত্রণায় ঝাপসা হয়ে আসছে। ইয়াসিফ ওকে আগলে ধরে চিৎকার করে ডাকল, “মৃন্ময়ী! মৃন্ময়ী!”
মৃন্ময়ী তখন জ্ঞান হারাচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাত তুলে জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপের দিকে ইঙ্গিত করে অস্ফুট স্বরে কেবল একটাই কথা বলতে পারল, “শিশির আগুনের ভেতরে...” কথাটা শেষ হতেই মৃন্ময়ীর মাথাটা ইয়াসিফের কাঁধে নুয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তে অন্ধকারের দুই প্রান্ত থেকে আরও দুটি ছায়া সেখানে এসে হাজির হলো। সামনে তাকিয়ে দেখল, সব শেষ। ইটভাটার ছাদটা পুরোপুরি ধসে পড়েছে, আগুনের শিখা সবকিছু গ্রাস করে নিয়েছে। কোনো মানুষের পক্ষেই এখন ওই নরককুণ্ডে ঢোকা সম্ভব নয়। অথচ ওরা বাঁচাতেই এসেছে। তাহমিদ আর প্রণয় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। হারের নিঃশব্দ হাহাকার নিয়ে তারা একে অপরের দিকে তাকাল। কোনো কথা হলো না, কেবল পরাজিত সৈনিকের মতো মাথা নিচু করে তাদের সেখান থেকে ফিরে যেতে হলো।
.
ইটভাটার ভয়াবহ আগুন যখন নিভে এল, তখন সেখানে পড়ে আছে পোড়া ইটের স্তূপ আর ছাই। দমকল বাহিনী আর গ্রামের মানুষ ধ্বংসস্তূপ সরাল। আগুনের লেলিহান শিখা যা পুড়িয়ে শেষ করতে পারেনি, তা হলো শিশিরের হাতে থাকা ঘড়ি আর গলার চেইন। সনাক্তকরণের জন্য এইটুকু আর মৃন্ময়ীর শেষের কথাটুকু যথেষ্ট ছিল।
ওদিকে মৃন্ময়ীর অবস্থা সংকটাপন্ন। ইয়াসিফ ওকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও জ্ঞান ফেরার কোনো লক্ষণ নেই। ও একেবারে নিথর, পাথরের মতো স্তব্ধ। রওশন আরা হাসপাতালের বারান্দায় আছাড় খেয়ে বিলাপ করছেন। তার গগনবিদারী চিৎকার হাসপাতালের দেওয়াল চিরে দিচ্ছিল।
শিশিরের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ল। যে মানুষটা বিনা পয়সায় বাচ্চাদের পড়াতো, যে হেসেই মানুষের দুঃখ ভুলিয়ে দিত, সে আজ নেই। বাতাসের প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে শিশিরের নাম প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
শিশিরের মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকে অরুনিমা আর স্বাভাবিক মানুষের মধ্যে নেই। প্রণয় ওকে সামলানোর চেষ্টা করতেই অরুনিমা এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। চোখের করুণ চাহনি মুহূর্তেই এক ভয়ঙ্কর জিঘাংসায় রূপ নিল। উন্মাদের মতো বলল, “তাওহীদ ভাবছে ও জিতে গেছে? না, এইবার লুকায়া থাকার দিন শেষ। ওই জানোয়ারটা আমার পেটের সন্তানরে অস্বীকার করছে, আমার ইজ্জত নিছে খেলছে, আমি তাও সইছিলাম। কিন্তু আজ ও আমার কলিজার টুকরা ভাইটারে জ্যান্ত পুড়াইয়া মারছে!”
অরুনিমা ঘরের এককোণ থেকে একটা ধারালো দা হাতে তুলে নিতে চাইল, প্রণয় এসে ওকে থামাল। স্থির করতে চাইল। কিন্তু ওর দুচোখে আগুনের শিখা বেরোচ্ছে। হিসহিস করে বলল, “পুলিশ-আদালত দিয়া ওর বিচার হবে না, ওর বিচার আমি করব।”
শান্ত ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। অরুনিমাকে শান্ত করা যাচ্ছিল না। প্রতিশোধের নেশায় ও তখন সাক্ষাৎ রণচণ্ডী। এতদিন যে ছাই চাপা আগুন অরুনিমার ভেতরে ধিকধিক করে জ্বলছিল, শিশিরের মৃত্যু তাকে এক ধ্বংসাত্মক দাবানলে পরিণত করেছে।
.
চারদিক থমথমে নিস্তব্ধতা, ঠিক ঝড়ের আগের পূর্বাভাস। এমন সময় জমিদার বাড়ির অন্দরমহলে মকবুল রহমানের ফোনের স্ক্রিনটা আবার জ্বলে উঠল। সেই রহস্যময় অপরিচিত নাম্বার থেকে কাঙ্ক্ষিত মেসেজটা এসেছে। হাড়হিম করা নির্দেশ: “বাড়ি থেকে বের হন। আমি যা যা বলব, এখন থেকে ঠিক তা-ই করবেন। একটুও এদিক-ওদিক হবে না। একা একা গ্রামের পূর্ব দিকে যেখানে শ্মশানঘাট, সেই রাস্তার দিকে আসতে থাকেন।”
মকবুল রহমানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই খুনি বা নির্দেশক তার প্রতিটি পদক্ষেপ নজর রাখবে। তিনি নিজের শয়নকক্ষে ঢুকলেন। বহুদিনের পুরনো কাঠের ড্রয়ারটার দিকে হাত বাড়ালেন। একা যখন যেতেই হচ্ছে, তখন নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলটা সাথে রাখা জরুরি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখলে অন্তত আত্মরক্ষা করা যাবে। ড্রয়ারটা খুললেন। কিন্তু ভেতরটা ওলটপালট। সব আছে, কালো রঙের ভারী পিস্তলটা নেই। মকবুল রহমান পাগলের মতো ড্রয়ারের ভেতর হাতড়ালেন। বিড়বিড় করে বললেন, “পিস্তলটা গেল কই? ওইখানেই তো ছিল!”
অতঃপর তাকে পিস্তল ছাড়াই রাতের অন্ধকারে বের হতে হলো।