প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ৬

🟢

রশিদ একবার পেছনে তাকাল। কাজ শেষ, নিশ্চিত। নিঃশব্দে হাত ইশারায় দলবলকে কাছে ডাকল। কেউ কথা বলল না। ওরা রওনা হলো। গন্তব্য, আকন্দ বাড়ি। গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে ছায়ার মতো এগোতে লাগল কয়েকটা অবয়ব। পায়ের শব্দ ঢেকে দিচ্ছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ চিৎকার। রাতটা যেন সব দেখে ফেলেও কিছু না দেখার ভান করছে। সবার সামনে একজন। তার হাতে ছু-রিটা। রক্তে ভেজা ছু-রির ধারটা চাঁদের আলোতে মৃদু ঝিলিক দিচ্ছে। যেন আলো ছুঁতে চায়, আবার লুকোতেও চায়। ছুরির রক্ত তাজা, এখনো শুকায়নি। ছু-রির গা বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা করে মাটিতে পড়ছে আবার পেছনের জনের পায়ের চাপায় মিলিয়ে যাচ্ছে।

রাত প্রায় দু’টো। আকন্দ বাড়ির চারপাশে অন্ধকার এমনভাবে চেপে বসেছে, যেন আলো বলে কিছু যে আছে তাই সকলে ভুলে গেছে। দূরের হ্যারিকেনগুলোর ক্ষীণ আলো এখানে পৌঁছায় না। নিস্তব্ধতা এত ঘন যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও কানে লাগে। রশিদ আর তার দল থেমে গেল বাড়িটার সামনে। তাহের আকন্দকে বিকেলেই দেখা গেছে পূর্বপাড়ায় ভাইয়ের বাড়ির দিকে যেতে। সে আজ আর ফিরবে না বাড়িটা আজ ফাঁকা। যদিও আকন্দ সাহেবের স্ত্রী রয়েছে তবুও ছেলেমানুষ ইয়াসিফ একলাই। রশিদের ঠোঁটের কোণে নিষ্ঠুর নিষিদ্ধ একটা হাসি খেলল। আজ রাতের শিকার সে-ই। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন হাত তুলল। ঠক। ঠক। কড়া নাড়ার শব্দটা রাতের বুক চিরে ভেতরে ঢুকে গেল।

অনেকক্ষণ পর ভেতর থেকে একটা চাপা আওয়াজ ভেসে এলো, “কে?”

ইয়াসিফের গলা। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো নিঃশ্বাস চেপে ধরল। কেউ কোনো শব্দ করল না। ভেতরের পায়ের শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে। কাঠের দরজায় কান পেতে ইয়াসিফ আবার সেই প্রশ্ন করল, “কে?”

রশিদ গলা খাঁকারি দিল। কণ্ঠটাকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল, “ভাই… আমি।”

ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল, “আমি কে? এই রাতের বেলা কি দরকার?”

রশিদ একটু থামল। তারপর বলল, “ভাই, আমি পাশের গ্রামের সাইফ। আপনার আব্বা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। খুব খারাপ অবস্থা। একটু আসলে ভালো হয়।”

ইয়াসিফের ভুরু কুঁচকে গেল। একটু সন্দেহ হলেও পাত্তা দিল না। দরজার খিলটা খুলতেই কাঠের পাত দু’খানা সরে গেল। সে ঠিক বুঝে ওঠার আগেই, অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছুরির ফলা ঝাঁপিয়ে পড়ল। ঝকঝকে একটা ঝিলিক। ইয়াসিফ প্রতিক্ষণে পিছিয়ে গেল। ছুরিটা শূন্যে কোপ মারল। সামান্য এক ইঞ্চির জন্য বেঁচে গেল সে। হাতের টর্চলাইটটা পড়ে যায়নি, শক্ত করে ধরা ছিল। তৎক্ষণাৎ আলোটা সামনে ফেলল। সাদা আলোয় মুহূর্তেই মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।

রশিদ! জমিদারের খাস লোক। ইয়াসিফ দাঁত চেপে বলল, “রশিদ? তুই?”

রশিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল। পেছন থেকে আরেকজন এগিয়ে এলো। চেহারায় বিষ মাখানো হাসি। রশিদ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “টার্গেট মিস করছ ক্যা? দে চাকু মাইরা সানডে-মানডে ক্লোজ কইরা দে।”

ইয়াসিফ এক ঝটকায় নিজেকে সামলে নিল। পা দুটো শক্ত করে মাটিতে গেঁথে দাঁড়াল। টর্চের আলোটা সোজা লোকটার চোখে মারল। মুহূর্তের জন্য লোকটা চোখ কুঁচকে ফেলল। সেই ফাঁকে ইয়াসিফ পাশে রাখা কাঠের চেয়ারটা টেনে নিয়ে ঢাল বানাল। ছুরির কোপ পড়ল চেয়ারের গায়ে। কাঠ ফেটে গেল। সে পিছিয়ে গেল না বরং চেয়ারটা ঘুরিয়ে সামনে থাকা একজনের পায়ে সজোরে ঠেলে দিল। লোকটা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেল।

আরেকজন পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইতেই ইয়াসিফ দরজার পাল্লা ঠেলে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ওরা সংখ্যায় বেশি। চারদিক থেকে ধস্তাধস্তি, ধাক্কা আর অনবরত গালিগালাজ চলছে। কয়েক মুহূর্তের প্রতিরক্ষা সম্ভব হলো মাত্র। তারপরই শক্তি ফুরোতে লাগল। এতগুলো অস্ত্রধারী মানুষের সাথে একা অস্ত্রহীন হয়ে লড়াই করা সম্ভব হচ্ছে না, কপাল বেয়ে ঘাম নামছে। ঠিক তখনই, বাড়ির ভেতরে একের পর এক বাতি জ্বলে উঠল। মায়ের কণ্ঠ ফেটে বেরিয়ে এলো, “ইয়াসিফ বাবা কই তুই? কি হচ্ছে? বাইরে এত চেঁচামেচি কেন? কারা এলো?”

মায়ের কণ্ঠটা কানে পৌঁছাতেই ইয়াসিফের মনোযোগটা নড়েচড়ে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি সরে গেল ওদের দিকে থেকে।

“মা...” বলার আগেই ঝলসে উঠল ছুরির ফলার আলো। প্রথম কোপটা এসে লাগল ডান কাঁধের নিচে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় কোপটা পড়ল পিঠের উপর দিকে। রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। ইয়াসিফ হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। দাঁত চেপে আর্তনাদটা গিলে ফেলতে চাইল, কিন্তু পারল না। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। ঠিক সেই সময় ভেতর থেকে দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ। মায়ের আতঙ্কিত চিৎকার, “ইয়াসিফ, বাবা...”

এই চিৎকারটা ওদের জন্য সংকেত ছিল। রশিদ দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল, “চল। দ্রুত চল, মানুষজন আইয়া পড়লে সব্বনাশ হয়ে যাইব।”

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছায়ার মতো সবাই মিলিয়ে গেল। রাতের আঁধারে মিলিয়ে যেতে সমস্যা হলো না। ইয়াসিফ মাটিতে পড়ে রইল। রক্তে ভিজে গেছে কাপড়। কান ঝাঁঝরা করা মায়ের কান্না আর ডাকের ভেতরেই সে অজ্ঞান হয়ে গেল।

চিৎকার আর হইচই শুনে আশপাশের ঘরগুলোও জেগে উঠল। কে কোথা থেকে বেরিয়ে এলো কেউ বুঝে ওঠার আগেই উঠোন ভরে গেল মানুষে। কেই হারিকেন হাতে, কেই টর্চ হাতে আবার আলো-আঁধারির ভেতরেই কারো কারো চোখে পড়ল উঠোনে রক্তে ভেসে থাকা ইয়াসিফকে। একজন দৌড়ে এসে আহাজারি শুরু করল, “আল্লাহ আল্লাহ! এইডা কী হইল? ইয়াসিফরে কে মারল রে?”

উদ্বেগ আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তেই। একজন তার মাকে সামলাতে গেল কিন্তু তিনি অনবরত ইয়াসিফের অচেতন দেহ ঝাঁকিয়ে ডাকছে, “ইয়াসিফ, চোখ খোল বাবা… কথা ক!”

রক্ত বন্ধ করার জন্য একজন গামছা চেপে ধরল, আরেকজন দৌড়ে গিয়ে ভ্যান আনল। আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সবাই মিলে সাবধানে তাকে তুলে নিল। হারিকেনের আলো দুলতে দুলতে সামনে চলল, পেছনে ছুটল মানুষ। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে একটাই কথা ভেসে বেড়াচ্ছে, “হাসপাতালে নিতে হবে, তাড়াতাড়ি। রক্ত বন্ধ করা যাইতেছে না কোনোভাবেই। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।”

মানুষ বুঝতে পারল না, কী হচ্ছে হঠাৎ? তাদের শান্তশিষ্ট গ্রামীণ জীবনে কার নজর লাগল? তবে শাঁখারিয়া গ্রামের অন্ধকার রাস্তা সাক্ষী হয়ে রইল আরেকটা রক্তাক্ত সত্যের, আরেকটা রক্তাক্ত দেহের।

.

মৃন্ময়ী স্থির হয়ে বাবার লাশের পাশে বসে আছে। নিঝুম রাত। গভীর নৈঃশব্দ্যে আচ্ছন্ন চারিধার। কেউই এখন পর্যন্ত কিছু জানে না। ও বাইরে এসেছিল শুধু বাবাকে ডাকতে, “আব্বা…”

বিজ্ঞাপন

ডাকটা ওইভাবেই গলার ভেতরে আটকে গিয়েছিল। উঠোনের মাটিতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত শরীরটা দেখেই ওর পা দু’টো অবশ হয়ে গিয়েছিল। আর এক পা এগোনোর শক্তিও পায়নি। ধপ করে বসে পড়েছিল মাটিতে। তারপর সেই যে বসেছে, আর ওঠেনি। বলা ভালো, উঠার শক্তি পায়নি। একটু কান্নাও করেনি ও, চিৎকার না, হাহাকারও না। চোখ দু’টো শূণ্য দৃষ্টিতে বাবার মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিল শুধু। এতদিন যে মুখটার দিকে তাকিয়ে সাহস ও অনুপ্রেরণা পেত, তা আজ চিরতরে নিভে গেছে। সাহসের আঁধার আজ নিশ্চল, নিস্তব্ধ। দুঃখের সবটুকু জল ফুরিয়ে গেছে, এখন শুধুই শূন্যতা। কান্নার সময় পেরিয়ে গেছে, নতুন করে আর ভেজার কিছুই অবশিষ্ট নেই। হৃদয় শুকিয়ে কাঠ, পাথর হয়ে বসে আছে মৃন্ময়ী। রাতটা আরও গাঢ় হলো। মৃন্ময়ী একই ভঙ্গিতে বসে রইল। নিভৃতে বাবা হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণায় মেয়েটি এক রাতে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বড় হয়ে গেল। বিসর্জন দিতে হলো ওর জীবনের সকল শিশুসুলভ সরলতা!

সকাল সকাল জহির মোল্লার লাশ দাফন করা হলো। দাফনের আগেই পুলিশ এসেছিল। কয়েকজন অফিসার উঠোনে দাঁড়িয়ে চারপাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। জিজ্ঞেস করল কীভাবে কি হয়েছিল? কখন হয়েছিল? সবশেষে বলল, “আমরা তদন্ত করব। অপরাধীদের ছাড় দেওয়া হবে না।”

কথাগুলো অরণ্যে রোদন হয়ে রইল। পুলিশের এই নিস্ফল আবেদনে কেউ কান দিল না। মানুষ জানে, পুলিশের দৌড় কতদূর? কার সাথে কথা বলবে পুলিশ? কে উত্তর দেবে? মৃন্ময়ী ঘরের দুয়ারে খিল এঁটেছে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। দরজার ওপাশে সে আছে কি না, সেটুকুও নিশ্চিত না। নিজেকেও পৃথিবী থেকে বহুদূরে রেখেছে। রওশন আরা শয্যায় অজ্ঞান। মুখটা ফ্যাকাসে, নিঃশ্বাসটুকু শুধু আছে বলেই মানুষজন বুঝছে তিনি বেঁচে আছেন। তার চারপাশে গ্রামের কয়েকজন মহিলা বসে আছে। তারা মাথায় পানি ঢালছে, কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ফিসফিস করে দোয়া পড়ছে, আবার চোখ মুছছে আঁচলে। পরিবারটার জন্য কষ্ট হচ্ছে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে পরিবারের দুটো সদস্য কতল হলো। আর কি আছে ওদের জীবনে?

চেয়ারম্যান সাহেব এলেন, জমিদার এলেন সান্তনা দিতে। তারা উঠোনে দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ ইতস্তত করলেন। সবাই এসে দাঁড়িয়ে রইল। কথা বলার মানুষ নেই। শোকটাই সকল প্রশ্নের উত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে!

দু’দিন পর ইয়াসিফের জ্ঞান ফিরল। এই দু’টা দিন সময় থমকে দাঁড়িয়ে ছিল। ডাক্তাররা আগেই বলে দিয়েছিলেন, অবস্থা আশঙ্কাজনক। শরীর থেকে অনেক রক্ত ঝরেছে। ছুরির কোপ এমন জায়গায় লেগেছিল যে, একটু এদিক-ওদিক হলেই সব শেষ হয়ে যেত। ভাগ্য আর জেদের মাঝখানে ঝুলে ছিল ইয়াসিফের প্রাণ। সেদিন রাতেই খবর পাঠানো হয়েছিল তাহের আকন্দকে। খবর পেয়ে তিনি আর দেরি করেননি। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিলেন হাসপাতালে। ছেলেকে অচেতন অবস্থায় দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল তার। কিন্তু অশ্রুতে বুক ভাসাননি। এই সময় কাদা তার জন্য বিলাসিতা। জহির মোল্লা খুন হওয়ার খবর পাওয়ার পর আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। এটা কাকতালীয় ঘটনা হতে পারেনা। সবকিছুর সুতো গিয়ে এক জায়গাতেই বাঁধা। তাহের আকন্দ সব বুঝেও চুপ করে রইলেন। প্রকাশ্যে কিছু বললেন না। এখন কথা বললে বিপদ আরও বাড়বে। ইয়াসিফের জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কাজটাই করলেন তিনি। ছেলের কানে কানে বললেন, “একদম চুপচাপ থাকবি। বাপ আমার, আমাদের কথা একবার ভাব। তোর ভাগ্য সাথে ছিল বলে আজ বেঁচে গেছিস বাবা। ওরা এত সহজে ছাড়বে না আমাদের।”

ইয়াসিফ কিছুই বলল না। চোখ দু’টো শুধু ছাদের দিকে স্থির হয়ে ছিল। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছিল শরীর, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জ্বালাচ্ছিল ভেতরের আগুন। এই দু’দিনে তাহের আকন্দ কোনোরকমে পুলিশকে বুঝিয়ে বিদায় করেছেন। আজ আর এড়ানো গেল না। পুলিশ এসেছে, ইয়াসিফের বয়ান নিতে। আশ্চর্যের বিষয়, ইয়াসিফ পুলিশকে সত্যটা বললে না। শুধু বলল, “আমি কাউকে দেখার সুযোগ পাইনি।”

তবে সে উপরে চুপ থাকলেও ভেতরে ভেতরে আগুন জ্বলছিল। সব জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল ক্রোধে। আজ যদি সে সব বলে দিত, পুলিশ কী করবে? পুলিশ মামলা করবে। চার্জশিট দেবে। কোর্টে মামলা চলবে। কয়েক বছর ধরে তারিখের পর তারিখ পড়বে। সাক্ষী, প্রমাণ হারাবে। শেষমেশ কী হবে? বেশি হলে তাওহীদ আর তার সঙ্গীরা “অপরাধী” প্রমাণিত হবে। হয়তো গ্যাং রেপের জন্য আজীবন কারাদণ্ড। খুনের জন্য ফাঁসি বা ফাঁসির বদলে যাবজ্জীবন। আর জমিদার? সে প্রভাবশালী ব্যক্তি। আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। সর্বোচ্চ যা হবে, কিছুদিন হাজত তারপর জামিন। সম্মান একটু আঁচড় খাবে, এই যা। এসবে ইয়াসিফের পোষাবে না। ময়ূরীর যন্ত্রণা ওদের চার্জশিটে ধরা পড়বে না। জহির মোল্লার নিথর দেহ ওদের রায়ে বেঁচে উঠবে না। কিছু অপরাধের শাস্তি আদালত দিতে পারে না। সেগুলোর বিচার অন্য জায়গায় হয়, অন্যভাবে হয়। এই অন্যায়ের বিচার হবে, স্বহস্তে ব্যক্তিগতভাবে।

.

বিকালের মৃদুমন্দ্র রোদে মৃন্ময়ী উঠোনে ঝাড়ু দিতে ব্যস্ত ছিল। ও এত মনোযোগ দিয়ে ঝাড়ু দিচ্ছিল যে, আশেপাশের শব্দ কানে পৌঁছাচ্ছে না। সেসময় শিশির এসে দাঁড়াল উঠোনের দ্বারে। মৃন্ময়ী লক্ষ্য করল না। সেই ঝাড়ুর শলার আগা তার পা মাড়িয়ে গেল। অদ্ভুতভাবেই ও চমকে উঠল। শিশির বুঝতে পারল, মৃন্ময়ী ব্যস্ত আর তার উপস্থিতি অবচেতনভাবে ওকে ধাক্কা দিয়েছে। মৃন্ময়ী ঝাড়ু থামিয়ে মাথা তুলে তাকাল, “আপনি এখানে?”

শিশির এগিয়ে এসে বলল, “চাচী বাড়িতে আছে?”

“আছে।” মৃন্ময়ীর উত্তর সংক্ষিপ্ত। তারপর একটুখানি থেমে বলল, “কিন্তু কথা বলবে না। যা বলার আমাকে বলুন।”

“আচ্ছা।” বলেই সে চুপ করে রইল। এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখল। মৃন্ময়ী ঝাড়ুটা একপাশে ঠেলে অন্য কাজে হাত দিল। ইচ্ছে করেই বসে কথা বলার অবকাশ দিল না। কাজের ফাঁকেই শিশিরের দিকে তাকিয়ে বলল, “বলুন, শুনছি। বসে কথা বলার সময় নেই।”

শিশির ইতস্তত করল। তারপর নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “চাচার দোকানপাটের কী হবে?”

মৃন্ময়ী থেমে গেল। চোখ দুটো সরাসরি শিশিরের দিকে তুলে তাকাল। কণ্ঠে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, “কেন? আমিও কি মরে গেছি?”

শিশির হতভম্ব হয়ে গেল, “তুমি দেখবে?”

“দেখব। আমাকে কি অবলা নারী ভেবেছেন? আমি আমার বাপ-বোনের মতো ভীতু নই।”

শিশির কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল মৃন্ময়ী ঝাড়ু দিচ্ছে, বাড়ির অন্যান্য কাজ করছে। কিন্তু সেই তাড়াহুড়োর মধ্যে অদৃশ্য লক্ষ্য লুকানো। প্রতিটি কাজই এত তৎপর, এত দ্রুত, যেন দেখানোর জন্য। শিশিরের বুঝতে অসুবিধা হলো না। ও সব আড়াল করে নিজের সমস্ত আবেগ, সমস্ত শোক এবং সমস্ত ক্ষত থেকে লুকানোর চেষ্টা করছে। শিশির এগিয়ে এসে মৃন্ময়ীর হাত ধরল। মৃন্ময়ী চোখ তুলে তাকাতেই সে বলল, “কষ্ট পেলে কাঁদো। সবকিছু নিজের মধ্যে চাপিয়ে রাখছো কেন? তোমার ভেতরের যন্ত্রণা বাইরে বেরোতে দাও।”

“কষ্ট পাব কেনো?”

“কষ্ট পাওয়ার জন্য কারণ লাগে না মৃন্ময়ী। কখনো কখনো মানুষ শক্ত থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তুমি একা সব সামলাতে চাইছো। কিন্তু তুমি পাথর না। ভাঙলে ভাঙো, কাঁদলে কাঁদো তাতে তুমি ছোট হবে না।”

“আমি কাঁদব না।” শীতল গলায় বলল ও।

“আমার সামনে অন্তত মুখোশ পরতে হবে না। আমি দেখেছি তোমাকে শক্ত হতে, এবার একটু দুর্বল হলেও ক্ষতি নেই।”

মৃন্ময়ীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি ওদেরকে শেষ করে ফেলব।” দীর্ঘদিন চেপে রাখা ক্ষোভ, অপমান আর অসহায়তা একসাথে জ্বলে উঠল। চোখ দুটো শুকনো, অথচ তার ভেতরে দাবানল দাউদাউ করছে। প্রতিশোধের সেই আগুন লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করল ও। শিশির স্পষ্ট দেখতে পেল। এই মৃন্ময়ীকে সে আগে দেখেনি। সে কিছু বলল না। কোনো উপদেশ দিল না। মৃন্ময়ীর কাঁধে হাত রাখল, ভরসার হাত।

এরপর মাত্র দু’দিন গেল। এই দু’দিনের ব্যবধানে একজন মানুষকে কেন্দ্র করে পাঁচ দিক থেকে পাঁচটি অস্ত্র তুলল পাঁচজন ভুক্তভোগী। পিস্তল, ছুরি, কোদাল, দা, রশি; পাঁচটা অস্ত্র, পাঁচটা হাত তবে তাদের প্রত্যেকের লক্ষ্য একটাই। একজন মানুষ! সে হচ্ছে তাওহীদ!

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প