প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ১

🟢

বিয়ের দিন বউ পালিয়ে গেছে! এই কথাটা গ্রামজুড়ে ছড়াতে সময় লাগল না। কেউ বলল, বাপ-মা জোর করে বিয়ে দিচ্ছে বলে পালিয়েছে। কেউ বলল, অন্যকারো সাথে পালিয়েছে। কেউ আবার ফিসফিস করে ভয়ানক অনেক কথাই বলল। কিন্তু ইয়াসিফ বিশ্বাস করতে পারছিল না। ময়ূরীর তো পালানোর কথা ছিল না। এই বিয়েটা ওদের দু’জনেরই স্বপ্ন ছিল। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটা সম্পর্ক! শত বাঁধা পেরিয়েও একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি। অতঃপর আজ সেই প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত সন্ধ্যা। ময়ূরীর তো কনের সাজে ঘরের ভেতর বসে অপেক্ষা করার কথা ছিল। তবে? ওই ঘরটা ফাঁকা। শাড়ি, গয়না, ময়ূরী; কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। ইতোমধ্যে কনের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে সবাই। পুকুরপাড়, বাঁশঝাড়, গ্রামের শেষ রাস্তা কোনো খানে বাদ নেই। নাম ধরে ধরে ডাকাডাকি হচ্ছে, “ময়ূরীইইই!”

কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া নেই। ইয়াসিফ আর অপেক্ষা করল না। তার অস্বস্তিটা সন্দেহে রূপ নিয়েছে। এই গ্রামে যত অঘটন ঘটেছে, সব কিছুর শিকড় এক জায়গাতেই গিয়ে ঠেকে। জমিদার বাড়ি! সে সোজা সেদিকেই হাঁটা ধরল। ইয়াসিফ ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “তাওহীদ!” একটু থেমে চেঁচালো, “তাওহীদ! বাহিরে আয়।”

কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে চেঁচাল, “তাওহীদ! আমি জানি তুই ভিতরেই আছিস।” কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। বেরিয়ে এলো জমিদার হাজী মকবুল রহমান। ইয়াসিফকে একবার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “এভাবে চেঁচামেচি করছ কেন? এটা কোনো বাজার না। ভদ্রলোকের বাড়ি‌।”

ইয়াসিফের কণ্ঠ ক্রোধে রুদ্ধ হয়ে আসছিল, “ময়ূরী কোথায়?”

জমিদার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন, “ময়ূর? সেডা কেডা? আমার এখানে কোনো ময়ূর বা উটপাখি আসে নাই। যাও গা বাবা।”

ইয়াসিফ এক পা এগিয়ে এসে বলল, “ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভারে স্মার্ট। দুই দিন আগেও এই বাড়ির পেছনে যা হয়েছে...” আজ সকালে ময়ূরীর বলা কথায় সে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ল।

“চুপ!” জমিদার সাহেবের গলা চড়ল। চক্ষু যুগল হিম হয়ে এলো, “এই বাড়ির নাম নেওয়ার আগে মুখ সামলে কথা বলবা। প্রমাণ আছে? না থাকলে এক পাও সামনে বাড়াইও না।”

ইয়াসিফ এখনও রোষে কাঁপছিল, “আগে ময়ূরীকে পেয়ে নিই।” সে বলল “তারপর আপনার আর আপনার ছেলের ব্যবস্থা করব।” জমিদার সাহেব কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু ইয়াসিফ থামিয়ে দিল, “ভেবেছিলাম বিয়েটা শেষ হোক, তারপর হিসাব চুকাবো। কিন্তু না, আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।”

জমিদার সাহেব ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বললেন, “প্রমাণ আছে?”

“নেই। কিন্তু বের করব। একটা না, অনেকগুলো। যেদিন প্রমাণ পাব, সেদিন লুকানোর জন্য আকাশ–পাতাল কোনো কিছুতেই ঠাঁই পাবেন না।”

জমিদার কিছুই বললেন না। ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ইয়াসিফ ফটকের দিকে এগিয়ে আরেকবার চোখ তুলে তাকিয়ে বলল, “ওয়েট অ্যান্ড সি।”

ইয়াসিফ পুরোপুরি চলে যাওয়ার পর জমিদার সাহেব কিছুক্ষণ ফটকের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। চোখেমুখের কঠিন ভাবটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেল। দৃষ্টিতে চাপা উদ্বেগ। তিনি ভেতরের দিকে ঘুরে গলা চড়ালেন, “রশিদ!”

এক মুহূর্তের মধ্যে একজন মাঝবয়সী লোক দৌড়ে এলো, “জি, সাহেব।”

জমিদার গলা নিচু করে বললেন, “তাওহীদ হারামজাদাকে এখনই খবর দে। আজকেই যেন শহরে চলে যায়।”

“এখনই?”

“হ্যাঁ।” জমিদার দাঁত চেপে বললেন, “দু’দিন সবকিছু চুপচাপ ছিল। এখন আর থাকবে না। মানুষ ক্ষেপেছে, পুলিশ আসবে গ্রামে। যাহ, তার আগেই ওরে বল চলে যাইতে। এক মুহূর্তও দেরি করা চলবে না।”

রশিদ মাথা নুইয়ে বলল, “আজ্ঞে সাহেব।”

.

ময়ূরীর বাড়িতে তখন কান্নার রোল পড়ে গেছে। উঠোনে, ঘরে, বারান্দায় সবখানে কান্নার শব্দ। মৃন্ময়ী ফোঁপাচ্ছে, বাবা নিঃশব্দে চোখ মুছছে, কেউ কেউ আবার মাটিতে বসে মাথায় হাত দিয়ে শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। ময়ূরীর মা রওশন আরা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বুক চাপড়ে কাঁদছেন আবার হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছেন, “আমার মাইয়াডা কই? আমার মাইয়াডারে খুঁজে দাও আল্লাহ!”

মৃন্ময়ী মাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নিজেরও চোখ শুকিয়ে গেছে। এ কোন বিপদ নেমে এলো? রাত নেমে এসেছে। এখনও ময়ূরীর একটা খবর পাওয়া যায়নি। জহির মোল্লা বিকেলের দিকে থানায় গিয়েছিলেন। ঘণ্টাখানেক পরে ধ্বংসাত্মক অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন। দৃষ্টিতে ক্লান্তি, অবয়বে শ্রান্তির আভা। রওশন আরা ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কি বলল পুলিশ? কিছু করবে তো?”

জহির মোল্লা নিচু গলায় বললেন, “কিছুই না।” কষ্টটা চেপে রেখে বললেন, “ওর বলল, ২৪ ঘণ্টা না পেরোলে নাকি কিছু করা যায় না। আর যেহেতু বিয়ের আসর থেকে মেয়ে গায়েব… ওরা একদম সিওর, মেয়ে পালাইছে।”

রওশন আরা চিৎকার করে উঠলেন, “আমার মাইয়া পালাইবো কেন? কার লগে পালাইবো?”

জহির মোল্লার গলা ভারী হয়ে এলো, “আরও বলল, এখন কেস-ফেস করে লাভ নাই। সময় নষ্ট। যাও, যাও।” তিনি চুপ করে গেলেন। ঘরের ভেতর আবার কান্নার শব্দ বেড়ে উঠল। মৃন্ময়ী এগিয়ে এলো। বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আব্বা, তোমরা কি পুরা গ্রামটা দেখছো?”

জহির মোল্লা তাকিয়ে বললেন, “দেখছি তো মা। মানুষজন সবদিকেই গেছে।”

বিজ্ঞাপন

“ইয়াসিফ ভাই কই এখন?” ইয়াসিফের খবর তিনি জানেন না। তাই চুপ করে রইলেন। রওশন আরাও তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। মৃন্ময়ী নিচু গলায় বলল, “ইয়াসিফ ভাই আপাকে ছাড়া এমনে বসে থাকার মানুষ না। উনি নিশ্চয়ই খুঁজছেন। উনি যদি কিছু জানেন…”

ওর কথা পুরোপুরি শেষ হলো না। বাইরের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এলো। আর সেই অন্ধকারের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সত্য।

ঘটনাটা শুরু হয়েছিল ঠিক দু’দিন আগে। ইয়াসিফ শাহরিয়ার, আকন্দ বাড়ির একমাত্র ছেলে। গ্রামের সীমানা পেরিয়ে অনেকদিন আগেই শহরে চলে গেছে। পড়াশোনা শেষ করে সেখানেই চাকরি-বাকরি করছে। ছুটিতে আসা–যাওয়ায় গ্রামের সাথে তার সম্পর্কটা কখনোই ছিঁড়ে যায়নি।‌ ময়ূরীর সাথে ইয়াসিফের সম্পর্কটা নতুন না। ছোটবেলার চেনাজানা, তারপর ধীরে ধীরে ভালো লাগা আর একসময় তার গভীরতা। বছরের পর বছর ধরে ওরা একে অপরকে নিঃশব্দে ধরে রেখেছে। চাকরি পাওয়ার পর ইয়াসিফ প্রথম যেটা করেছিল, সেটা হলো বাড়িতে সব কথা খুলে বলা। মা–বাবা আপত্তি করেননি। ময়ূরীকে তারা ছোটবেলা থেকেই চেনেন। গ্রামের অন্য দশটা মেয়ের মতো ও না। ভীষণ শান্তশিষ্ট, ভদ্র, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা। কারো সাথে উচ্চস্বরে কথা বলা তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকাতেও সংকোচ বোধ করত।

বিয়ের প্রস্তাবের পর সবকিছু ভীষণ দ্রুত এগিয়ে গেল। দুই পরিবারেই রাজি। তারিখ ঠিক হলো, প্রস্তুতি শুরু হলো। সবকিছু এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে, কেউ কল্পনাও করেনি এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই উতলে উঠছে এক ভয়ংকর ঝড়। সেই ঝড় আসতে সময় নিয়েছিল মাত্র দু’ঘন্টা।

ইয়াসিফ বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ আগেই গ্রামে ফিরেছিল। কিন্তু দু’দিন আগে হঠাৎ করেই শহরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কাজের একটা জরুরি ঝামেলা, না গেলে চলছিল না। তাই কোনো উপায় না পেয়ে শহরে ফিরে যেতে হয় তাকে। এই ঘটনাটা ময়ূরীর জানা ছিল না। ইয়াসিফ ভেবেছিল, ফিরে এসে বলবে। সেদিন সন্ধ্যার পর ময়ূরী ঘরেই ছিল। হঠাৎ পেছনের জানালায় মৃদু শব্দ। ময়ূরী জানালার কাছে গিয়ে দেখল, পাশের বাড়ির কাজের মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও নিচু গলায় বলল, “আপা, ইয়াসিফ ভাই তোমাকে বাড়ির পেছনের দিকে ডাকছে।”

ময়ূরী একটু অবাক হলো, “এখন?”

মেয়েটা মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ। একটু আগেই আসছে। তাড়াতাড়ি যেতে বলছে।”

ময়ূরীর মনে সন্দেহ জাগেনি। কারণ বিগত কয়েকবার ইয়াসিফ ঠিক এইভাবেই, লোকচক্ষুর বাইরে বাড়ির পেছনে দেখা করেছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে ময়ূরী আঁচলটা ঠিক করে বেরিয়ে পড়ল। ও পেছনের দিকের সরু পথটায় কাউকে দেখতে পেল না। আরেকটু এগিয়ে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই সবকিছু ঘটে গেল। পেছন দিক থেকে কেউ বা কারা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। একটা শক্ত হাত মুখ চেপে ধরল। চিৎকারটা গলার ভেতরেই আটকে গেল। আরেকজন পেছন থেকে দুই হাত জড়িয়ে ধরল, শরীরটা হাওয়ার মতো করে তুলে নিল। ময়ূরী ছটফট করতে লাগল। পা মাটিতে পড়ছে না, শ্বাস নিতে পারছে না। একজন ধমক দিল, “আওয়াজ করবি না।”

তারপর পাঁজাকোলা করে তুলে নেওয়া হলো ওকে। ঝোপঝাড়, কাদা, ভাঙা ইট পেরিয়ে দ্রুত এগোতে লাগল তারা। কয়েক মুহূর্ত পরেই একটা জীর্ণ কুটিরের সামনে এসে থামল সবাই। দরজাটা ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল। ময়ূরী হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। উঠে দাঁড়াতে চাইল, ঠিক তখনই তাওহীদ সামনে এসে দাঁড়াল। মুখে সেই ভয়ংকর হাসি, “কই যাস?”

ময়ূরী কাঁপতে কাঁপতে পিছিয়ে গেল। দেয়ালে পিঠ ঠেকল। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল ভয়ে, “তাওহীদ ভাই, আমি কিছু করি নাই। আমাকে ছেড়ে দেন…”

তাওহীদ হেসে উঠল। হাসিটা হিংস্র, তাচ্ছিল্যের। সে চারপাশে তাকিয়ে অন্যদের দিকে ইশারা করল, “ভাই? শুনছিস সবাই? এখন আমি ভাই!”

বাকি কয়েকজন হাসল। কেউ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ জানালার ধারে। কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে লালসা। ময়ূরী মাথা নাড়ল, “আমি বাড়ি যাব। কেউ জানে না আমি এখানে এসেছি, ইয়াসিফ জানলে...”

নামটা শুনেই তাওহীদের চোখে আগুন জ্বলে উঠল, “ইয়াসিফ? ওরে বিয়ে করবি বলে এত দেমাক?”

ময়ূরী আরও পিছোতে চাইল। কিন্তু আর জায়গা নেই। তাওহীদ হঠাৎ করে জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে চারপাশের সবাইকে দেখিয়ে বলল, “দেখছিস? পাখি পালাতে চাইছে।”

চারদিক থেকে চাপা আওয়াজ উঠল, “শোধ নেন ভাই। আজই সময়, আপনের আব্বা কইয়া দিছে।”

তাওহীদ এক পা এগিয়ে এলো। ময়ূরীর শাড়ির আঁচলটা টেনে ধরল। ও কেঁপে উঠল। দু’হাত দিয়ে নিজেকে আগলাতে চেষ্টা করল, পিছিয়ে যেতে চাইল কিন্তু পারল না। তাওহীদ ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি খেলিয়ে বলল, “কিছু মানুষ আছে যারা ভাবে, সবকিছু ওদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তোকে আমি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম না? যাহ এখন আমি তোকে বলছি, আর দরকার নাই। বিয়ে ছাড়াই অনেক কিছু করা যায়। আজ আমি একলা করব না, সবাই মিলে।” তাওহীদের কণ্ঠে তাচ্ছিল্য। ময়ূরীর চোখে আতঙ্ক। কুটিরের বাতিটা কেঁপে উঠল। সেই কাঁপুনির ভেতরেই হারিয়ে গেল ময়ূরীর শেষ আশাটুকু। তাওহীদ আর তার সঙ্গীদের হিংস্র হাসি, মদের গন্ধ, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীর মতো নীরবতা ময়ূরীর জীবনটাকে থেঁতলে দিয়েছিল। সেদিনই ময়ূরীর ভেতরটা মরে গিয়েছিল, শুধু শরীরটা বেঁচে ছিল।

এরপর যা ঘটেছিল, সেটা আর বলার মতো ছিল না। বাইরের পৃথিবী তখনও স্বাভাবিক। কেউ জানত না, ওই চার দেয়ালের ভেতরে কীভাবে একটা জীবন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরে, যখন দরজাটা আবার খুলল ময়ূরী তখন মাটিতে বসে ছিল। শাড়ির আঁচল এলোমেলো, চোখ দুটো শূন্য। কাঁদার শক্তিটুকুও শেষ হয়ে গেছে। তাওহীদ সামনে এসে দাঁড়াল, “আজ যা হইছে, একটা শব্দও যদি বাইরে যায়...” সে বাকিটা শেষ করল না। প্রয়োজনও ছিল না। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। আগুনের আলোয় তার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে কুটিল হাসি হেসে বলল, “তোর বোনটা তো বাড়িতেই আছে তাই না?”

ময়ূরীর বুকটা কেঁপে উঠল। ওরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। কুটিরের ভেতর শুধু ধোঁয়ার গন্ধ আর ভুক্তভোগী না, বন্দী ময়ূরীর নিঃশ্বাসের শব্দ রয়ে গেল।

ময়ূরী এই সব কথা কাউকে বলেনি। কেউ জানলো না, কেউ কিছু বুঝল না। পরদিনই ইয়াসিফ এসেছিল। ময়ূরী মুখ খুলল না। চুপচাপ, নিঃশব্দে বসে থাকল। ওর চোখে ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্ন আর ভয়, দু’টোই ঝলমল করছিল। সবাই ওর মন খারাপের কারণ হিসেবে ভেবে নিয়েছে, বিয়ে হয়ে যাবে তাই মেয়ের মন খারাপ।

সেই চুপচাপ ময়ূরী বিয়ের দিন অর্থাৎ আজ সকালবেলা আকুল হয়ে কেঁদেছে। ইয়াসিফ দেখা করতে এসেছিল। ময়ূরী ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট, সমস্ত ভয় বেরিয়ে এলো। চোখ দিয়ে পানি ঝরছে, আর ঠোঁট কম্পমান। ইয়াসিফ চুপচাপ ওর মাথায় হাত রাখল। কিছু বলল না। ময়ূরী অস্পষ্টভাবে কিছু বলল। তাওহীদ সম্পর্কে একটুখানি ইঙ্গিত দিল, কিন্তু পুরোটা বলল না। শুধু এতটুকুই, যাতে ইয়াসিফ কিছুটা বুঝতে পারে। ময়ূরী বলল, “ওরা আমাকে জমিদার বাড়ির পেছনে ধরে নিয়ে গেছিল।ওই বাড়ির পেছনের একটা কুটির আছে না! সেখানে কি হয়েছিল জানো? ওরা ওরা, জমিদার সাহেবও সব জানে...” ব্যস এইটুকুই। ময়ূরী বাকি কথাটা শেষ করতে পারেনি। বিয়েবাড়ির হৈ হট্টগোলে আর কিছু বলার সুযোগ পায়নি। যেহেতু ইয়াসিফের সাথে তাওহীদের আগে থেকেই একটা ঝামেলা আছে তাই ময়ূরীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা ইয়াসিফ মনে রাখল। ভাবল, “যা করার বিয়েটা হয়ে গেলে করব।” কিন্তু ওই মুহূর্তে সে ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি ঠিক কী হয়েছিল তার প্রাণপ্রিয় ময়ূরীর সাথে!

যে বিয়ের পর ব্যবস্থা নিবে, সেই বিয়েটাই তো হলো না। চোখে খুঁজে ফিরছে ময়ূরীকে, কোথায় গেল ও? কেন এমন আচরণ করল? সকালবেলা কেঁদে কেঁদে এসে জড়িয়ে ধরল, আর এখন কোথায় হারিয়ে গেল?

.

সকাল হয়ে এলো। সূর্যের আলো গ্রামের ঘর-বাড়ির ওপর পড়তে শুরু করেছে। রাতের নিঃশব্দ, নির্ঘুম মুহূর্তগুলো চোখের পলকে সবাইকে ক্লান্ত করে রেখেছে। খোঁজ এখনও চলছে অবিরত। হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতো খবর এলো, “ময়ূরীকে পাওয়া গেছে।”

বাড়ির সবাই চুপ হয়ে গেল। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। এরপর খবরের ভয়ংকর সত্য সামনে এলো, “ময়ূরীর লাশটা জমিদার বাড়ির পেছনে, আমগাছের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।”

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প