প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ৪

🟢

তাওহীদ বর্তমানে অস্বাভাবিক রকম খোশ মেজাজে আছে। যেন কিছুই ঘটেনি। যেন কোনো রাত, কোনো আর্তচিৎকার তার জীবনের পাতায় একটুও দাগ কাটেনি। এত জঘন্য কাজের পরেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। থাকবেই বা কেন? মাথার উপর যখন বাবার ক্ষমতাধর ছায়া আছে তখন ভয় নামের জিনিসটা তার অভিধানেই নেই। বাবা বলেছিল শহরে ফিরে যেতে। তাওহীদ শোনেনি, শোনার প্রয়োজনও বোধ করেনি। উল্টো শার্টের উপরের দু’টা বোতাম খুলে, চওড়া বুকে হাওয়া লাগিয়ে, চোখে কালো সানগ্লাস চেপে দেদারসে ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামজুড়ে। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে হাসছে বন্ধুদের সাথে, আড্ডা দিচ্ছে। গ্রামের মানুষ জানে, জমিদারের ছোট পুত্র বখাটে। তাই তারা সহজে ঘাঁটায় না, খুব একটা কথাবার্তা ও বলে না লোকজন। তাওহীদও গ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে যায় না। ওদের সে মানুষই মনে করে না। তার নিজের একটা দল আছে। ছোট কিন্তু বেশ শক্ত সামর্থ্য। এই ছেলেগুলো তাওহীদের গোপন বিজয়ের অংশীদার, সবগুলো বখাটে। এই ছেলেগুলো পুরো গ্রামটাকে ওদের ব্যক্তিগত খেলার মাঠ মনে করে।

ওদের আড্ডার জায়গাটা গ্রাম থেকে একটু দূরে, পুরোনো ইটভাটার পেছনে একটা পরিত্যক্ত কুঁড়েঘর। সাধারণত গ্রামের মানুষ কেউ ওখানে যায় না। জায়গাটা ঝোপঝাড়ে ঘেরা, এক পাশে শুকনো খাল, দিনের বেলাতেও অস্বস্তিকর লাগে। সন্ধ্যা নামলেই তাওহীদের দলটা সেখানে জড়ো হয়। এখানেই ওরা নিজেদের কুকীর্তির গল্প বলে। কে কাকে কখন কীভাবে ফাঁদে ফেলেছিল, কে কতটা ভয় পেয়েছিল, কখন কার চোখে অশ্রুধারা নেমে এসেছিল... সবকিছুই ওদের কাছে রসালো গল্প। আজও সেই আলাপ হচ্ছিল। তাওহীদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা পা আরেকটার উপর তুলে হাসতে হাসতে বলে, “মুখটা মনে আছে? ওই সময়ের!”

বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে হো হো করে হেসে ওঠে। সে হাসিগুলো ভারী, কর্কশ, শীতল, নিষ্ঠুর, নির্দয়। যেন কোনো মানুষের হাসি নয়, শিকারের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শিকারির হাসি। মোহন নামের একজন নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “ভাই ময়ূরীর সবকিছু মিটমাট হয়ে গেছে তাই না?”

তাওহীদ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি খেলল, “অল ক্লিয়ার।” সে বলল, “আব্বা আছে না!”

রাজীব বলল, “ভাগ্যিস আছে।”

মোহন জবাবে বলল, “নাহলে তো ঝামেলা হইয়া যাইত ভাই।”

তাওহীদ মাথা নাড়ল। সানগ্লাসটা ঠিক করে নিয়ে বলল, “ঝামেলার চিন্তা তোরা করিস না। যা মন চায় দেদারসে সেটাই কর। সব আব্বা দেখবেনি। মনে আছে, অরুনিমার কথা? সে বেচারি তো নদীতে ডুবে নিজেকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। হো হো হো...”

হাসিটা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলো। সেই মুহূর্তে দরজার বাইরে পায়ের শব্দ। কাঠের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল তাহমিদ। তাওহীদের বড় ভাই। ঔরসজাত ভাই হলেও তাওহীদ আর তাহমিদ এক নয়। তাহমিদ বেশ সাদামাটা ধরনের ছেলে। চোখে মুখে সেই ঔদ্ধত্য ভাবটা নেই। তাহমিদ এই কুঁড়েঘরে খুব একটা আসে না। ভেতরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়াল। হাসির শব্দ থেমে গেল। সবাই চুপ। তাহমিদের দৃষ্টি ঘুরে ঘুরে সবার মুখে পড়ল, বিশেষ করে তাওহীদের দিকে। সে কিছুই বলল না। জানে, ছোট ভাইটা বেপরোয়া। জানে, বাবার ক্ষমতার আড়ালে কত কিছু চাপা পড়ে যায়। জানে, এসব একদিন খুব খারাপ জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সে কী করবে? বাপের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই। ছোট ভাইকে থামানোর ক্ষমতাও নেই। তাওহীদ উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে বলল, “ভাইজান তুমি এইখানে?”

তাহমিদ বলল, “আব্বা তোকে খুঁজতেছে।”

তাওহীদ বাকি ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা থাক তাহলে এখন। দেখি আব্বাজান কি হুকুম করে। আসছি।” তারপর ভাইয়ের সাথে হাঁটা দিল নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। আব্বা আবার শহরে ফিরে যাওয়ার কথা বলে কিনা কে জানে? সে ভ্রু কুঁচকে হাঁটে। এই পালিয়ে যাওয়ার কথাটা শুনতে তার ভালো লাগে না।

.

শিশির এই এলাকার চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে। গত কয়েকদিন এলাকায় ছিল না, পরিবার সমেত এক আত্মীয়ের বিয়েতে বাইরে গিয়েছিল। গ্রামের খবর থেকে ওরা তখন অনেক দূরে। আজ বিকেলে ফিরেই গ্রামের বাতাসটা অস্বাভাবিক ঠেকল। চেয়ারম্যান নজির আহমেদ সব শুনে দুঃখ প্রকাশ করলেন। সকালে জহির মোল্লার সাথে দেখা করবেন বলেও ঠিক করলেন।

ময়ূরী আর মৃন্ময়ী, ওরা দু’বোন শিশিরের ছাত্রী। কথাটা শুনে সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। বাড়ি ফিরে কোনোরকমে জামা কাপড় পাল্টাল। মাথার ভেতরে শুধু একটা কথাই ঘুরছিল, এটা কীভাবে হলো? বেরোনোর সময় মাকে শুধু বলল, “একটু বের হচ্ছি।” তারপর পা আপনাতেই ময়ূরীদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে গেল। ওদের বাড়ি গিয়ে দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পর দরজাটা খুলল মৃন্ময়ী। চোখ দুটো লাল, মুখটা ফ্যাকাশে, কিন্তু মেরুদণ্ডটা স্থির রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। শিশিরকে দেখেই ও একটু চমকে উঠে বলল, “আপনে?”

শিশির গলা খাঁকারি দিয়ে খুকখুক করে কাশল, “ভালো আছো?” কথাটা জিজ্ঞেস করেই সে বুঝল, এরকম পরিস্থিতিতে এই প্রশ্নটা কতটা বেমানান!

মৃন্ময়ী কিছু বলল না। দরজা থেকে সরে দাঁড়াল, “আসুন।”

শিশির ভেতরে ঢুকল। বাড়ি জুড়ে শোকের ছায়া, নীরব ক্রন্দন। বাতাসও শোকাচ্ছাস বয়ে বেড়াচ্ছে। সে একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “চাচা আছে?”

মৃন্ময়ী মাথা নাড়ল, “আছে।” মৃন্ময়ী শিশিরকে উঠোনের মোড়ায় বসতে ইশারা করে নিজে ভেতরের ঘরে গেল বাবাকে ডাকতে। কিছুক্ষণ পর জহির মোল্লা বেরিয়ে এলেন। লোকটাকে দেখে শিশিরের কেমন যেন লাগল। এই মানুষটাকে আগে যেমন দেখেছে, এখন আর তেমন নেই। চোখ দুটো বসে গেছে, সেই চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। মুখে মোচ দাড়ি অগোছালো। একজন ভাঙা মানুষ যে ভেতরে ভেতরে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। রওশান আরা তখনও শয্যাশায়ী। ঘরের ভেতর নিঃশব্দে পড়ে আছেন। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মৃন্ময়ী উঠোনের এক কোণে খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে রইল। পা দুটো অবশ লাগছে। জহির মোল্লা একবার তাকালেন মেয়ের দিকে। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, “যা, ভেতরে যা। এদিকে কাজ কি?”

বাবার আদেশে মৃন্ময়ী চুপচাপ ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। আসলে জহির মোল্লার বলা কথাটা ছিল ভয় থেকে বলা। এই গ্রামের বাতাস, ছায়া মেয়ের গায়ে লাগুক তিনি চান না। ভেতরে ঢুকতেই রওশান আরার ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা গেল, “কে আইছে?”

মৃন্ময়ী শাড়ির আঁচলটা মুঠোবন্দী করছিল। ও কী বলবে? স্যার? অসম্ভব। ভাই? অসম্ভবেরও ওপরে কিছু হলে সেটা। তাই চুপ করে রইল। রওশান আরা আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কইলি না যে?”

মৃন্ময়ী নিচু গলায় বলল, “পড়াইতে আসে যে, সে আইছে।”

“শিশির?”

“হুম।”

“ওরা আইলো কবে?”

মৃন্ময়ী চোখ নামিয়ে বলল, “জানিনা। আব্বার সাথে কথা কইতেছে।” ও এগিয়ে গিয়ে দরজায় কান পাতল। দরজার ফাঁক গলে শিশিরের দিকে চোখ পড়ল। নিভৃত সুখের আবেশে মনটা পুলকিত হলো। শিশিরের প্রতি ওর একটু ভালোলাগা আছে। তবে যতটা না মৃন্ময়ীর আছে তারচেয়েও বেশি শিশিরের আছে, তা ও জানে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে স্বীকারও করে। মৃন্ময়ী ওদের কথায় মনোযোগ দিল। জহির মোল্লা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছেন, “এই গ্রাম ছাড়ব। যেটুকু জমি আছে, সব বিক্রি করে দিব। আমি তোমার আব্বার জন্য অপেক্ষা করছি। তার সঙ্গে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে নেব।”

শিশির কিছুটা চমকালো বোধহয়, “এটা কেনো করবেন চাচা? কেনো এমন কথাবার্তা বলছেন?”

জহির মোল্লা গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। ধীরে বললেন, “তুমি বুঝবা না বাবা। মাইয়ার বাপের অনেক সমস্যা থাকে। একটা তো গেছেই…” কথাটা বলেই তিনি থেমে গেলেন। গলাটা ধরে এলো, “আরেকটার জীবনটা তো নষ্ট করতে পারি না।”

বিজ্ঞাপন

শিশির অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চাচার কথা তার বোধগম্য হচ্ছে না, “কিন্তু মৃন্ময়ীর জীবন নষ্ট হবে কেন? কি হয়েছে?”

জহির মোল্লা উত্তর দিলেন না। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন; যেন এই ঘর, এই উঠোন, এই মানুষগুলো কেউ নেই।

ওই শূন্যতার ভেতরেই আবছাভাবে ভেসে উঠল ময়ূরীর মুখটা। মেয়ের আর্দ্র আঁখি, কম্পিত ওষ্ঠ্য, হৃদয়ের হাহাকার, গোপন বেদনা। মনে হলো, ময়ূরী ঠিক তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ শুধুমাত্র কিছু জানার আগ্রহে নিথর হয়ে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখের কোণ ভিজে গেল কিন্তু তিনি তাকিয়েই রইলেন...

ঠিক সেই সময়েই উঠোন পেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে এলো ইয়াসিফ, “চাচা! চাচা...” তার কণ্ঠস্বর হাঁপাচ্ছে, নিঃশ্বাস পড়ছে এলোমেলোভাবে, অস্থির ভঙ্গিতে।

জহির মোল্লা চমকে উঠে পাশ থেকে বললেন, “বাবা, আমি এখানে। কি হইছে?” বলতে বলতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। শিশিরও তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল।

ইয়াসিফ কোনো ভূমিকা না টেনে চোখে চোখ রেখে কঠিন স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আপনি জানেন, ময়ূরীর সাথে আসলে কি হয়েছিল?”

প্রশ্নটা জহির মোল্লার মাথায় বজ্রপাতের মত হয়ে আঘাত করল। তিনি কেমন থমকে গেলেন। শিশির হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল ইয়াসিফের দিকে। ইয়াসিফের গলা এবার আরও চড়ে উঠল, “চাচা আপনি জানেন কি না, বলুন!”

চিৎকার চেঁচামেচিতে মৃন্ময়ী আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “কি হইছে?”

ইয়াসিফ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। জোরালো গলায় বলল, “চাচা, আপনি বলুন।”

জহির মোল্লা চোখ নামিয়ে বললেন, “কিছু হয় নাই তো বাবা। যা হইছে, তা তো দেখলাই।”

ইয়াসিফ সঙ্গে সঙ্গে কথাটা কেটে দিল, “যা দেখেছি, সেটুকু শুধু দেখানো হয়েছে। আমি যা দেখিনি, সেটাই জানতে চাই।”

জহির মোল্লার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। বুঝে গেলেন, ইয়াসিফ অযথাই আন্দাজ করছে না। নিশ্চিত কিছু জেনেই এসেছে। তার কণ্ঠ হঠাৎ রুক্ষ হয়ে উঠল, “আমি চাই না তুমি আমার মাইয়ার বিষয়ে কথা কও। তোমাদের তো বিয়া হয় নাই। বিয়া হইলে সব দায়িত্ব তোমার উপর ন্যস্ত করতাম কিন্তু বিয়া তো শেষ পর্যন্ত হইল না, বাবা।”

ইয়াসিফের দৃষ্টিতে আগুনের ঝলক। এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আপনি বিষয়টা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, চাচা। ময়ূরীকে যে খুন করা হয়েছে, তা আপনি জানেন না? অস্বীকার করতে পারবেন?”

মৃন্ময়ী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। খুন? মানে হত্যা? শিশির নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে ভুলে গেছে। এগিয়ে এসে অবিশ্বাসী কণ্ঠে বলল, “কি হয়েছে ভাই? খুন মানে কি? পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তো এসব কিছুই ছিল না!”

ইয়াসিফ শিশিরের দিকে তাকাল। চোখে লালচে ক্লান্তি, কণ্ঠে জমাটবাঁধা ক্রোধ। ধারালো গলায় বলল, “ওটাই তো সমস্যা। রিপোর্টটা ছিল সাজানো।”

মৃন্ময়ীর বুকের ভেতরটা ধপ করে উঠল, “সাজানো?”

ইয়াসিফ আবার বলল, “দ্বিতীয় পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট পেয়েছি। ময়ূরী আত্মহত্যা করেনি। ওকে খুন করা হয়েছে। এর আগে ওর উপর পাশবিক নির্যাতন হয়েছে। গ্যাং রেপ।”

মৃন্ময়ীর মাথার ভেতরটা ঘুরে উঠল। দম নিতে কষ্ট হচ্ছিল। হাত দিয়ে খুঁটি আঁকড়ে ধরে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করল। ইয়াসিফ জহির মোল্লার দিকে তাকাল, “এই কারণেই ও চুপ ছিল। কেউ চেয়েছিল এটাকে পুঁজি করে সবকিছু আত্মহত্যা বানিয়ে শেষ করে দিতে। চাচা আপনি ভয়ে চুপ ছিলেন, আমি বুঝতে পারছি। এখন জানতে চাই, অপরাধী কে? যদিও আমি জানি, কিন্তু আপনার মুখ থেকে শুনে নিশ্চিত হতে চাই।”

জহির মোল্লা হঠাৎ এগিয়ে এসে মৃন্ময়ীর হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললেন। গলাটা কেঁপে উঠল তাড়াহুড়োয়, “আমি কিচ্ছু জানি না।” চোখ সরিয়ে নিয়ে বললেন, “কে বলছে তোমাকে এসব? কিসের তদন্ত করছ আবার? ময়ূরীকে তো দাফন করা হয়েছে।” তারপর মৃন্ময়ীর দিকে ফিরে বললেন, “তুই ঘরে আয়। এরা যা ইচ্ছে হয় করুক। যা মন চায় বলুক।”

ইয়াসিফ পেছন থেকে গলা তুলে বলল, “এটা তাওহীদের কাজ, তাই না? আমি ওকে দেখে নিচ্ছি।”

কথাটায় জহির মোল্লার বুকের ভেতরটা চিরে দিল। তিনি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে অসহায়তা। একজন ভেঙে পড়া বাবার আকুতি, “না বাবা, না। তুমি কিছু করো না।” এক হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে বললেন, “আমার এক মেয়ে গেছে। আরেক মেয়েকে হারাতে পারব না আমি।”

“কি বলছেন এসব আপনি? আরেক মেয়েকে হারানোর কথা উঠছে কীভাবে?”

তিনি মৃন্ময়ীর দিকে তাকালেন। ওই তাকানোর ভেতর ভয় ছিল, অনুনয় ছিল, ছিল সেই কালো স্মৃতিগুলো; যা তাকে প্রতিদিন দমবন্ধ করে রাখে। ভাঙ্গা গলায় বললেন, “ওরা বড় মানুষ, বাবা। ক্ষমতাওয়ালা। একটা কথা বললে আরেকটা লাশ পড়তে সময় লাগে না। আমি ময়ূরীকে বাঁচাতে পারলাম না। মৃন্ময়ীটাকে অন্তত বাঁচতে দাও।”

ইয়াসিফ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সবকিছু মিলিয়ে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, কেন একজন বাবা সত্যের বিপক্ষে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে? এটা অবশ্যই তার দুর্বলতা না। এটা ভয়, এই ভয়টা জন্মেছে সন্তানের জন্য। সে ধীরগতিতে নিঃশ্বাস নিল। গলাটা শান্ত কিন্তু ইস্পাতের মতো শক্ত রেখে বলল, “চাচা, আপনি চিন্তা করবেন না। দায়িত্ব আমি নিচ্ছি, সবকিছু আমার উপর ছেড়ে দিন। মৃন্ময়ীও বাঁচবে আর ময়ূরীও ন্যায় পাবে।”

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প