প্রণয় প্রত্যাবর্তন

পর্ব - ৫

🟢

শাঁখারিয়া গ্রাম পেরিয়ে আরও দুটো গ্রাম গেলেই পড়ে মিঠাই পুকুর।

এই গ্রামটা ছিমছাম, শান্তশিষ্ট। কোন ঝুট ঝামেলার বালাই নেই বললেই চলে। গ্রামের একেবারে কোণের দিকে ছোট্ট একটা বাড়ি। বাড়ির কার্নিশে একজোড়া শালিকের বাসা। দু’টো পাখি ডাল বদল করছে, মাঝে মাঝে ডানা ঝাপটে নিজেদের মতো করে সময় কাটাচ্ছে।

দুপুরের রোদটা চড়া, উঠোনটা একেবারে শুকনো, মাটির ফাটলে ফাটলে ধুলো জমে আছে। হাওয়া নেই বললেই চলে, সবকিছু থমকে আছে রোদের তাপে। বাড়ির সামনে বাঁশের দড়িতে কয়েকটা কাপড় ঝুলছে। একটা বেগুনি রঙের শাড়ি, একটা শার্ট আর ছোট বাচ্চার কয়েকটা কাপড়। পুবের পুকুরের দিক থেকে কাদার গন্ধ ভেসে আসছে। অরুনিমা বারান্দায় চাটাই পেতে বসে আছে। ওর ছয় বছরের ছেলে শান্ত পাশেই গুটি আর কাঠি নিয়ে খেলছে, “মা এইটা দেখো।” শান্ত গুটি সাজাতে সাজাতে বলছে, “এইটা আমার বাড়ি, এইটা দোকান।”

অরুনিমা হেসে উঠল, “বেশ! তোমার বাড়িতে কে কে থাকবে বাবা?”

শান্ত গুটি সাজানো থামিয়ে মাথা তুলে তাকাল, “তুমি আর বাবা।” বেশ গম্ভীর গলায় বলল ও। অরুনিমা ছেলেটাকে কাছে টেনে নিল। ছেলেটার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে এলোমেলো চুলে আদর জমে রইল। মা-ছেলের এই খুনসুটির মাঝেই হঠাৎ উঠোনে প্রায় ঝড়ের গতিতে দৌড়ে ঢুকল প্রণয়। প্যানিক আক্রান্তের মত দেখাচ্ছে তাকে। অরুনিমা উঠে দাঁড়াল। প্রণয় নিজেকে সামলে বলল, “শান্ত, আব্বু তুমি বাইরে খেলো। আম্মুর সাথে কথা আছে।”

শান্ত কিছু না বুঝেই উঠোনে চলে গেল। প্রণয় অরুনিমার হাত ধরে ঘরের ভেতর টেনে নিল। উন্মত্তের মতো বলল, “সর্বনাশ হয়ে গেছে।”

অরুনিমা আঁতকে উঠল। এতক্ষন শুধুমাত্র প্রণয়কে দেখছিল। চাপা কন্ঠে প্রশ্ন করল, “কি সর্বনাশ? কি হয়েছে? এইভাবে হন্তদন্ত হয়ে কোথা থেকে এলে?”

প্রণয় একবার দরজার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ময়ূরী খুন হয়েছে।”

“কীহহহহ?” অরুনিমার মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে এলো প্রায় আর্তচিৎকার হয়ে। অরুনিমার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রণয় এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। কোথা থেকে শুরু করবে, সেটা ঠিক করতে পারছে না। গলাটা শুকিয়ে আসছিল। শুকনো ঢোক গিলেই বলল, “ও আত্মহত্যা করে নাই অরু, ওকে খুন করা হইছে।”

অরুনিমার চোখ দুটো পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল, “কি বলছ তুমি?”

এরপর প্রণয় নিঃশ্বাস ছেড়ে দ্রুত সমস্ত ঘটনা, যা সে শুনে এসেছে নিজের চোখে দেখেছে, সব বলতে লাগল। অরুনিমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, “সবাই তো বলছিল...”

“সব মিথ্যা।” প্রণয় জোর দিল, “ইয়াসিফের সন্দেহ হয়। সে শহরে গিয়ে বড় অফিসারের সাথে কথা বলে। আবার পোস্টমর্টেম করায় গোপনে। ওইখানেই উঠে আসে আসল সত্য।”

অরুনিমা দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়াল, “এখন ওখানকার কি অবস্থা? আমি কি একবারও যেতে পারবো না? বলো, প্রণয় কে করেছে এই কাজ? আগে বলো, এত ঘটনা জানলে কি করে যেহেতু আত্মহত্যা বলেই ঘটনাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ”

প্রণয়ের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, “লাশ আবার তোলা হয়েছে। ইয়াসিফ আর মৃন্ময়ীর সাহায্য করেছে। ওরা এই বিষয়টা সম্পূর্ণ গোপনে করেছে। তদন্ত শেষে আবার দাফন করার জন্য গ্রামে ফিরছে। এখন আর ঘটনা গোপন নাই। সব জানাজানি হয়ে গেছে।”

অরুনিমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ময়ূরীর মুখ। ওর প্রাণবন্ত হাসিটা, চোখের ভাষা। অরুনিমা ছলছল চোখে প্রণয়ের দিকে তাকাল। চোখের কোণে জল জমে আছে, কিন্তু পড়ছে না। অভিমান আর রাগে আটকে আছে। গলা ধরে এসেছে তবুও তীক্ষ্ণ কন্ঠে প্রশ্নটা করল, “কে করেছে এই কাজ?”

প্রণয় চুপ করে রইল। নামটা উচ্চারণ করলেই বাতাস বিষিয়ে উঠবে সাথে অরুনিমাও। তারপর মৃদুস্বরে বলল, “আমি যেটুকু শুনেছি, জমিদারের ছেলে ছাড়া আর কারও নাম মাথায় আসে না।”

অরুনিমার শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারল না। আক্রোশে গলা কেঁপে উঠল, “তাওহীদ?” নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মুখটা লাল হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে ধরল ও। এতদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ এক লহমায় ফেটে বেরোতে চাইছে। প্রণয় নীরবে মাথা নাড়ল, “হুম।” তারপর এক পা এগিয়ে এসে অরুনিমার কাঁধে হাত রাখল। সামান্য অভয়দানের চেষ্টা করল। নিচু গলায় বলল, “একা না, আরো অনেকেই আছে।”

অরুনিমা প্রণয়ের হাতটা চেপে ধরল। ভেজা চোখে তাকিয়ে বলল, “ওরা কি ওদের পাপের শাস্তি কোনোদিনও পাবে না প্রণয়? বলো, এইসব মানুষ কি এভাবেই পার পেয়ে যায়?” গলদেশ ভেঙে গেল শেষ কথাটায়। এতদিন চুপ করে থাকায়, মাথা নিচু করে বেঁচে থাকায় বুকের ভেতর জমে থাকা বিষ আজ উপচে পড়ছে। একটু দম নিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল, “আমাকে একবার নিয়ে যাবে প্লিজ! আমি একটু যেতে চাই, আমি নিজে দেখতে চাই। কতদিন যাইনা বলতো?”

প্রণয় অরুনিমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর ওর হাতটা ছাড়িয়ে নিল। চোখে চোখ রাখল না। জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব শান্ত জমাট বাঁধা গলায় বলল, “একটা কথা বুঝতে হবে তোমাকে... যে মানুষটা সারা দুনিয়ার কাছে মৃত, সে হুট করে আবার জীবিত হয়ে উঠতে পারে না।”

অরুনিমা থমকে গেল। প্রণয় এবার ওর দিকে ফিরে তাকাল, “ওই গ্রামে তুমি মৃত, অরুনিমা। সবার কাছে নদীতে ডুবে যাওয়া একটা গল্প, একটা অতীত! বুঝেছ?” প্রণয় কথাগুলো এতটাই জোর দিয়ে বলল যে তা নিজের গায়েও বিঁধছে, “হঠাৎ যদি তুমি সেখানে গিয়ে দাঁড়াও, তাহলে শুধু তোমার জীবন না, যারা সত্যটা জানতে চাইছে, উদঘাটন করতে চাইছে তাদের সবার গলায় ছুরি ঠেকবে।”

অরুনিমা শূণ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গাল বেয়ে অঝোর ধারায় টুপটাপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। প্রণয় স্থির কণ্ঠে শেষ কথাটা বলল, “তোমাকে থাকতে হবে দূরে। জীবিত থেকেও মৃত হয়ে। এটাই এখন তোমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।”

শেষ কথাটুকু শোনা মাত্র অরুনিমার ধৈর্য্যর বাঁধ ভাঙল। কতদিন হয়ে গেল! ছয়টা বছর! কম সময়? সারাজীবন কি এইভাবেই বেঁচে থাকতে হবে ওকে? এতক্ষণ যেটুকু শক্তি দিয়ে নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, মুহূর্তেই তা চুরমার হয়ে গেল। ও দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল। সে কান্না নিঃশব্দ নয়, বুক ফেটে বেরোনো কান্না। তখনই উঠোন থেকে দৌড়ে এলো শান্ত। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েই বলল, “মা, মা তুমি কান্না করো কেন? কান্না তো পঁচা মেয়েরা করে!”

ও ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে এসে মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিতে হাত বাড়াল। কিন্তু অরুনিমা তখন নিজের ভেতরের ঝড় সামলাতে পারল না। একরাশ তাচ্ছিল্য আর অজানা রাগে ও শান্তকে ঠেলে সরিয়ে দিল, “যা এখান থেকে।”

শান্ত হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়াল। বড় বড় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলল না। কিছু বোঝারও ক্ষমতা নেই ওর। শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই মা তো একটু আগেও হাসছিল! প্রণয় এগিয়ে এসে শান্তকে কোলে তুলে নিল। বুকের সাথে চেপে ধরে চুলে চুলে হাত বুলিয়ে দিল, “তুমি আমার কাছে আসো বাবা। মায়ের মনটা একটু খারাপ। মন ভালো হলে তারপর আবার মা আদর করবে।”

শান্ত বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে দিল। এখানেই সব নিরাপত্তা। বাবা সবসময় এমনই। বাবার বুকে মাথা রাখলে পৃথিবীটা আবার ঠিক হয়ে যায়। শান্তর ছোট্ট মাথার ভেতরে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, মা’টা যে মাঝে মাঝে এমন হয়ে যায় কেন? এই ভালো, এই খারাপ…

মা’কে বুঝতেই পারে না শান্ত।

.

জমিদার হাজী মকবুল ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে হাঁটতে লাগলেন। প্রতি পা ফেলতেই মেঝে কম্পিত হচ্ছে। দাগিয়ে রাখা দাড়িও রাগে কাঁপছিল, চোখে জ্বলছিল ক্রোধের আগুন। সবকিছুই আজ তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।

“কী! কীভাবে সব বের হয়ে যাচ্ছে? মোল্লার এত বড় সাহস আমার বিরুদ্ধে যায়? সবকটাকে দেখে নিব, সবকটাকে শেষ করে ফেলব।” তিনি নিজের সঙ্গে কল্পনাত্মক কথা বললেন। জহির মোল্লাকে যে হুমকি ছুড়েছিলেন তা কাজে দেয়নি। চোখ বুজলেই মনে হচ্ছে, আর এক মিনিট সময় পেরোলেই গ্রামের মানুষদের সামনে নিজেই ধুঁকে পড়বেন। এতদিনের খ্যাতি, সম্মান, প্রতিপত্তি এক নিমিষে ধুলোয় মিশে যাবে। দম বন্ধ করা অস্থিরতা, ক্রোধ আর আতঙ্ক একত্র হয়ে জমিদারের বুকের ভেতর একটি অগ্নিকুণ্ড তৈরি করছে। তিনি হঠাৎ থেমে দাঁড়ালেন। চাপা স্বরে আগুন কণ্ঠে চিৎকার দিয়ে ডাকলেন, “তাহমিদ!”

ডাক শুনেই তাহমিদ ঘরে ঢুকল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই বাবা বলল, “এইবার তুই নিজ দায়িত্বে তাওহীদকে ঢাকা পৌঁছে দিয়ে আসবি,” জমিদার দাঁত চাপলেন, “আর এক মুহূর্ত দেরি চাই না আমি। হারামজাদাকে আমি আরও সপ্তাহখানেক আগেই শহরে চলে যেতে বলছি। কানে নিচ্ছে না।”

তাহমিদ থমকে গেল। তবে যা শুনছে তা সত্যি? অথচ সে এসবের কিছুই জানেনা। বাবা কি তবে ইন্ধন দাতা? বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারল না, “আব্বা বাইরে কিছু কথা শোনা যাচ্ছে। সেসব কি সত্যি?”

বিজ্ঞাপন

তার নিষ্করুণ মুখ। কণ্ঠে বরফের মতো শীতলতা, “সত্য-মিথ্যার বিচার আমি করব। কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা, সেটা জানার দায়িত্ব আমি কাউকে দেইনি। তোকেও কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”

“কিন্তু আপনাকে নিয়ে...”

“সেসব আমি দেখে নিচ্ছি।” তসবির দানা টানতে টানতে কথাটা কেটে দিলেন তিনি। তাহমিদ আর কিছু বলল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই দরজার পাশ থেকে তাওহীদ এগিয়ে এলো। তাকে দেখে জমিদার বড় ছেলেকে নির্দেশ করলেন, “দ্রুত যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা কর।”

তাহমিদ চলে যেতেই তাওহীদ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আব্বা, আপনি আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বলছেন? এদের ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালানোর মতো প্রাণী অন্তত আমি নই। আপনি শুধু অনুমতি দিন, জহির মোল্লার খেল আমি এখনই খতম করছি।”

“শুধু মোল্লা একা নয়। ইয়াসিন আকন্দের ছেলেটাও আছে। একবার বলুন, দুনিয়ার বুক থেকে নামটাই নিঃশেষ করে দিই।”

জমিদার চোখ মেলে চাইলেন। হঠাৎ বজ্রনির্ঘোষের মতো হুংকার ছাড়লেন, “তাওহীদ! মাথা গরম করিস না। তুই এক্ষুনি গ্রাম ছাড়বি। পুলিশ এসেছে। যা করার আমি করব। যা, এই মুহূর্তে!”

বাবার সেই হুংকারের সামনে তাওহীদের সমস্ত দম্ভ মুহূর্তে চুপসে গেল। আর কোনো কথা বেরোল না মুখ থেকে। রশিদের সহায়তায় দুই ভাই উল্টোপথে দ্রুত পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ওরা বের হওয়ার দশ মিনিটও হয়নি। বাইরে থেকে হঠাৎ অনেক মানুষের হট্টগোলের শব্দ ভেসে এল। তৎক্ষণাৎ ভেতর থেকে তার স্ত্রী সালেহা দৌড়ে এলেন, “দেখেন! বাহিরে কতডি মানুষ জড়ো অয়েছে! অয়েছেটা কি কিছুই বুঝতে পারতেছি না। আপনে একটু বাইরায় যাইয়া দেখেন।”

জমিদার স্তব্ধ হলেন। চোখে ক্রোধ আর আতঙ্ক মিশ্রিত ভঙ্গিতে দৌড়ে দরজা দিয়ে বাইরে বের হয়ে গেলেন। বাইরে পা রাখতেই থমকে গেলেন তিনি। উঠোন, রাস্তা যেদিকে চোখ যায়, মানুষ আর মানুষ। গ্রামের সব মানুষ যেন একত্রিত হয়েছে। কথার উপর কথা, হইচইয়ে বাতাস ভারী। কেউ চেঁচাচ্ছে, কেউ গালিগালাজ করছে, কেউ আবার শুধু দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে। কোনো কথাই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না। জমিদার দুই হাত তুলে গলা চড়িয়ে বললেন, “চুপ করেন! এক এক কইরা কথা বলেন!”

কে শোনে কার কথা! ভিড় আরও গর্জে উঠল। সেই হট্টগোল ঠেলে এক মধ্যবয়সী লোক সামনে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে জমাট ক্ষোভ, “আমরা আপনাকে সম্মান করি ঠিকই। তাই বইলা কি আপনার অবিচার মেনে নেব? এই গ্রাম কি আপনার বাপ-দাদার খাস সম্পত্তি নাকি?”

চারদিক থেকে সায় তুঙ্গে উঠল, “হ ঠিক!”

“ঠিক কইছে!”

লোকটা আবার বলল, “আপনার ছোট ছেলেটাকে ডাকেন। তাওহীদ কই? ওরে সামনে আনেন।”

জমিদারের মুখ শক্ত হয়ে গেল। কিছু বলার আগেই ভিড়ের ভেতর থেকে আরেকজন চেঁচিয়ে উঠল, “মাইয়াডারে মাইরা ফেলাইয়া হুমকি ধামকি দেওয়া হচ্ছে? আমরা গ্রামের মানুষ কি সব মইরা গেছি?”

আরেকজন তীক্ষ্ণকন্ঠে বলল, “এইখানকার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বানানো! টাকা দিয়া সব চাপা দেওয়া হইছে। এইসব আমরা জাইনা গেছি।”

ভিড় ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল, “আমরা বিচার চাই!”

“খুনি ছাড় পাবে না!”

“ক্ষমতার জোরে সব ঢাইকা রাখা যাবে না!”

জমিদার আবার গলা তুললেন, “এইসব মিথ্যা কথা! প্রমাণ আছে?”

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, “প্রমাণ আছে! ইয়াসিফ বাবার কাছে দ্বিতীয় রিপোর্ট আছে। মাইয়াডারে খুন করছে, ওরে নষ্ট করছে।”

এই কথায় ভিড় একেবারে ফেটে পড়ল। কেউ বলল, “এ গ্রামে আর আপনাদের রাজ চলবো না!”

চারপাশ থেকে একসাথে গর্জন উঠল, “ডাকেন তাওহীদকে!”

“ডাকেন!”

“আমরা শুধু অপরাধীর বিচার চাই। আপনার ছেলে যদি নির্দোষ হয়, সামনে আনেন। আর দোষী হলে, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা কইরেন না।”

জমিদার দুই হাত তুললেন। গলার স্বর নামালেন, যেন ভিড়ের উত্তাপ ঠান্ডা করা যায়। চোখে মুখে সেই চেনা ধর্মভীরু ভাব আনলেন। ভারী কন্ঠে বললেন, “শুনেন… শুনেন আপনারা, এইভাবে চেঁচাইলে কোনো সত্য বের হইবো না।”

ভিড়ের আওয়াজ একটু কমল। জমিদার সেই সুযোগটাই কাজে লাগালেন। তিনি বললেন, “প্রথম কথা, আমার ছেলে এখন এইখানে নাই। সে ঢাকা শহরে গেছে। নতুন চাকরি পাইছে আপনাদের দোয়ায়।” একটু থেমে চারপাশে তাকালেন। গলায় ধর্মের আস্তরণ, “আপনারা তো জানেন, আমি হাজী মানুষ। নামাজ-কালাম করি। আল্লাহর ভয়ে চলি। আমি কি আমার ছেলেদের এই শিক্ষা দিছি? এমন নোংরা কাজ?”

কেউ কিছু বলার আগেই তিনি এগিয়ে গেলেন, “তাওহীদের মাথা একটু গরম, এইটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে খুন? ধর্ষণ?” ভিড়ের মধ্যে ফিসফিস শুরু হলো। জমিদার সুযোগ বুঝে আরও নিচু স্বরে বললেন, “সত্যি কইতে কি, মাইয়ার চরিত্র আগে থেকেই ভালো ছিল না। চরিত্র ভালো থাকলে মাইয়া পেরেম করে? দেখেন গিয়া, আকন্দের পোলার লগে কিছু হয়েছিল তাই আত্মহত্যা করছে। আগের পোস্টমর্টেমে সব পরিষ্কার।”

তিনি তসবির দানা থামিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “এই যে পরে যে রিপোর্ট বের হইছে, এইটা বানানো। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কিছু লোক চায় গ্রামে আগুন লাগাইতে, আমার সম্মান নষ্ট করতে।” ভিড়ের দিকে আঙুল তুলে বললেন, “আপনারা বুদ্ধিমান মানুষ। গুজবে কান দিলে চলবে? প্রমাণ ছাড়া একজন হাজী মানুষ আর তার পরিবারকে এভাবে অপদস্থ করা কি ঠিক?”

লোকদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেছে। তারা তো শুধুমাত্র জহির মোল্লার থেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনেই দৌড়ে এসেছে। এখন কেউ কেউ পিছিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জমিদারের কথাই ঠিক। তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষ, তার পরিবার এত খারাপ হবে? কখনোই না। হাজী মকবুল শেষে প্রায় মিনতির সুরে যোগ করলেন, “আমি আপনাদেরই লোক। এই গ্রামই আমার সব। আপনারা যদি চান, আমি নিজে তদন্তে সহযোগিতা করবো। কিন্তু এইভাবে বিচার করলে সত্য মরে যাবে।”

জমিদারের কথায় অনেকের মুখে দ্বিধা নেমে এলো। সন্দেহ আর ক্ষোভ, দুটোই রইল। কেউ কেউ ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিল। জমিদার কুটিল হাসলেন। তাকে পাকড়াও করা এত সহজ? ইয়াসিফ শাহরিয়ার! জহির মোল্লা! হাঁটুর বয়সী এই মানুষগুলো তাকে টপকাবে? অসম্ভব।

.

ময়ূরীর দাফনটা আবার হলো। কিন্তু শোকটা আর আগের মতো ছিল না। যেটা একবার মিইয়ে গিয়েছিল, সেটা এবার নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। আগুনে ঘি ঢালার মতো। কান্না ছিল কিন্তু তারচেয়েও বেশি ছিল চাপা ক্ষোভ, দাঁতে দাঁত চেপে রাখা রাগ। ইয়াসিফ তখনো পুলিশের নজরদারির ভেতর। জিজ্ঞাসাবাদ, কাগজপত্র পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। দাফনেও থাকতে পারল না। ভেতরে ভেতরে রক্ত গরম হয়ে উঠছিল তার। মনে হচ্ছিল, এসব ঝামেলা যদি না থাকতো তবে এতক্ষণে তাওহীদের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকত এবং কুকুর শিয়ালে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। কিন্তু এখন আবেগ দিয়ে কিছু করার সুযোগ নেই, সেটা সে নিজেও জানে। পুলিশ নতুন করে কেস ফাইল করেছে। সবকিছু একদম শুরু থেকে। সব নোট করতে করতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। অফিসার সিদ্ধান্ত নিল, কাল সকালে জমিদার সাহেবের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা হবে। এই ফাঁকে ইয়াসিফ গ্রামের মানুষদের থেকে খবর পেল, তাওহীদ নাকি গ্রামে নেই। শহরে চলে গেছে। ইয়াসিফ দাঁতে দাঁত চেপে ছুরির মতো ধারালো কণ্ঠে বলল, “গ্রামে নেই তো কী হয়েছে? সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিলেও, জানোয়ারটা আমার হাতের বাইরে যাবে না। যেখানে লুকাক, যেভাবেই লুকাক… ময়ূরীর রক্তের হিসাব ওকে দিতেই হবে।”

রাতটা অস্বাভাবিক রকমের নিস্তব্ধ। দিনভর কান্না, হাহাকারে এই বাড়ির মানুষগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। মনের সাথে শরীরটাও ভেঙে গেছে। রওশান আরা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। মৃন্ময়ী চোখ মেলে তাকিয়ে আছে অন্ধকারে। কেউ কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না। ঠিক তখনই, বাড়ির সামনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ঠক। ঠক। জহির মোল্লা আঁতকে উঠলেন। চোখের কোণ মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালেন। এত রাতে কে এসেছে? গ্রামের কেউ? তিনি দরজার কাছে গিয়ে কাঠের খিলটা সরালেন। দরজা খুলতেই কিছু বুঝে ওঠার আগেই শরীরটা ঝাঁকুনি খেল। ঠান্ডা কিছু একটা বুকের ভেতর ঢুকে গেল।

একটা না, পরপর কয়েকবার ছু’রির আঘাত। জহির মোল্লার চোখ বড় হয়ে গেল। মুখ খুলে চিৎকার করতে চাইলেও গলা থেকে কোনো শব্দ বেরোল না। বাতাস আটকে গেল ফুসফুসে। পা দুটো আর শরীরের ভার নিতে পারল না। তিনি মাটিতে ঢলে পড়লেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াগুলো এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঠিক যেভাবে এসেছিল, নিঃশব্দে সেভাবেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

বিজ্ঞাপন
প্রণয় প্রত্যাবর্তন গল্পটি আফিয়া আফরিন-এর লেখা একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক থ্রিলার গল্প