রোদশীর বিদায়ের শেষে ফের সকলের মন খারাপ হয়ে গেল। রেহানা খাতুন আহাজারি করে বলতে লাগলেন, 'আমার ভরা ঘরবাড়ি। সব ফাঁকা শুনশান হয়ে যাবে একদিন। বড় গুলোর বিয়ে হয়ে গেছে, সবাই আলাদা আলাদা কত দূরে থাকছে! আর রোদটাও চলে গেল। কিছুদিন বাদে ঝিলমিল আর তানিশাকেও বিদায় দিতে হবে। কত বড় বাড়িটা আমার খালি পড়ে থাকবে।'
রোদ্দুর এগিয়ে এসে বলল, 'আমি আছি না?'
'তুই আর কি করবি দাদুভাই? তুই তো নিজেই থাকিস না আমাদের কাছে। বিয়ে দিলে বউ কি এখানে রেখে যাবি? তা তো তুই বউ নিয়েই আগে দৌড়াবি।'
'উহুঁ, তুমি একদম চিন্তা করো না। আমি কয়টা বিয়ে করব জানো? চারটা। তিনজনকে তোমাদের এখানে রেখে যাব, একটাকে আমি নিয়ে যাব আমার সেবাযত্ন করার জন্য। ভালো হবে না বলো?'
তিনি হেসে বললেন, 'পাগল ছেলে একটা। যা দাদুভাই ঘরে যা। আমিও যাই, একটু বিশ্রাম নিই গিয়ে। শরীর আর চলে না।'
রোদ্দুর ইতস্তত করে বলল, 'শোনো আমাকে একটা হেল্প করতে হবে। আমি হয়তো কাল চলে যাব। মাকে এখনও বলি নাই, বললেই কান্নাকাটি শুরু করে দিবে। তুমি সকাল সকাল উঠে মাকে বলবে আমার কথা। শুধু বলবেই না, মাকে ম্যানেজ করতে হবে।'
রেহানা খাতুন মুখে কিছু বললেন না, তবে এক লহমায় তার মনটা যে খারাপ হয়ে গেল সেটা চেহারাই বলে দিল। দাদী ঘরে যাওয়ার পর রোদ্দুর'ও চলে এলো নিজের ঘরে। লাগেজ বের করে নিজের কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিল। হঠাৎ মনে পড়ল আসার পথে সানিয়ার জন্য একটা আংটি কিনেছিল। তার ঘরে যেহেতু কেউ আসে না তাই আংটিটা রেখেছিল ওয়ারড্রবের উপরে। কোথায় গেল? তার যতদূর মনে পড়ে সে তো আংটিটা কোথাও সরিয়ে রাখে নাই। ওহ আচ্ছা! কেউ তাকে বলে দিল না, কিন্তু সে নিশ্চিত বুঝতে পারল এটা ঝিলমিলের কাজ। যখন ছবি নিয়েছে, তখন নিশ্চয়ই আন্টিটাও সরিয়েছে। রোদ্দুর বোঝে না, এই মেয়েটা কেনো তার সাথে এমন শত্রুতামি করে! একদম ছোটো বেলা থেকেই, রোদ্দুরকে দু'চোখে দেখতে পারে না। তার একটাই কথা— সবাই তো ওকে ভালোবাসে; চোখে হারায়; তবে আমি আর ভালোবাসব কেনো?
হিংসুটে মহিলা কোথাকার! ঠোঁটের আগায় সবসময় রি'ভলবার নিয়ে চলাফেরা করে। কেউ কিছু বলতে গেলেই সেই রি'ভলভারের আ'ঘাতে তাকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়।
রাত বলে রোদ্দুর ছেড়ে দিল। এখন চিৎকার চেঁচামেচি করার মত ধৈর্য বা শক্তি কোনোটাই নেই, আজ সারাদিন ভালোই খাটাখাটুনি করতে হয়েছে। রোদ্দুর ঘরের বাতি অফ করে শুয়ে পড়ল। বিভিন্ন চিন্তায় জর্জরিত মস্তিষ্ক তাকে খুব সহজে ঘুমাতে দিল না। তারপর কখন ঘুমিয়ে গেল, নিজেও আর টের পেল না।
.
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই ঝিলমিল বাড়ি থেকে বের হলো। শিউলিকে ডেকে নিয়ে দু'জন উত্তর দিকের পুকুর পাড়ে গিয়ে বসল। এটা তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সব খারাপ হোক অথবা ভালো, এখানে এসে বসে থাকে। আর সাথে বান্ধবীদের পেলে তো কথাই নেই! তখন যত রকমের বাঁদরামি করা যায়, কোনোটাই ছাড় দেয় না। কিছুদিন আগে একটা ছেলের সাইকেলের চাকা পাংচার করে দিয়েছিল, সেই ছেলেটার সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল।
ঝিলমিল পালাতে চেয়েছিল কিন্তু সেই ছেলেটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, 'ভালো আছো তুমি?'
ঝিলমিল মুখে প্লাষ্টিক হাসি ঝুলিয়ে উত্তর দিল, 'আমি ভালো আছি তো। ভালোই থাকি সবসময়।'
তারপর শিউলিকে ফিসফিস করে বলল, 'অ্যাই, আমরা কিছুদিন ওর সাইকেলের চাকা পাংচার করে দিয়েছিলাম, সেটা কি দেখেছিল নাকি ও?'
'আমি কি জানি!' সেও ফিসফিস করে বলল।
ঝিলমিল হেসে জিজ্ঞেস করল, 'আর কিছু বলবেন কি? আমাদের আসলে কাজ ছিল একটু।'
'না। কিছু বলব না।'
'তাহলে আমরা যাই, ঠিক আছে ভাইয়া।' ফাজলামির স্বরে সুর টেনে বলল ঝিলমিল।
ছেলেটা মাথা নাড়াল। ঝিলমিল আর শিউলি দু'জনের সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়াল। ছেলেটা গাছটা যখন ক্রস করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে সে পেছন থেকে পা বাড়িয়ে দিল, আর তাতে পা আটকে ছেলেটা ধপাস করে হুমরি খেয়ে পড়ে গেল। ঝিলমিল আর শিউলি উল্টো পথে দৌড় দিল। কিছুটা দূরে এসে দু'জনেই দাঁড়িয়ে পড়ল। শিউলি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, 'ভাই তুই কি পাস এসব করে? ছেলেটাকে এভাবে ফেলে দিলি?'
'খুব দরদ হচ্ছে তোর তাই না? তো যা গিয়ে বাঁচা ওকে। সেবা যত্ন করে সারিয়ে তোল, তারপর একটা বেনারসি পড়ে ওর সাথে বিয়ের আসরে বসে যা।'
'ধুর সব সময় বেশি বুঝিস তুই। সেদিনও ওর সাইকেলটা নষ্ট করলি আর আজকে ওরেই..... তোর বাসায় যদি কোনদিন বিচার নিয়ে যায়, কি হবে ভাবতে পারছিস? আমরা যে ধাক্কা মেরেছি, তা দেখেছে কিনা কে জানে?'
ঝিলমিল ঘাসের উপর বসতে বসতে বলল, 'রোদ্দুর অভদ্রটাকে যদি এইরকম একটা শিক্ষা দিতে পারতাম, তবে আমার জীবনের ষোল আনা পূর্ণ হতো। সেদিন ওর গার্লফ্রেন্ডের ছবি হাতে পেয়েছি। সেটা নিয়ে কয়েকবার ব্ল্যাকমেইল করেছি। বেচারা ফাঁদে পড়ে আমাকে পাঁচটা চকলেট করে দিয়েছে। বলেছে, ছবিটা যেনো কাউকে না দেখাই এবং ওকে দিয়ে দেই। আমি অবশ্য কাউকে দেখাই নাই তবে ওর হাতেও দেই নাই। থাকুক আমার কাছে, আবার সুযোগ বুঝে কাজে লাগাব। হিহিহি!'
শিউলি হতাশ দৃষ্টিতে ঝিলমিলের দিকে তাকাল। এই মেয়েটাকে কিছু বোঝানো মুশকিল। যা ইচ্ছে হয়, তাই করে। প্রাইভেট পড়তে গিয়ে স্যারের সাথে পর্যন্ত বদমাইশি করে। শিউলিকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায় দিতে হয়। কী করবে? একাও ছাড়তে পারে না, আবার সহ্যও করতে পারে না।
ঝিলমিল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, 'একটা উপায় বাতলে দে তো দোস্ত।'
'কীসের?'
'এক শয়তানকে শায়েস্তা করতে হবে। বেশি বাড়াবাড়ি করতেছে ইদানিং। বাড়ির সবাই ওরে এত ভালোবাসে, এত আদর-আহ্লাদ করে যে একদম মাথায় চড়ে নাচতেছে। আমার এসব বিরক্ত লাগে, অসহ্য লাগে। বল তো, ওরে কেনো সবসময় এত মাথায় তুলে রাখতে হবে?'
'রোদ্দুর ভাইয়ের কথা বলছিস তাইনা। আচ্ছা তুই তাকে এত হিংসে করিস কেনো?' জিজ্ঞেস করল শিউলি।
'বাদড় ছেলে একটা। একদম দেখতে ইচ্ছে করে না আমার। সবসময় হাঁসের ছানার মত প্যাক প্যাক করতে থাকে। বাড়িতে আসবে, সাধারণ কিছু একটা করবে; আর সবাই ভাববে, ও বাবা রোদ্দুর তো পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কাহিনী করে ফেলল।' মুখ ভেংচাল ঝিলমিল।
শিউলি হাসল, কিছু বলল না। আরেকটু বাদে দু'জন উঠে গেল। শিউলিকে বাড়ি এগিয়ে দিয়ে ঝিলমিল'ও বাড়ি এলো। আজ দুপুরের পর সবাই মিলে আপুর বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানে যাবে, তার'ই আয়োজন চলছে। ঝিলমিল'ও যাবে, তবে সে তৈরি হবে আরোও কিছুক্ষণ পর।
ছাদে যাওয়ার পথে রোদ্দুরকে দেখতে পেল। রোদ্দুর ওকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলো। সরাসরি বলল, 'আমার আংটি কই?'
ঝিলমিল কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, 'আংটি? তোর? তুই আবার কবে থেকে আংটি পড়া শুরু করলি?'
'ফাজলামি করবি না। ওয়ারড্রোবের উপর একটা আংটি ছিল, তুই নিয়েছিস? ফেরত দে। ওইটা আমার দরকারি জিনিস।'
'ওমা! আমি কখন নিলাম। তুই তো আমাকে দিলি।'
'আমি কখন দিলাম?'
'কখন মানে? কাল তুই আমাকে চকোলেট নিতে বললি না, ওখানেই তো ছিল। ভাবলাম তুই তো ছেলে মানুষ, তুই এই চিকমিকি টাইপের আংটি দিয়ে কি করবি? মনে হয় আমার জন্য রেখেছিস। তাই নিয়ে নিলাম।' ঝিলমিল নির্বিকার ভাবে বলল।
নাহ, মাথা গরম করা যাবে না একদম। রোদ্দুর ঠান্ডা মাথায় অথচ তেজি গলায় বলল, 'ওটা আমাকে দিয়ে দে।'
ঝিলমিল কোমড়ে এক হাত রেখে আরেক হাত নাড়াতে নাড়াতে বলল, 'ছিঃ একটা জিনিস দিয়ে আবার ছোটো লোকের মত চাইতে লজ্জা করে না তোর? তোর মনটা একদম নর্দমার মত অপরিষ্কার।'
'এই এই...... আমার মন নিয়ে কোনো জাজমেন্ট হবে না। আমার মন হচ্ছে বেবি ক্রিমের মত নরম এবং পরিষ্কার।'
'হুহ, এত ফাল পারিস না। চুপ থাক। তোর ফালতু বকবক শোনার মত সময় বা শখ কোনোটাই আমার ইচ্ছা নাই। আমার থেকে দূরে দূরে থাকবি, ১০০ হাত দূরে। বুঝলি?'
'দেখ তোকে ভালোভাবে বলতেছি, আংটি ফেরত দে। ওটা আমি আমার গার্লফ্রেন্ডের জন্য কিনেছিলাম। ফেরত দে বলছি।'
ঝিলমিল মোটেও পাত্তা দিল না। চুল উড়িয়ে চলে গেল। রোদ্দুর শুধু ওর গমনপথের দিকে চোখ গরম করে তাকাল। ঠিক সেইসময় বড় চাচী এসে দু'জনের উদ্দেশ্য বললেন, 'তোরা দুজন এত ঝগড়া করিস কেন? একটু মিলেমিশে থাকতে পারিস না বাপু? কি হয়েছে ঝিলমিল? রোদ্দুর কি চাইল? দিয়ে দে ওকে ওর জিনিস।'
ঝিলমিল এগিয়ে এসে বলল, 'উহুঁ, তোমাদের আদরের ছেলে তার কোন কিছু নিতে চায় নাই। হবু ভাবীর......'
রোদ্দুর ইশারায় ঝিলমিলকে চুপ করতে বলল। ঝিলমিল চুপ করে গেলে চাচী ফের জিজ্ঞেস করলেন, 'কি? হবু ভাবীকে?'
ঝিলমিল বলল, 'আমি কি জানি? ওকেই জিজ্ঞেস করো। আমি যাই গো, আমাকে আবার আমার আপুর শশুর বাড়ী যেতে হবে। রেডি হতে হবে, সাজগোজ করতে হবে; বহুত দেরি। এখন শুরু না করলে পরে আবার দেরি হয়ে যাবে। তোমাদের সাথে আর সময়মতো বের হতে পারব না। পরে দেখা গেল, তোমরা চলে গেলে এই অধমকে একলা ফেলে।'
ঝিলমিল চুল নাড়াতে নাড়াতে চলে গেল। রোদ্দুর বলল, 'আমিও তাই বুঝলে! তোমার শাশুড়ি আম্মা আমাকে কড়া ভাষায় বলে দিয়েছে, আমিও যেনো আপুর বৌ-ভাতের অনুষ্ঠানে তোমাদের সাথে যাই। আমাকে আবার কাল ঢাকা ফিরে যেতে হবে, কাজকর্ম আছে।'
বড় চাচী রোদ্দুরের ফিরে যাওয়ার কথা শুনেই আগের সব ভুলে গেল। আর্দ্র কণ্ঠে বলল, 'চলে যাবি বাবা? এই না দু'দিন আগে এলি।'
'আজ নিয়ে নয়দিন হবে আমি এসেছি।' রোদ্দুর হেসে বলল।
তবুও তিনি মনখারাপ করে রইলেন। রোদ্দুর চলে গেল। মনে মনে ঝিলমিলের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করল। তারপর মনে পড়ল, ঝিলমিল তো তার নিজের গোষ্ঠীর মধ্যেই পড়ে। তারপর আবার নিজের কপাল চাপড়াল।
.
আজকের দিনটা রোদ্দুর থেকেই গেল। ওখান থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছিল, রোদ্দুর অবশ্য রাতেই ফিরতে চেয়েছিল। কিন্তু বাড়ির সবাই নারাজি। কেউ এইরাতে তাকে যেতে দিবে না। মনোয়ার সরকার বললেন, 'তুই এত তাড়াহুড়া করছিস কেনো? এইজন্য তোকে চাকরিতে যোগ দিতে নিষেধ করেছিলাম। বাড়ির ব্যবসা-বাণিজ্যে যোগ দিলে বাড়িতেই থাকতে পারতি, এত প্রেসার পড়ত না। সবদিক থেকে শান্তি।'
রোদ্দুর ঝটপট বলল, 'মাফ চাই। আমি কাল'ই যাব। তবুও আমাকে তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে টেনে নিও না। বিরক্তিকর, একদম বিরক্তিকর।'
রোদ্দুর মনের মাঝে একরাশ হতাশা নিয়ে ঘরে গেল। ঘড়ির দিকে তাকাল, এগারোটা বাজে। রাত কখন শেষ হবে? সানিয়া ফোন করে আজ একটু মন খারাপ করেছিল। রোদ্দুরের মনটাও অলক্ষ্যে ওইদিকে টানছে।
অবশেষে ভোরের আলো ফুটল। সূর্য্যি মামার সাথে রোদ্দুর'ও তৈরি হয়ে গেল। বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে পড়ল। রিমঝিম, ঝিলমিল, তানিশা এদের দেখা পায় না, এরা এখনও পড়ে পড়ে মোষের মত ঘুমাচ্ছে।
মোড়ের মাথায় সাইফুল ভাইকে দেখতে পেল সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। এগিয়ে গিয়ে দু'য়েক কথা বলে জিজ্ঞেস করল, 'সাত সকালে এখানে কি করছেন ভাই?'
সে হেসে সলজ্জ মুখে উত্তর দিল, 'ঝিলমিলের জন্য অপেক্ষা করছি।'
রোদ্দুর হতবাক হলো। জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের ঝিলমিল?'
'হুঁ।'
'ওকে দিয়ে কি করবেন?'
'একটু দরকার ছিল ভাই। আপনি কোনদিকে যাচ্ছেন? বাড়ির দিকে নাকি? গেলে ওকে একটু মোড়ের মাথায় আসতে বইলেন তো।'
রোদ্দুর মাথা নেড়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। হুম, কাহিনী তো কিছু একটা আছে। খতিয়ে দেখতে হবে!
.