দাদু বলতে লাগল— “গতরাতে আমার চোখের চশমাটা ছিল নাইট ভিশন একটা ডিভাইস। চশমাও বলা যায় তবে মূলত চশমা নয়। এই ডিভাইসের বিশেষত্ব হলো এইটা দিয়ে অন্ধকারেও সবকিছু দেখা যায়। যদিও সাদা কালো দেখায় তবুও সব স্পষ্ট দেখা যায়। এটা আমাকে আমার এক বন্ধু উপহার দিয়েছিল। সে গোয়েন্দা কর্মকর্তা।”
— গতকালকা রাত্তিরে এটা দিয়ে কী ভূত দেখছেন কর্তা মশাই?
— চুপ করে থাক। আমাকে বলতে দে আগে সবটা।
দাদু আবার বলতে শুরু করল— “রাত যখন ১:৪৭ মিনিট তখনই ওই আওয়াজটা শুরু হয়েছিল। আর ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভুত হচ্ছিল। তখন আমার দৃষ্টি সম্পূর্ণটাই কুহকের দিকে। হঠাৎ দেখি দ্বিতীয় তাকের একটা বই যেন তাকের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। দেখে গায়ে কাটা দিচ্ছিল। আগে এমন বেশ অতিপ্রাকৃত জিনিস দেখার অভিজ্ঞতা আছে। তবুও, যখন দেখছি বই তাকের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে তখন কেমন লাগে?”
— কী সাংঘাতিক ব্যপার। আপনি নিজ চোখে দেখেছেন নীল বাবু?
— হ্যাঁ, হাসান।
আমি দাদুর কথা গিলছি আর ভাবছি গতরাতের ঘটনাটা।
— তো যাই হোক। ১:৪৯ এই আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায় আর আমার চোখের সামনেই বইটিও আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যায়। পরে আলো জ্বেলে একবার দেখে নিশ্চিত হলাম সবটা। দেখলাম ইমদাদুল হক মিলনের লিখা ‘নুরজাহান' উপন্যাসের ৩য় খণ্ডটি নেই।
— কী ডরের কাহিনি কর্তা মশাই। আপনে এত সময় চুপ না থাইকা যদি বইটারে গিয়া ধরতেন তাইলে আইজকা বইটা যাইতে পারে না। আমরারে কইলে সবাই মিলে টান দিয়া ধরতাম। ভূতের যতই শক্তি হওক আমরা সবার থেইক্কা কমই হইব।
নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলাম— “এই উপন্যাসের ১ম ও ২য় খণ্ডই তো আগে নিখোঁজ হয়েছিল?”
— হ্যাঁ, এটারই ১ম ও ২য় খণ্ড উধাও হয়েছিল প্রথমে।
— ভূতের মনে হয় বইটা বেশ পছন্দ হয়েছে। নাহয় ১ম দুই খণ্ড নেওয়ার পরে ৩য় খণ্ড নিতো না। কী বলেন নীল বাবু?
— হয়ত। হয়ত না।
দাদু আবার বলছেন— “যার দোকান থেকে কুহককে কিনেছিলাম, সেই মাসফিক হোসেনকে সকালে ফোন করলাম। তাকে বলেছি সব। সে আসছে বাসায়। সম্ভবত কাছাকাছি পৌঁছেও গেছে।”
কথা শেষ হতে না হতেই কলিং বেল বেজে উঠল। তাহের চাচা দরজা খুলে দিল।
— আরে মাসফিক সাহেব। এসে পড়েছেন। আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?
— না, ইন্দ্রনীল বাবু। সমস্যা হয়নি।
— বসুন, আগে সকালের নাস্তা করবেন; তারপর যা বলার বলবেন।
— আমি সকালের নাস্তা সেরে এসেছি। একটু তাড়ায় আছি।
— আচ্ছা, তাহলে চা খেতে খেতে বলতে শুরু করুন। তাহের, যা চা নিয়ে আয়।
তাহের চাচা চা নিয়ে এলে তাতে চুমুক দিয়ে মাসফিক সাহেব বলতে শুরু করলেন— “এই বুকশেলফটা জমিদার মশাইয়ের বেশ পছন্দের ছিল। তখনকার সময়ে এইটা বানানোর সময় জমিদার মশাই দেখতে গিয়েছিল। দেখতে গিয়ে এই বুকশেলফের দ্বিতীয় তাকে যখন হাত দিয়ে ঘসা দেয় তখন তার হাত কেটে যায়। জমিদার এমনিতে বইয়ের প্রতি উৎসুক থাকলেও ব্যক্তি জীবনে খুব একটা ভালো লোক ছিলেন না। তার হাত কেন কাটলো সেই অপরাধে ২ জনকে শাস্তিস্বরূপ গলা কেটে হত্যা করা হয়েছিল। যখন এই বুকশেলফটি নিয়ে জমিদারের লাইব্রেরিতে রাখা হয় তখন তার বইও এইভাবে উধাও হতে শুরু করে। একপর্যায়ে এই রহস্য উদঘাটন করতে সে তার বিশ্বস্ত কয়েকজন লোককে এই দায়িত্ব দেয়। একবার একটা বই যখন নিচে তাকের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছিল তখন একজন ওইটা আটকাতে বইয়ে শুধু মাত্র স্পর্শ করেছিল। পরে ওই লোকটা এই হাতের ব্যথায় কাতরে মারা গিয়েছিল। এইসব কারণেই এই বুকশেলফটির নাম- কুহক। মানে মায়া বা ভেলকি।”
আমি উৎসুক মন নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম— “তো এই ঘটনাটা আপনি কীভাবে জানলেন?”
মাসফিক সাহেব জবাবে বললেন— “বুকশেলফটি কেনার পর প্রথম কয়েক বছর এইটাতে বই রাখা হয় নাই। অন্য দ্রব্যাদি রাখা ছিল এতে। তাই প্রথম প্রথম এই সমস্যার ছিটেফোঁটাও আমাদের কারও নজরে আসেনি। কিন্তু একপর্যায়ে যখনই বই রাখা শুরু হয়েছে তখনই বই উধাও হতে থাকে। পরে আমি হরিপদ সেনগুপ্তের কাছে যাই। জমিদার রায়পল্লব সেনগুপ্তের বংশধর জনাব হরিপদ সেনগুপ্ত একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক। দৈনিক কাগজের ছোঁয়া পত্রিকায় কাজ করেন তিনি। হরিপদ সাহেবই আমাকে এইসব তথ্য দেয়। পরে বহুদিন বুকশেলফটি ফেলে রাখা ছিল। বাসায় অনেক জায়গা দখল করেছিল এটি। তাই পরবর্তীতে দোকানে ফেলে রেখেছিলাম।”
সব শুনে দাদু বলল— “বুঝতে পেরেছি।”
— আমি ইন্দ্রনীল বাবুর কাছে খুবই লজ্জিত। আসলে এইটা আমার কাছে একটা বোঝা হিসেবে ছিল। পরিত্রাণের উপায় পাচ্ছিলাম না। তাই বাবু যখন চাইলেন তখন আর মানা করিনি। আমার জানতাম এই কুহকের বন্দোবস্ত করলে একমাত্র ইন্দ্রনীল বাবুই পারবেন। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।
— সমস্যা নেই মাসফিক সাহেব। ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিনের বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে সামান্য কিছু কথা এড়িয়ে যাওয়া বিশেষ অপরাধ নয়। আমি কুহককে রেখে দিব আমার জ্ঞানতরীতেই। তবে দ্বিতীয় তাকে আর বই থাকবে না। থাকবে অন্যান্য সুন্দর কিছু কারুকাজ।
সব শুনে তাহের চাচা বলে উঠল— “বাপরে বাপ। আগের জমিদাররা কীরকম দজ্জাল আছিন, নিজের হাত কাটছে এর লাইজ্ঞা দুইজনরে মাইরা ফালাইল।”
মাসফিক সাহেব চলে গেলেন। আমরা গিয়ে কুহকের দ্বিতীয় তাক খালি করে ফেললাম। দাদু এইখানে বিখ্যাত কিছু জিনিস রাখবে। বিভিন্ন সময় তাকে তার বন্ধু সমাজ উপহার দিয়েছে। ওইগুলোই রাখবে এখানে।
আমি নিজ কক্ষে চলে গেলাম। গত কয়েকদিন বইয়ের ধারে কাছে যাওয়া হয়নি, তাই পড়া জমে গেছে। বই নিয়ে বসে টানা ৩ ঘণ্টা পড়লাম। কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি, এ কী! মাত্র ৩০ মিনিট অতিবাহিত হয়েছে। পড়াশুনা আসলেই একটা বোরিং কাজ।
ঘড়ির কাঁটা যেন আমার সঙ্গে শত্রুতা করেছে। একদিকে বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে আমার মনে হচ্ছিল, আজ বুঝি জ্ঞানী হয়ে ঘর থেকে বের হব। অন্যদিকে সময় যেন বলছে, “ভাই, এত তাড়াহুড়ো করে জ্ঞানী হওয়ার কী দরকার?”
আবার মনের মাঝে কয়েকটা লাইনও ঘুরপাক খাচ্ছে—
“একটি একটি বই যে কেন যায় হঠাৎ মিলিয়ে,
কোন অচেনা পথের শেষে থাকে তারা গিয়ে?
নিশিথ রাতে প্রশ্ন জাগে, রহস্যের নেই শেষ—
বইগুলোর সেই গন্তব্যই কি কুহক রহস্যের দেশ?”