কুহক রহস্য

পর্ব - ৫

কুহক রহস্য বাংলা গল্প - লেখক মীর মোঃ তানজিরুল ইসলাম

রাত প্রায় ১১টা। দাদু, হাসান ভাই, তাহের চাচা আর আমি ভূত ধরতে প্রস্তুত। শফিক ভাই ভয়েই আসেনি। ভূতে নাকি তার ভীষণ ভয়। দাদুর নির্দেশে বাসার সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। আগে থেকেই কুহকে রাখা বইয়ের ছবি তুলে রেখে দিয়েছি ফোনে। যাতে কিছু পরিবর্তন হলেই বুঝতে পারি। সবাই জ্ঞানতরীতে গিয়ে লুকিয়ে পড়লাম। আমি আর দাদু কুহকের অপর পাশে রাখা আলমারির পেছনে বসেছি। হাসান ভাই আমাদের চেয়ে একটু দূরেই আছে, একটা বুকশেলফের পেছনে। আর তাহের চাচা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ জ্ঞানতরীতে প্রবেশ করলেই সে পেছন থেকে হামলা করবে। হামলা করার জন্য একটা পাটের বস্তা আর একটা লাঠিও সঙ্গে নিয়েছে সে।

রাত গড়িয়ে ১২টা। শুধু মশার গান আর দেওয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সবাই নীরব। দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে তাহের চাচা বসে পড়ল। হালকা হালকা ঘুমে হাসান ভাই মাঝে মাঝেই ঢলে পড়ছে। আমার চোখে ঘুম নেই। দাদুও একদম সজাগ। একটু পর পর দাদু আর আমার দৃষ্টি বিনিময় হয়। একপর্যায়ে নীরবতা ভেঙে ফিশ-ফিশ করে দাদুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম— “আজকে মনে হয় ভূত আসবে না বই নিতে।”

— চুপচাপ বসে থাক। দেখি কী হয়।

আমি সম্মতি সূচক মাথা নাড়লাম।

ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে রাত যখন ১টা বাজে তখন পরিবেশটা কেমন যেন আরও শান্ত হয়ে গেলো। হাসান ভাই আর তাহের চাচা ঘুমিয়ে কুপোকাত। হাসান ভাইয়ের‌‌‌ কাছে গিয়ে আমি আস্তে আস্তে ডাকলাম— “হাসান ভাই। ও হাসান ভাই, উঠে পড়ো।”

দুই একটা ধাক্কা দিতেই হাসান ভাই উঠে পড়েছে।

এবার আমি আর হাসান ভাই মিলে তাহের চাচাকে ডাকতে গেলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিছুই দেখা যাচ্ছে না তেমন। আন্দাজ করে করে পা ফেলে তাহের চাচার কাছে গেলাম। লাইট জ্বালানো দাদুর বারণ। ঘুমিয়ে পড়লেও এক হাতে বস্তা ও আরেক হাতে লাঠি এখনও শক্ত করেই ধরে আছে। ধাক্কা না দিয়ে আমি তার হাতের লাঠি ধরে হালকা টান দিলাম। একটু টান পড়তেই তাহের চাচা জেগে উঠেই পাটের বস্তা হাসান ভাইয়ের মাথায় ঢুকিয়ে দিল। তারপর জোরে জোরে চিৎকার শুরু করল— “কর্তা মশাই, কর্তা মশাই…। ভূত ধইরা ফালাইছি। দুইটা ভূত কর্তা মশাই। একটায় আমার হাতের লাঠিখানা লইয়া গেছে আরেকটারে পাকরাও করছি।”

আমি একটা কথা বলব সেই মুহূর্তে আমাকে তাহের চাচা দিল কোমর দিয়ে ধাক্কা। ধাক্কা খেয়ে, “ফেলে দিল রে…” বলতে বলতেই পড়ে গেলাম মেঝেতে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার আর তাহের চাচার এমন চিৎকারে মুহুর্তে পরিবেশটা বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠলো। দাদু তড়িঘড়ি করে আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এসে ধমকাতে লাগল— “আরে আহাম্মক ওইটা হাসান। ছাড় হাসানকে।”

দাদুর ধমক খেয়ে হাসান ভাইকে ধরার হাতটা একটু নরম করলো তাহের চাচা। কিছু না ভেবেই ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে যা দেখলাম তাতে হাসতে হাসতে পেট ব্যথার জোগাড়। হাসান ভাই মাটিতে পড়ে আছে আর তার মাথার উপর পাটের বস্তা জড়িয়ে ধরে আছে তাহের চাচা। দৃশ্যটা দেখে একপর্যায়ে ‘খিক খিক’ করে হেঁসে উঠলাম। হাসি জোরে প্রকাশ করার উপায় নেই। দাদু শুনলে আমার খবর আছে।

ইতোমধ্যে তাহের চাচা বস্তা সরিয়ে হাসান ভাইকে উঠিয়ে বসাল। তেমন ব্যথা না পেলেও হাসান ভাই এই ধস্তাধস্তিতে বেশ হাঁপিয়ে গেছে। দাদু চুপ করেই রইল। কিছু বলছে না।

— আজ্ঞে, কী কমু কর্তা মশাই। ঘুমের থেইক্কা উইঠা সামনে দেখলাম কালো মুখ দেখা যায়। আবার আমার লাঠি ধইরাও টানাটানি শুরু করছে। ভাবছিলাম ভূতে আইয়া আমারে কাতুকুতু দিতে চাইতাছে।

— তুই একটা আহাম্মক। সাধেই কী তোরে আমি আমরা কাঠের ঢেঁকি বলি?

ঘুটঘুটে অন্ধকারের এমন কথোপকথনে, আমার কেন জানি হাসি আসছে। মুখ চেপে হাসছি। এমন কথা বার্তায় হাসান ভাইও একপর্যায়ে হেঁসে ফেলল।

রাত গড়িয়ে ১:১৭ মিনিট। দাদু বলল— “সবাই আবার নিজ নিজ জায়গায় চলে যাও। ফজরের আজান পর্যন্ত দেখি কিছু হয় কী না।”

অপেক্ষা করতে লাগলাম আবারও আর মনে মনে ভাবতে লাগলাম— “ভূত ব্যাটা আসছে না কেন? এমন কান্ডে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেছে নাকি কে জানে।”

রাত এগোতে থাকে। এক একটা মিনিট তখন বেশ দীর্ঘ মনে হচ্ছে। তারপরও ভূত ধরতে হবে। ঠায় বসে রইলাম। রাত তখন কতটা ঠিক বলতে পারি না। হঠাৎ জ্ঞানতরীতে কেমন জানি ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভব করলাম। পরিবেশটা অন্যরকম লাগছে। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দরজা এবং কুহকের দিকে নজর রাখছে। দাদু একদৃষ্টিতে কুহকের দিকে তাকিয়ে আছে। পিনপতন নিরবতা ভেঙে হঠাৎ করে জ্ঞানতরীতে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে— “ক্রিও ক্রিও ক্রিও‌।”

পোকায় কাঠ কাটলে যেমন শব্দ হয় তেমন শব্দ হচ্ছে। কিন্তু এই শব্দটা তারচেয়ে অনেকে বেশি স্পষ্ট এবং জোরে হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমি একটু ভয় পেতে শুরু করলাম। হাসান ভাই আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে একপর্যায়ে আমার গায়ে লেগে গেছে। দাদু তখনও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কুহকের দিকে। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হচ্ছে না। এতক্ষণ কিছু না থাকলেও আবছা আবছা আলোয় দাদুর চোখে এখন একটা চশমা দেখতে পাচ্ছি। দাদু তো চশমা পড়ে না। সে স্পষ্ট দেখতে পায় সবকিছু। কয়েকদিন আগে ডাক্তার সাহেবও বলল, “দাদুর চোখ এখনও অনেক ভালো।”

বিজ্ঞাপন

কিছু না বুঝে থ মেরে সব দেখলাম। শব্দটা শুনে হালকা ভয়ে শরীরের লোম খাড়া হয়ে আছে। আনুমানিক ১-২ মিনিট পর শব্দটিও বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ আওয়াজ আসল— “ওঠে পড়ো সবাই।”

কথাটা দাদুর মুখ থেকে এসেছে। হঠাৎ করে এমন কথায় হাউমাউ করে এসে দাদুকে জড়িয়ে ধরল তাহের চাচা।

— আরে আহাম্মক ছাড় আমাকে। এত ভয় পেয়ে আসছে ভূত ধরতে। ছাড়… ছাড়…

চাচা ছেড়ে দিল। দাদু বলল— “লাইট জ্বালিয়ে দে সায়েম।”

আমি “জি দাদু” বলে লাইট জ্বালিয়ে দিলাম। লাইট জ্বালাতেই দাদুর চোখের দিকে নজর গেল। একটা বেশ অন্যরকম চশমা পড়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম— “এটা কবে কিনলে? আর রাতে পড়েছ কেন?”

দাদু কোনো কথা না বলে কুহকের দ্বিতীয় তাকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল— “সবাই ঘুমিয়ে পড়ো এখন। কালকে সকালে কথা হবে।”

অগত্যা, আর কোনো কথা না বলে সবাই ঘুমাতে চলে গেল। হাসান ভাই গোসল করে এসে আমার সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙলো সকাল ৯টায়। পাশে হাসান ভাই নেই। চোখ কচলাতে কচলাতে নিচে নামলাম। দাদু আর হাসান ভাই ড্রয়িং রুমে বসে কথা বলছে। আমাকে দেখে হাসান ভাই ডাকল— “সায়েম, আয়। নীল বাবু কী যেন বলবে।”

গিয়ে দাদুর পাশেই বসলাম। বসে বললাম— “কী বলবে দাদু? বল।”

— তাহের, তুইও আয়। একেবারেই সবাইকে বলি।

— আজ্ঞে, অলমেটটা রাইখা আইতাছি কর্তা মশাই।

— ওটা অলমেট না রে আহাম্মক। অমলেট বল অমলেট। এতদিনেও তোরে শিখাতে পারলাম না কিছু।

তাহের চাচা এসে বলল— “যেইটা অলমেট ওইটাই অলমেট।” সবাই হেঁসে ফেলল। তাহের চাচার এমন কথা আমার ভীষণ প্রিয়। সে সহজ সরল ভাবে বলে সবই। কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। দাদু চাচাকে আদর করে আহাম্মক বলে, রাগ করে না।

— অনেক হাসি তামাশা হলো। এইবার শুনো সবাই।

দাদু জিজ্ঞেস করল— “গতকালকে রাতে কী ঘটেছিল কিছু বুঝলে কেউ?”

— না, নীল বাবু। কিছুই তো বুঝলাম না। কিছু কী হয়েছিল আদৌও?

— গত রাতে আমার চোখে একটি চশমা দেখতে পেয়েছিলে নিশ্চয়ই?

— হ্যাঁ, দাদু। ওইটা রাতে কেন পড়েছিলে?

— বলছি। শুনো তবে….

বিজ্ঞাপন