কুহক রহস্য

পর্ব - ৩

কুহক রহস্য বাংলা গল্প - লেখক মীর মোঃ তানজিরুল ইসলাম

অপেক্ষা করতে করতে রাত তখন প্রায় ৮ টা। কলিং বেলের শব্দে দৌড়ে নিচে নেমে দরজা খুললাম— “হাসান ভাই, তুমি। বেশ হতাশ হলাম।”

— কেন রে? তুই কী ভেবেছিলি?

— আমি ভেবেছিলাম দাদুর সেই সারপ্রাইজ দরজার এসে কড়া নাড়ছে।

— আমাকেও বলল সারপ্রাইজ আছে। রাতে যেন আসি। তাই তো আসলাম।

— আচ্ছা, দেখা যাক কী সারপ্রাইজ দেয় আমাদের।

হাসান ভাইয়ের‌‌‌ গলা শুনে দাদু বেরিয়ে এলো। এসে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় বলল— “হাসান, চলে এসেছ।”

— হ্যাঁ, নীল বাবু। আপনি ডেকেছেন আর আমি আসিনি তা কখনো হয়েছে?

— আচ্ছা বসো। সারপ্রাইজ পথেই আছে। এই এসে পৌঁছালো বলে।

আমি কোনো কথা না বলে তাদের কথা গিলছিলাম। কথা বলতে বলতে কিছুক্ষণ পরেই দাদুর মোবাইল বেজে উঠলো।

— এসে পড়েছো? আচ্ছা… আচ্ছা…। আমি দরজা খুলে বাইরে দাঁড়াচ্ছি। চলে আসো। কইরে, তাহের…। এদিকে আয়…

— যাই, কর্তা মশাই।

আমাকে আর হাসান ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দাদু ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো। হঠাৎ দেখি বাড়ির মধ্যে ছোটোখাটো একটা পিকআপ প্রবেশ করছে। এইটা দেখে আমার কৌতূহলী দৃষ্টি আরও উৎসুক হয়ে উঠছে। গাড়ি এসে দাঁড়াল ঘরের দোরগোড়ায়। গাড়ি থামতেই দাদু বলে উঠল— “সারপ্রাইজ…”

কিন্তু কীসের কী? এত একটা বুকশেলফ। যার চেহারাও খুব একটা সুবিধার না। বুকশেলফটা মেটালের তৈরি, যার গায়ে লেগে আছে অসংখ্য মরীচার চিহ্ন বিশেষ। দেখেই বুঝা যাচ্ছে অনেক পুরানো জিনিস।

— এইটা কী আনলে তুমি দাদু?

— বলছি, লিটল ম্যান বলছি।

দাদু যখন খুব খুশি থাকে তখন আমাকে লিটল ম্যান ডাকে। তখন তুমি বলে আর বাকি সময় তুই। কিন্তু এই ভাঙাচুরা গড়নের বুকশেলফ পেয়ে এত খুশি হওয়ার কারণ এখনো স্পষ্ট না।

বুকশেলফটা ভীষণ ভারী। বেশ কয়েকজন মিলে নামিয়ে ঘরের ডাইনিং এ রাখলো আপাতত। রেখে পিকআপ নিয়ে তারা চলে গেল। চলে যাওয়ার পর মূহূর্তেই তাহের চাচা বলে উঠল— “এইরহম ভাইঙ্গা যাওয়া একটা বুকশেলোফ নিয়া আইলেন কর্তা মশাই। এর চেয়ে আমারে কইলেও ভালো জিনিস খুঁইজা বাইর করতাম।”

— এই বুকশেলফের ব্যাপারে তোমার কী অভিমত হাসান?

— আপনি যখন এনেছেন, এইটাতে অবশ্যই বিশেষ কিছু আছে।

— এইজন্যই তো তোমাকে আমার এত পছন্দ হাসান। না জেনে কোনো মন্তব্য করো না তুমি।

— আমি কিন্তু এইটা নিয়ে খুবই হতাশ দাদু। আমি ভেবেছিলাম কী না কী। কত আশা নিয়ে বসেছিলাম।

বিজ্ঞাপন

— কেন লিটল ম্যান? তুমি কী ভেবেছিলে তোমার জন্য একটা টুকটুকে বউ নিয়ে আসবো?

এইটা বলার পর একরাশ হেঁসে নিল সবাই। আমিও সামান্য লজ্জা পেলাম।

— এখন রাতের খাবার খেয়ে নাও। খেয়ে তারপর এই বুকশেলফ সম্পর্কে বলছি।

খাবার খেয়ে সবাই ড্রয়িং রুমে বেশ আটঘাট বেঁধেই বসেছে, বুকশেলফ সম্পর্কে জানবে বলে। দাদু বলতে শুরু করল— “এই বুকশেলফটার একটা নাম আছে। কেউ বলতে পারবে কী নাম?”

— না, কর্তা মশাই।

— আমি বলব চৌধুরী বাবু?

— শফিক, তুই চুপ থাক। কেনার সময় তো তুই সাথেই ছিলি আমার।

— না, আমাদের কারও জানা নেই এই ব্যাপারে। আপনিই বলে দিন নীল বাবু।

— এই বুকশেলফটির নাম হলো ‘কুহক।’

— আজ্ঞে, কুহক আবার কী জিনিস? জীবনের কালে এই পরথম আইজকা এমন আজগুবি নাম শুনলাম।

— কুহক মানে তো, “মায়া, ভেলকি কিংবা যাদু। তাই না দাদু?”

— হ্যাঁ, ঠিক তাই।

হাসান ভাই জিজ্ঞেস করল— “এইটার নাম কুহক কেন?”

দাদু আবার বলতে শুরু করল— বহুকাল আগে আমাদের এই অঞ্চলের অন্যতম ধনী জমিদার ছিল ‘রায়পল্লব সেনগুপ্ত।’ সে বইয়ের প্রতি ছিল খুবই শৌখিন প্রকৃতির বইপোকা। তার ছিল সুবিশাল এক রাজকীয় লাইব্রেরি। ওই লাইব্রেরির প্রতিটি বুকশেলফ এবং আলমারির আলাদা আলাদা করে তিনি নাম দিয়েছিলেন। সে মারা যাওয়ার পর তার ছেলে এবং পরবর্তীতে তার নাতিদের উপরে এই লাইব্রেরির দায়িত্ব পড়ে। তার নাতি জমিদার রুদ্রায়ন সেনগুপ্ত এর সময়কালে জমিদারি প্রথা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে থাকে। এক পর্যায়ে এই লাইব্রেরির দায়িত্ব চলে আসে সরকারের কাছে। সরকার এইখানকার কয়েকটি আলমারি ও বুকশেলফ নিলামে বিক্রি করে দেয়। তার মধ্যে একটা হলো এই ‘কুহক।’ যেটা নিলামে কিনে নিয়েছিলেন জনাব মাসফিক হোসেন। বিগত বেশ অনেকদিন ধরে এই সেলফটি তার দোকানের এক কোণে অযত্নে অবহেলায় পড়ে ছিল। মাসফিক হোসেনের দোকান মূলত আলমারি ও স্টেইনলেস স্টিল জাতীয় সব জিনিসপত্রের। আমি ওইখানে গিয়েছিলাম একটা বুকশেলফের অর্ডার দিতে। গিয়ে এইটা দেখে এবং শুনে আর লোভ সামলাতে পারলাম না, নিয়ে আসলাম। জমিদার রায়পল্লব সেনগুপ্তের বই প্রীতির ব্যাপারে আগেই শুনেছিলাম। তার লাইব্রেরির একটা বুকশেলফ আমার লাইব্রেরিতে থাকলে তা বেশ আভিজাত্যের বিষয়।

রাত তখন প্রায় ১১টা। হাসান ভাই মাত্র বের হলো। আমরাও সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেলাম। আমি বেশ হতাশ। যদিও জিনিসটা মন্দ না তবুও আমার মনে ধরেনি তেমন একটা। রাতে কুহক ড্রয়িং রুমেই থাকে। সকালে তাকে পরিষ্কার করে রঙিন সাজে সাজিয়ে তার কাঙ্ক্ষিত স্থানে রেখে দেওয়া হবে।

পরদিন সকালে উঠে দেখি ইতোমধ্যেই কুহককে পরিষ্কার করা শেষ। আগে দেখে তেমন একটা সুবিধার না লাগলেও এখন দেখে সামান্য ভাল লাগছে। তার গায়ের মরীচা গুলো এখন আর নেই। দাদুর নির্দেশে কুহককে রঙিন করতে হাত লাগাল তাহের চাচা। পুরো বুকশেলফটিকে রুপালি রং করা হলো।

বিকেল বেলায় দাদুর হাঁক শুনে নিচে নামলাম। কুহকের গায়ে দেওয়া রং শুকিয়ে গেছে। এখন দেখে ভালোই লাগছে। আগের থেকে ঢের ভালো।

এখন তাকে উপরতলায় জ্ঞানতরীতে নিতে হবে। দাদু বেশ কয়েকজনকে আগে থেকেই বলে রেখেছিল। সবাই এসে হাজির। কুহককে সবাই মিলে উপরতলায় নিয়ে গেল। উপরতলায় দিয়ে সবাই যে যার মতো চলে গেল। জ্ঞানতরীতে এখন শুধু মাত্র আমি আর দাদুই উপস্থিত। আগের বুকশেলফটার বইগুলো একটা পাশেই রাখা ছিলো।

— তো লিটল ম্যান, চলো বইগুলো যথাস্থানে সাজিয়ে রেখে দেই?

— চলো দাদু।

— মোটা মোটা সাহিত্যের বইগুলো একদম নিচের তাকে রাখো। আর ছোট বইগুলো উপরে।

বিজ্ঞাপন