সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় উঠলে ‘নিরিবিলি জ্ঞানকুঞ্জ’— এর সবচেয়ে বিশেষ অংশটি চোখে পড়ে। উপরের তলার ডান পাশে রয়েছে দুটি সুন্দর থাকার কক্ষ, যার প্রতিটির সঙ্গে রয়েছে সংযুক্ত ওয়াশরুম।
তবে উপরের তলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও গর্বের স্থান হলো পুরো বাঁ পাশজুড়ে বিস্তৃত সুবিশাল ‘জ্ঞান ও গবেষণা কক্ষ।’ এটি মূলত একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র— যেখানে বই পড়া, লেখালেখি, গবেষণা, চিন্তাভাবনা ও জ্ঞানচর্চার জন্য রয়েছে প্রশস্ত ও মনোরম পরিবেশ। বইয়ের তাক, পড়ার টেবিল এবং গবেষণার উপযোগী শান্ত পরিবেশ এই কক্ষটিকে বাড়িটির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছে। ‘নিরিবিলি জ্ঞানকুঞ্জ’ নামটির যথার্থতা যেন সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় এই জ্ঞান ও গবেষণা কক্ষেই। এই কক্ষটির একটি নাম রয়েছে। কক্ষটির নাম জ্ঞানতরী।
জ্ঞানতরীর বাঁ পাশে এবং সামনের দিকে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দাজুড়ে রয়েছে বাহারি রকমের ফুলের গাছ ও সবুজের সমারোহ। সেখানে দাঁড়ালে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা উপভোগ করার পাশাপাশি বই পড়া, চা পান কিংবা নীরবে বসে চিন্তার জগতে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চাইবে না।
বর্ণনা শুনে মনে প্রশ্ন জাগেনি এই বাড়িটি কোথায়? বাড়িটি সিলেটে। সিলেটের মূল শহর থেকে একটু দূরে, শ্রীরামপুরের একটি আবাসিক এলাকায়। কর্মজীবনে দাদু অনেক জায়গায় গেলেও শেষমেষ তার জন্মস্থান সিলেটেই নিজের সবশেষ ঠিকানার জন্য বাড়িটি তৈরি করেন।
আড্ডা শেষে দাদু আর হাসান ভাই উপরতলায় যাচ্ছে জ্ঞানতরী কক্ষে। তাদের পেছন পেছন আমিও রওনা দিলাম। এই কক্ষে গেলেই একটা আলাদা শান্তি পাওয়া যায়, মনে হয়, যেন অন্য জগতে চলে এসেছি। চারিদিকে আলমারি, বুকশেলফ আর অপরূপ দেওয়াল লেখনিতে পুরো কক্ষটি যেন কোনো চিত্রশিল্পীর কল্পনায় আঁকা এক অপরূপ শান্তির স্থান।
— শ্রীকান্ত বইটা কী আপনার সংগ্রহে আছে নীল বাবু?
— হ্যাঁ, আছে। সায়েম, হাসানকে বা দিকের সবশেষ বুকশেলফটায় নিয়ে যা। নিচের দিক থেকে দ্বিতীয় তাকে বইটা আছে।
— এদিকে আসো হাসান ভাই।
হাঁটতে হাঁটতে কাঙ্ক্ষিত বুকশেলফের কাছে গেলাম। বইটিও পেলাম, কিন্তু তা আর পড়ার মতো অবস্থায় নেই। হাতে নিতেই বইয়ের শক্ত মলাট বাদে বাকি সব পৃষ্ঠা ছোট ছোট টুকরোর মতো নিচে পড়ে গেল। বুঝাই যাচ্ছে ইঁদুরের সূক্ষ্ম দাঁতের কারুকাজ। একটা বইয়ের এই অবস্থা দেখে আমি আর হাসান ভাই আরো কয়েকটা বই বের করলাম; ওইগুলোর ও একই দশা।
— দাদু, ও দাদু।
— হ্যাঁ, বল।
— এদিকে তো সব বই ইঁদুর কেটে ফেলেছে। অবস্থা খুবই খারাপ।
— কই দেখি।
বইয়ের এমন করুণ দশা দেখে দাদুর কপালে দেখা গেল স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। কপাল চুলকাতে চুলকাতে বলল— “হাসান, দেখো তো সেলফটার কী অবস্থা? ওইটা অক্ষত আছে তো?”
বুক সেলফটা ভালো করে দেখতেই দেখা মিলল ওইটারও নাজেহাল অবস্থা। পোকায় খেয়ে বুকশেলফের অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে। সব দেখে দাদু ভীষণ চটে গিয়েছে। রাগান্বিত মাথায় নিচে নামতে নামতে হাঁক দিচ্ছে— “তাহের, এই তাহের। কোথায় রে আমড়া কাঠের ঢেঁকি! কোথায় তুই?”
নিচতলা থেকে আওয়াজ ভেসে আসল— “আজ্ঞে, যাই কর্তা মশাই।”
রান্নাঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে তাহের চাচা জিজ্ঞেস করল— “কী হইছে কর্তা মশাই? এত জোরে জোরে ডাক পারতাছেন কিয়ের লাইজ্ঞা?”
— তোর প্রধান দায়িত্ব ছিল আমার জ্ঞানতরী দেখে রাখা। ওইখানে একটা সেলফে এত গুলো বই ইঁদুরে শেষ করল। আমার সেলফটাও শেষ করে দিলো পোকার দলেরা। তুই একটু খেয়াল রাখবি না?
মাথায় হাত দিয়ে চাচা বলল— “কী কইতাছেন কর্তা মশাই! আমিতো গতকাইলকা সকালেও দেইক্কা আইলাম, সব সাফসাফাই কইরা আইলাম। আমার তো কোনো কিছু নজরে আইলো না।”
— তোর নজরে আসলে কী আর এই কাণ্ড হতো?
ইতোমধ্যে আমি আর হাসান ভাইও নিচে নেমে এসেছি। দাদুকে এখন শান্ত করা কোনো সাধারণ মানুষের কর্ম না। এই একটা জিনিসে সে অনেক বেশি কঠোর। অন্য সব বিষয়ে তার চেয়ে মিশুক আর হাস্যরসাত্মক মানুষ আমার নজরে তেমন একটা পড়েনি। হাসান ভাইয়েরও একই অভিমত দাদুকে নিয়ে।
— আচ্ছা, যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। এখন আর মাথা গরম করবেন না নীল বাবু। আমি একটা নতুন বুকশেলফ দেখছি। দেখি ভালো কাঠের তৈরি না পেলে বানিয়ে ফেলব।
— হ্যাঁ, হাসান ভাই। ওইটাই ভালো হবে।
— আমি কী যে কমু কিছু মাথায় আইতাছে না কর্তা মশাই। আমার তো ওই সাধ্যি ও নাই যে একটা নতুন বুকশেলোফ বানাইয়া দিমু।
— ওইটা বুকশেলোফ না তাহের। বুকশেলফ বলে ওইটাকে। যার মানে হলো বই রাখার তাক বা আলমারি বিশেষ। তোর বানিয়ে দিতে হবে না, তবে এখন থেকে খেয়াল রাখবি একদম গোয়েন্দার মতো।
— গোয়েন্দা কেমনে নজরে রাহে কর্তা মশাই?
— আচ্ছা এইসব ছাড়ো দাদু। আমরা নতুন একটা বুকশেলফ নিয়ে এসে ওইটার স্থলে রেখে দেই, তাহলেই তো সব সমাধান হয়ে যায়।
— এখন আমি যাই নীল বাবু। আর আমি দেখছি কীভাবে কী করা যায়।
— একটু তাড়াতাড়ি দেখো হাসান। আর আমিও দেখেছি।
— জি, নীল বাবু।
কথাবার্তা শেষ করে হাসান ভাই বেরিয়ে পড়লো। আমি পড়তে বসার পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। কিন্তু এখন মন চাইছে না। পড়াশুনা হলো এই জগতের সবচেয়ে একঘেয়ে কাজ— যা চাইলেও করতে হয়, না চাইলেও করতে হয়। নাহলে সভ্য সমাজে মুখ দেখানো দায় হয়ে পড়ে। এই পড়াশুনাকে কে যেন আবিষ্কার করেছিল জানি না। যদি তাকে জীবিত পেতাম তবে তার সাথে আমার অন্তত একটা ধস্তাধস্তি হতো এই ব্যাপারে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। পড়াশুনার ব্যাপারটা যদি মেনেও নেই পরীক্ষার ব্যাপারটা মানা সম্ভব না। পরীক্ষা কেন দিতে হবে? পরীক্ষার প্রবর্তককে হাতের কাছে পেলে কী করতাম তা ভেবে পাচ্ছি না। হয়ত তার সাথেও ধস্তাধস্তি কিংবা কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়ে যেত। আর এরকম কোনো প্রতিযোগিতা হলে, তাতে আমার হারার কোনো সম্ভাবনা নেই।
দিন গড়িয়ে বিকেল এলো। দাদু বাইরে গিয়েছিল, এইমাত্র ফিরলো। ফিরে ড্রয়িং রুমে বসার খানিকক্ষণ পরেই মোবাইলে রিং বেজে উঠলো। দাদু ফোন তুলে বলল— “আজকে রাতেই পাঠিয়ে দেন। রাত হলেও সমস্যা নেই।”
এমন কথা শুনে একটু কৌতূহল হলো। কী পাঠাতে বলছে, জানা দরকার।
— কী পাঠাতে বলছো দাদু?
— সারপ্রাইজ থাকুক এই বিষয়টা। বাসায় এলেই দেখতে পাবি। রাতে হাসান ও আসছে।
হাসান ভাইও আসছে, তার মানে বিশেষ কিছুই হবে। শুনে তো আমার কৌতূহলের শেষ নেই। কী হতে পারে তা ভেবে কোনো কূল কিনারা পাচ্ছি না। আবার জিজ্ঞেস করলাম, তাতেও একই উত্তর— “বাসায় এলেই দেখতে পাবি।”
বুঝলাম যে এখন বলবে না। অগত্যা, রাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। কখন আসে সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিস, আর জিনিসটাই-বা কী?