দাদুর কথামতো সব বই রাখা শেষ করলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ছাদে এসেছিলাম। আজকের আকাশের চাঁদটা একদম কানায় কানায় পরিপূর্ণ, যেন আমায় কিছু বলতে চাইছে কিন্তু বলতে পারছে না। মনে মনে একটা ছন্দ বেশ খানিকক্ষণ ধরেই উঁকি দিয়ে উঠছে। বলব? বলেই ফেলি—
দেখা হবে, কথা হবে, পরে যখন
আমি তার প্রেমের জলে ভাসবো তখন।
নদীর পানি দেখবে আমাদের,
দেখবে আকাশের চাঁদ,
আরেকটা চাঁদ আমার পাশে,
আমি হব তার প্রেমে উন্মাদ।
ধুর ছাই। কী সব হাবিজাবি লাইন ভাবছি। দাদু যদি শুনতে পারে তবে প্রতি লাইনেই ভুল ধরে বুঝিয়ে দিবে, সাহিত্য ব্যাপারটা নিছকই হাবিজাবি লেখার গল্প নয়।
পরদিন সকাল সকাল হাসান ভাই চলে এল। এসে কফি খাওয়াও শেষ। কফি খেয়ে উপরতলায় আসছে। আর আমি সবেমাত্র ঘুম থেকে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠলাম। উঠে সিঁড়িতেই হাসান ভাই আর দাদুর সাথে দেখা হয়ে গেল। দাদু জ্ঞানতরীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে হাসান ভাইকে, কুহককে দেখাবে। আমিও তাদের পেছন পেছন গিয়ে জ্ঞানতরীতে প্রবেশ করলাম। কুহকের সামনে এসে হাজির সবাই।
— বাহ, কুহককে বেশ ভালোই তো মানিয়েছে এইখানে।
— এইটা তোমার নীল বাবুর পছন্দ হাসান। না মানিয়ে যাবে কোথায়?
— দাদু, দ্বিতীয় তাকে বইগুলো হেলে পড়েছে মনে হচ্ছে। সংখ্যায়তো কম কম লাগছে।
— গণনা করে দেখ তো।
— দ্বিতীয় তাকে মোট বই আছে ৫৮টা। কিন্তু আমিতো ৬০টা বই রেখেছিলাম দাদু।
— এইটা তোর মনের ভুল। বই তো আর চুরি হয়ে যাবে না। আর চুরি গেলেও দুইটা করে বই কেউ নেবে না।
— তোমার মনের ভুল হয়ত সায়েম।
— হ্যাঁ, হাসান ভাই। হয়ত…
মাথায় হাত চুলকাতে চুলকাতে জ্ঞানতরী থেকে বের হয়ে এলাম। আমিতো ৬০টা বই-ই রেখেছিলাম। নাকি আমারই মনের ভুল? ধুর ছাই, যা হবার হয়েছে। দুইটা বই কী ডানায় ভর করে উড়ে পালাবে?
দাদুর কাছে জ্ঞানতরীতে থাকা সব আলমারি এবং বুকশেলফের কোথায় কোন তাকে কতটি এবং কী কী বই আছে তার লিস্ট আছে। গতকালকে বইগুলো রেখে সে ওই লিস্ট আর বানায়নি। আজকে বানাবে হয়ত।
সকালের নাস্তা খেয়ে, হাসান ভাই চলে যায়। সে চলে যাবার কিছুক্ষণ পর, দাদুর জরুরি তলব আসে তাহের চাচার মাধ্যমে— “কর্তা মশাই আপনেরে নিচে যাইতে কইছে।”
নিচে গেলাম। দাদু তার ডায়রি ধরিয়ে বলল— “কুহকের বইয়ের লিস্টটা করে নিস।”
অগত্যা, ডায়রি নিয়ে আবার উপরতলায় আমার রুমে চলে আসলাম। এসে একটু পরেই জ্ঞানতরীতে গেলাম এবং বিশাল সেই কর্মযজ্ঞ শুরু করলাম। কুহকে মোটমাট ৪টা তাক। তার মাঝে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০০ এর মতো। কোন তাকে বইয়ের সংখ্যা কত এবং তাক অনুসারে বইয়ের নাম লিখে লিস্ট তৈরি করতে হবে। মনে মনে বললাম— “আমার আজকের দিন শেষ। কত সময় যে লাগে কে জানে…”
পরদিন দুপুরে খাবারের টেবিলে বসে দাদু বলল— “আবু জাফর শামসুদ্দীন এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ পড়ব বলে, আজকে সকালে জ্ঞানতরীতে গিয়েছিলাম। তোর দেওয়া লিস্ট অনুযায়ী, বইটা কুহককের দ্বিতীয় তাকে থাকার কথা। কিন্তু বইটা পেলাম না। না পেয়ে সন্দেহ হলো এবং বইগুলো গণনা করলাম। লিস্ট অনুযায়ী দ্বিতীয় তাকে বই থাকার কথা ৫৮টা; কিন্তু বই আছে ৫৭টা। একটা বই মিসিং।”
— পদ্মা মেঘনা যমুনা?
— হ্যাঁ, ওটাই।
— কোথায় গেল বইটা?
— এই বইটা কোথায় গেল তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন মাথায় খেলছে সেই সকাল থেকে!
— কী প্রশ্ন?
— গতকালকে তুই বলেছিলি যে দ্বিতীয় তাকে আগের দিন তুই ৬০ টা বই রেখেছিস।
— হ্যাঁ, আমার তাই মনে হয়েছিল। পরে তো তোমরাই আমাকে গুলিয়ে দিলে….
— আগের বুকশেলফটার লিস্ট তো আমার কাছে ছিলো। ওইটা মিলিয়ে দেখলাম। ইমদাদুল হক মিলনের লিখা ‘নুরজাহান’ উপন্যাসের ১ম ও ২য় খন্ড নেই। তার মানে গতকালকে তুই-ই ঠিক ছিলি। আসলেই বই দুটি কম ছিল।
— বইগুলো যাচ্ছে কোথায়? এইটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার।
— প্রশ্ন তো একটাই।
— কী প্রশ্ন?
— বইগুলো যাচ্ছে কোথায়?
এইসব নিয়ে আলোচনা করতে করতেই খাবার খাওয়া শেষ হলো। মনে বার বার একই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে— বইগুলো যাচ্ছে কোথায়?
যদিও এরকম রহস্য রহস্য গন্ধে আমার বেশ মজাই লাগছে। আগেই বলেছিলাম, এমন কিছু হলে আমি সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। চিন্তা করে একটা বুদ্ধি বের করলাম। জ্ঞানতরীর পাশের বারান্দায় যাচ্ছি দাদুকে বলতে। সে ওখানেই আছে।
দাদুর কাছে গিয়ে পাশের ইজি চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দিলাম। আর বললাম— “একটা বুদ্ধি মাথায় খেলছে। করলে কেমন হয় ভাবছি। আর যাই হোক বেশ এডভ্যাঞ্চার হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।”
— কী বুদ্ধি?
— আজকে রাতে আমরা যদি কুহককে পাহারা দেই তাহলে কেমন হয়?
— আমার মাথায়ও যে বিষয়টা আসেনি তা না। এসেছে। কিন্তু…
— কোনো কিন্তু নেই দাদু। এই রহস্য বের করতেই হবে। তুমি হাসান ভাইকেও আসতে বল। আজকে রাতে বেশ রোমাঞ্চকর কিছু হতে যাচ্ছে। হয় চোর ধরবো নাহয় ভূত।
— ভূত?
— হ্যাঁ, ভূত।
— তুই কী বলতে চাচ্ছিস, বইগুলো ভূতে নিয়ে যাচ্ছে?
— তা বলছি না সরাসরি। কিন্তু ভেবে দেখো, রাতের বেলায় চুপিসারে কোনো একটা ভূতে এসে বই নিয়ে পালাচ্ছে আর আমরা হাতে নাতে তাকে ধরলাম।
— কী সব যে বলছিস। ভূত কী ধরা যায় নাকি। আর ভূত বলে কিছু নেই। জ্বীন জাতির ব্যাপার অস্বীকার করছি না তবে ভূত হলো মনুষ্য সৃষ্ট কাল্পনিক চরিত্র। যার অস্তিত্ব বাস্তবে নেই।
— যাই হোক। কল দিয়ে হাসান ভাইকে আসতে বলো। আজকে ভূতই ধরব।
দাদু হাসান ভাইকে কল দিয়ে বলল— “আজকে রাতে চলে এসো। ভূত ধরতে পারি কী না দেখি।”
— কী বলছেন নীল বাবু! ভূত?
— হ্যাঁ, হয় ভূত ধরব নাহয় অদ্ভুত কিছু উদঘাটন করব। কিন্তু ভূত থাকবেই তাতে।
দাদু বেশ রসিক মানুষ। আমার সাথে তাল মিলিয়ে ভূত ধরতে তার আগ্রহও কম নয়। দেখা যাক রাতে কী হয়…
হাসান ভাই সন্ধ্যার পর পরই এসে গেল। ফোনে তাকে সবকিছু এত বিস্তারিত বলা হয়নি। তাই মনে হয় ঘাবড়ে গেছে যে, ভূত ধরবে নাহয় অদ্ভুত কিছু উদঘাটন করবে মানে কী?
এসে দাদুর সাথে গল্প করতে বসে পড়েছে। কয়দিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে পড়তে বসা হচ্ছে না। খালি এটা ওটা করেই দিন কাটাচ্ছি। পরশু থেকে আবার আটঘাট বেঁধে পড়তে বসব। সারা রাত সজাগ থাকলে কালকেও পড়া হবে না নিশ্চিত। তাই একদম পড়শু।