আজকে মেজাজটা কেন যে এত ফুরফুরে জানি না। দাদুকে আজকে তার প্রাত্যহিক যুদ্ধও করতে হয়নি। প্রাত্যহিক কী যুদ্ধ করে দাদু? শুনে বুক কেঁপে উঠলো? প্রতিদিন সকালে আমাকে ডেকে ঘুম থেকে জাগানো এক-একটা যুদ্ধের চেয়ে কম কীসে?
দাদু ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে আর একটা বইয়ে চোখ বুলাচ্ছে। চা শেষ করার আগেই বাসার কলিং বেল বেজে উঠল— “ক্রিং ক্রিং ক্রিং।”
পায়ে পা তুলে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল দাদু। কলিং বেলের শব্দ শুনে হাঁক দিল— “তাহের, আরে এই তাহের। কোথায় রে? দেখ তো কে এসেছে।”
— আজ্ঞে যাই, কর্তা মশাই।
তাহের চাচা দরজা খুলেই বলে উঠল— “হাসান বাবু আইছে কর্তা মশাই। আহেন, হাসান বাবু ভিতরে আহেন।”
হাসান ভাই ভেতরে আসতেই দাদু জিজ্ঞেস করল— “শরীরের কী খবর হাসান? ঠিক আছো এখন?”
— হ্যাঁ, নীল বাবু। এখন অনেকটাই হালকা। আপনি কেমন আছেন?
— আমি ভালো আছি। আর ভালোই থাকি সবসময়, এইটা তো তোমার অজানা নয়।
— হ্যাঁ, তা জানি।
— তাহের, হাসানের জন্য কফি নিয়ে আয়।
— আজ্ঞে, কর্তা মশাই।
কিছুক্ষণ পর তাহের চাচা কফি দিয়ে গেল। কফির মধ্যে চুমুক দিতে দিতে দাদু আর হাসান ভাই শুরু করল তাদের আড্ডা। তারা দুইজন আড্ডায় বসলে আর নিস্তার নেই। কখন যে দিন কেটে যায়, বুঝাই মুশকিল।
তাদের আড্ডার ফাঁকে সবার পরিচিতি পর্ব শেষ করা যাক।
আমার দাদু— অধ্যাপক হুমায়ুন কবির চৌধুরী। দাদু একজন অবসরপ্রাপ্ত বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। বয়স ৭২ হলেও এখনো সব চুল-দাড়ি সাদা হয়ে যায়নি, কাজে কর্মে এখনো তাগড়া যুবকের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে। জীবনে বহু সরকারি কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিজের সমস্ত জ্ঞান তার ছাত্রদের উজাড় করে দিয়েছেন।
এছাড়া দাদু একজন বিখ্যাত কবিও বটে। তার প্রকৃত নাম থেকে ইন্দ্রনীল বাবু নামেই তিনি বেশি সমাদৃত এবং পরিচিত। তার সাহিত্যিক পদচারণায় এই নামটি তিনি ছদ্মনাম হিসেবেও ব্যবহার করেন। ঘুরে বেড়ানো, লেখালেখি এবং রহস্য উদঘাটন তার শখ।
দাদুর এই নামেরও একটা ছোট্ট গল্প আছে। দাদুর বয়স যখন ৪২ পেরিয়ে ৪৩ এ ছুঁই ছুঁই; তখন এক জঙ্গল অভিযানে দাদু আবিষ্কার করে, এক আশ্চর্য নীল পাথর। পাথরের আকার খুবই ছোট। এখন দুই টাকায় যে লজেন্স পাওয়া যায়, খানিকটা তার মতোই আঁকার। পাথরটা দেখে দাদুর সন্দেহ হয় এটা অনেক দামি কোনো ধাতু বা হীরে কী না। সেই সন্দেহ থেকে পাথরটি নিয়ে দাদু চলে যায় জাদুঘরে। জাদুঘর থেকে জানানো হয়— গবেষণা করে জানাতে হবে এই পাথরের ব্যাপারে, তাৎক্ষণিক কিছু বলা সম্ভব নয়। বেশ কয়েকদিন গবেষণা শেষে জাদুঘর থেকে জানানো হয় এক আশ্চর্য ঘটনা।
জানানো হয়— “পাথরটির বয়স প্রায় পাঁচশত বছর। ধারণা করা হয় মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবরের শাসনামলের শেষ দিকে কিংবা তার ছেলে সম্রাট হুমায়ুনের শাসনামলের প্রথম দিককার পাথর এটি। তখনকার সময়ে এই পাথর দিয়ে আংটি বানানো হতো, যা ছিলো তৎকালীন সবচেয়ে মূল্যবান ধাতুর একটি।”
প্রায় পাঁচশত বছর অতিবাহিত হলেও পাথরটি থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা নীল আলোই বলে দেয়, তার মূল্য কতখানি।
কিছুদিন পর বাংলাদেশ সরকার দাদুকে তার নির্লোভতা এবং এই আবিষ্কারের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয় ও তার উপাধি দেয়— ইন্দ্রনীল। সেই থেকে দাদু তার নিজের নামের চেয়ে ইন্দ্রনীল বাবু নামেই বেশি পরিচিত।
হাসান ভাই একজন উদ্যোক্তা ও তরুণ লেখক। পুরো নাম হাসান ইমতিয়াজ। তার একটি ই-কমার্স প্লাটফর্ম আছে যেখানে সে বিভিন্ন দ্রব্য বিক্রি করে। ব্যক্তিগত জীবনে সে বিবাহিত। হাসান ভাইয়ের সাথে আমাদের কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, যা আছে তা হলো আত্মার সম্পর্ক। সে আমার দাদুর ভীষণ ভক্ত। দাদুর থেকে লেখালেখি সহ অনেক বিষয়ে শিখার সুবাদেই মূলত তার আমাদের সাথে সম্পর্ক। হাসান ভাই দাদুকে নীল বাবু বলে ডাকে। ইন্দ্রনীল বাবু নামটা নাকি তার কাছে অনেক গম্ভীর মনে হয়।
আমাদের বাসায় আরও দুইজন থাকে। তাহের চাচা আর শফিক ভাই। বাসার যাবতীয় সব কাজ একাই করে তাহের চাচা। এই যেমন— রান্না করা, ঘর মোছা, বাজার করা। তবে তাহের চাচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ দাদুর ‘জ্ঞান ও গবেষণা’ কক্ষ পরিষ্কার রাখা।
শফিক ভাই আমাদের ড্রাইভার। ড্রাইভার হলেও সে তাহের চাচার সাথে মোটামুটি সব কাজেই হাত লাগায়।
আর বাকি থাকি আমি। আমার পুরো নাম সায়েম কবির চৌধুরী। সবাই সায়েম বলেই ডাকে। আমার ব্যাপারে যত কম বলা যায় ততই ভালো। আমি মোটামুটি একটু চঞ্চল প্রকৃতির, যা দেখি সব কিছুতেই আমার আগ্রহ। আর যদি কোনো আশ্চর্য বা অতিপ্রাকৃত কিছুর সন্ধান পাই তবে তো কথাই নেই, একদম সব ছেড়ে-ছুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বর্তমানে ভর্তি পরীক্ষার কঠিন সময় পার করছি আমি। এখনো এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পায়নি। আশা করছি ফলাফল আর যাই হোক, ফেল করে নিজের নাক কাঁটাবো না অন্তত। আমার ইচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ব, সেই মতোই প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমার এই ইচ্ছের পেছনে দাদুর অবদান সবচেয়ে বেশি। সে সাহিত্যিক মানুষ। তাকে দেখে-দেখে আর তার সাথে থেকে আমারও ওই সাহিত্যকেন্দ্রীক দিকেই যাওয়ার ইচ্ছেটা বেশ পুরনো।
বাসায় আর কেউ থাকে না। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আমার বাবা-মা কোথায়? তারা ২০০৮ সালে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। মুখোমুখি বাসের সংঘর্ষে প্রায় সাথে সাথেই মারা যায় আব্বু; আর হাসপাতালে নেওয়ার পথে আম্মু। জানি না আমি কীভাবে বেঁচে রইলাম। তাদের সাথে আমিও ছিলাম ওইদিন। কিন্তু একটা ফুলের টোকা অবধি লাগেনি আমার শরীরে। আল্লাহ সেদিন আমার প্রতি অশেষ মেহেরবানি করেছিল। যাক সেদিকে আর না যাই, দুঃখের পাল্লায় আরও ওজন বাড়িয়ে তেমন একটা লাভ নেই।
সবার পরিচয়ের পাশাপাশি আমাদের প্রিয় ‘নিরিবিলি জ্ঞানকুঞ্জ’— এর সঙ্গেও পরিচিত হওয়া যাক। এটি শুধু আমাদের বসবাসের একটি বাড়ি নয়; বরং আমাদের ভালোবাসা, স্বপ্ন, জ্ঞানচর্চা ও পারিবারিক আবেগের এক সুন্দর আবাসস্থল। দুইতলা বিশিষ্ট এই ডুপ্লেক্স বাড়িটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলী, প্রশস্ততা ও নান্দনিকতার অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। চারপাশের সবুজ গাছপালা, ফুলের বাগান ও খোলা পরিবেশ বাড়িটিকে দিয়েছে এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও নিরিবিলি আবহ।
বাড়ির মূল প্রবেশপথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই সামনে প্রশস্ত ডাইনিং স্পেস। ডাইনিংয়ের এক পাশে রয়েছে একটি সুবিশাল রাজকীয় টেবিল। ডাইনিংয়ের ডান পাশে রয়েছে সুন্দর ও পরিপাটি ড্রয়িং রুম। অতিথিদের স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে পারিবারিক আড্ডা— সবকিছুর জন্যই এটি একটি আরামদায়ক স্থান। ড্রয়িং রুমের পেছনের দিকে লাগোয়া রয়েছে একটি সুসজ্জিত কিচেন রুম, যেখানে প্রয়োজনীয় সবকিছু সুন্দরভাবে সাজানো। ডাইনিং স্পেসের পাশেই রয়েছে উপরের তলায় যাওয়ার সিঁড়ি। সিঁড়ির আশপাশে রয়েছে দুটি থাকার কক্ষ। এর মধ্যে একটি কক্ষের সঙ্গে রয়েছে সংযুক্ত ওয়াশরুম, আর অন্য কক্ষটির জন্য রয়েছে একটি কমন ওয়াশরুম।