আঁধারের তারাবাজি

পর্ব - ১৯

🟢

"মৌচাকের মধুমন রাজ্যে আপনাকে স্বাগতম"

আলতো হাসলো নভ।তবে শব্দের উৎস খোজার জন্য রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই ডানে চোখে পড়লো খাচায় বন্ধি তোতা পাখিটিকে,,,,, যেটি বারবার লাফিয়ে লাফিয়ে বলছে..

"মৌচাক এসেছে,,মৌচাক এসেছে।"

হেসে ফেললো নভ,,পেছন থেকে মোয়ান বললো..

"এটা বোনির,,,বোনিই এসব বলা শিখিয়েছে। "..

নভ রুমটার চারদিকে চোখ বুলালো,,,গোলােপি রঙ করা দেওয়াল ভর্তি নানা রকম হাতের কাজে।,,,এক পাশ পুরোটাই ছবি ঝুলানো,,মোমের ছবি সব।,,,

নভ এগিয়ে গেলো ছবিগুলোর দেখে।একটা ছবিতে মোম চোখ ছোট ছোট কে কিটকিটিয়ে হাসছে আর একটা টেডি জড়িয়ে আছে।,,,নভ হাত বোলালো ছবিটায়।

" ছবি জমানো বোনের একটা শখ।তাই এইসব।"

নভ হাত সরালো,,খাটে চোখ যেতেই দেখলো কয়েকটা টেডি পরে আছে,,বিভিন্ন রকমের।,,,,,নভ এগিয়ে গেলো তোতা পাখিটার কাছে,,খাচাটা হালকা নাড়িয়ে দিলো।সাথে সাথেই পাখিটা ডানা ঝাপটে বলে উঠলো..

"মোমবাতি,,,মোমবাতি,,"

নভ মৃদু হাসলো।,,,মোয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো..

"আমি এটা মোমের কাছে নিয়ে যেতে চাই।"

মোয়ান মাথা ঝাকিয়ে বললো..

"হ্যা,,নিন না,,,বোনি খুব খুশি হবে এটা পেলে।"

আরো কিছুক্ষণ মোমের রুমটা পর্যবেক্ষণ করে নভ মোমের পাখিটা আর মোয়ানের থেকে মোমের সকল রিপোর্ট নিয়ে এহসান বাড়ি ছাড়লো।,,,আতিয়া অনেকবার কিছু খাওয়ার জন্য বললো,,,তবে নভ খেলো না,,,শুধু এটুকুই বললো..

"যেখানে আমার মোমকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়,সেখানে খাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।,, "

বলেই বেরোতে নিলে,,পেছন থেকে আতিয়া ডেকে বললো..

"আমার মেয়েটা কে আমি একটু দেখবো।,,"

নভ উত্তর দিলো...

"সময় হলে অবশ্যই দেখতে পারবেন।"

আর কিছু বললো না নভ।বেরিয়ে গেলো এহসান বাড়ি থেকে।,,।

()()()()

পরদিন তিশুর রিসেপশন থেকেই নভ চলে আসে শাহবাগের মেডিকেয়ার হসপিটালে।মোয়ানও আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো নভের জন্য।,,আসতেই রাজকীয় স্টাইলে ভেতরে ঢুকলো নভ,,পেছন পেছন মোয়ানও।,,,,হসপিটালের কনফারেন্স রুমে উপস্থিত রয়েছে বাংলাদের নাম করা ১৮ জন নিউরোলজিস্ট।,,,,,অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে উপস্থিত হলো নভ।সবাই বিনয়ী হলো।,,

প্রায় দেড় ঘন্টার মিটিং এর পর জানানো হলো যে,এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে এরকম সিরিয়াস ব্রেইন ক্যান্সারের অপারেশন শুরু হয়নি।,,,

নভ আর মোয়ান হতাশ হলো,তবে হাল ছাড়লো না।,,সবাইকেই জানিয়ে দেওয়া হলো,এর সলিউশন খুজে বের করতে।যত টাকা লাগে নভ দেবে।,,,,

+)(+)(+

ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতেই নভের চোখে পড়লো বাড়িটা কেমন শান্ত।রান্নাঘরে রুবি টুকটাক কাজ করছে।সাথে আখিও আছে।সোফায় পলি বসে ফোনে ইম্পর্টেন্ট ডিসকাস করছে তার বিজনেস নিয়ে।,,,নভ ধ্যান দিলো না।,,,একটু ক্ষীণ কন্ঠে রুবিকে ডেকে বললো..

"কাকিয়া,,,,বাকিরা কোথায়?,,আমার মোম?"

রুবি আলতো হেসে বললো..

"এতো উতলা হওয়ার প্রয়োজন নেই।,,,ছাদে আছে বাকিদের সাথে।"

নভ কিছু বললো না,,,,,সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাবে তখনই পেছন থেকে পলি ডাকলো...

"দাড়া নভ।,"

নভ পেছন ফিরলো,,,

"ঐ মেয়েটা আর কতদিন থাকবে এই বাড়িতে?,,তিশুর বিয়ে তো শেষ,,"

নভ নিচের দিকে তাকালো,,,এরপর মুখ তুলে সরাসরি বললো...

"পরশুই ফিরবে।"

পলি যেন খুশি হয়ে গেলো,,,তবে তা বেশিক্ষন টিকলো না,,,যখনই নভ রুবিকে ডেকে বললো..

"কাকিয়া,,,,রমেশকে বলো আমার শার্ট গুলো কেচে দিতে।,,,পরশু ফিরে যাবো।"

রুবি ভ্রু কুচকে এগিয়ে এলো...

"সেকি নভ বাবা,,,চলে যাবো মানে?,,বাড়িতে কি তোর একটুও মন বসে না?,,,আধ ঘন্টার পথই তো বাড়ি থেকে অফিসটা।,,,"

"এখান থেকে ২ ঘন্টা লাগে কাকিয়া"

"আমরা তো কালই বাগানবাড়ি থেকে ঐ বাড়িতে চলে যাবো।,,,সেখান থেকেই যাওয়া আসা করবি।"

নভ তাকালো পলির পাংশুটে মুখের দিকে..

"এ বাড়ির কিছু মানুষের প্রবলেম হয় আমি থাকলে।"

পলি বুঝলো নভের ইঙ্গিত করা কথাটা,,,,তেমনিই তেতে উঠে বললো..

"আমি কখন বললাম তুই থাকলে আমার সমস্যা হয়?,,,তোর বাড়ি,,তুই থাকবি না তো কে থাকবে?,,,আমি ঐ মেয়েটাকে যাওয়ার কথা বলছি।"

"ওর একটা নাম আছে,,,না ডাকতে পারলো ওকে নিয়ে কথাও বলো না।,৷ আর আমার গেস্ট আমার বাড়িতে যতদিন ইচ্ছে থাকবে।তাতে তোমার কি প্রবলেম?,,তোমার ঐ বোনের ছেলে মেয়ে দুটো যে বছরের পর বছর এই বাড়িতে থাকতো,,? তখন কেন তাদের যাওয়ার কথা উঠতো না?,,"

"ওরা আমাদের রিলেটিভ নভ,,,,ওরা থাকতেই পারে,,,,কিন্তু ঐ মেয়েটা..."

"উহু,,,, সামলে,,,বলেছিনা ওর নাম নেবে না তুমি,,,,,,,আমি যতদিন থাকবো,,ওও ততদিনই থাকবে,আমার সাথে আমার বাড়িতে।"

একটু থামলো নভ।বড় বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে রুবির দিকে তাকিয়ে বললো...

"ভেবেছিলাম মোমকে নিয়ে আবার রিসোর্টে চলে যাবো কাকিয়া,,,আমি এমনিতেই ওকে আনতে চাইনি।,,যাস্ট তিশুর বিয়েতে আমাকে থাকতেই হবে এই জন্য,,,ওকে একা রাখতে আমি পারিনা।,,,না হলে এই নোংরা মেন্টালিটির মানুষদের মাঝে ওকে আনতামই না।,,"

পলি চেচিয়ে বলে উঠলো..

"নভ,,,,,তুই তোর মা কে নোংরা বলছিস?"

নভ শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো পলির দিকে।বা হাতের তর্জনী নাড়িয়ে দাতে দাত চেপে বললো...

"ইউ আর নট মাই মম,, নেভার এভার।"

তারপর সাথে সাথেই রুবির দিকে তাকিয়ে বললো...

"কাকিয়া,,,এবার থেকে আমি বাড়িতেই থাকবো।৷,, সাথে আমার মোমও থাকবে।,,,তুমি ঐ বাড়িতে ওর জন্য একা রুম ক্লিন করে রেখো।"

আর দাড়ালো না নভ ধুপধাপ পায়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো।,, আর এদিকে রাগে ফুসতে ফুসতে পলি ভাবলো...

"এই মেয়েকে তাড়াতেই হবে এবার।"

()()()

কেটে গেলো আরো পাঁচ দিন।,,,,বাগান বাড়ি ছেড়ে সবাই শহরের বাড়িটায় এসেছে।মোমের বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে।তবে ঐ বাগানবাড়িটাই বেস্ট ছিলো।,,,

এই কয়দিনে মোমের সাথে পলির অনেকবারই তর্ক লেগেছে।কখনো বা নভ এসো পলিকে থামালো, আবার কখনো বা মোম নীরবে সব শুনে গেলো,,,, তবে এসব কিছুকে পাত্তা না দিয়ে মোম বেশ আছে ইশু,নোভাদের সাথে।,,,,

সন্ধ্যা বেলায় অফিস থেকে ফিরতেই নভের চোখ গেলো কিচেনের দিকে।,,সাথে সাথেই বিগড়ে গেলো নভের মেজাজ।,,,পকেটে হাত গুজে এগিয়ে গেলো কিচেনে৷,

"কি হচ্ছে এসব?"

সাথে সাথেই তার দিকে তাকালো আখি রুবি আর মোম।ডায়নিং এর পাশে থাকা পলিও তাকালো সেদিকে।,,,

"তুমি কিচেনে কেন এসেছো?''

সরাসরি প্রশ্ন মোমের দিকে তাকিয়ে। মোম অপ্রস্তুত হলো,,,রুবির দিকে একবার তাকিয়ে আবার নভের দিকে তাকালো,,,

" এ্ এমনি,,, ভাো লাগছিলো না,,,তাই কাকিয়ার সাথে একটু কথা বলতে এলাম।"

নভ চোখ ঘুরিয়ে মোমকে পরখ করে নিলো..

"হাতে খুন্তি নিয়ে চুলার সামনে দাড়িয়ে কথা বলা হচ্ছে? "

মোম চুপ করে রইলো,,,পিটপিট করে দেখতে লাগলো নভের ভাব ভঙ্গি।

নভ তাকালো রুবির দিকে..

'ও কেন আগুনের কাছে এসেছে কাকিয়া?"

রুবি কিছু বলতে যাবে,,তার আগেই মোম তাড়া দিয়ে বললো..

"কাকিয়া কিছু করেনি,,,আ্ আমিই জোর করে চুলোর কাছে এসেছি।".

নভ তাকালো মোমের দিকে...

" তুমি যে এমনিতেই অষ্টরম্ভা, সেটা আমি জানি।"

চোখ পাকিয়ে ঠোট উলটে তাকালো মোম।,,,কোমরে এক হাত গুজে,আরেক হাতের খুন্তিটা নভের দিকে তাক করে বললো...

"কি বললেন আপনি?,,,আমি অষ্টরম্ভা? "

"তো আর কি?,,,একটু পরে যে মাইগ্রেনের ব্যথায় কান্না কাটি করতে হবে তা জানা নেই তোমার?,,,তখন কিন্তু আমি ঠাটিয়ে কানের নিচে দেবো বলে রাখলাম।"

মোম দুষ্টু হেসে বললো...

"সেটা আপনি পারবেন না মি.রোমিও।,,আমি জানি?"

নভ একটু চুপ থেকে মোমের হাত শক্ত করে ধরে খুন্তিটা ছাড়াতে ছাড়াতে বললো...

"বেশি পেকে গেছো তুমি,,,আগের সব ভুলেও গেছো।আজ আবার মনে করাবো তোমায়,,,"

বলতে বলতেই জোর করে মোমকে পাজা কোলে তুলে নিলো,,,রুবি বলে উঠলো..

"নভ বাবা,,ওকে বকিস না,,ভয় পাবে তো মেয়েটা।ছেড়ে দে ওকে।"

নভ শুনলো না,,,,,এগিয়ে গপলো মোমলে নিয়ে।পেছন থেকে পলি বলে উঠলো...

"সামান্য রান্নাইতে করছিলো,,,অগ্নি পরিক্ষা তো আর দিচ্ছিলো না।'

নভ থামলো,,,,মাথাটা ঘুরিয়ে পলির দিকে তাকিয়ে বললো...

" ও এই বাড়িতে রান্নার লোক হয়ে আসেনি"

আর থামলো না,,,,গটগট পায়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো।গিয়ে ঢুকলো মোমের জন্য নির্ধারিত রুমটায়।,,বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সাথে সাথেই মোমে ওরনা টানতে নিলেই মোম বলে উঠলো...

"আল্লাহ,,,আবার রোমিও গিরি শুরু করছে।"

নভ ভ্রু কুচকালো,,,

"আগেও করেছিলাম?"

মোম অপ্রস্তুত হলো,,,ওরনা টেনে ঠিক করে বললো...

"ছাড়ুন তোহ।ভালো লাগছে না আমার"

বলতে বলতেই কম্বল টেনে শুয়ে পড়লো।,,,মোমের এমন কান্ডে নভ হতভাগ।তবুও একটা নিঃশ্বাস ফেলে মোমের দিকে ঝুকে তার মুখের উপর থেকে কম্বলটা সরিয়ে বললো..

"শরীর খারাপ লাগছে?"

"উহুম,,,"

"তাহলে এভাবে শুয়ে পড়লে যে?,"

"এমনিই,,,,আপনি তো ফ্রেশ ও হননি,,,যান, ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিন।"

"আমি এমনিতেই ফ্রেশ মাইন্ডে আছি।"

"শরীর থেকে ঘামের গন্ধ আসছে "

"এখন শীতকাল"

জ্বীভ কাটলো মোম,,মিথ্যা ধরা পরপ গেয়ে কিনা,,আমতাআমতা করে বললো...

"শ্ শীতেও ঘাম হয়,, এখন গিয়ে ফ্রেশ হন যান।"

নভ হাসলো,,,

"শরীর যদি সত্যিই খারাপ না লাগে তাহলে বই নিয়ে বসো একটু,,আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"

বলতে বলতেই বের হলো নভ,,,,আবার ফিরেও এলো,,,এসেই মোমের খাটের পাশে বসে বললো...

"শোনো,,বাড়িতে একটা মেয়ে আর একটা ছেলে এসেছে।,,ওদের সাথে কথা বলতে যেও না যেন।,,,"

"কে এসেছে?"

"আমার খালাতো ভাই,আর বোন।,,,আর আম যতক্ষণ বাড়ি থাকব না,, ততক্ষন একদম ছেলেটার সামনে যাবে না।,,,এমনিতেও এরিয়ে চলবে সবসময় "

বলেই উঠে যেতে নিলে মোম পেছন থেকে প্রশ্ন করলো...

"কেন?"

নভ থামলো,,,ঘাঈ ঘুরিয়ে তাকালো মোমের দিকে,,,মোহময় কন্ঠে বলে উঠলো...

"আমার আকাশের চাঁদ অন্য কেউ পরখ করার অধিকার তার নেই।,,,ঐ চাঁদের আলো শুধু এই অবয়ব রায়ানিশের জন্যই বরাদ্দ।"

আঁধারের তারাবাজি পর্ব ১৯ গল্পের ছবি