এক ফাগুনের গল্প

পর্ব - ২০

🟢

- হঠাৎ এমন করে উল্টে গেলে কেন?

- ঢাকা থেকে যাবার পর এখন পর্যন্ত একবারও কল দিয়ে খবর নিয়েছো? চোখের সামনে থেকে আড়াল হয়ে বড় বাঁচা বেঁচে গেলে তাই না?

- সেরকম কিছু না মোহনা, আসলে আমি একটু ব্যস্ত সময় পার করলাম তাছাড়া আন্টির কাছে কল দিয়ে তো কথা বলেছি।

- মায়ের সঙ্গে কথা বলা যায় আর আমার সাথে কথা বলতে গেলে সময় নেই তাই না? সোজা করে বলে দিলেই পারো যে আমার সাথে কথা বলতে চাও না।

- এমনটা আমি কখনো ভাবিনি, বরং তোমার সাথে নতুন করে কিছু সাজানোর স্বপ্ন দেখি।

- কি বললে?

- না কিছু না।

- আরেকবার বলো না প্লিজ।

- হবে না।

- লক্ষি সোনা চকলেট দিমুনে এত্তগুলা।

- দুটো পাঁচ টাকা?

- ওই?

- কি?

- আমি শুধু একদিন চকলেট বিক্রি করেছি আর সেই কথা মনে রেখে বসে আছো?

- যে চকলেট বিক্রি করার জন্য তোমার সাথে সেই দিন পরিচয়, সেটা ভুলে যেতে বলছো?

- সেদিন যদি অন্য কোন মেয়ে থাকতো? তোমার বসের মেয়ে না হয়ে অন্য কেউ হলে কি করতে?

- যখন ভালো লেগেছিল তখন ঠিকই তাকেও আমি এমন করে কথা বলতাম।

- কি করছো?

- গল্প করছিলাম তার মধ্যে তুমি কল দিলে।

- বাবার কাছে বলে দেবো কিন্তু যে তুমি কাজ করো না বরং গল্প করো।

- হাহাহা, অফিসে প্রথম দিন তাই পরিচিত হচ্ছি।

- খেয়েছো?

- হ্যাঁ তুমি?

- আমিও।

- রাখলাম তাহলে? রাতে কথা হবে।

- এখন থেকে সবসময় সকাল বিকেল রাতে কল দিয়ে কথা বলতে হবে রাজি তো?

- আচ্ছা চেষ্টা করবো।

- গুড বয়।

★★

সপ্তাহ খানিক অফিস করেই বুঝতে পারছি যে শিমু মেয়েটির অবস্থা খারাপ। তার মাধ্যমে আমি যেকোন সময় বিপদের সম্মুখীন হতে পারি যেটা আমাকে শুধু মোহনার জীবন থেকে নয় বরং অফিস থেকে বের করে দিতে পারে। মোহনার বাবার উপর আমি সত্যি সত্যি অবাক হলাম কারণ তিনি আমাকে বিপদে ফেলার জন্য অনেক কিছু করছেন। বিজন কুমারের কথা শুনে ভেবেছিলাম স্যার হয়তো মোহনার কাছ থেকে আলাদা করতে চায়। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারছি যে তিনি সম্পুর্ণ আমাকেই নির্মূল করতে চায়। তবে আগে থেকে ভালো ব্যবহার করার জন্য মনে হয় সরাসরি কিছু বলতে পারে না। তাই কৌশলে প্ল্যান করে আমাকে একটা অপবাদ বা কাজের বিষয় এক সমস্যার মধ্যে ফেলে বের করবেন। যাতে করে আমি মোহনা এবং তার অফিস থেকে বিদায় হই।

শিমু সমস্যা তৈরী করতে পারতো না যদি আমার কাজ আছে নিজে করতাম। কিন্তু দুজনেই যেহেতু একই কাজ করি সেহেতু কোথাও ভুল হলে সেটা আমাদের দুজনের উপর পরে। দেখা যাচ্ছে সে ইচ্ছে করে একটা বড় ভুল করে ফাইল রেডি করলো আর সেই অপবাদ পরে গেল আমার কাঁধে তখন ব্যাপার টা কীভাবে দাঁড়াবে?

পরিস্থিতি খারাপ বিবেচনা করে আমি বিকল্প কিছু করার চেষ্টা করছি। এমন সমস্যার জন্য আপাতত দুটো কাজ করা জরুরি মনে হচ্ছে।

(১)

যেহেতু চাকরির ক্ষেত্রে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে তাই নতুন চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। চাকরি করতে এসে এবং মোটামুটি যারা বেশ পরিচিত ছিল সবার কাছে এক রাতের মধ্যে সকল ডিটেইলস দিয়ে দিলাম।

(২)

মোহনার সাথে সবকিছু খুলে বলতে হবে যাতে করে পরবর্তীতে কোন ভুলবোঝাবুঝি না হয়। যদি সত্যি সত্যি বিপদে পরি তাহলে সমগ্র মানুষ আমার যদি বিপক্ষে থাকে তাহলে সেদিন মোহনাকে যেন পাশে পাই।

ভাবনা অনুযায়ী রাত দশটার পর কল দিয়ে মোহনার কাছে সবকিছু বললাম। মোহনা আমার কথা ঠিকই বুঝতে পেরেছে এবং এরকম কিছু সে ইঙ্গিত পেয়েছে তাও বললো। স্যার নাকি আমার বিষয় একটু একটু নেগেটিভ কথা বাসায় বলা শুরু করেছে। আমি কাজ তেমন মনোযোগ দিয়ে করছি না আগের মতো। আর নিজের শহরে এসে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করে যাচ্ছি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।

- আমি বললাম, এখন আমি কি করবো?

- তুমি বাবার অফিস থেকে চাকরি ছেড়ে দাও।

- তাহলে তো নতুন করে চাকরি পেতে কষ্ট হবে।

- কিন্তু যদি বাবা কিছু করে ফেলে তাহলে?

- স্যারকে নিয়ে আমার তেমন ভয় নেই তবে শিমু মেয়েটির জন্য খুব ভয় হচ্ছে। না জানি হঠাৎ করে কোন বিপদে ফেলে দিয়ে আমাকে বিয়ের আসনে বসিয়ে দেয়।

- কি বললে?

- না কিছু না।

- তোর সাথে কোন কথা নেই, টুট টুট টুট।

মোহনা রাগ করে কল কেটে দিল, আমি আবার সাথে সাথে কলব্যাক করলাম কিন্তু নাম্বার বন্ধ। মনে হয় রাগের মাত্রা বেশি হয়ে গেছে তাই মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছে। রাতে যতক্ষণ জাগ্রত ছিলাম ততক্ষণে ফোন চালু করে নাই, সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে অনেকবার চেষ্টা করছি কিন্তু বন্ধ।

অফিসে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল করলাম মোবাইল বাসায় রেখে এসেছি, নাস্তা করে টেবিলে রেখেছি তারপর আর আনা হয় নাই। প্রথমে ভেবেছিলাম পকেটমার নিয়ে গেছে কিন্তু অন্য একজনের নাম্বার থেকে কল দিয়ে দেখলা মা (সৎমা) রিসিভ করেছে। তারপর নিশ্চিত হলাম যে মোবাইল বাসায় রেখে এসেছি। দিনটা উসখুস করে কাটতে লাগলো কারণ মোবাইল কাছে থাকলে একটু পর পর কল দিয়ে মোহনার নাম্বারে চেষ্টা করতাম যদি অন করে?

বিকেলে সাড়ে পাঁচটার দিকে বাসায় পৌছলাম, আর রুমের দরজা নক দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু দরজা খুলে যিনি দাঁড়িয়ে আছে তাকে দেখে অবাক হলাম। কারণ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মোহনা, তার পরনে নীল রঙের শাড়ি, দুহাত ভর্তি চুড়ি আরও নানা ধরনের সজ্জিত জিনিস।

আমি কিছু একটা বলতে যাবো তখন পিছন থেকে মা বললোঃ- সজীব এসেছিস তুই? তাড়াতাড়ি আয় ভিতরে, তোর বিচার আছে।

- বললাম, কি হইছে মা?

- আচ্ছা তুই যে তোর অফিসের স্যারের মেয়েকে ভালবেসে বিয়ে করেছিস, সেটা আমাদের জানালে কি খুব ক্ষতি হতো? আমি হয়তো তোর সৎমা কিন্তু তোর বাবার কাছে তো বলতে পারতি?

- কিন্তু মা.....!

- কোন কিন্তু নেই, মেয়েটা খুব মিষ্টি রে একদম মনের মতো পুত্রবধূ পেলাম।

- আমি তোমার সাথে পরে কথা বলবো মা।

- আচ্ছা ঠিক আছে যা তোর রুমে চলে গেছে মনে হয়।

আমি আমার রুমে গিয়ে দেখি মোহনা খাটের উপর মাথা নিচু করে বসে আছে। আমি হাত দিয়ে তার মাথা উচু করে দেখি দুগাল বেয়ে পানি পরছে। কান্না করে চোখমুখ লাল করে ফেলেছে।

- বললাম, কি হইছে মোহনা?

. মোহনা আমার বাড়িতে কীভাবে আসলো আর কি হইছে ঢাকা শহরে? সেটা জানার জন্য পরবর্তী পর্বের অপেক্ষা করুন।

.

বিঃদ্রঃ- কথা দিয়েছিলাম এক ঘন্টার মধ্যে যতটুকু লিখতে পারবো ততটুকু পোস্ট করবো। কিন্তু মাঝে গ্রাম থেকে মা কল দিল তাই তার সাথে ২০ মিনিট কথা বললাম। নাহলে আরেকটু বেশি হতো তবে গল্প লেখার চেয়ে মায়ের সাথে কথা বলে আনন্দ বেশি পেলাম। মায়ের জন্য বাড়িয়ে লিখতে পারিনি বলে কেউ তাকে বকা দিও না। মনে রেখো, সেই মায়ের জন্য কিন্তু আজ আমি সজীবের অস্তিত্ব।

আমার মায়ের জন্য সবাই দোয়া করবেন।

.

এক ফাগুনের গল্প পর্ব ২০ গল্পের ছবি