এক ফাগুনের গল্প

পর্ব - ২৪

🟢

বললাম, তোমার বাবার এক বন্ধুর অফিসে আমি চাকরি করতাম, ইনি কি সেই ব্যক্তি?

- তা তো জানি না তবে মনে হয় তিনিই হবেন কারণ তাদের আলোচনা শুনে সেরকমই মনে হচ্ছে।

- সেই লোকটা কি এখনো আছে তোমাদের বাসায়?

- না তিনি চলে গেছেন।

- আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি একটা কাজ করতে পারবে মারিয়া?

- জ্বি বলেন।

- ওই লোকটা পরেরবার যখন আসবে তখন একটু কষ্ট করে আমাকে কল দিতে পারবে?

- ঠিক আছে স্যার, আচ্ছা স্যার একটা কথা বলবো?

- হ্যাঁ বলো।

- মোহনা কে?

- তোমার বাবার বন্ধুর মেয়ে।

- আপনি তাকে ভালবাসেন?

- এমন প্রশ্ন করা কি ঠিক হচ্ছে?

- আপনার তো আরেকটা গার্লফ্রেন্ড ছিল তাই একটু কৌতূহল হচ্ছে স্যার। বিরক্ত হলে সরি স্যার, মাফ করবেন প্লিজ।

- সময় করে তোমাকে সবকিছু বলবো, তুমি ঠিকমত পড়াশোনা করিও।

- ঠিক আছে স্যার, আসসালামু আলাইকুম।

★★

রাত দশটার মতো বাজে, মোহনার সাথে এখনই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। মোহনার বাবার সাথে কথা কাটাকাটি না করে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে সবকিছু করতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন এই বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়া, কারণ মা যদি মোহনার বাবার সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষতি করতে চায় তাহলে তো সব শেষ। মোহনার নাম্বারে কল দিয়ে তাকে এই রুমে আসতে বললাম, মোহনা পলকের মধ্যে এসে উপস্থিত।

- কি হইছে? এত জরুরি তলব? রাতে ঘুমানোর আগে মুখ না দেখে শান্তি লাগে না বুঝি?

- সেটা তো আছেই, তোমার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে তাই ডেকেছি।

- কি কথা?

- আগে বসো তারপর বলছি, মা-বাবা কি করে?

- সবাই টিভি দেখে, আমিও তাদের সাথে বসে গল্প করছিলাম আর তুমি ডাক দিলে।

- আচ্ছা যা বলি মনোযোগ দিয়ে শোনো।

- হুম।

- তোমার বাবা আজকেই চট্টগ্রামে এসেছে, আমার মনে হয় তিনি সকালে বিমানে এসেছে কারণ বাসে করে এত তাড়াতাড়ি আসা সম্ভব না।

- হ্যাঁ বাবা তো বেশিরভাগ সময় চট্টগ্রামে বিমানে করে আসে, আগে এমন হয়েছে। কিন্তু এখন কি সে আমাকে নিতে এসেছে?

- হ্যাঁ, আর তার সাথে সাথে আমাকে শিক্ষা দেবে।

- মানে?

- তোমার বাবার বন্ধু আছে একজন যার মেয়েকে আমি পড়াতাম, সেই বন্ধুর বাসায় এসেছিল। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা হচ্ছে তাদের সাথে আমার মা হাত মিলেয়েছে।

- কিন্তু কেন? আন্টির তাতে লাভ কি?

- তুমি জানো না মোহনা, আমার সৎমায়ের টাকার প্রতি অনেক লোভ আছে। তোমার বাবার অফিসে চাকরি পাওয়ার আগে আমি যে কত গালাগালি তার কাছে শুনেছি সেটা বোঝাতে পারবো না। সবসময় শুধু বেকারের জন্য তিরস্কার করতো যেগুলো মনটা খারাপ করে দিতো। আর যেই চাকরি পেলাম তার পর থেকে আমি তার কাছে কত ভালো। আমার মনে হয় তোমার বাবা তাকে টাকার লোভ দেখিয়ে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবেন।

- এখন কি হবে? আমরা তাহলে কি শত্রুর মাঝে বাস করবো নাকি?

- সেজন্য তোমাকে ডাকলাম, আমাদের যা করার সবকিছু একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমার মনে হয় আগামীকালই আমাদের এই বাড়ি ত্যাগ করতে হবে নাহলে বিপদ ঘিরে আসছে।

- তাহলে আগামীকাল সকাল হবার অপেক্ষা না করে আজকে রাতের মধ্যে বেড়িয়ে পরি চলো। যদি কাল সকাল বেলা অন্য কোন বিপদ চলে আসে? একটা রাত কিন্তু অনেক সময় সজীব।

- আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু বাসা থেকে বের হয়ে তো রাস্তায় থাকা যায় না। তুমি বরং রাতে না ঘুমিয়ে জেগে থেকো, আমি ডাকলেই যেন পাই। আর তুমি তোমার যা কিছু নিয়ে আসছো সবকিছু গুছিয়ে তৈরী থেকো। আমি আমার কিছু বন্ধুর সাথে কথা বলে একটা ব্যবস্থা করে তারপর বের হবো।

- আচ্ছা ঠিক আছে।

★★

মোহনাকে নিজের রুমে রেখে আমি আমার ভাইয়ের রুমে আসলাম, সে ঘুমিয়ে পরেছে। বেলকনিতে গিয়ে যেই বন্ধুর ফ্লেক্সিলডের দোকানে বেশিরভাগ সময় বসতাম তাকে কল দিয়ে সবকিছু বললাম।

- সে বললো, তুই কোন চিন্তা করিস না কেউ কিছু করতে পারবে না।

- না রে দোস্ত এখন তাদের সাথে জোরজবরদস্তি করা যাবে না। গতকাল রাতে রাগের মাথায় অনেক কিছু বলেছি কিন্তু আসল কাজ মাথা ঠান্ডা করেই করতে হবে। তুই আপাতত আমাদের জন্য রাতের ব্যবস্থা কর, আর আমরা বাসা থেকে বের হয়ে যেন গাড়িতে উঠতে পারি। তাই তুই একটা সিএনজি নিয়ে বাসার সামনের গলিতে অপেক্ষা করবি।

- আচ্ছা ঠিক আছে, আর কিছু করতে হবে?

- যেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হবে সেখানে যেন তুই ছাড়া আর কোন পরিচিত মানুষ না জানে।

- আচ্ছা চেষ্টা করবো।

- আপাতত যা বললাম সেগুলো পালন করলেই হবে মনে হয়, বাকিটা পরে দেখা যাবে।

- কোন চিন্তা করিস না, কাজ হয়ে যাবে।

এগারোটার দিকে মোহনা আমার রুম থেকে কল দিয়ে বললো সে নাকি ওখানে আমার যা যা কাপড় ছিল সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছে। অনেকটা সহজ হয়ে গেল, এখন শুধু অপেক্ষা করছি যেন ভালো করে বের হতে পারি।

রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে তারপর আমি মোহানকে নিয়ে বের হলাম। মোটামুটি যা যা দরকার সবকিছু নিয়ে নিলাম, আমার নিজের যা কিছু ছিল সবই আমার রুমে ছিল। তাই সেগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সবগুলো নিয়ে নিতে সমস্যা হলো না।

বাসার সামনে বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে, আমরা তাই দ্রুত সিএনজির মধ্যে উঠে বসলাম। তারপর সিএনজি চলতে লাগলো, মনে হয় তার কাছে কোথায় যেতে হবে তা আগেই বলা হয়েছে।

আমরা অলংকার মোড় পেরিয়ে সামনে গিয়ে সিটি গেইট এর আগে ডান দিকে ঢুকলাম। এদিকটা হচ্ছে আকবর শাহ থানার অন্তর্ভুক্ত, কিছুটা ভিতরে গিয়ে একটা ছোট্ট গলির মধ্যে সিএনজি দাঁড়াল। আমরা নামার পরে সিএনজি দাঁড়িয়ে রইলো আর আমরা তিনজন হাতের ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। গলির মধ্যে অন্ধকারে তেমন দেখা যাচ্ছে না তাই মোবাইল বের করলাম টর্চ জ্বালানোর জন্য।

মোবাইল বের করে দেখি অর্পিতার নাম্বার থেকে ৬৭ টা Missed Call এসে জমা হয়েছে। অবাক হলাম অনেকটা, মনের মধ্যে কেঁপে উঠল তাই টর্চ জ্বালানো বাদ দিয়ে আমি কলব্যাক করলাম।

- অর্পিতা রিসিভ করে বললো, এতবার কল দিলাম রিসিভ করলে কেন? ঘুমাচ্ছ?

- মোবাইল সাইলেন্ট করা ছিল তাই টের পাইনি কিন্তু এতবার কল কেন? সবকিছু ঠিক আছে তো?

- তুমি আমাকে অনেক অভিশাপ দিচ্ছ তাই না সজীব?

- কোই না তো।

- তাহলে আমার হাতে বিয়ের মেহেদীর রঙ মুছে যাবার আগেই কপালের সিঁদুর মুছে গেল কেন?

- মানে কি? কি হইছে?

- অর্পিতা কান্না করতে করতে বললো, বিজন মারা গেছে সজীব। তুমি কোথায় আছো? একটু আসবে?

- কি.....?

এক ফাগুনের গল্প পর্ব ২৪ গল্পের ছবি