এক ফাগুনের গল্প

পর্ব - ২৫

🟢

অর্পিতার কথা মোহনার সাথে আলোচনা করতে তো সাহস পাচ্ছি না, অর্পিতা ফিরে এসেছে এ কথা যদি জানে তাহলে কষ্ট পাবে। এই মুহূর্তে অচেনা স্থানের মধ্যে মোহনাকে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। পরিস্থিতি এমন হবে কোনদিন ভাবতে পারিনি, আমার সাথে কেন বারবার এমন হবে?

- কিছুক্ষণ পরে আমি অর্পিতার কাছে কল দিলাম আর বললাম, আমি তো চট্টগ্রাম থেকে অনেকটা দুরে আছি। হাসপাতালে পৌঁছাতে প্রায় তিন ঘন্টার বেশি লাগবে, তোমরা কতক্ষণ থাকবে?

- অর্পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললো, সে মারা গেছে অনেক সময় হয়ে গেছে। তার পরিবার সবকিছু ঠিক করে নিয়েছে আমরা মনে হয় একটু পরেই বের হবো।

- তাহলে কি দেখা হবে না?

- তুমি কি একটু চেষ্টা করে তাড়াতাড়ি আসতে পারো না সজীব?

- সম্ভব হলে তো অবশ্যই যেতাম, কিন্তু সময় যেটা লাগার সেটা তো লাগবেই।

- আচ্ছা ঠিক আছে আসতে হবে না, টুট টুট টুট।

কল কেটে দিয়ে মোবাইল বন্ধ করে দিল, বারবার কল দিয়ে ব্যর্থ হলাম। মিথ্যা বলে সকাল পর্যন্ত সময় নিলাম কারণ মোহনাকে অপরিচিত এখানে একলা রাখা ঠিক নয়। তাছাড়া আমি সেখানে গিয়ে কি বা করতে পারি...?

আমরা দুজন একই রুমে ঘুমাবো কারণ আমার বন্ধু এই বাসায় নিয়ে আসার সময় তাদের বলেছে আমরা স্বামী স্ত্রী দুজন। কিন্তু অর্পিতা আর বিজনের জন্য মনটা খারাপ লাগছে, জীবন কখন কীভাবে ফুরিয়ে যায় বোঝা বড় কঠিন।

আমার বন্ধু আমাদের পৌঁছে দিয়ে সিএনজি নিয়ে চলে গেছে আর আমরা দরজা বন্ধ করে দুজনেই বিছানায় বসে আছি। মোহনাকে বেশি চিন্তিত মনে হচ্ছে না সে হয়তো আনন্দিত কিন্তু আমার মনের মধ্যে কি চলে?

- মোহনা বললো, কি ভাবছো? যা হবার পরে দেখা যাবে এভাবে মন খারাপ করে থেকো না।

- তুমি ঘুমিয়ে পরো মোহনা, আমার ঘুম পেলে আমি নিচে শুয়ে পরবো।

- কেন? দুজন একসাথে ঘুমালে সমস্যা কি? আজ নাহয় দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে থাকলাম। এমন একটা বিপদের রাতে কাছাকাছি থেকেও আলাদা কেন রবো?

- মানে...?

- মানে হচ্ছে বিয়ের আগেই বাসর।

- আমার মনটা সত্যি সত্যি খারাপ প্লিজ তুমি ঘুমিয়ে পরো মোহনা।

- তুমি মন খারাপ নিয়ে অন্ধকারে হাহুতাশ করবে আর আমি ঘুমাবো? আমাকে তোমার এতটা স্বার্থপর মনে হয় গো?

- তা বলছি না আমি, কিন্তু রাত প্রায় শেষ হয়ে গেছে তাই ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে তো তাই না?

- তাহলে তুমিও আসো, একটা হাত বাড়িয়ে দাও আমি সেই হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমাবো।

- আমরা এখন চট্টগ্রাম থেকে কোথায় যাবো?

- যেতে হবে কেন?

- তোমার বাবার হাত থেকে পালাতে হলে অবশ্যই ঢাকা ও চট্টগ্রাম ত্যাগ করতে হবে। কোন একটা ছোট্ট মফস্বল শহরে গিয়ে দুজন একসাথে থাকবো।

- তাহলে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

- কিন্তু কোন যায়গা যাবো?

- ভালো ভাবে চিন্তা করে তোমার কোন বন্ধু আছে কিনা খুঁজে বের করো।

- আচ্ছা ঠিক আছে বালিশে মাথা দিয়ে তারপর না হয় ভেবে দেখি।

★★

সকাল বেলা ঘুম থেকে আগে উঠলাম আমি, মোহনা আমাকে ধরে ঘুমিয়ে আছে। তার মাথা এলোচুল আমার মুখের ওপর কিছুটা আছে। এক মুহুর্তর জন্য আমি চলমান পৃথিবীর কোলাহল ভুলে যাচ্ছি। এমন করে জীবন কাটানোর স্বপ্ন সবাই দেখে কিন্তু বাস্তব হচ্ছে যে বিয়ের পরে বেশিরভাগ জীবন এমন থাকে না। আমি মোবাইল বের করে অর্পিতার নাম্বার ট্রাই করছি কিন্তু নাম্বার বন্ধ। মনে হয় রাগ করে এমনটা করেছে কিন্তু আমার সঙ্গে এত রাগ কেন?

অফিসের এক স্টাফের কাছে কল দিয়ে জানলাম যে বিজনের লাশ হাসপাতাল থেকে নিয়ে গেছে।

ঘড়িতে সকাল নয়টা বেজে গেছে, গতকাল রাতে ভেবে রেখেছি সকাল বেলা খুলনায় রকির কাছে কল দেবো। রকি সপ্তাহ খানিক আগে খুলনা গেছে, তাই এখনো মনে হয় খুলনাতে আছে।

- হ্যালো রকি?

- হ্যাঁ সজীব বল, কি খবর তোর?

- বেশি ভালো না রে, খুব বিপদের মধ্যে আছি।

- কি হইছে..?

- আমি সবকিছু সংক্ষিপ্ত আকারে বললাম, সবটা শুনে রকি বললোঃ- তাহলে তুই সরাসরি খুলনা চলে আয়। আমি তোর জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেবো চিন্তা করিস না, কিন্তু ভালো কোন চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবো না বন্ধু।

- আপাতত চাকরির ব্যবস্থা দরকার নেই, আগে এক নিরাপদ স্থান দরকার।

- তাহলে আজকেই খুলনা চলে আয়।

- অনেক ধন্যবাদ বন্ধু।

মোবাইল কেটে দিলাম তখন মোহনা চোখ বন্ধ করেই বললোঃ- তোমার বন্ধুকে বলবে আমাদের জন্য যেন একটা সুন্দর বাসর ঘর সাজিয়ে রাখে।

- তাকিয়ে দেখি মোহনা চোখ বন্ধ করে আছে, আমি কিছু না বলে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পরে মোহনা তার এক চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, দেখ দেখ আমার একটা চোখ ঘুমিয়ে আছে আর অন্য চোখের ঘুম ভেঙ্গে গেছে।

- আমি শুধু একটু হাসলাম, আর অমনি মোহনা হাত বাড়িয়ে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে নিল।

বিছানা থেকে উঠে গেলাম, সামান্য কিছু খাবার তো খেতে হবে। দরজা খুলতে গিয়ে দেখি দরজা বাহির থেকে বন্ধ করা হয়েছে। বারবার ধাক্কা দিয়েও আমি দরজা খুলতে পারলাম না, মোহনার চোখ মুখ যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

- মোবাইল বের করে গতকাল রাতে যে বন্ধু এখানে দিয়ে গেছে তাকে কল দিলাম। সে রিসিভ করে তখন বললোঃ- কি খবর সজীব? ঘুম ভাঙলো?

- হ্যাঁ ভেঙেছে কিন্তু দরজা বন্ধ কেন বাহির থেকে?

- ওহ্ জেনে গেছো তাহলে? দরজা খোলার দরকার কি ভাই? সবকিছু তো ভিতরে আছে। ভালো করে গোসল করো, তারপর আবার গোসল করো কোন সমস্যা নেই।

- ফাজলামো বন্ধ করো, তাড়াতাড়ি তাদের দরজা খুলে দিতে বলো আমাদের খুব ক্ষুধা পাচ্ছে।

- একটু সহ্য কর ভাই, দরজা তোমার ওই নায়িকার বাবা নিজের হাতে খুলবে।

- আমার নিশ্বাস বন্ধ হতে চললো, কোনরকমে নিজে সামলে নিয়ে বললাম, মানে কি?

- বন্ধু মানে খুবই সহজ, টাকার লোভ বড় ভয়ংকর রকমের বস্তু। আমি কোন নামকরা ওলি আউলিয়া নই যে টাকার লোভ থাকবে না। বিনা পরিশ্রমে এত গুলো টাকা কেউ হাতছাড়া করে বন্ধু?

এক ফাগুনের গল্প পর্ব ২৫ গল্পের ছবি