বিজন কুমার ঘুমে অচেতন কিংবা অজ্ঞান হয়ে আছে বুঝতে পারছি না, আমি এসেছিলাম তাকে দেখার জন্য কিন্তু এখন মাথার মধ্যে বারবার অর্পিতার কথা এসে যাচ্ছে। উপস্থিত সকলের মধ্যে থেকে একজন আমাকে বললেনঃ-
- বাবা তুমি কি বিজনের পরিচিত? মানে আমরা তো কেউ তোমাকে চিনতে পারছি না তাই জিজ্ঞেস করা, কিছু মনে করো না।
- না না আঙ্কেল কিছু মনে করিনি, অপরিচিত কেউ আসলে তার বিষয় কৌতূহল জাগ্রত হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। আমি আর বিজন একই অফিস চাকরি করি, আমি আজ সকালেই অফিসে গিয়ে জানতে পেরে ছুটে এসেছি।
- লোকটা এবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন, আমি এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পথ জানি না। মাথাটা ঘুরিয়ে পিছনে অর্পিতার দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখি সে মাথা নিচু করে কি যেন ভাবছে।
বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না, মনে মনে ভাবলাম যে ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করে পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যায়। যেহেতু বিজন ঘুমিয়ে আছে তাই কথা বলার সুযোগ নেই, তারচেয়ে বরং ডাক্তারের সাথে আলাপ করে আসি।
আমি উপস্থিত বয়স্কের দিকে তাকিয়ে বললাম যে আমি ডাক্তার এর সাথে কথা বলে আসি আপনারা একটু শান্ত হয়ে বসুন। চিন্তা করবে না শুধু আশীর্বাদ করেন সেটাই একমাত্র ভরসা।
।
।
ডাক্তারের সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝতে পারছি যে অবস্থা বেশি গুরুতর নয়। ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা করতে পারলে সবকিছু ঠিক হবার সম্ভবনা আছে। তবে মারাত্মক এক্সিডেন্ট এর জন্য অনেকদিন ধরে ভুগতে হতে পারে। আমি বললাম, যদি জীবন টা ফিরে পায় তাহলে তো আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই। অসুস্থ থাকুক সেটা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠবে, তাই আপনারা একটু আপনাদের নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবেন।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে পরলাম, কেবিনে যেতে ইচ্ছে করছে না। অর্পিতার বিষয় কৌতূহল টা শেষ করলে ভালো হতো কিন্তু সেই উপায় কোথায়? অর্পিতা যদি আমার সাথে কথা বলতে না চায় তবে তো আরো বেশি কষ্ট পেতে হবে। সে যদি কথা বলতে চাইত তাহলে তো মোবাইলে এতদিন কথা বলতো। কিন্তু যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় সবকিছু শেষ করেছে, নিজেকে আড়াল করার জন্য সকল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। তার সাথে কাকতালীয় ভাবে দেখা হলে সেখানে কথা বলতে চাওয়া বোকামি।
আমি আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আসলাম, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তারপর নামতে লাগলাম। মাঝামাঝি নামার পরে হঠাৎ করে পিছন থেকে ডাক দিল অর্পিতা।
- চলে যাচ্ছ?
- আমি পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি অর্পিতা সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দিয়ে কথা বলতে চাইলাম কিন্তু আওয়াজ বের হতে চায় না তাই মাথা নাড়িয়ে বোঝালাম " হ্যাঁ চলে যাচ্ছি। "
- অর্পিতা এবার সিঁড়ি দিয়ে নেমে আমার দিকে এসে বললোঃ- তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।
- কি কথা?
- এখানে বলবো?
- তাহলে?
- কোন একটা সাইডে গিয়ে বসি?
- ঠিক আছে।
বারান্দায় রোগীর স্বজনরা বসার জন্য কিছু যায়গায় চেয়ার রাখা হয়েছে। আমরা সেখানে দুটো আসন দেখে বসলাম, আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। যদি ওদের পরিবারের কেউ দেখে ফেলে তাহলে হয়তো মনের মধ্যে কৌতূহল জাগ্রত হবে।
- বললাম, যা বলার একটু তাড়াতাড়ি বলো আমাকে অফিসে যেতে হবে।
- আছো কেমন?
- দেখছো যেমন।
- গেছো কি ভুলে?
- পারবো না কোন কালে।
- রাগ কি ভিষণ?
- লাভ কি জীবন?
- আমি ছিলাম নিরুপায়।
- অভিযোগ নেই তায়।
- কষ্ট তোমার অনেক বেশি।
- তবুও কিন্তু মুখে হাসি।
- হাসিটা হয়তো মিথ্যে সৃষ্টি।
- সেদিকেই সবার মূল দৃষ্টি।
- জানতে চাইবে না কেন হারালাম?
- আমি অযোগ্য সেটাই ভেবে নিলাম।
- কিন্তু সেটা সত্যি নয়।
- মানুষের ভাবনাও ভুল হয়।
- তুমিই আমার যোগ্য ছিলে।
- সেজন্যই তো ভুলে গেলে।
- বিশ্বাস করো ভালবাসি আজও।
- ঠকেছি একবার, ঠকবো কি আরও?
- আমাকে কি অনেক ঘৃণা করো?
- পারবো না সেটা জানোতো বড়।
- কিছুদিন আগেই হয়েছে বিয়ে।
- সংশয় নেই সেকথা নিয়ে।
- বিজন আমার বিয়ে করা স্বামী।
- এখানে এসে জানলাম আমি।
- তোমার জীবনটা কষ্টেই গেল।
- জানো তো সবই, কি লাভ হলো?
- দেবে কি আমায় ক্ষমা করে?
- অনেক আগেই দিয়েছি করে।
- দোয়া করিও বিজনের জন্য।
- বলতে হবে না, মন বিষন্ন।
- অনেক কথা বলার ছিল।
- কিন্তু সময় ফুরিয়ে গেল।
- এখনই কি চলে যাবে?
- বসে থেকে কি লাভ হবে?
- আবার কখন আসবে তুমি?
- জানে শুধু অন্তর্যামী।
- ভালো থেকো সবসময়।
- চললাম তাহলে, বিদায়...!
★★
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আর অফিসে যেতে ইচ্ছে করছে না তবুও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাব কি যাব না সেটা ভাবলাম। তারপর অফিসে কল দিয়ে কথা বলে জানালাম যে আমি আজকে অফিসে আর যাবো না। অফিসে কথা বলে রিক্সা নিয়ে আগ্রাবাদ চলে আসলাম তারপর বাসে উঠে বাসার দিকে।
বাসায় যখন আসলাম তখন সবাই মাত্র দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। আমাকে দেখে মনে হয় সামান্য অবাক হয়ে গেল, আমি তেমন কিছু না বলে সবাইকে স্বাভাবিক করার জন্য বললামঃ-
- আমাদের অফিসের একটা ছেলে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে ভর্তি তাই তাকে দেখে সরাসরি বাসায় ফিরে এলাম। তোমরা শুরু করো আমি হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি।
" খাবার টেবিলে বসে জানতে পারলাম যে আজকে মোহনা রান্না করেছে। বেলা এগারোটার দিকে মা নাকি জরুরি কাজে বাহিরে গেছিল তখন মোহনা নিজের হাতে রান্না করেছে। মা বারংবার মোহনার রান্নার প্রশংসা করতে লাগলো, তবে আমি ঢাকাতে থাকার সময়ই খেয়েছি তার হাতের রান্না। বড়লোক বাবার কন্যা হলেও সে রান্না করে খুব ভালো করে।
খাবার খেয়ে রুমের মধ্যে বসে আছি তখন মোহনা হাতে করে চায়ের কাপ নিয়ে প্রবেশ করলো। এমন করে বাড়ির কাজ করছে মনে হয় যেন সে কতদিন ধরে এ বাড়িতে বসবাস করে? উচ্চবিত্ত পরিবার হতে এসে এভাবে মিলিয়ে চলতে পারবে সেটা কল্পনার বাইরে ছিল।
- আমার দিকে কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো, চুমুক দিয়ে দেখো তো চিনি ঠিক আছে কিনা?
- তুমি যখন এনেছো তখন ঠিকই আছে।
- অফিসে কিছু হয়েছে নাকি?
- কোই না তো, ও হ্যাঁ হ্যাঁ একটা ছেলে এক্সিডেন্ট করে হাসপাতালে আছে তার জন্য মনটা খারাপ।
- তোমার সাথে কিছু হয়েছে?
- নাহহ।
- বাবার সাথে কথা হয়েছে আমার।
- কি বলে সে?
- বাবা আমার সাথে এমন কঠিন ভাবে কথা বলে যেগুলো আগে কখনো বলে নাই। মনে হচ্ছে আমার বাবা পাগল হয়ে গেছে নাহলে কেন এমন করে?
- টেনশন নিও না সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
- আমার খুব ভয় করছে সজীব।
- কেন?
- তোমাকে যদি হারিয়ে ফেলি? এতটা কাছে এসেও যদি তোমাকে না পাই তাহলে তো বড্ড কষ্ট হবে।
- তা ঠিক।
- চলো না আমরা তাড়াতাড়ি বিয়ে করি।
- তারপর?
- তারপর দু'জনেই রাঙামাটি খাগড়াছড়ির কোন একটা জঙ্গলে গিয়ে বাস করবো। নাহলে সন্দ্বীপ বা মনপুরার মতো কোন চরের মধ্যে চলে যাবো যেখানে বাবার হাত পৌঁছবে না।
- আচ্ছা ঠিক আছে মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখ সময় হলে যেকোনো সময় চলে যাবো।
- সত্যি বলছো?
- হ্যাঁ।
- বিয়ে করবে কখন?
- খুব শীঘ্রই।
|
সচারাচর বিকেলে কখনো ঘুমাই না, কিন্তু গতকাল রাতে ভালো ঘুম না হবার জন্য ঘুমিয়ে পরলাম। ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন মাগরিবের আজান দিচ্ছে চারিদিকে। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করলাম, তারপর বাসা থেকে বের হতে চাইলাম
- মোহনা বললো, না গেলে হয় না? আন্টি বাসায় নেই আর তুমিও চলে যাবে?
- অবাক হয়ে বললাম, মা বাসায় নেই?
- না।
- কোথায় গেছে?
- বললো যে তার কোন এক বান্ধবীর বাসায় যাবে ফিরতে দেরি হতে পারে, আর আমি যদি পারি তবে যেন রাতের ভাতটা রান্না করি।
আমি আর বাহিরে না গিয়ে সোজা রুমের মধ্যে চলে গেলাম, ল্যাপটপ বের করে অফিসের কিছু কাজ করার চেষ্টা করা যাক। মোহনা অনেক খুশি হয়েছে, সে আমার পাশে বসে মোবাইল নিয়েই আছে।
মা ফিরে এসেছে সাড়ে আটটার দিকে। রাত পৌনে দশটার দিকে হঠাৎ করে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসলো। রিসিভ করে জানতে পারি যে, সে আমার ছাত্রী মারিয়া, যার বাবার সুপারিশে আজ মোহনার বাবার সাথে পরিচয়।
- কেমন আছো মারিয়া?
- জ্বি স্যার ভালো, আপনি কেমন আছেন?
- চলছে আলহামদুলিল্লাহ।
- পড়ানো বন্ধ করার পরে আমাকে ভুলেই গেছেন স্যার, চট্টগ্রামে আসলেন কতদিন হয়ে গেল তবুও একদিন আসলেন না।
- মানসিক সমস্যার মধ্যে যাচ্ছি তাই সঠিক ভাবে কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারি নাই। সরি।
- স্যার একটা কথা বলতে কল দিছি আমি।
- কি কথা?
- আমি একটা বিষয় বুঝতে পারছি না স্যার...!
- কি হইছে? পড়াশোনা নিয়ে সমস্যা? কেন তুমি কি নতুন শিক্ষকের কাছে পড়ো না?
- উহু মাথা মোটা স্যার আপনি, আমি বলতে চাচ্ছি যে, যেদিন আপনার মেসেঞ্জার চেক করেছি সেদিন তো লেখা ছিল সানজিদা। কিন্তু স্যার মোহনা কে? তার সাথে আপনার কিসের সম্পর্ক?
- তুমি মোহনার কথা জানলে কীভাবে?
- আজকে আপনার মা আমাদের বাসায় এসেছিল।
- কখন? আর আমার মা'কে তো তোমার চেনার কথা নয়।
- একবার এসেছেন সকালে এগারোটার পরে, আর দ্বিতীয়বার এসেছেন বিকেলে আসরের পরে। সকাল বেলা যখন এসেছে তখন শুধু বাবা আর আপনার মা কথা বলছিলেন। কিন্তু বিকেলে আরেকজন এসেছে তিনি বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
- আমি অবাক হয়ে গেলাম, মারিয়ার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু তার মানে মোহনার বাবা নাকি? যদি সত্যি সত্যি মোহনার বাবা এসে থাকে তাহলে সেখানে আমার মা গিয়ে কি করবেন? তাহলে কি মোহনার বাবা আমার মাকে হাতে নিয়ে ফেলেছে? নাকি হাতে নেবার চেষ্টা করে যাচ্ছে?