এক ফাগুনের গল্প

পর্ব - ১৭

🟢

নদীর মধ্যে বেশিক্ষণ টিকে থাকার প্রথম পদ্ধতি হচ্ছে পানির সাথে বেশি জোরাজোরি না করা। যদি ভেসে থাকার মতো কিছু পাওয়া যায় তাহলে সেটাই অবলম্বন করতে হবে। নদীর মধ্যে তীর খুঁজে বের করা বেশি অসম্ভব কিছু না কিন্তু শরীরের মধ্যে যদি শক্তি না পাই তাহলে কি করার? সামান্য স্রোতের সাথে ভাসতেছি, কিছু একটা করা দরকার কারণ হঠাৎ করে যদি নদীর মোড় পরিবর্তন হয় তাহলে পানির ঘোরের মধ্যে পরতে হবে। তাছাড়া বেশিক্ষণ টিকতে পারবো বলে মনে হয় না, হঠাৎ করে পায়ের সঙ্গে জালের অস্তিত্ব অনুভব করলাম। যদি সত্যি সত্যি কোন জেলের পাতা জাল হয় তাহলে বাঁচার একটা ক্ষীণ সম্ভবনা আছে। হাত দিয়ে জাল ধরার চেষ্টা করছি, এসব জাল সাধারণত নদীর মধ্যে লঞ্চ চলাচলের পথে ফেলে কেন বুঝতে পারছি না। জাল ধরে ধরে এগিয়ে যাচ্ছি কারণ জাল ভাসিয়ে রাখার জন্য জেলেরা ড্রাম জাতীয় কিছু ব্যবহার করে। যদি সেরকম কিছু পাওয়া যায় তাহলে আলহামদুলিল্লাহ।

কিছুক্ষণ এগিয়ে গিয়ে একটা ২০ লিটারের তেলের ক্যান পেলাম, সেটা দেখে ভালো লাগলো। আমার শরীর ভাসিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট, আমি আমার শরীর থেকে শার্ট খুলে নিলাম। তারা শার্টের হাতা দিয়ে ক্যানের হাতলের মধ্যে ঢুকিয়ে নিজের শরীরে বেঁধে নিলাম। যদি অজ্ঞান হয়ে যাই কিংবা মৃত্যু ঘটে তাহলে অন্তত জালের মালিক আমাকে খুঁজে পাবে।

অনেকটা দুরে একটা চলন্ত নৌকা দেখা যাচ্ছে, সেই নৌকায় হারিকেন কিংবা মশাল জ্বলছে। যদি আমার চিৎকার করার শক্তি থাকতো তবে হয়তো তাদের কানে আওয়াজ পৌঁছাতে পারতাম। বিখ্যাত সিনেমা "টাইটানিক" এর শেষ মুহূর্তের নায়িকার মতো আমি উদ্ধার করার কাউকে দেখতে পেয়েও কিছু বলতে পারছি না। আকাশে পূর্ণ চাঁদ আরো বেশি করে আলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছে। আকাশটা এখন সবচেয়ে সুন্দর মনে হচ্ছে, এরকম তো কখনো মনে হয় নাই। নাকি এভাবে মনোযোগ দিয়ে কখনো আমি উপভোগ করি নাই?

||

||

চোখ বন্ধ অবস্থায় বুঝতে পারছি চোখের সামনে সূর্য আলো ছড়িয়ে আছে। আস্তে আস্তে চোখ মেলে যখন তাকালাম তখন দেখি সত্যি সত্যি একটা জানালা দিয়ে সম্পুর্ণ সূর্য দেখা যাচ্ছে। আমি একটা বিছানার উপর শুয়ে আছি, গায়ের উপর কাঁথা দিয়ে আবৃত। সূর্যের সাইজ আর তীব্রতা দেখে মনে হয় বেলা প্রায় দুপুর হয়ে গেছে, চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। টিন আর বাঁশের চাটাই দিয়ে ঘেরা রুমের মধ্যে আমি এক কোণে পরে আছি। বাম দিকে একটা চেয়ার রাখা এবং তার উপর একটা জগ আরেকটা গ্লাস। জগ-গ্লাস দেখে সাথে সাথে পানির পিপাসা অনুভূত হলো, সম্মুখে আছে, হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেই হয় কিন্তু ইচ্ছে করে না। শরীরের কাপড় কেউ সযত্নে পরিবর্তন করে দিয়েছে, সেই ব্যক্তি পুরুষ নাকি মহিলা সেটাই বুঝতে পারছি না।

আরো ঘন্টা খানিক পরে একটা কাঁচাপাকা দাড়ি সম্মিলিত লোক প্রবেশ করলো। আমি তার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি হাসি হাসি ভাবে আমাকে দেখে যাচ্ছেন।

- আপনার জ্ঞান ফিরেছে তাহলে?

- জ্বি, এটা কোন যায়গা?

- হাতিয়া, নোয়াখালী।

- কিন্তু আমি তো বরিশাল থেকে ফিরছিলাম আর সম্ভবত কীর্তনখোলা নদীতে পরেগেছিলাম। তাহলে এত দুরে কীভাবে আসলাম?

- আমিও বরিশাল থেকে ট্রলার নিয়ে ফিরছিলাম, আপনাকে অন্য একটা জেলে গ্রুপ তাদের জালের ড্রামের সাথে পেয়েছে। আমি যখন রাতে ফিরি তখন তারা সিগনাল দিয়ে দাঁড়াতে বলে। তারপর বিস্তারিত জানার পরে আমি আমার ট্রলারে করে নিয়ে এসেছি আমার বাড়িতে। কিন্তু দুদিন পর আপনার জ্ঞান ফিরেছে, গত দুদিন আপনার প্রচুর জ্বর ছিল।

- আমি পানি খাবো।

- হ্যাঁ অবশ্যই অবশ্যই।

- পানি শেষ করে বললাম, আমার পকেটে মোবাইল ছিল সেটা কি আছে নাকি নদীতে চলে গেছে?

- জ্বি আছে কিন্তু নষ্ট হয়ে গেছে মনে হয় কারণ আমি অনেক চেষ্টা করছি আপনার পরিচিত কারো নাম্বার বের করে যোগাযোগ করার জন্য।

- আপনার কাছে যদি মোবাইল থাকে তাহলে সেই মোবাইলটা একটু দিবেন? আর আমার নষ্ট মোবাইল টা নিয়ে আসুন, সিম পরিবর্তন করে আমি নিজেই যোগাযোগ করবো।

- সেটা তো মাথায় আসে নাই, আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি।

দরজা পর্যন্ত গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, আপনি তো মনে ক্ষুধার্ত তাই আগে কিছু খেয়ে তারপর নাহয় যোগাযোগ করবেন।

- সমস্যা নেই আপনি আমার কাছে এনে দিয়ে নাহয় ব্যবস্থা করবেন। আমি ততক্ষণে ফোনে কথা বলে নেবো, আমার পরিচিত জন খুব টেনশনে থাকবে। যেহেতু দুদিন ধরে আমার কোন খবর তারা জানে না তাই চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক।

- ঠিক আছে যাচ্ছি আমি।

লোকটা ফিরে আসে একটা খারাপ খবর নিয়ে।

আমার মোবাইল নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তার একটা নাতি আছে সেই নাতির হাতে নাকি দেখেছে কিছুক্ষণ আগে। কিন্তু নাতি সেটা কোই রাখলো সেটা আর পাওয়া গেল না, লোকটা লজ্জিত হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি তাকে আস্বস্ত করে বললাম তেমন কোনো সমস্যা নেই।

সন্ধ্যা বেলা সামান্য জ্বর নিয়ে লোকটার ছেলের সঙ্গে বেরিয়ে পরলাম। ঢাকা চলে যেতে হবে, লোকটার কাছ থেকে পথের খরচ নিয়ে বের হলাম। ঢাকা গিয়ে তাদের টাকা পরিশোধ করে দেবো বলে কথা দিলাম তবে আমাকে সেবা করার ঋণ কোনদিন শোধ করতে পারবো না।

বাসে করে ঢাকা আসতে আসতে পরদিন সকাল প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেছে। আর বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন সকাল দশটা বাজে। বাড়ির মধ্যে যখন ঢুকলাম তখন আরও বেশি অবাক হয়ে গেলাম কারণ মুল দরজা খোলা ছিল। ড্রইং রুমে ৫/৬ জন পুলিশ বসে আছে, আমাকে দেখে তারা সবাই যে অবাক হয়ে গেছে সেটা সকলের চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে।

এক ফাগুনের গল্প পর্ব ১৭ গল্পের ছবি