এক ফাগুনের গল্প

পর্ব - ১৪

🟢

একটু পরে বুঝতে পারলাম জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ নাই, বাহিরে ঝড় আরম্ভ হচ্ছে। এমনিতেই খুন হবার জন্য সবকিছু থমথমে বিরাজ করছে তারমধ্যে আবার ঝড়ের আরম্ভ। আমি তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে দিলাম, ফাহিম আমার পাশে চুপচাপ বসে আছে। তার চোখে মুখে কিছু জিজ্ঞেসা করার মতো ভাব ফুটে উঠেছে।

পরদিন সকালে বাড়িতে আবার পুলিশ এলো, সেই অল্পবয়সী পুলিশের নাম তামিম হাসান। সকাল বেলা টেবিলে নাস্তা খেতে খেতে এলাকার বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের আলাপ আলোচনা শুনছিলাম, তামিম হাসান বললোঃ-

- আপনি বাহিরের মেহমান আমাদের এলাকায় এসে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হলেন। আপনার মনে হতে পারে যে সবসময় মনে হয় আমাদের এই এলাকার মধ্যে এমন হয়ে থাকে। সত্যি বলতে এমন ঘটনা কিন্তু অনেক বছর পরে ঘটলো।

- আমি বললাম, আমি তেমন কিছু মনে করিনি তবে আসল খুনি ধরা পড়ুক সেটাই প্রত্যাশা করি। আমার মনে হয় আপনারা একটু সচেতন হলেই বিষয়টা খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারবেন।

- আপনার কাছে কি বিষয়টা খুব স্বাভাবিক ভাবে মনে হচ্ছে? মানে সহজে উদঘাটন হবে?

- জ্বি হবে, কারণ এই রহস্যের সমাধান পাবার পথ অনেক গুলো আছে মনে হয়। সবগুলো পথ যদি সঠিক ব্যবহার করা যায় তাহলে গন্তব্যে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু সঠিক স্থানে যাবার পথ ব্যবহার না করে যদি ভুল রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যান তবে গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব না। বছরের পর বছর শুধু মামলা ঘুরতে থাকবে, আস্তে আস্তে পুরাতন মামলা চাপা পরে যাবে নতুন সকল মামলার মাঝে।

- আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করছি আর তাছাড়া যেহেতু চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে খুন হয়েছে তাই তিনি নিজেই এর শেষ দেখে ছাড়বেন।

- শুনে অনেক খুশি হলাম।

- আপনি শহরের মানুষ, আর আপনাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে আপনি বিচক্ষণ ব্যক্তি। তবে কথা বলে চট করে বোঝা যায় কারণ আপনার সব কথা স্পষ্ট।

- জ্বি ধন্যবাদ।

★★

এগারোটার দিকে মোহনার সাথে কথা হলো, তার ভাবসাব দেখে মনে হয় সে আমাকে নিয়ে খুব চিন্তার মধ্যে আছে। কিন্তু আমার মনের চিন্তা হচ্ছে গতকাল রাতের চিঠি কে দিয়েছে?

- মোহনা বললো, তোমাকে নিয়ে আসাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে গেছে। যদি জানতাম এমন বিপদের মধ্যে পরবে তাহলে কোনদিন তোমাকে আসতে দিতাম না। আর আমি নিজেও এই বরিশালে এসে ঝামেলার মুখ দেখতাম না।

- বিপদ কখনো বলে আসে না মোহনা, এরা হঠাৎ করে এসে মানুষের জীবনে উপস্থিত হয়। বিপদের আরেকটা নাম দিতে পারো, তাদেরকে সারপ্রাইজ হিসেবে বলা যায় কারণ তারা হঠাৎ করে আসে।

- তোমার টেনশন হচ্ছে না?

- মোটেই না।

- কিন্তু কেন?

- আমি গতকাল রাতে একটা চিঠি পেয়েছি আমার রুমে, আর সেটা পড়ে আমি মোটামুটি অনেক কিছু বুঝতে পারছি।

- কিসের চিঠি?

- তুমি পড়বে?

- হ্যাঁ।

- আচ্ছা ঠিক আছে।

মোহনা চিঠি পড়ে কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে, তার মুখ থেকে শব্দ বের হচ্ছে না। আমার দিকে করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, তারপর বললোঃ-

- বাবা তাহলে তোমাকে আমার পথ থেকে সরানোর জন্য এতকিছু করতে চাচ্ছে?

- সেটা তো জানিনা আমি কিন্তু জানার চেষ্টা করবো অবশ্যই কারণ শেষ দেখার অপেক্ষা।

- তোমার কিন্তু এখান থেকে চলে যাওয়া উচিৎ, চল আমি তোমাকে নিয়ে ঢাকা চলে যাই।

- না মোহনা সেটা সম্ভব না, এখানে থেকে সবকিছু ভালো করে সবার সামনে আনতে হবে। সবাই যেন সত্যি ঘটনা নিজের চোখে দেখে আসল অপরাধীকে চিনতে পারে।

- যদি তুমি ফেঁসে যাও? তাহলে আমার কি হবে তা ভেবে দেখো।

- কিছু হবে না, একটা চিঠির লেখা পড়ে পালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

- একটা কথা বলতে চাই।

- বলো।

- রাগ করবে না তো?

- না করবো না।

- আমাকে কি ভালবাসা যায় না?

- কেন যাবে না? অবশ্যই যাবে।

- তাহলে একটু ভালবাসা দাও না, কতবার রাগ করে থেকেছি, কতবার ভুলে যাবার জন্য চোখের সামনে পরিনি। কিন্তু সবকিছুর ফলাফল শূন্য।

- ঢাকা গিয়ে ভেবে দেখি কি করা যায়।

- আমাকে নিয়ে ভাববে তুমি?

- হ্যাঁ।

- তুমি তো চট্টগ্রামে চলে যাবে।

- সমস্যা নেই, ফিরে আসার অজস্র পথ আছে।

- বাড়ি থেকে বের হবে না বেশি, কে কোনভাবে যে তোমাকে খুনের সাথে জড়িয়ে দেবে টেরই পাবে না। মাঝখানে আমার কপাল পুড়বে, নিজের জন্য না হোক কিন্তু আমার জন্য সাবধানে থেকো।

- ঠিক আছে।

★★

চারদিন পরের কথা।

বাড়ির মধ্যে বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে না, পাত্রপক্ষ উপজেলার একটা কমিউনিটি সেন্টারে সামান্য কিছু অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু মোহনা আর আন্টি ঢাকা যাবার জন্য অস্থির হয়ে গেছে এর কারণ হচ্ছে বিয়ে উপলক্ষে আসা কিন্তু সেখানে এসে এমন ঝামেলা কেউ সহ্য করতে পারে না। মোহনার বাবা মানে স্যার আর আসলেন না, যেখানে আমরা আছি ঝামেলার মধ্যে সেখানে তার এসে কাজ কি?

সকাল থেকে আমি প্রচুর টেনশনে আছি, সামিহার সেই পুরনো ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সাথে যোগাযোগ করেছি আরো দুদিন আগে। তার গ্রামে গিয়ে প্রতিবেশী আর বাজারের মধ্যে অনেক কিছু জানলাম। তবে আমি ভেবেছিলাম সবকিছু গোপনে করতে পেরেছি কিন্তু গতকাল রাতে আবার একটা চিঠি পেয়ে বুঝতে পারছি যে আমাকে কেউ অনুসরণ করেছে। আমার সকল চলাফেরা ও অনুসন্ধান সেই চিঠি প্রদানকারী ব্যক্তি চোখে চোখে রেখেছেন।

সামিহার বাবার মোটামুটি অনেক জমিজমা ছিল, তাদের পুরনো ঘরের মধ্যে কিছু ব্যাঙ্কের কাগজপত্র দেখে অবাক হলাম। আমি তেমন বুঝতে পারিনি বলে সেই ব্যাঙ্কে গেলাম, তাদের কাছে মোটামুটি তথ্য পেলাম কিন্তু বুঝতে পারলাম না। সবকিছু বাদ দিয়ে আমি গতকাল রাতে পাওয়া দ্বিতীয় চিঠি নিয়ে বেশি চিন্তা করছি।

চিঠি হলো।

কেমন আছেন মিঃ সজীব?

আগের চিঠিতে সালাম দিলাম কিন্তু এই চিঠিতে সালাম দিলাম না। কারণ সালাম শব্দের অর্থ হচ্ছে শান্তি বর্ষিত হোক, তাই গত চিঠিতে আপনার জন্য শান্তি কামনা ছিল। কিন্তু আজকের চিঠিতে কোন শান্তি কামনা নেই কারণ আপনার কাজকর্ম।

ভেবেছিলাম আপনি প্রথম চিঠি পড়ে যেকোনো উপায়ে অত্র গ্রাম ত্যাগ করবেন। কিন্তু আপনি সেটা না করে উল্টো অনুসন্ধান করে যাচ্ছেন, যেটা কিন্তু মেনে নিতে পারছি না। আপনি শিক্ষিত ব্যক্তি তাই সহজ করে বলছি, আগামীকাল আপনি আপনার সাথে আসা মেহমানসহ এলাকা ত্যাগ করবেন। যদি না করেন তাহলে সামিহার সাথে ঘটিত ঘটনা আবার মোহনার সাথে ঘটবে। তাই আমি চাই দ্বিতীয় কোন অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হবার আগেই আপনি তাদের নিয়ে শহরে ফিরে যান।

ইতি,

মোহনার শুভাকাঙ্ক্ষী।

চিঠির জন্য যতটা চিন্তা ছিল তারচেয়ে বেশি চিন্তা হচ্ছে কারণ একটু আগে জানতে পারলাম আজকে রাতের লঞ্চে নাকি আমরা ঢাকা ফিরছি। আন্টি নিজে চলে যেতে চাচ্ছেন, মোহনা আর ফাহিম দুজন মিলে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছে। মোহনা একটু আগে এসে আমাকে বলে গেল " খুব ভালো হচ্ছে আমরা চলে যাচ্ছি, আগামীকাল সকালে সদরঘাট পৌঁছতে পারলে হাফ ছেড়ে বাঁচি। "

আপনি তার কথার উত্তরে একটু হাসলাম, মনে মনে ভাবলাম " তুমিও এমনটা করতে পারো মোহনা? "

নিরুপায় হয়ে সন্ধ্যার আগেই আমরা সবাই লঞ্চ ঘটের দিকে রওনা দিলাম। রওনা দেবার কিছুক্ষণ আগে পুলিশ তামিম হাসান এসেছিলেন। সামান্য কথাবার্তা বলে আমাদের যাত্রার শুভ কামনা করে তিনি চলে গেলেন।

মালামাল সবকিছু কেবিনে রাখা হয়েছে, আন্টি ফাহিম মোহনা সবাই চেয়ারম্যান আঙ্কেলের কাছে বিদায় নিয়ে কেবিনে চলে গেছে। আমি চেয়ারম্যান আঙ্কেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, লঞ্চ ছাড়ার এখনো বিশ মিনিট বাকি আছে।

- আঙ্কেল বললেন, ভালো ভাবে যেও বাবা আর বাসায় পৌঁছে কল দিও। সবার জন্য আমরা কিন্তু চিন্তা করবো, তাছাড়া ঝড় তুফান কিছু হলে তখন টেনশন আরো বেড়ে যায়।

- বললাম, যে ঝড় তুফান আপনার এলাকায় দেখে গেলাম সেটাই ভুলবো না অনেকদিন। কত সুন্দর নিপুণ কৌশলে প্ল্যান করে আমাকে এলাকা ত্যাগ করানো হচ্ছে। প্রতিবাদ করতে গিয়েও করতে পারি না কারণ সাথে দুজন মহিলা আর একটা বাচ্চা। তবে আমি সকাল বেলা যখন বুঝতে পেরেছি যে আমার এই এলাকায় থাকার মেয়াদ শেষ। তখন সেই সকাল থেকেই আমি আমার অসমাপ্ত কাজগুলো অন্য কাউকে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি।

- মানে কি বাবা?

- আঙ্কেল আমি খুনিকে চিনতে পেরেছি, কে খুনটা করেছে সেটা জানি আমি। আর আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে সেই খুনিও জেনে গেছে আমি তাকে চিনতে পেরেছি। কিন্তু প্রমাণ করতে আরো দুদিন সময় দরকার ছিল তাই সেই সুযোগ খুনি আমাকে দিতে চাচ্ছে না।

- কে খুন করেছে?

এক ফাগুনের গল্প পর্ব ১৪ গল্পের ছবি