- বললাম, আপনি যেমনটা ভালো মনে করবেন সেটাই করেন তবে আমার বিশ্বাস আপনি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিবেন না। শিক্ষক ও বাবার পরে আমি যেই পুরুষ মানুষটাকে বেশি পছন্দ করি সেটা আপনি।
- আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা তোমার কাছে ঠিক কতটা সঠিক সেটা বুঝতে পারছি না। তবে আমার দিক থেকে আমি যথেষ্ট ভেবে তারপর সবকিছু ঠিক করেছি।
- জ্বি বলেন স্যার।
- তোমাকে এই অফিসে আর চাকরি করতে হবে না, আর আমার বাসা থেকেও তোমাকে চলে যেতে হবে। কিন্তু ভেবোনা আমি খুব কঠোর ভাবে কাজটা করে যাচ্ছি, আমি খুব শান্ত হয়ে করছি।
- ওহ্হ আচ্ছা।
- হ্যাঁ, চলতি মাসের শেষে তুমি এই অফিস থেকে চলে যাবে আর আমার বাসা থেকেও।
- ঠিক আছে।
- আমার কথা এখনো শেষ হয়নি।
- বলেন।
- চট্টগ্রামে আমাদের এই অফিসের জন্য নতুন একটা শাখা চালু করা হয়েছে, নিশ্চয়ই জানো?
- হ্যাঁ স্যার।
- তুমি সেখানে গিয়ে জয়েন করবে, আমার অফিসে চাকরি করবে ঠিকই কিন্তু ঢাকা শহরে নয়। আমি কি জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ তুমি?
- জ্বি স্যার, মোহনার জন্য।
- বুদ্ধিমান ছেলে, এবার তুমি বিবেচনা করে বলো যে আমি কি কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি?
- না স্যার, একজন দায়িত্ববান বাবা হিসাবে যেটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা চমৎকার। আবার আমার মতো চাকরিজীবীর ভবিষ্যত ভেবে আমাকে বেকার জীবন ধরিয়ে না দিয়ে অন্য ব্যবস্থা করেছেন সেটাও প্রশংসার দাবিদার। সেজন্য কিন্তু প্রথমেই বলেছি যে আপনি বিচক্ষণ ব্যক্তি তাই ভুল সিদ্ধান্ত নিবেন না।
- আমি আমার সাধ্য মতো চেষ্টা করি সবসময় যেন আল্লাহ এবং দুনিয়ার মানুষ আমার উপর খুশি থাকে। কিন্তু সবকিছু ঠিক আছে তবে একটা নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
- কি সমস্যা?
- মোহনার বড় খালার বাড়ি বরিশালে, তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে তাই সেখানে সবাইকে যেতে হবে। মোহনার খালাতো বোন তাই ওরা সবাই যাবে।
- আপনি যাবেন না?
- আমি যাবো বিয়ের দিন কারণ অফিস সামলাতে হবে তো তাই না?
- হ্যাঁ তা ঠিক।
- আমি বললাম, তোমার আন্টি মোহনা আর ফাহিম চলে যাক আর আমি পরে যাবো। কিন্তু সে কথা তো তোমার আন্টি মানতে রাজি হচ্ছে না।
- তাহলে কি করবেন?
- তোমার আন্টি বলছেন তোমাকে ছুটি দিতে।
- কেন?
- সে তোমাকে তাদের সাথে নিয়ে যাবে, তারপর সেখানে গিয়ে বিয়ে শেষ হলে তাদের নিয়ে ফিরবে।
- এটা কেমন কথা?
- খুব ভালো প্রস্তাব ছিল, কিন্তু আমি তো আপাতত এমনটা চাচ্ছি না কারণ আমি চাই মোহনার সাথে তোমার যোগাযোগ দেখা সাক্ষাৎ না হোক। কিন্তু তোমার আন্টি মানতে রাজি হচ্ছে না বলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য মোহনা তোমাকে নিয়ে যেতে রাজি নয় কিন্তু তোমার আন্টি জিদ করে বসে আছে।
- এটা মানার মতো প্রস্তাব না।
- তবুও মানতে হবে সজীব, কিছু করার নেই।
- মানে?
- মানে হচ্ছে তুমি মোনমহনাদের সাথে বরিশালে যাবে তবে আমার ইচ্ছায় না বরং তোমার আন্টির ইচ্ছেতে।
- আমার যেতে ইচ্ছে করছে না আপনি বরং আন্টি কে বলবেন যে আমি যেতে রাজি নই।
- তার দরকার নেই তুমি যাবে তাদের সাথে, তবে মোহনার সংস্পর্শ থেকে দুরে রবে। মাত্র কয়েকটা দিন তাই সেগুলো তোমাকে মোকাবেলা করতে হবে। আমার বিশ্বাস তোমাকে যে ভরসা করছি সেটা তুমি রক্ষা করবে। বরিশাল থেকে ফিরে তুমি চট্টগ্রামে যাবার প্রস্তুতি নেবে।
- কিন্তু স্যার।
- আলোচনা এখানেই সমাপ্তি, আগামীকাল সন্ধ্যা বেলা তোমার বরিশালে যাচ্ছ এটাই ফাইনাল।
- আপনি স্যার মানুষটা বড্ড অদ্ভুত।
- মোহনার জন্য তোমাকে বাড়ি আর অফিস থেকে বের করলাম তাই কিছু মনে করো না। আমার স্থানে হলে তুমিও এমনটা করতে হয়তো, তাছাড়া আমি কিন্তু তোমাকে মোটেই খারাপ ছেলে হিসাবে জানি না সবসময় নিজের সন্তান হিসাবে দেখি।
- সত্যি বলতে স্যার আমিও মোহনার থেকে এড়িয়ে চলতে চাই, আমি অর্পিতাকে ভুলতে পারবো না। তাই তার স্থানে অন্য কাউকে বসানো আমার পক্ষে সম্ভব না সে যত সুন্দরী হোক।
- যাক তাহলে নিশ্চিত হলাম, আশা করি ভালো করে বরিশাল সফর করবে।
- চেষ্টা করবো।
- আরেকটা কথা, আমি চেয়েছিলাম সবাই মিলে একটা গাড়ি নিয়ে চলে যাবে কিন্তু সেখানেও তোমার আন্টি সমস্যা। তিনি গাড়িতে বেশিক্ষণ চড়তে পারে না তাই বাসে কিংবা মাইক্রোবাসে যাওয়া যাবে না। তোমাদের লঞ্চে করে যেতে হবে, তবে সমস্যা নেই বরিশালের সেই ঘাটে মোহনার খালুর লোকজন অপেক্ষা করবে। মোহনার খালু বর্তমানে তাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাই সমস্যা নেই।
- আচ্ছা ঠিক আছে।
★★
পরদিন সন্ধ্যার আগেই আমরা সবকিছু নিয়ে ঢাকার সদরঘাট রওনা দিলাম। স্যারের বক্তব্য অনুযায়ী মোহনা আমাকে নিতে রাজি নয় কিন্তু তার মুখের অবস্থা দেখে মনে হয় না সে বিরক্ত। বরং একটা পর পর আড় চোখে তাকাতে দেখা যাচ্ছে। সারাদিন প্রচুর গরম পরেছে, আমরা রাস্তায় গাড়িতে থাকতেই হঠাৎ করে ২০/২৫ মিনিট ভারি বর্ষন হয়ে গেল। গরম এতে খানিকটা কমবে হয়তো, কিন্তু জৈষ্ঠ্যমাস তাই আকাশে হুট করে ঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে। এমন অবস্থায় লঞ্চে করে বরিশাল যাবার কোন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। আমি চট্টগ্রামের ছেলে, লঞ্চে করে আমি কখনো বরিশালে ভ্রমণ করিনি।
গাড়ি থেকে নামলাম, চারিদিকে পানি জমে গেছে, মাখামাখি অবস্থা হয়ে গেছে সবকিছু। ব্যাগপত্র যা আছে সেগুলো সবাই কিছু কিছু নিলাম, ড্রাইভার সাহেব ভারি লাগেজ নিলো আমিও আরেকটা ভারি ব্যাগ নিয়ে হাঁটছি।
সবার সামনে ড্রাইভার কারণ তিনি বরিশালের লোক এবং লঞ্চের টিকিট তিনি সংগ্রহ করেছেন গতকাল এসে। তার পিছনে ফাহিম, তারপর আন্টি, তারপর আমি খানিকটা পিছনে। আমার পিছনে পরার কারণ হচ্ছে মোহনা, উচু একজোড়া জুতা পায়ে দিয়ে কচ্ছপ গতিতে এগিয়ে আসছেন তিনি। আর তাহার জন্য আমাকে একটু পর পর থামতে হচ্ছে, যখন তাকে রেখে অনেকটা এগিয়ে যাই তখন সে হাঁটা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
চারিদিকে লোক লোকারন্য সবাই যার কাজে ব্যস্ত, আমি একবার কিছুটা সামনে গিয়ে দেখি পিছনে মোহনা নেই। মাথা সামান্য উপরে তুলে দেখি মোহনা দাঁড়িয়ে আছে, আবারও পিছনে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলার আগেই সে হাঁটতে লাগলো।
আরেকটু সামনেই ঘাট, হঠাৎ করে দেখি একটা মেয়ে ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় পানির মধ্যে পরে গেছে। ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম মেয়েটার চোখে পানি টলমল করছে। প্রথমে ভেবেছিলাম ব্যথা বেশি পেয়ে গেছে মনে হয় কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো সবার সামনে পরার জন্য সে আঘাতের চেয়ে লজ্জা পেয়েছে বেশি। তাই লজ্জায় কেঁদে উঠে যাবার মতো উপক্রম করছে তাছাড়া কিছু না।
মেয়েটা একা নয়, তার সাথে তার মা-বাবা আছে মনে হয় কারণ দুজনকে দেখা যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি তখন মোহনা পিছন থেকে হাত দিয়ে গুতা দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। আমি পিছনে ফিরে ওকে দেখে আবারও ওই মেয়ের তাকে তাকিয়ে রইলাম। সচারাচর এমন পরিস্থিতি সবসময় সৃষ্টি হয় না তাই দেখে নিতে পারি।
- আমি মেয়েটার বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, আঙ্কেল আপনারা কি লঞ্চে যাবেন?
- হ্যাঁ বাবা কিন্তু সাথে মালপত্র বেশি তাই সমস্যার মধ্যে পরে গেলাম। এদিকে মেয়েটা আছাড় খেয়ে ব্যথা পেয়ে কেমন করছে, মনে হয় যাত্রা করা ঠিক হবে না, শুরুতেই সমস্যা।
- আপনি কিছু মনে না করলে আমি আপনার ব্যাগটা ঘাট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আবার আমাকে ধোঁকাবাজ মনে করবেন না কারণ আমিও আপনাদের মতো বরিশালে যাবো।
- তুমি ধরতে পারবে? তোমার সাথে ব্যাগ আছে তোমার কষ্ট হবে, থাক বাবা। তবে তুমি নিজে আগ্রহ দেখাতে অনেক খুশি হয়েছি, ধন্যবাদ বাবা।
- সমস্যা নেই আঙ্কেল আর একটু তো পথ আমি সাহায্য করছি।
ব্যাগটা হাতে নিয়ে অবাক হলাম কারণ তার মধ্যে পাঁচ কেজি ওজন হবে না মনে হয়। কিন্তু সেটা নিয়ে একটা জলজ্যান্ত যুবতী মেয়ে রাস্তার মধ্যে উষ্টা খেয়ে পরে গেছে মানতে পারছি না।
ঘাটে গিয়ে দেখি ড্রাইভার তার হাতের মালপত্র এবং আন্টি আর ফাহিম কে রেখে এসেছে। আমি আমার হাতের ব্যাগটা দিলাম তিনি সেটা নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল, আর পাঁচ কেজি ওজনের ব্যাগটা তাদের কাছে দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মোহনা নেই।
এদিক সেদিক তাকিয়ে পিছনে হাঁটতে লাগলাম, হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম যেখানে ওই মেয়ে আছাড় খেয়ে পরেছে সেখানে। আর সেখানেই মোহনা তার হাতের ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আমি রাগ করবো নাকি অন্য কিছু বলবো বুঝতে পারছি না।
ভাবলাম আগের মতো আমি আসার সাথে সাথে মনে হয় হাঁটা শুরু করবে কিন্তু সে নড়ছে না। আমি কিন্তু হাঁটা শুরু করলাম কিন্তু সে আসে না তাই সামনে গিয়ে বললামঃ-
- কি হইছে?
- চুপচাপ।
- ওরে ভাই লঞ্চ ছেড়ে দেবে আর তুমি এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছো?
- ছেড়ে দিলে আমার কি?
- আমার কি মানে?
- রাস্তার মধ্যে উষ্টা খেয়ে পরে থাকা একটা মেয়ের কত বড় কপাল, তার হাতের ব্যাগ একজন সম্পুর্ণ অপরিচিত ছেলে নিয়ে যায়। আর আমার ফাটা কপাল তাই পরিচিত একটা মানুষ থাকতে একবার জিজ্ঞেসও করে না আমার কষ্ট হচ্ছে নাকি? কেন জিজ্ঞেস করবে? আমি তো কেউ না, আমি তো তার অর্পিতা না।
- আমি এবার হেঁসে দিলাম, বললাম, তাই বলে রাগ করে দাঁড়িয়ে আছো? আচ্ছা ঠিক আছে আমার কাছে দাও আর কষ্ট করতে হবে না।
- কোন দরকার নেই, আমি নিজেই পারবো। এ কথা বলেই মোহনা হনহন করে হাঁটতে লাগলো, এতটা জোরে হাঁটতে লাগলো যে আমি হেঁটে পারছি না তার সাথে।
সুন্দরবন-১০ নামের লঞ্চে করে আমরা যাচ্ছি, দুটো কেবিন বুকিং করা হয়েছে। একটাতে মোহনা আর আন্টি এবং আরেকটাতে আমি ও ফাহিম। তাদেরকে কেবিনে দিয়ে আমি একটু লঞ্চ পরিদর্শনে বের হলাম কারণ জীবনে প্রথম লঞ্চ ভ্রমণ। যেই লঞ্চে করে যাচ্ছি সেটা ভালো করে দেখা ভালো কারণ বিপদ আপদে কাজে লাগে। হাঁটতে হাঁটতে দ্বিতীয় তলায় এসে হঠাৎ মনে হলো কেউ আমাকে ডাকলো। ঠিক আমাকে ডাকে কিনা সেটা বোঝার জন্য চারিদিকে তাকিয়ে দেখছি। হঠাৎ করে দেখি সেই আঙ্কেল ও তার স্ত্রী কন্যা বসে আছে বিছানা পেতে। মেয়েটা তার কাপড় পরিবর্তন করেছে, মনে হয় ওয়াশরুমে গিয়ে পরিবর্তন করে এসেছে। তাদের সম্মুখে চায়ের ফ্লাক্স ও কাপ দেখা যাচ্ছে, মনে হয় ঢাকার বাসা থেকে চা তৈরি করে এনেছে। মেয়েটার মায়ের হাতে একটা পানের মোচা মনে হয়, বাহহ অদ্ভুত তো।
আমি তাদের সামনে গিয়ে বসলাম, আঙ্কেল তার সাথে চা খাবার জন্য অনুরোধ করেন। আমি আর কিছু না বলে রাজি হয়ে গেলাম তারপর কথা বলতে বলতে অনেক সময় পেরিয়ে গেল। মনে হয় মোটামুটি আধা ঘণ্টা হয়ে গেছে হঠাৎ করে আঙ্কেলের সেই মেয়ে বললোঃ-
- ভাইয়া একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
- বললাম, জ্বি করুন।
- আমি যখন রাস্তায় পরে গেছিলাম তখন আপনি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর আপনার ঠিক পাশেই একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই মেয়েটা কি আপনার পরিচিত ছিল?
- আপনি ঠিক কার কথা বলছেন বুঝতে পারছি না তবে আমার সাথে একটা মেয়ে ছিল এটা ঠিক। কিন্তু আপনি তার কথা বলছেন নাকি অন্য কারো কথা সেটা বুঝতে পারছি না, কিন্তু কেন বলেন তো?
- না তখন যেই মেয়ে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সেই মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে ওইযে দাঁড়িয়ে আছে। আর সে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছে তবে আমি যতটুকু বুঝতে পারছি তাতে মনে হয় সে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি পিছনে ফিরে দেখি মোহনা অদুরে দাঁড়িয়ে আছে, আমি তাকানোর সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। মনে মনে ভাবলাম হায়রে জীবন, সবসময় শুধু ভুল বুঝে গেল। সেদিন বৃষ্টির সাথে কথা বলতে দেখছে সেটাই আজও ভাঙ্গলো না, আবার নতুন করে ঝামেলা।