“আচ্ছা যাই হোক, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে আজকে। একটু পরে সন্ধ্যা নেমে যাবে। কত দিতে হবে বলুন, আজকেই নিয়ে যাবো ফুলির সুভাকে” দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে আরিফ সাহেব বললেন।
“দামের কথা বলে আমায় লজ্জা দিবেন না স্যার। পাখিটার প্রতি ফুলির ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। এই পাখিটা ফুলির জন্য আমার তরফ থেকে উপহার” দোকানদার বললো।
“না না তা কেমন করে হয়? দাম না নিলে তো আর পাখিটা নেওয়া যায় না” আরিফ সাহেব বললেন।
“কেন নেওয়া যাবে না স্যার? আমার ফুলি মায়ের জন্য এইটা আমার তরফ থেকে উপহার। এ নিয়ে আপনি আর কিছু বলবেন না, এইটা আমাদের মামা ভাগ্নির ব্যাপার” এই বলে পাখির পিঞ্জিরাটা খুলে এনে দিলো দোকানদার।
“বাবা, তুমি আর কিছু বলো না দোকানদার মামা আমাকে ভালোবেসে পাখিটা উপহার দিচ্ছেন” ফুলি তার বাবাকে বললো।
মেয়ের কথা শুনে বাবা আর কিছু বললো না।
“বেশ অনেক বছর পেলে পুষে বড় করেছি পাখিটাকে, ওকে যত্নে রেখো ফুলি” দোকানদার বললো ফুলিকে।
“আপনি চিন্তা করবেন না মামা আমি ওকে যত্নেই রাখবো আর মাঝে মাঝে আপনার কাছেও নিয়ে আসবো বেড়াতে” ফুলি বললো।
“আচ্ছা, তাহলে আসি আজকে” এই বলে আরিফ সাহেব দোকানদার থেকে বিদায় নিলেন।
“মামা আজকে আসি, আমি মাঝে মাঝেই আসবো সুভাকে নিয়ে” এই বলে ফুলিও বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লো।
বাসায় যেতে যেতে পাখিটাকে কোথায় রাখবে তা আলোচনা করে বাবা মেয়ে। অবশেষে ঠিক হলো ফুলির রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় রাখা হবে সুভাকে।
“আসিফ পাখিটা দেখে অনেক খুশি হবে তাই না বাবা!” ফুলি বাবাকে প্রশ্ন করলো।
“হ্যাঁ, অনেক খুশি হবে” আরিফ সাহেব মেয়েকে উত্তর দিলেন।
এই শুনে সুভা ও চিকন গলায় বলে উঠলো “অনেক খুশি হবে, অনেক খুশি হবে।”
সুভার গলায় এই প্রথম কথা বলতে শুনে আরিফ সাহেব। “তুই যা বলেছিলি সুভা তো তার চেয়েও সুন্দর করে কথা বলেরে ফুলি” আরিফ সাহেব মেয়েকে বললেন।
“ফুলি, ফুলি, ফুলি” বলে পিঞ্জিরাটা একবার চক্কর দিয়ে দিলো সুভা।
সুভার মুখে এই প্রথম নিজের নাম শুনে বেশ আনন্দ পেলো ফুলি। এইভাবে কথা বলতে বলতেই বাসায় পৌছায় বাবা মেয়ে।
বাসার দরজায় এসে জুতা খুলতে খুলতেই ফুলি আসিফকে ডাকলো “আসিফ, এই আসিফ দেখে যা কি নিয়ে আসছি।”
সুভা ও বলে উঠলো “আসিফ দেখে যা কি নিয়ে আসছি, আসিফ দেখে যা কি নিয়ে আসছি।”
ফুলির ডাক শুনে দৌড়ে এলো আসিফ, এসে বললো “কি এনেছো আপি?”
পাশ থেকে পিঞ্জিরাটা সামনে এনে ফুলি বললো “সারপ্রাইজ”
“এইটাই কি সেই পাখিটা আপি? যেইটা আমরা কয়দিন আগে আনতে গেছিলাম?” আসিফ জিজ্ঞেস করলো।
“হ্যাঁ, এইটাই ওই পাখিটা। আর খবরদার ওকে পাখি পাখি করবি না, বলেছিলাম না যে ওর নাম দিয়েছি আমি?” ফুলি বললো।
“হ্যাঁ, বলেছিলে তো” আসিফ উত্তর দিলো।
“কই গো শুনছো, তোমার মেয়ের পাখিকে পাওয়া গেছে অবশেষে। ওহ সরি সরি, সুভাকে পাওয়া গেছে অবশেষে” আরিফ সাহেব একটু জোরে স্বরেই বললো ফুলির মা কে উদ্দেশ্য করে।
নিজ রুম থেকে একবার উঁকি দিয়ে আবার রুমে ঢুকে পড়ল ফুলির মা, মনে হয় নতুন অতিথির আগমনে তার মনে খুব একটা খুশি নেই।
হাক ডাক শুনে ফুলির দাদু বেরিয়ে এসে বললো “কই দেখি কোথায় ফুলির সুভা পাখি?”
“এইযে দাদু দেখো” বলেই পিঞ্জিরাটা এগিয়ে দিলো ফুলি।
“এইটাতো একটা ময়না পাখি, বেশ সুন্দর করে কথা বলে ময়না পাখি” দাদু বললো।
“সুভা দাদু সুভা, ওর নাম সুভা” আসিফ বললো দাদুকে।
আকস্মিক এতো মানুষ একসাথে তাকে দেখতে আসছে দেখে সুভা যেন রীতিমতো নৃত্য শুরু করেছে পিঞ্জিরার ভেতর, সে শুধু একবার এইপাশ আরেকবার ওইপাশে যাচ্ছে আর সবাইকে দেখছে।
“মা একবার দেখেই আবার চলে গেলো রুমে” আসিফ বললো।
“দাড়া এইটার ঔষধ আমি দিচ্ছি দেখবি মা কোন কথা ছাড়াই সুভাকে সুন্দর মতো মেনে নিতে নিবে” বললো ফুলি।
“কিভাবে?” জিজ্ঞেস করলো আসিফ।
ফুলি বললো আমার রুমে চল দেখাচ্ছি।
আসিফ ফুলির সাথে সাথে চলে গেলো তার রুমে।
ফুলি এখন পিঞ্জিরার সামনে গিয়ে বলতে লাগলো “মা তুমি অনেক ভালো, মা তুমি অনেক ভালো” চার পাঁচবার একই কথা বলার পর সুভা ও বলতে শুরু করলো “মা তুমি অনেক ভালো, মা তুমি অনেক ভালো”
ফুলি আসিফকে বললো “এইবার চল মায়ের রুমে।”
পিঞ্জিরা সহ মায়ের রুমে প্রবেশ করলো দুজনে, আর ওইদিকে সুভা একই কথা বলেই চলেছে।
“এই এই তোরা পাখিটাকে এখানে আনিস না, আনিস না। আরে আরে নোংরা করবে তো।” ফুলির মা বললো।
আসিফ বললো “আরে আম্মু শুনোই না ও কি বলছে।”
কান পেতে সুভার মুখে যখন শুনেছে “মা তুমি অনেক ভালো" তখন হেসে উঠেছে ফুলির মা।
“তোরা পারিস ও বটে, এইটা শিখিয়ে এনেছিস পাখিটাকে” ফুলির মা হাসি মুখে কথাটা বললো।
“পাখি না আম্মু, সুভা বলো সুভা” বললো ফুলি।
“আচ্ছা আচ্ছা ওই হলো” বললো ফুলির মা।
এইসব খুনসুটি করতে করতেই রাত নেমে এলো। ইতিমধ্যে বাবার সাহায্যে সুভাকে যথাস্থানে রেখে দিয়েছে ফুলি।
সুভা এখন শুধু মানুষের কথা শুনে ওই কথাই বলতে পারে। কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দিবে ওতোটা পারদর্শী এখনো হয় নি। সুভাকে কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর শিখানোই ফুলির প্রথম কাজ বলে ঠিক করে সে নিজেই। একের পর এক দিন যেতে থাকে ফুলি আর সুভার সম্পর্কটা আরো মধুর হয়ে উঠতে থাকে। এই করতে করতে কেঁটে যায় আটটি মাস। এখন সুভা অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর ও দিতে পারে। এই যেমন তার নাম কি? কে তার নাম রেখেছে এইসব আরকি। গত আট মাসে কয়দিন পর পরই ফুলি সুভাকে নিয়ে দোকানদারের কাছে গেছে।দিন যেতে থাকে, দেখতে দেখতে ফুলির এইচএসসি পরীক্ষা ও শেষ হয়। এইচএসসির রেজাল্ট দিলে ফুলি জিপিএ ফাইভ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।
বর্তমানে ফুলি ও কাকলি দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রী। জাতীয় মেধায় ফুলি ৮৩ তম ও কাকলি ১২৩ তম স্থান অধিকার করে একই বিভাগে ভর্তি হয় দুই বান্ধবী। দুজনে একইসাথে শামসুন নাহার হলে থাকে একই রুমে, আর সাথে থাকে দুজনেরই প্রিয় সুভা।