সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে দাদুকে সব খুলে বলে ফুলি। আসিফ ও মনযোগ দিয়ে ফুলির কথা গিলছিলো।
সব শুনে দাদু বললো “আগে দেখো পাখি বিক্রি করে কি না, গাছে কাঁঠাল আর গোঁফে তেল দিয়ে তো লাভ নেই।”
“দিবে দাদু দিবে, আমিও যাবো পাখিটা আনতে” আসিফ বললো।
সন্ধ্যার পর নাস্তার টেবিলে সবাইকে চা খেতে আসার জন্য মা ডাকছে “এই ফুলি, এই আসিফ” নাস্তা খেতে আয় তোদের দাদুকে নিয়ে।
নাস্তার টেবিলে বসে আসিফ তার বাবার কানের কাছে গিয়ে ফিস ফিস করে বললো “বাবা কালকেই পাখিটা আনতে যাওয়া যায় না?
“আমিতো কালকে ব্যাস্ত থাকবো, আগামী বৃহস্পতিবার যাবো” বাবা বললো।
“সবার আনন্দ যেন আর ধরে না, ঘরে এই পাখি এনে তুলবা না বলে দিলাম” মা বললো।
এইটা বলার পর আসিফ আর ফুলি একটু কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো “একটা পাখি আনলে কি এমন ক্ষতি হবে আম্মু, ওইটার সব আমরাই করবো তোমার কিছু করতে হবে না।”
ছেলে মেয়ের এমন কাঁদো কাঁদো চেহারা দেখে মা ও অবশেষে অনুমতি দিলো। এইটা আসিফ আর ফুলির একটা ট্রিক্স, কোন কিছু করতে মা বাঁধা দিলে এই ট্রিক্সের মাধ্যমেই মা কে রাজি করে তারা।
“জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর” বলে উঠে দাদু।
আরিফ সাহেব বাবার কথায় সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বললো “ঠিক বলেছো, আব্বা।”
তারপর যে যার রুমে চলে গেল, ফুলি গিয়ে পড়তে বসলো। কিন্তু পড়া তো আর হয় না, পরে আজকে সারাদিন যা যা হলো সব নতুন ডায়রিটায় লিখলো।
পরদিন নির্ধারিত সময়ের আগেই কলেজে যেতে প্রস্তুত ফুলি।
“মা, আজকে আমি বাবার সাথে যাবো কলেজে" ফুলি মা কে উদ্দেশ্য করে বললো।
"তোর বাবা তো অনার্স স্টুডেন্ট দের প্রাইভেট পড়াবে এক ঘন্টা। তুই কি করবি এতো আগে আগে গিয়ে?" মা বললো।
"কথা বলোনা তো খাবার দাও আজকে একসাথে যাবো বাবার সাথে” ফুলি বললো।
অগত্যা, মেয়ের সাথে আর কিছু না বলে খাবার দিলো মা। সে জানে ফুলিকে কিছু বলে লাভ নেই, যেইটা ওর মনে ধরে ওইটাই করবে সে।
খাবার খেয়ে বাবা মেয়ে একসাথে কলেজে পৌছায়। গতকালকে রাতেই কাকলিকে ফোন দিয়ে আগে আসতে বলে রেখেছিলো ফুলি। রিকশা থেকে নেমে কাকলিকে কলেজের গেটেই দাঁড়ানো অবস্থায় দেখা যায়। বাবা কে বিদায় জানিয়ে ফুলি আবার পাখি দেখার জন্য কাকলিকে নিয়ে রওনা হয় ওই আগের দোকানটায়।
“এতো সকালে কি দোকান খুলবে?” কাকলি প্রশ্ন করে।
“এই রে, পাখির সাথে কথা বলবো এই আনন্দে এতো সকালে যে দোকান খুলবে না তা ভূলেই গেছিলাম” ফুলি বললো।
“তাও এসে যখন পরেছি একবার নাহয় গিয়ে দেখেই আসি” কাকলি একটু হতাশার সুরেই বললো।
দোকানের সামনে গেয়ে হতাশ হলো দুজনেই, দোকান এখনো খুলে নি।
“দোষ তো তোরই। সকালে আসতে বললি, কি কাজ ওইটাও বললি না বললে তো আর এমন হতো না” কাকলি একটু রাগি রাগি গলায় বললো কথাটা।
“এতো সকালে দোকান খুলবে না কথাটা খেয়ালই ছিলো না, তুই রাগ করিস না কাকলি” একটু নরম স্বরে বললো ফুলি।
“এখন এই এক ঘন্টা আমরা কি করবো?” কাকলি জিজ্ঞেস করলো ফুলিকে।
“গল্প করেই কাটিয়ে দিবো, আর কি করার আছে” ফুলি বললো।
কাকলি সম্মতি দিয়ে বললো “আচ্ছা চল, ওইদিকের রাস্তাটায় হাটতে হাঁটতে কথা বলি অনেক দিন তেমন হাটা হয় না।”
“টিফিনের সময় কিন্তু আমরা আবার আসবো” ফুলি বললো।
“আমি আর পারবো না” কাকলির উত্তর এলো।
“প্লিজ প্লিজ প্লিজ কাকলি তুই না আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী, আজকে টিফিনে আয় কালকে আর আসবো না” ফুলি বললো।
“তারমানে পরশু আবার আসবি” কাকলি জিজ্ঞেস করলো।
“পরশুর কথা পরশু হবে আজকে টিফিনে আসবো এইটাই আমার শেষ কথা” ফুলি বললো।
এইভাবে গল্প করতে করতে কলেজের টাইম হয়ে আসলে কলেজে প্রবেশ করে তাদের কক্ষে যায় তারা। চারটা ক্লাস করার পর অবশেষে টিফিনের সময় আসলো। টিফিন খেয়ে তড়িঘড়ি করে কাকলিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো ফুলি। গতকালকের মতো আজকেও সেই ফ্লাইওভার পাড়ি দিয়ে দোকানে এসে হাজির দুজন। পাখিটা আগের জায়গাতেই আছে আজকেও। দোকানদার এর সাথে হাসি সুলভ দৃষ্টি বিনিময় করে ফুলি পাখির পিঞ্জিরার দিকে এগিয়ে গেল। আজকে অবশ্য পাখিটা কিছু বলছে না, শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে ফুলিকে।
“মনে হয় আমাকে চিনতে পেরেছে, কি বলিস” কাকলিকে জিজ্ঞেস করলো ফুলি।
“কি জানি বাবা, অতো শতো জানি না” কাকলি উত্তর দিলো।
“তোমার নাম কি?” পাখিটাকে জিজ্ঞেস করে ফুলি।
পাখিটার এই কথাটা তেমন পাত্তা দিলো বলে মনে হচ্ছে না, সে ফুলিকে দেখেই যাচ্ছে একমনে।
আরো দুই একবার ফুলি একই কথা জিজ্ঞেস করার পর পাখিটাও বলতে শুরু করলো “তোমার নাম কি? তোমার নাম কি?”
পেছন থেকে দোকানদার বললো “ওর কোন নাম দেওয়া হয় নি, সবে দুইমাস কথা বলা শুরু করেছে। নাম দিলে আস্তে আস্তে নাম ও বলতে পারবে।”
“ওর কোনো নাম ঠিক করেছেন মামা?” দোকানদারকে প্রশ্ন করলো ফুলি।
“না, তবে ভাবছি কি নাম দেওয়া যায়” দোকানদার উত্তরে বললো।
“কিছু মনে না করলে আমি একটা নাম দিবো ওর?” দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো ফুলি।
“তুমি দিবে? আচ্ছা বলো শুনি, যদি পছন্দ হয় ওইটাই রাখবো” ফুলিকে উদ্দেশ্য করে বললো দোকানদার।
একটু ভেবে ফুলি হঠাৎ বলে উঠল “সুভা।”
দোকানদার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো “সুভা?”
“হ্যাঁ মামা সুভা, এই নামটা ওর জন্য সব ক্ষেত্রেই খাটে” ফুলি বললো।
“ঠিক বুঝলাম না, কিভাবে খাটে বলোতো” দোকানদার বললো।
“সুভা মানে সুন্দর, পাখিটার কারণে আপনার দোকানদার সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আবার সুভা মানে কল্যাণকর, মঙ্গলময়। পাখিটার কল্যাণে আপনার দোকানের বেচাকেনা ও ভালো হয় মানে আপনার কল্যাণ হয় মঙ্গল হয় তাই এই দিক চিন্তা করলেও নামটি বেশ মানানসই” ফুলি বললো।
“বাহ, বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে তো তুমি। কি সুন্দর করে নামটার ব্যাখ্যা দিলে” দোকানদার বললো।
“মামা ও ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল, বুদ্ধি তো একটু থাকবেই” কাকলি পাশ থেকে বললো।
“হ্যা, তাইতো বলি নাহলে এতো বুদ্ধি তো থাকার কথা না” দোকানদার বেশ তৃপ্তির হাসি মাখা মুখে বললো।
“এইবার বলেন নামটা পছন্দ হয়েছে কি না” দোকানদারকে ফুলি জিজ্ঞেস করলো।
“হ্যাঁ, আর পছন্দ না হয়ে উপায় আছে? আজকে থেকে ওর নাম সুভা” দোকানদার বললো।
পাখিটাকে নিজে নাম দিতে পেরে বেশ খুশি ফুলি। কলেজে ফিরে যাওয়ার আগে আবার একবার পিঞ্জিরার কাছে যায় ফুলি।
“কি নামটা পছন্দ হয়েছে? আজকে থেকে তোমার নাম সুভা” পাখিকে উদ্দেশ্য করে ফুলি বললো।
“সুভা, সুভা, সুভা” বেশ কয়েকবার এক নিঃশ্বাসে নামটি বলে ফেললো পাখিটা।
পিঞ্জিরার ভেতরে বেশ কয়েকবার লাফিয়ে লাফিয়ে নামটা বেশ পছন্দ হয়েছে বলেই জানান দিলো বলেই মনে হয়। ফুলি বেশ খুশি, পাখিটার ও নামটা পছন্দ হয়েছে এই ভেবে। দাড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দুজনেই শুনতে পেলো টিফিন শেষের ঘন্টা, সেই শুনে দুজনে দৌড়ে গেল কলেজে।