ফুলি ও সুভা

পর্ব - ৪

ফুলি ও সুভা বাংলা গল্প - লেখক মীর মোঃ তানজিরুল ইসলাম

বাড়িতে গিয়ে আজকের সব ঘটনাও দাদুকে বললো ফুলি, ওইদিনের মতো আজকেও আসিফ সব কথা শুনলো পাশে বসে। আসিফের আগ্রহটাও বেড়েই চলছে পাখিটাকে নিয়ে।

পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবারও ফুলি বেশ কয়েকবার কাকলিকে বলেছে পাখির কাছে যেতে। কিন্তু কাকলি কিছুতেই যাবে না। গতকালকে তার যেইরকম দৌড়ে আসতে হয়েছিল সেই ভেবেই হাঁপিয়ে উঠছে সে, আজকে আর নয়।

পরদিন বুধবার কলেজে যেতে যেতেই চিন্তা করে রাখে আজকে অবশ্যই যাবে। টিফিন পিরিয়ডে ফুলি আজকেও কাকলিকে নিয়ে গেলো সেই পাখিটার সাথে কথা বলবে বলে। কাকলি যেতে চায় নি কিন্তু ফুলি তো নাছোড়বান্দা, তাই অবশেষে যেতেই হলো। আজকে গিয়ে বেশ গল্প গুজব করে এক পর্যায়ে পাখিটাকে ফুলি বলে আসে “কালকে বৃহস্পতিবার, কালকে তুমি আমাদের বাসায় যাবে আর ওখানেই থাকবে।”

কথা বার্তা শেষে আজকে টিফিন শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেই কলেজে ফিরে আসে তারা।

বাসায় যেতে যেতে বাবার সাথে বাবার সাথে চুক্তি করে নেয় কালকে সে কলেজ যাবে না আর সকাল ১০ টায় বেরিয়ে পড়বে পাখির উদ্দেশ্যে।

“তোর এই পাখির জন্য ছুটি নিতে হলো আমার কালকে” ফুলিকে উদ্দেশ্য করে তার বাবা বললো।

“ওই একদিন ছুটি কাটালে কিছু হবে না, তাছাড়া কালকে কতো মজা হবে বলোতো” ফুলি বললো।

যেই ভাবা সেই কাজ, পরদিন ১০ টার আগেই যাওয়ার জন্য তৈরি বাবা মেয়ে। কিন্তু সমস্যা হলো আসিফ ও পাখি আনতে তাদের সাথে যাবে বলে বায়না ধরেছে সেই সকাল থেকেই, এইজন্য সে স্কুলে পর্যন্ত যায়নি আজকে। বায়না তো আর যে সে বায়না নয় একদম নিয়ে যেতেই হবে, না নিয়ে গেলে যে বাসায় হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটাবে তা তার হাব ভাবেই বুঝা যাচ্ছে। অগত্যা, ছেলে মেয়ে দুইজনকে নিয়েই রওনা হলেন আরিফ সাহেব।

বাসা থেকে বেরিয়ে ৪-৫ মিনিট হাঁটলেই মেইন সড়ক। রিকশার জন্য বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হলো না, কিছুক্ষণের মধ্যেই রিকশা নিয়ে তারা লাইব্রেরীর দিকের গলির মুখে হাজির। সেখানে আগে থেকেই কাকলি দাঁড়ানো। ফুলি কাকলিকে গত রাতেই ফোন করে বলেছে সে যাতে কলেজ না যায়, যাতে সরাসরি দোকানটার সামনে আসে। পাখিটা সঙ্গে করে আজকে ফুলির সাথে তাদের বাসায় যাওয়ার কথা কাকলির।

কিন্তু এ কি, কাকলির মুখটা এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন? ফুলি এসেই কাকলিকে এ কথা জিজ্ঞেস করল।

কাকলি উত্তর দিতে যাবে তক্ষুনি আসিফ বললো “তোমার গল্প পড়ে শুনবো কাকলি আপু, আগেতো পাখিটা নিয়ে বাসায় যাই। তোমারও তো আজকে আমাদের বাসায় যাওয়ার কথা, আপি বললো।”

“চল চল দেরি হয়ে যাচ্ছে তো, আমার আরো কাজ আছে আজকে। শুধু এই পাখি নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না, ছুটি যখন নিয়েছি বাকি কাজগুলোও যতটুকু পারি করে রাখবো।” আরিফ সাহেব সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো।

সবাই হাঁটতে হাঁটতে দুই মিনিটের মধ্যেই দোকানে পৌঁছাল। পিঞ্জিরার কাছে যেতেই ফুলি একটু থমকে দাঁড়ালো, দেখলো পিঞ্জিরা থাকলেও তাতে সুভা নেই।

“সুভা কোথায় মামা?” দোকানদারকে জিজ্ঞেস করে ফুলি।

“সুভাকে তো বিক্রি করে দিয়েছি” দোকানদার উত্তর দিলো।

“বিক্রি করে দিয়েছেন মানে? আপনি না কয়দিন আগে ফুলিকে বললেন এইটা বিক্রির জন্য নয়” ফুলির বাবা বললো।

বিজ্ঞাপন

“আপনি কে? চিনলাম না ঠিক” দোকানদার বললো।

“ওহহ আমার তো পরিচয়ই দেওয়া হয় নি, আমি ফুলির বাবা। আর একটা পরিচয় ও আছে বটে, সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আমি। তবে আজকে এইখানে ফুলির বাবা হয়েই এসেছি” আরিফ সাহেব বললেন।

“আসসালামুয়ালাইকুম স্যার, ভালো আছেন আপনি?” দোকানদার আরিফ সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন।

“ভালোই তো ছিলাম এতোক্ষণ কিন্তু এখন কতটুকু ভালো আছি তা ঠিক বুঝতে উঠতে পারছি না। আপনি তো মশাই লোকটা বেশি সুবিধাজনক না, আমার মেয়েকে বললেন ওই পাখি বিক্রির জন্য নয় অথচ বেচে দিলেন” আরিফ সাহেব বললেন।

এতোক্ষণ চুপ করে থাকলেও নিরবতা ভেঙ্গে ফুলি বললো “আমিতো আপনাকে আরো আগেই বলেছিলাম আমার কাছে বিক্রি করে দিতে। আর গতকালকেও তো পাখিটা দেখে গেলাম, একদিনেই পাখি বিক্রিও করে দিয়েছেন। কার কাছে বিক্রি করেছেন?” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম নিলো ফুলি।

“বলছি বলছি, সবাই এতো অস্থির হয়ে যাবেন না শুনার আগেই, আপনারা বসুন এইখানে” চেয়ারের দিকে ইশারা করে দোকানদার বললো।

“হ্যাঁ, বলুন। বসছি আমরা” আরিফ সাহেব দোকানদারের দিকে তাকিয়ে বললো।

ফুলির দিকে তাকিয়ে দোকানদার বলা শুরু করলো “গতকালকে তুমি যখন দোকান থেকে গেলে তার খানিকটা সময় পরেই একজন ভদ্রলোক তার মেয়েকে নিয়ে দোকানে প্রবেশ করলো।”

“তারপর? তারপর কি হলো?” পাশ থেকে আসিফ কৌতুহলি দৃষ্টিতে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো।

দোকানদার আবার বলতে শুরু করলো “দোকানে আসার পর মেয়েটা আমাকে উদ্দেশ্য করে কি কি দিতে হবে সেই নিয়ে লম্বা একটা লিস্ট শুনিয়ে দিলো। মেয়েটার হাতে একটা লিস্ট ছিলো কি কি নিতে হবে, সম্ভবত ওর মায়ের তৈরি। আমিও সেই মতো জিনিস পত্র দেওয়া শুরু করলাম। মোটামুটি দুই তিনটা জিনিস দেওয়ার পর মেয়েটার ওই পাখিটার দিকে নজর পড়লো। নজর পড়তেই মেয়েটা তার হাতে থাকা লিস্টটা তার বাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে পাখির পিঞ্জিরার কাছে গিয়ে পাখিটাকে দেখতে লাগলো। দুই একটা কথাও বোধহয় ততক্ষনে পাখিটাকে বলেছে।”

“তারপর? তারপর কি হলো?” আবারও আসিফের দিক থেকেই প্রশ্নটা আসলো।

একটু থেমে দোকানদার আবারও বলতে শুরু করল “তারপর মেয়েটা এক মিনিট মতো দাঁড়িয়ে থেকে তার বাবাকে ডাকলো ‘আব্বু, ও আব্বু দোকানদার মামাকে লিস্টটা দিয়ে একটু এদিকে আসো তো।’ মেয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ভদ্রলোক ও আমার হাতে লিস্টটা ধরিয়ে দিয়ে মেয়ের কাছে গেল। মেয়েটা তার বাবাকে কি যেন বলছিলো, বেশ আস্তে আস্তে কথা বলায় আমি কিছুই শুনতে পাই নি, আর তাদের বাজার সদাই দিতে দিতে ওইদিকে তেমন লক্ষ্য ও করতে পারি নি। তার দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই তাদের সব জিনিসপত্র ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলেছি আমি। এরপর মেয়েটা আর তার বাবা তাদের জিনিসপত্র নিতে এগিয়ে আসলো।”

“পাখিটা যে আমার মেয়ের ভিষণ পছন্দ হয়েছে, কত হলে বিক্রি করবেন?” মেয়েটার বাবা প্রশ্ন করলো।

প্রশ্নের উত্তরে আমিও বিক্রি করবো না বলে জানালাম যেমনটা ফুলিকে বলেছিলাম। কিন্তু মেয়েটা নাছোড়বান্দা, পাখি না নিয়ে সে যাবেই না। রীতিমতো কান্না জুড়ে দিলো পাখির জন্য। মেয়েটার কান্না দেখে বেশ মায়া হলো আমার। গতবছরের বর্ষা মৌসুমে আমার মেয়ে পানিতে পরে মারা যায়, আমি যেন মেয়েটার মুখে আমার নিজের মেয়ের চেহারা ভেসে উঠতে দেখলাম। মেয়েটা তখনও কেঁদেই যাচ্ছে। তখন আমার কি যে হলো আমি ঠিক জানি না, মেয়েটাকে বললাম “তুমি থামো মা, থামো। পাখিটা তুমি বাসায় নিয়ে যেতে চাও? অনেক ভালো লেগেছে পাখিটা?”

মেয়েটা কাঁদো কাঁদো গলায়ই বললো “পাখিটা আমাকে দিয়ে দেন না মামা, আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। ওর কথা বলা অনেক ভালো লেগেছে।”

“আচ্ছা মা, পাখিটা তুমি নিয়ে যাও” আমি মেয়েটাকে বললাম।

বিজ্ঞাপন