ফুলি ও সুভা

পর্ব - ১

ফুলি ও সুভা বাংলা গল্প - লেখক মীর মোঃ তানজিরুল ইসলাম

সেদিন বেশ বৃষ্টি পড়ছিলো, আর তার সঙ্গে আকাশের গর্জনে পরিবেশটা ছিল বেশ ছমছমে। ঘুমানোর জন্য বেশ সুন্দর একটা পরিবেশ থাকলেও ফুলির সেইদিকে তেমন একটা মন নেই, সে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে ডাইরি লিখছে। দিনের অবস্থা একটু খারাপ হওয়ার আগেই কারেন্ট চলে যায়, ইদানিং আরও বেশি জ্বালাতন শুরু করছে। এই নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে কমপ্লেইন জানানোর জন্যেও বাবাকে বলেছে ফুলি, এতো কারেন্ট গেলে টিকা দায় হয়ে পড়ে। ডাইরি লিখা ফুলির নিত্য অভ্যাস, প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লিখে। এই যেমন এখন লিখছে রিকশাওয়ালা মামার কথা।

এইতো আজকে সকালে কলেজে যাওয়ার পথে রিকশাওয়ালা মামার সাথে ২০ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা চাওয়ায় তমুল তর্কাতর্কি হয়। অবশেষে ২০ টাকাতে রাজি হওয়ায় রিকশায় উঠে বসলো ফুলি, যেতে যেতে রিকশাওয়ালা তার অসুস্থ ছোট মেয়ের কথা বলা শুরু করে। প্রচন্ড জ্বর তার মেয়ের, কয়দিন যাবৎ তার আয় রোজগার তেমন ভালো না যাওয়ায় মেয়েকে ডাক্তার ও দেখাতে পারছে না। এই শুনতে শুনতেই কলেজ গেইটের সামনে রিকশা থামলো। রিকশা থেকে নেমে ৫০ টাকার একটা নোট দিয়ে ফুলি বললো “২০ টাকা আপনার ভাড়া আর বাকিটা আপনারা মেয়ের জন্য মামা, ওকে ঔষধ কিনে খাইয়েন।” রিকশাওয়ালা নিতে না চাইলেও সে “আপনার মেয়েকে ঔষধ কিনে দিয়েন” এইকথা বলতে বলতেই কলেজের ভেতরে চলে গেলো। একটু এগিয়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলো রিকশাওয়ালা মামা রিকশা ঘুরিয়ে একটা বেশ চওড়া হাসি দিয়ে রিকশা নিয়ে চলে গেলো।

এই হলো ফুলি, অন্যায় কিছু বললে সে যেই হোক তার উচিত কথা থেকে নিস্তার পায় না কিন্তু আদতে তার মনটা বেশ নরম। কারো দুঃখ কষ্ট শুনলে যতটুকু যা পারে সাহায্য করে। ছোটবেলায় তার ফুলের প্রতি বেশ ভালোবাসা ছিলো। যেখানেই ফুল দেখতো কান্নাকাটি জুড়ে দিতো ফুলটা তার হাতে না আসা অবদি। বেশ কয়েকবার গোলাপ ছিড়তে গিয়ে হাতে কাটাও বিধেছে , তবু তার ফুল লাগবেই। এইসব দেখে ফুলির দাদি তাকে ফুলি ঢাকতে শুরু করে, একদিন দুইদিন করে ডাকতে ডাকতে এখন সবাই ওকে ওর আসল নাম মারিয়া তাবাসসুম থেকে ফুলি নামেই বেশি চিনে।

ফুলির দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে ফুলের প্রতি তার ভালোবাসায় বেশ মরচে ধরে গেছে। ফুল দেখলেই তার দাদির দেওয়া নামের কথা মনে হয়, আর তারপর ওর দাদির কথা। ভিষণ ভালোবাসতো ফুলি তার দাদিকে। মারা যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন নাওয়া খাওয়া ও প্রায় ভুলেই গেছিলো, পরে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়।

বর্তমানে ফুলির পরিবারে আছে তার বাবা মা তার ছোট ভাই আর তার দাদু। ফুলির অবসরে গল্প করার সঙ্গি তার দাদু জনাব হাসান ইকবাল। বহুদিন আগেই হাইস্কুল শিক্ষক হিসেবে পেনশন পায় তার দাদু। বাবা জনাব আরিফ ইকবাল তার কলেজেরই পদার্থবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক । মা সামিনা তাবাসসুম গৃহিণী আর ছোট ভাই আসিফ ইকবাল সবে মাত্র ক্লাস টু তে পড়ে, সবাই ওকে আসিফ বলেই ডাকে।

ফুলির গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগরের তুলাতলা গ্রামে। ছোটবেলা থেকে বাবার চাকরির সুবাদে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ ও ফরিদপুরে যেতে হয়েছে। যেখানেই তার বন্ধু বান্ধবি হয়ে সম্পর্কটা একটু গভীর হয় ওমনি শুনা যায় বাবার বদলি হয়েছে। এই নিয়ে সে বেশ বিরক্ত সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি, কিছুদিন পর পরই বদলি হয়ে যাওয়া ওইখানে আবার খাপ খাওয়ানো এইসব ওর ভালো লাগে না। মনে মনে প্রায়ই সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই নিয়ে গালি ও দেয়। ফুলির ওই একটাই গালি “সব কয়টা স্টুপিড।” অন্য কোনো গালি সে কাউকে দেয় না, ওইসব কুৎসিত ভাষায় তার খানিকটা এলার্জি আছে। “স্টুপিড” ইংরেজি শব্দ, শুনতেও তেমন একটা খারাপ শুনায় না তাই এইটাই অনেক ভেবে চিন্তে বেছে নিয়েছে রাগ ঝাড়ার অস্ত্র হিসেবে। ছোট ভাই আসিফ প্রায়ই এই “স্টুপিড” গালিটা খেয়ে থাকে। যদিও তাতে তার কিছু যায় আসে না।

বিজ্ঞাপন

সবশেষ সহকারী অধ্যাপক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে বদলি হয়ে ফুলির বাবা চট্টগ্রামের রাউজানে এখানকার সরকারি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে এসেছে ফুলির এসএসসি পরীক্ষার পর। রাউজান শহরটা খুব একটা বড় না, শহর না ঠিক উপশহর বলা চলে। ঘন্টা চারেক সময় নিয়ে বের হলে পুরো রাউজান শহরটা অলিগলি সহ ঘুরে ফেলা সম্ভব। শহরে বেশ খুঁজেও বাসা না পেয়ে একটু গ্রাম সাইডে বাসা নিতে হয়। যদিও জায়গাটা ফুলি আর আসিফের বেশ মনে ধরেছিলো, কোলাহল মুক্ত এলাকা আর চারিপাশের পরিবেশ ও বেশ সুন্দর। বাসার নিচ তলায় বাড়িওয়ালা থাকে আর তারা উপর তলায় উঠেছে, বাসাটা দুইতলা বিশিষ্ট।

আজকে রবিবার, বাসা থেকে কলেজে যেতে বের হয় ফুলি। রাস্তায় এসে খানিক অপেক্ষার পর রিকশা পেয়ে যায়, আজকে অবশ্য ভাড়া নিয়ে কিছু বলা লাগে নি। রিকশাওয়ালা নিজ থেকেই ২০ টাকা চাইলো। রিকশাওয়ালা মামার সাথে কথা বলতে বলতেই কলেজে চলে আসলো ফুলি। রিকশা থেকে নামতেই তার বান্ধবী কাকলি কে দেখে একটু জোরে স্বরেই ডাক দিলো “কাকলি, এই কাকলি।” ডাক শুনতে পেয়ে কাকলি দাড়ালো, এরপর দুজনে একসাথে গল্প করতে করতে কলেজে প্রবেশ করলো। কাকলি হলো ফুলির এইখানকার সবচেয়ে ভালো বান্ধবী। ছয়মাস হলো সে রাউজানে এসেছে, আর কাকলির সাথে তার বন্ধুত্বের বয়স প্রায় পাঁচ মাসের মতো। এই কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী দুজনেই।

কলেজে প্রথম ক্লাস শেষ হওয়ার পর ফুলির মনে পড়লো তার আগের ডায়রিটা প্রায় শেষের পথে, আর চার-পাঁচটা পাতা বাকি আছে। মনে পড়ার পরক্ষনেই কাকলিকে বললো আজকে কলেজ ছুটির পর লাইব্রেরীতে যেতে হবে একটু, তার ডায়রি কিনতে হবে। কাকলি সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বললো “আচ্ছা যাবো নে।” বেশ খানিকক্ষণ হয়ে গেলো এখনো জাহিদ স্যার আসছে না ক্লাসে। জাহিদ স্যার তার কলেজের ইংরেজি প্রভাষক। কাকলির সাথে কথা বলতে বলতেই একজন এসে ক্লাসের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে গেলো “জাহিদ স্যার আজকে ছুটিতে আছেন, প্রিন্সিপাল স্যার সবাইকে বলেছেন চাইলে তোমরা এই সময়ে অন্য কিছু পড়তে পারো বা খেলাধুলা করতে পারো, কিন্তু কোনো শোরগোল যেনো না হয়।”

তার মানে ৪৫ মিনিট কোনো কাজ নেই। কাকলি ফুলিকে বললো “চল ফুলি, তোর ডায়রি কিনে নিয়ে আসি এখনি।”

ফুলিও কথা না বাড়িয়ে ডায়রি কিনতে বেরিয়ে পড়লো। কলেজ গেইট থেকে বেরিয়ে রাস্তার অপর পাশের দুইটা গলি পরেই লাইব্রেরী। রাস্তায় অনেক গাড়ি চলাচলের জন্য কাকলি আর ফুলি ফ্লাইওভার দিয়ে রাস্তা পেরুলো। লাইব্রেরীতে গিয়ে বেশ অনেকগুলো ডায়রি দেখে পছন্দ করে একটা ডায়রি কিনে আবার কলেজের উদ্দেশ্য রওনা হলো দুই বান্ধবী। যেতে যেতেই কাকলি হঠাৎ করে পাখির কিচিরমিচির শুনতে পেয়ে পাশে তাকিয়ে বলে “ওই দেখ ফুলি, ময়না পাখি।”

কাকলির কথা শুনে ফুলি তাকিয়ে দেখলো বেশ বড় সড় একটা সাজানো পিঞ্জিরায় একটি ময়না পাখি। দেখতে বেশ আকর্ষণীয় লাগায় দুজনেই পাখিটিকে আরো কাছ থেকে দেখতে এগিয়ে গেলো।

বিজ্ঞাপন