কাছে যেতেই ফুলি লক্ষ করলো বেশ চিকন গলায় পাখিটি বলছে “রহিম মিয়ার মাথায় টাক, রহিম মিয়ার মাথায় টাক।”
সেই শুনে ফুলি তো বেশ অবাক! অনেক দিন প্রাকটিস করালে পাখি কথা বলতে পারে শুনলেও কখনো কোনো কথা বলা পাখি দেখেনি সে। বিষয়টা বেশ নতুন অভিজ্ঞতা ওর জন্য। কথা বলতে শুনে পাখিটার একদম কাছে গিয়ে ফুলি কাকলিকে বললো “দেখ দেখ পাখিটা কেমন সুন্দর করে কথা বলে।”
“হ্যাঁ তাইতো দেখছি” কাকলি বললো।
পিঞ্জিরার এতো কাছে যেতে দেখে দোকানদার তার ক্যাশবাক্সের কাছ থেকেই বলে উঠলো “ওকে বিরক্ত করো না বাচ্চারা, কলেজে যাও।”
ফুলি বললো “চলে যাবো মামা একটু দেখেই।”
এই শুনে পাখিটি এখন আগের কথা ছেড়ে বলতে লাগলো “চলে যাবো মামা একটু দেখেই, চলে যাবো মামা একটু দেখেই।”
ফুলির তো এই কথা শুনে সে কি হাসি।
ফুলি কাকলির সাথে পরামর্শ করতে পাশে টেনে নিয়ে বললো “পাখিটা বাসায় নিয়ে গেলে কেমন হয় কাকলি?”
“বাসায় নিতে চাইলেই যেনো তোকে নিতে দিবে” কাকলি বললো।
“বিক্রি না করলে কি দোকানে এনে রেখেছে নাকি” একটু হতাশ হয়ে ফুলি উত্তর দিলো।
“আচ্ছা তাহলে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেই তো হয় সে বিক্রি করবে কি না” কাকলি বললো।
এই কথা শুনে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কাকলির হাত ধরে দোকানদারের কাছে গিয়ে ফুলি বললো “মামা পাখিটা কি বিক্রির জন্য রেখেছেন।”
“এইটা বিক্রি হবে না, পাখিটা থাকলে বাচ্চারা এইটার আকর্ষণে দোকানে আসে তাতে আমার বেচাকেনা ভালো হয়” সাফসাফ এই কথা জানিয়ে দিলো দোকানদার।
কথাটি শুনে ফুলি বেশ হতাশ হয়ে যায়। পর মূহুর্তেই কন্ঠটা একটু নরম করে বলে উঠে “পাখিটা আমার কাছে বিক্রি করে দেন না, একটু বেশি দাম হলেও দিয়ে দেন আমাকে।”
দোকানদার আবারও একই কথা বললো যে পাখি বিক্রি হবে না।
তারপর আর কি, হতাশ হয়ে দোকান থেকে বের হয়ে চলে যেতে শুরু করে দুজনেই। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবারও ফুলি পেছন ফিরে দোকানে ঢুকে বলে “আমি মাঝে মাঝে পাখিটার সাথে কথা বলতে আসলে আপনার সমস্যা নেই তো।”
দোকানদার বললো “না, সমস্যা নেই। তুমি কথা বইলো এসে।”
এই শুনে একটু মুচকি হাসি বিনিময় করে “ধন্যবাদ মামা” বলে কলেজে চলে যায় দুইজন।
আর ফুলি মনে মনে ভেবে রাখে বাবার কাছে পাখিটার জন্য আবদার করবে যাতে এনে দেয়।
ছুটির পর বাবা মেয়ে একই সাথে বাড়ি ফিরে প্রতিদিন। আজকেও তার ব্যাতিক্রম ঘটে নি, দুজনে একসাথে বের হয়ে রিকশা করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। যেতে যেতে আজকের ঘটে যাওয়া সবকিছু বাবার সাথে শেয়ার করলো। বাবা ও তার পুরোনো দিনে এমন বেশ কিছু পাখি সম্পর্কিত ঘটনা বললো। ফুলি তার বাবার কাছে আবদার করে বসলো যেভাবেই হোক ওই পাখি তার লাগবেই, যে ভাবেই পারে ওইটা যেনো তাকে এনে দেওয়া হয়।
“পাখিটাতো বিক্রির জন্য নয়, দোকানদার তো বললোই তোকে মা” ফুলির বাবা বললো।
কিন্তু ফুলি কোনো কথা শুনতে রাজি নয় তার ওইটা লাগবেই লাগবে। মেয়ের এমন জেদ দেখে বাবা চেষ্টা করবে বলে কথা দেয়।
কিন্তু ফুলির সেই এক কথা “চেষ্টা নয়, ওই পাখি আমার চাই ই চাই।”
ফুলির এমন কথা শুনে রিকশাওয়ালাও বলে উঠলো “একটু বেশি দাম বললেই দিয়ে দিবে বোধহয় স্যার, শুনেছি পাখিটা নিয়ে ওই দোকানদার ও বেশ জ্বালাতনেই আছে। প্রতিদিন ওর পিঞ্জিরা পরিষ্কার করতে করতেই নাকি সে হয়রান।”
ফুলির বাবা বললো “তুমিও দেখেছো পাখিটা?”
“আমরা সারাদিন রিকশা চালাই হয়রান হইলে একটু চা খাই, বাজারেই থাকি সারাদিন। আমাদের কাছে মোটামুটি সব খবরই পাবেন” রিকশাওয়ালা বললো।
এইভাবে কথা চলতে চলতেই বাড়ির কাছে এসে পড়েছে রিকশা। নেমে বাসায় যেতে যেতেও বেশ কয়েকবার বাবাকে ওই পাখি এনে দিতে বললো ফুলি।
বাবা বললো “আচ্ছা আগামী কয়েকদিন বেশ ব্যাস্ত থাকবো, সামনের বৃহস্পতিবার যাবো ওই দোকানে, দেখি কি করা যায়।”
কথা বলতে বলতে বাসায় প্রবেশ করলো দুইজন।
“বাবা মেয়ের কি নিয়ে এতো কথা হচ্ছে?” ড্রইং রুম থেকে ফুলির দাদু জিজ্ঞাসা করলো।
ফুলি বললো “তোমার সাথে আমার অনেক গল্প করার আছে আজকে দাদু।”
“কি বিষয়ে গল্প দাদুভাই?” ফুলির দাদু জিজ্ঞেস করলো।
“আমি আগে গোসল করে আসি শরীর ঘেমে একদম একাকার হয়ে আছে, এসে বলছি দাদু” ফুলি বললো।
“কই গো শুনেছো, তোমার মেয়ে আজকে এক শালিক পাখি দেখে এসেছে এখন ওইটা নাকি ওকে এনে দিতেই হবে” রান্নাঘরে ফুলির মা কে উদ্দেশ্য করে ফুলির বাবা বলে উঠলো।
“ওইসব পাখি-টাখি এইখানে আনা চলবে না, এইটা বাসা নাকি চিড়িয়াখানা!” রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসলো।
“আমি কথা দিয়ে দিছি মেয়েকে, দেখি আগামী বৃহস্পতিবার যাবো। দেখি চেষ্টা করে আনতে পারি কি না” ফুলির বাবা বললো।
“তুমিই তো ওকে লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছো” একটু রাগি রাগি গলায় আবারো রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসলো।
“পাখিটা কথা বলে” ফুলির বাবা বললো।
“যতযাই বলো, কথাই বলুক আর গানই বা গাক না কেন ওই পাখি আমি আনতে দিবো না। পরে ওইটার মলমূত্র এইগুলো কি তোমার মেয়ে পরিষ্কার করবে? সব তো আমারই করা লাগবে” ফুলির মায়ের উত্তর আসলো।
দাদুকে গোসল দিতে যাবে বলেও না গিয়ে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে মা-বাবার কথা শুনতে থাকলো ফুলি। এতোক্ষণ বেশ চুপচাপ হয়ে দাদুর পাশে বসে থাকলেও পাখি কথা বলে শুনে বেশ আগ্রহী কন্ঠে আসিফ বলে উঠে “পাখিটা কি সত্যিই কথা বলে আপি?”
ছোট ভাই আসিফ ফুলিকে ছোট থেকেই আপি ডাকে।
“হ্যাঁ অনেক সুন্দর করে কথা বলে” ফুলি আসিফকে উদ্দেশ্য করে বলে।
“তাহলে আব্বু পাখিটা তুমি নিয়েই আসো, আমিও ওর সাথে কথা বলবো” আসিফ বাবাকে বলে।
এইসব শুনে ফুলির আম্মু বেশ রাগি রাগি একটা মুখ নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসছে দেখেই ফুলি এক ঝটকায় তার রুমে ঢুকে যায়। এরপর আর দেরি না করে কাপড় নিয়েই গোসল করতে বাথরুমে ঢুকে পড়ে।