ফুলি ও সুভা

পর্ব - ৫

ফুলি ও সুভা বাংলা গল্প - লেখক মীর মোঃ তানজিরুল ইসলাম

“দাম কত বললেন না ভাই?” মেয়েটার বাবা বললো।

“দাম দিতে হবে না এমনি নিয়ে যান, আমার ও এমন একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে ছিলো ভাই। গতবছর পানিতে পরে মারা যায়, আপনার মেয়ের মধ্যে আমি আমার মেয়েকে দেখলাম মনে হলো, এমনি নিয়ে যান দাম দিতে হবে না” আমি বললাম।

দাম দিতে হবে না বলার পরও ভদ্রলোক অনেক জোর করে আমার শার্টের বুকপকেটে ৫০০০ টাকা ঢুকিয়ে দিলেন, না নিলে মাইন্ড করবেন বললেন। তাই শেষে আমিও আর কিছু বলি নি, রেখে দিয়েছি টাকা।

“আমরা শুধু পাখিটাই নিবো, আমাদের বাসায় একটা পিঞ্জিরা আছে অলরেডি। আপনি শুধু পাখিটা খুলে দেন” মেয়েটার বাবা বললো।

আমিও পাখিটা খুলে মেয়েটার হাতে দিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বিদায় জানালাম। কথা বলতে বলতে বেশ আবেগি হয়ে উঠেন দোকানদার। এতোক্ষণ গতকালকের পুরো ঘটনা বলে সামনে টেবিল থাকা জগের মধ্য থেকে এক মগ পানি নিয়ে ঢক ঢক করে খেলো দোকানদার। কোনো ক্রেতা না আসায় কথা বলায় ঝামেলা পোহাতে হয় নি দোকানদারের।

সব শুনে ফুলির মন ও ভিষণ খারাপ হয়ে গেল। কিছু বললো না সে, শুধু চুপচাপ বসে রইলো।

“এতোক্ষণ হলো আসলেন আর আমি আপনাদের চায়ের জন্য পর্যন্ত বললাম না, একটু বসুন আমি চায়ের অর্ডার দিচ্ছি” এইটা বলে দোকানদার উঠে দাঁড়ালো।

“না, চা আর খাবো না। আপনি বসুন, এমনিতেই আপনার অনেক সময় নষ্ট করলাম” আরিফ সাহেব বললেন।

“তোমার প্রতি এইটা আমার ঠিক বিচার হয় নি তুমি আমার প্রতি রাগ করো না মা” ফুলিকে উদ্দেশ্য করে দোকানদার বললো।

“না, মামা। আপনার প্রতি আমার কোনো রাগ নেই” একটু অভিমানী সুরে ফুলি দোকানদারকে বললো।

“আচ্ছা, তাহলে আমরা উঠি” আরিফ সাহেব বললেন।

“এক কাপ চা ও খেলেন না স্যার” দোকানদার বললো।

“না, আজকে আর না। আরেকদিন আসলে খাবো” প্রতি উত্তরে আরিফ সাহেব বললেন।

“ভালো থাকবেন স্যার, আর তুমিও ভালো থেকো ফুলি” এই বলে দোকানদার তাদের বিদায় দিলো।

ফুলিকে বুঝাতে বুঝাতে বাসায় নিয়ে আসলেন আরিফ সাহেব। তার মনটাও খারাপ, মেয়ে মুখ ফুটে কিছু চাইলো আর সে এনে দিতে পারলো না। আর ফুলির মন তো ভিষণ খারাপ, বেশ মন মরা হয়ে গেছে সে এই বিষয়টায়। মাঝে কয়েকদিন কেটে গেল, ফুলিও মোটামুটি তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, পাখিটার জন্য তেমন আর মন খারাপের ভাবটা নেই।

আজকে সোমবার, কলেজ ছুটির পর বাবা মেয়ে একসাথেই বেরিয়ে কলেজ গেইটে দাড়ালো।

বা পাশ থেকে একটা রিকশাওয়ালা এসে হাক দিলো “কোথায় যাবেন স্যার?”

“তুমি সেই রিকশাওয়ালা না, যে পাখি বিক্রি করে দিবে বলেছিলে?” আরিফ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।

“জি, আমি সেই” রিকশাওয়ালা নিচু স্বরে জবাব দিলো।

আর বেশি কথা না বলে আরিফ সাহেব মেয়েকে নিয়ে রিকশা উঠে বসলেন আর বললেন “বাসায় যাবো, চলো। তুমি তো চিনোই?”

“জি, স্যার চিনি” বলে রিকশাওয়ালা উত্তর দিলো।

প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেও একটু সময় যেতেই রিকশাওয়ালা বললো “পাখিটাকে কে যেন কিনে নিয়ে গেছিলো, আবার ফেরত দিয়ে গেছে।”

কথাটা শুনেই এতোক্ষণ চুপ করে বাবার পাশে বসে থাকা ফুলি বলে উঠলো “কি বলছেন মামা? দিয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, শুনেছি মেয়ের বায়নাতে কে যেন কিনে নিয়ে গেছিলো। কিন্তু দুই তিনদিন পরেই পাখিটা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আবার ফেরত দিয়ে গেছে।” রিকশাওয়ালা বললো।

“পাখিটাকে কি তুমি দেখেছো ওই দোকানে গত দুই এক দিনের মধ্যে?” আরিফ সাহেব প্রশ্ন করলেন রিকশাওয়ালা কে।

বিজ্ঞাপন

“হ্যাঁ স্যার আজকেও দেখেছি, দুপুর ১২ টা হবে তখন। ওই দোকানদার বিপরীত পাশে যেই হোটেলটা আছে না? ওইখানে আমি চা খাই যখনই রিকশা চালাতে চালাতে একঘেয়ে লাগে। আজকে একবারই চা খেতে গেছিলাম, তখন পাখিটাকে দেখেছি দোকানেই” রিকশাওয়ালা বললো।

“ঠিক করে দেখেছেন তো মামা? পিঞ্জিরায় পাখিটা ছিল তো? পিঞ্জিরাটা কিন্তু ওইখানে আছে ভেতরে পাখিটা দেখেছেন আপনি নিশ্চিত?” ফুলি এক নিঃশ্বাসে এতোগুলা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসলো রিকশাওয়ালাকে।

“হ্যাঁ মামা, আমি শতভাগ নিশ্চিত যে আমি দেখেছি” রিকশাওয়ালা এক কথাতেই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো।

“ভাই, তুমি রিকশাটা ঘুরিয়ে ওই দোকানে নিয়ে চলো আমাদের। এই পাখির জন্য আমার মেয়ের বেশ মন খারাপ ছিলো গত কিছুদিন। এখনো মুখের সেই আগের হাসিটা ফিরে আসে নি ওর, পাখি ফেরত দিয়ে গেলে আজকে ওইটা নিয়েই বাসায় ফিরবো” আরিফ সাহেব বললো।

বাবার কথায় খুবই খুশি হয়ে ফুলি বাবাকে বলে উঠলো “থ্যাংক ইয়ু বাবা। ইউ আর দ্যা বেস্ট ড্যাড, আই লাভ ইয়ু।”

রিকশা ঘুরিয়ে দোকানের দিকে যেতে লাগলো তারা।

মিনিট দশেকের মধ্যেই দোকানে পৌঁছেও গেলো।

“এইতো বাবা, পাখিটা এখানেই আছে” পাখির দিকে ইশারা করে ফুলি বললো।

ততক্ষণে দোকানদার ও টের পেয়ে গেছে ফুলি এসেছে। পাখির দিকে এক নজর তাকিয়ে দোকানের ভেতরে গেলেন আরিফ সাহেব।

কিছু বলার আগেই দোকানদার বললো “কি বলবেন তা আমি জানি। আপনি বসুন আমি চায়ের জন্য বলে আসি, আজকে আর ওইদিনের ভূল করছি না। আগে চা খাবেন তারপর সব কথা।”

অগত্যা, কি আর করা। বসলেন আরিফ সাহেব আর ফুলিকেও ডেকে এনে বসালেন। দোকানদার চায়ের জন্য বলে আসতে আসতেই প্রশ্ন করলো “খোঁজ কিভাবে পেলেন যে পাখিটা দিয়ে গেছে আবার?”

“রিকশাওয়ালার মাধ্যমে” আরিফ সাহেব বললেন।

“পাখিটা নিয়ে যাওয়ার পর সে নাকি দুইদিন কিছুই খায় নি। তারপর দিন কিছু দানা মুখে নিলেও তা ওই বেঁচে থাকার তাগিদে। না খেয়ে অসুস্থ হয়ে গেছিলো পাখিটা” দোকানদার বললো।

“আর তাই যাতে না খেয়ে মারা না যায় ওই ভদ্রলোক এসে ফেরত দিয়ে গেছে, তাইতো?” ফুলি বললো।

“একেবারে ঠিক বলেছো ফুলি” দোকানদার মাথা নাড়তে নাড়তে বললো।

“এখন ঠিক মতো খাচ্ছে তো সুভা?” ফুলি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো।

“হ্যাঁ, এখন খাচ্ছে। তবে আগের থেকে কম, তুমি যখন আসতে তখন বেশ সুখী থাকতো পাখিটা” দোকানদার বললো।

“সুভা? সুভা কে?” আরিফ সাহেব মেয়েকে প্রশ্ন করলেন।

“আরে বাবা তোমাকে বলেছিলাম না পাখিটার আমি একটা নাম দিয়েছি? ওই নামটাই তো সুভা” ফুলি বাবাকে বললো।

“ও হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছিলি তো” আরিফ সাহেব বললেন।

ততক্ষণে চা এসে হাজির, চায়ে চুমুক দিতে দিতেই আরিফ সাহেব প্রশ্ন করলেন “এখন পাখিটা নিয়ে যেতে কোনো সমস্যা নেই তো দোকানদার সাহেব?”

“না না সমস্যা নেই। আমিতো আরো দিন গুনছিলাম কখন ফুলি আসবে পাখিটা নিতে” দোকানদার বললো।

“তারমানে আপনি নিশ্চিত ছিলেন আমি আসবোই?” ফুলি দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলো।

“মোটামুটি নিশ্চিতই ছিলাম তবে কিছুটা সন্দেহ ও ছিলো, ওইদিনের পর তো তুমি আর এইদিকে আসো নি” দোকানদার বললো।

“এসে আর কি হতো? শুধু শুধু মনে পড়বে সুভার কথা এই চিন্তা করে আর আশা হয় নি” ফুলি বললো।

“আর দুই একদিন আপনাদের পথ চেয়েও যদি না আসতেন তবে আপনার কলেজে গিয়ে খবরটা দিয়ে আসবো ভেবেছিলাম” আরিফ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলেলেন দোকানদার।

বিজ্ঞাপন