'ভালোবাসা কাউকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়,কারও জীবনকে করে তোলে সুন্দর; আবার কাউকে করে তোলে হিংস্র। যে হিংস্রতা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়,অন্যকেও করে মা রাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত।
কেউ কেউ তার ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে কষ্টের সাগরে ভাসে আবার কেউ কেউ প্রত্যাখ্যানের আঘাত সইতে না পেরে অপর মানুষটির ক্ষতি করে... যেভাবে করেছে প্রত্যুষ। সে ছোঁয়াকে অন্য কারও পাশে সহ্য করতে না পেরে তার মুখে অ্যা সিড ছুড়ে মে রেছে।আচ্ছা... তারপর কী হলো?সত্যিই কি সেদিন প্রত্যুষ তার কাজে সফল হয়েছিল?
উঁহু, হয়নি! সেদিন ছোঁয়াকে আদর বাঁচিয়ে নিয়েছে। যখনই ছোঁয়ার মুখে অ্যাসিড পড়তে যাচ্ছিল,আদর তাকে আগলে নেয়; ফলে ওর পিঠে গিয়ে সেই অ্যাসিড পড়ে। ছোঁয়া বেঁচে গেলেও আদরের অনেক ক্ষতি হয়। সেদিন প্রত্যুষের গলার তীব্র চিৎকার শুনে ছোঁয়া চমকে পেছনে তাকাতেই দেখল, প্রত্যুষ বোতলের মুখ খুলে সরাসরি তার মুখ লক্ষ্য করে তরলটা ছুড়ে মারল। ভয়ে ছোঁয়ার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল,সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এল।চিৎকার দিয়ে সাহায্য চাইবে সে সুযোগটুকুও সে পেলোনা।
'কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা ঝড় এসে ধাক্কা দিল ছোঁয়াকে।দূর থেকে ছুটে আসা আদর নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ছোঁয়াকে জড়িয়ে ধরে রাস্তার একপাশে ছিটকে সরে গেল।প্রত্যুষের ছুড়ে মা রা অ্যা'সিডের সিংহভাগ গিয়ে পড়ল পিচঢালা কালো রাস্তায়। তাৎক্ষণিকভাবে সেখান থেকে ধোঁয়া উঠে রাস্তাটা পুড়ে কালো হয়ে গেল।কিন্তু পুরোপুরি রক্ষা পেল না আদর।ছোঁয়াকে আড়াল করতে গিয়ে অ্যা সিডের কিছুটা অংশ আদরের পিঠের একপাশে এবং ডান হাতের কনুইয়ের ওপর ছিটকে পড়ল।তীব্র একটা হিসহিস শব্দের সাথে সাথে আদরের শার্টের কাপড় পুড়ে চামড়াতে গিয়ে কা মড়ে ধরল।যন্ত্রণায় আদরের মুখটা নীল হয়ে গেল, কিন্তু তারপরেও সে ছোঁয়াকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে রাখল,যেন কোনোভাবেই ছোঁয়ার গায়ে এক ফোঁটা অ্যা সিডও না লাগে।অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও আদর ছোঁয়াকে বলছিল,
"তুমি ঠিক আছো তো?"
ছোঁয়া ওপর-নিচ মাথা নাড়ে।নিশ্চিত হয় আদর।ফুটপাতের ঠিক পাশেই ডিউটি করছিল কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ।এই আকস্মিক ও নৃ শংস ঘটনাটি তাদের চোখ এড়ায়নি। অ্যাসিডের বোতল ছুড়ে মেরেই প্রত্যুষ যখন পালানোর জন্য ঘুরে দৌড় দিল, মুহূর্তের মধ্যেই ট্রাফিক পুলিশরা ক্ষিপ্র গতিতে তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল। একজন পুলিশ অফিসার প্রত্যুষের হাত মুচড়ে ধরলেন।
ঠিক তখনই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের একটি টহল গাড়ি এসে রাস্তার মোড়ে থামল। ট্রাফিক পুলিশরা প্রত্যুষকে টেনেহিঁচড়ে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। হাতকড়া পরা অবস্থায়, পুলিশের গাড়িতে ওঠার শেষ মুহূর্তেও প্রত্যুষ একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ছোঁয়ার দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না; ছিল চরম হিংস্রতা আর প্রতিশোধের আগুন,যা দেখে ছোঁয়া আতঙ্কে আদরের বুকে আরও লেপ্টে গেল।
আদরের ক্ষতটা খুব বেশি গভীর ছিল না, কারণ অ্যা সিডের বেশিরভাগটাই রাস্তায় পড়েছিল। ছোঁয়া তখন আদরকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটল। ডাক্তাররা দ্রুত জরুরি চিকিৎসা শুরু করলেন; ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে বিশেষ মলম আর ব্যান্ডেজ মুড়িয়ে দেওয়া হলো। ডাক্তার জানালেন, চামড়া খুব বেশি পুড়েনি, তবে ক্ষত শুকাতে আর চামড়ার স্বাভাবিক রং ফিরে আসতে মাস তিনেক সময় লাগবে।
পরের তিনটি মাস ছোঁয়া এক মুহূর্তের জন্যও আদরের কাছ থেকে দূরে সরে যায়নি। প্রতিদিন নিজ হাতে আদরের ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া, তাকে খাইয়ে দেওয়া সব ছোঁয়া একাই করত। ছোঁয়া মানুষটার প্রতি ঋণী হয়ে গিয়েছিল। ওদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে ততদিনে।তবে ভালোবাসার সম্পর্কটা ঠিক গড়ে ওঠেনি তখনও!
.
তারপর অতিবাহিত হলো অনেকগুলো দিন। আদর আর ছোঁয়ার সম্পর্কটা ভেঙে যাবে ভেঙে যাবে করেও আবার জোড়া লেগে গেল। আর জোড়াটা লাগল আমিরার জন্য।আমিরার বয়স এখন ৬ বছর। আদর আর ছোঁয়ার বিয়ের পরে ২ টা বছর কে টে গেছে। ওরা দুজনেই বুঝদার,দুজনেরই প্রচুর আত্মসম্মানবোধ। কেউ কারও কাছে নত হয়নি। কেউ-ই কাউকে আগে ভালোবাসার কথা জানায়নি; তবে এক ছাদের নিচে এত দিন থাকতে থাকতে কেমন যেন এক অনুভূতি জন্মেছে।তা দুজনেই ঠাহর করতে পেরেছে।এর নাম যদি ভালোবাসা হয়,তাহলে আদর আর ছোঁয়া দুজনেই দুজনকে ভালোবাসে।তাহলে প্রকাশ করতে এতো আপত্তি কোথায়?
.
আজ আমিরার জন্মদিন, বাড়িতে মেহমানদের আনাগোনা। আমিরার স্কুলের ফ্রেন্ডরাও এসেছে, ওর মাম্মি-পাপ্পার অনেক প্রশংসা করছে। আমিরার শুনতে ভালোই লাগছে। ওর মাম্মি হলো বেস্ট মাম্মি, যে ওর র ক্তের কেউ না হয়েও ওকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছে।আর আদর হলো বেস্ট বাবা, যে আমিরার সুখের জন্য নিজের জীবনটাও দিয়ে দিতে পারে।এমন দুটো মানুষকে মা-বাবা হিসেবে পেয়ে আমিরা অনেক খুশি!
মেহমানদের অনেকেই আদরের অফিসের লোক! তার মধ্যে ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট সানিয়া একজন,যে আদরকে পছন্দ করে। মেয়েটা এসে সোজা আমিরার কাছে গেল। আমিরা আর ছোঁয়া তখন পাশাপাশি বসে আছে। আমিরা কালো কালারের একটা সুন্দর গাউন পরেছে, তার সাথে ম্যাচিং করে একই রঙের শাড়ি পরেছে ছোঁয়া। আদরও পরেছে একই রঙের পাঞ্জাবি। আমিরা বায়না করছিল মাম্মির মতো লিপস্টিক লাগাবে, তাই ছোঁয়া ওকে লিপস্টিক লাগিয়ে দিচ্ছিল।এ দৃশ্য আবার দূর থেকে দেখছিল আদর। তখনই সে খেয়াল করল, সানিয়া গিয়ে আমিরার হাতে একটা ফুলের তোড়া আর গিফট দিয়ে বলছে,
"আমিরা মামুনি,দিস ইজ ফর ইউ!"
আমিরা ছোঁয়ার দিকে তাকায়, ইশারায় জিজ্ঞেস করে গিফটগুলো নেবে কিনা? ছোঁয়া হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেই আমিরা গিফটগুলো নেয়। সানিয়া তখন ছোঁয়াকে বলে,
"আ.... তুমি কি একটু যাবে?আমার আমিরার সাথে কথা ছিল।"
আদরের অফিসের লোক, তাই ছোঁয়া না করল না। অন্য কেউ হলে বা অন্য সময় হলে সে পাল্টা প্রশ্ন করত, যেতে চাইত না। আমিরার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেস্টরা বিদায় নিচ্ছে!ছোঁয়া যেতেই মেয়েটা আমিরার ঠিক পাশে বসল, ওকে জিজ্ঞেস করল,
"আচ্ছা... আমিরা, আমাকে তোমার কেমন লাগে?"
"ভালো না।"
মেয়েটার হাসিমাখা মুখটা বেজার হয়ে গেল। বাচ্চা মানুষ, তাই কথাটা মনে ধরল না। ভাবল, একটু সময় মিশলেই বন্ধুত্ব হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হলো না। মেয়েটা হাড়ের বজ্জাত! ডাইনি-ফাইনি করে অপমান করছে সানিয়াকে। সানিয়া সেসবও মনে ধরল না। আমিরাকে জিজ্ঞেস করল,
"আমিরা, তুমি তো বাচ্চা। বাচ্চারা এমন দুষ্টুমি করে?"
আমিরা দুই দিকে মাথা নাড়ে, যার উত্তর না। সানিয়া এবার বলে,
"আচ্ছা একটা কথা বলো তো,তোমার পাপ্পার পাশে আমাকে কেমন লাগবে?"
"ভালো না। পাপ্পার পাশে আমার মাম্মি ছাড়া আর কাউকেই ভালো লাগে না। না মানে না।"
"কিন্তু তোমার মাম্মি তো নেই।আমি তোমার মাম্মি হলে কেমন হবে?"
আমিরা রাগল,গাল ফুলাল সে।দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোঁয়াকে দেখিয়ে বলল,
"ওই তো আমার মাম্মি।"
আমিরার কথা অনুসরণ করে সানিয়া তাকায় ওদিকে। ছোঁয়াকে দেখতে পায় সে। সত্যিই কি ছোঁয়া আদরের স্ত্রী! কিন্তু ওদের ভাবসাব দেখে তো তা মনে হচ্ছে না!সানিয়া কেমন একটা ভাব নিয়ে বলল,
"ওই মেয়েটা!সিরিয়াসলি!"
আরও কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো সানিয়া।এক ভরাট পুরুষালী কন্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে,
"ওই মেয়েটা নয় সানিয়া।শি ইজ মাই ওয়াইফ।মিসেস আহসান।বুঝলে?"
সানিয়া থমথম খেয়ে বলল,
"হ... হ্যাঁ স্যার। বুঝেছি।"
আমিরাকে নিয়ে আদর চলে গেলো ওখান থেকে।সময় হয়ে এসেছে এবার কেক কা টতে হবে।
.
আমিরা কেক কা টল। তার মাম্মি-পাপ্পাকে নিয়ে অনেক ছবিও তুলল। সব মেহমানরা চলে গেলে আদর ছোঁয়াকে নিয়ে কোথাও একটা গেল। ছোঁয়া জানে না আদর তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, জিজ্ঞেসও করেনি। আজকাল উনার চোখের দিকে তাকাতেও কেমন যেন লাগে। লোকটার চাহনি অন্য কিছু বলে। আচ্ছা, আদর কি ছোঁয়াকে ভালোবাসে? নিজের প্রশ্নের উত্তরটা পেয়েও গেল ছোঁয়া।
আদর তাকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে গেল। চারদিক দেখে ছোঁয়া আনন্দে আত্মহারা হলো। ফুল আর ক্যান্ডেল দিয়ে সুন্দর করে সাজানো চারদিক। ছোঁয়ার অনেকগুলো ছবি দিয়ে ডেকোরেট করা হয়েছে জায়গাটা। ছোঁয়া চারদিকে চোখ বুলিয়ে আদরের পানে তাকায়, ওকে বলে,
"এসব আপনি করেছেন? আমার জন্য!"
"হুম।"
"হঠাৎ... এসব কেন?"
ছোঁয়ার হাত দুটো ধরে চুমু খেয়ে বলল আদর,
"ভালোবাসি তাই!"
"সত্যিই ভালোবাসেন?"
"হুঁ।"
ছোঁয়া চুপ করে রইল।স্মৃতিচারণ করল পুরোনো দিনের। সেই বিয়ের দিনের পর থেকে সুন্দর সুন্দর সব ঘটনাগুলো তার মনে পড়ল আবারও।আচ্ছা, সে কি আদরকে ভালোবাসে? বাসে হয়তো! নইলে লোকটার কষ্টে ওর কেন কষ্ট হয়? উনাকে না দেখলে মনটা ওভাবে ছটফট করে কেন?ভালোবাসে বলেই হয়তো! আদর আরেকটু এগোল,ছোঁয়াকে প্রশ্ন করল,
"তুমি কি আমাকে ভালোবাসো,ছোঁয়া?"
"হয়তো!"
আদর হাসল।সে জানে ছোঁয়া তাকে ভালোবাসে।একটু হলেও ভালোবাসে।তবে মুখে স্বীকার করতে পারছে না।তবে আদরের বিশ্বাস, একদিন ও গভীরভাবে আদরকে ভালোবাসবে।যেভাবে সে বেসেছে।আদর আবারও বলল,
"আজ আমার স্বীকার করতে কোনো অসুবিধা নেই ছোঁয়া। আমি তোমাকে ভালোবাসি,ভালোবাসতে বাধ্য হয়েছি। তুমি সারাজীবন আমার সাথে থেকো, প্লিজ। আমিরার জন্য হলেও থেকে যেও। আমি তোমাকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখব, আমার রানি বানিয়ে রাখব।"
ছোঁয়া বলল,
"আপনি রেখে দিলে আমার চলে যাওয়ার সাধ্য কোথায়?"
কথাটা বলা মাত্রই ছোঁয়ার চোখ দুটোর সন্ধি ঘটল আদরের চোখের সাথে। সে চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। আর কিছুক্ষণ তাকালেই জ্ঞান হারাবে টাইপ অবস্থা হলো ওর! সে মাথা রাখল আদরের বুকে।আদর তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।আকাশ, বাতাস আর সুন্দর প্রকৃতিকে সাক্ষী রেখে আবারও বলল,
"ভালোবাসি।"
ছোঁয়ার কাছ থেকেও এল একই উত্তর,
"ভালোবাসি।ভালোবাসি মি. আহসান।"