অল্প বেঈমানী মন

পর্ব - ১

অল্প বেঈমানী মন বাংলা গল্প - লেখিকা আফরোজা আঁখি

'উনি বিবাহিত।আর একটা বাচ্চাও আছে।এমন একজন মানুষকে আমি বিয়ে করতে পারব না।না মানে না।কখনোই না।এর থেকে ভালো তোমরা আমাকে বি ষ খাইয়ে মে রে ফেলো।'

বদ্ধ দরজার ওপাশে থাকা মেয়েটি বার বার বলে যাচ্ছে কথাগুলো।ওর মা আর বড় বোন ছায়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।ডাকাডাকি করছেন।কিন্তু মেয়ের কানে যাচ্ছে না সেই ডাক।ওর বাবা বসে আছেন ড্রইং রুমে পাতানো সোফায়।উনার সামনেই বসে আছেন ছায়ার হবু শশুর বাড়ির লোকজন।ছোঁয়া যাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল সেও ওখানে উপস্থিত।লোকটা নিশ্চিত মনে ফোন ঘাটছে।ছোঁয়ার বাবা জামশেদ আহমেদের রাগ হচ্ছে কিন্তু কিছু করতে পারছেন না।মেয়ের কান্নাকাটি দেখে উনি একসময় উঠে গেলেন।বদ্ধ দরজার ধাক্কা দিয়ে বললেন,

"ছোঁমা মা।তোমাকে এই বিয়ে করতে হবেনা।আমি এই বিয়ে হতে দিব না।তুমি বেরিয়ে আসো।"

উনার কথার রেশ টেনে সাথে সাথেই বলে উঠলো ছায়ার হবু বর আহির,

'তাহলে আপনার বড় মেয়ের সাথে আমার বিয়েটাও হচ্ছে না।বিয়ের ঠিক একদিন আগে বিয়ে ভেঙে গেলে মানুষজন কি বলবে একবার ভেবে দেখুন!'

জামশেদ আহমেদ রাগী চোখে তাকালেন।আহিরকে বললেন,

'মজা হচ্ছে আমার সাথে?তোমার আর তোমার পরিবারের মানুষদের মনে এমন নোংরামি ছিলো তা আগে বলো নি কেন?'

'আগে বললে আজকের দিন টা আসতো না!আপনি প্রথম দিনই বিয়েটা ভেঙে দিতেন।তাই বলিনি।'

ভদ্রলোক ছেলেটার সাথে কথায় পেরে উঠছেন না।ভারী বেয়াদব সে।উনি রাগ ঝাড়লেন বড় মেয়ের উপর।ছায়াকে বললেন,

'ছিহ!এ তোমার পছন্দ?এ কেমন ছেলেকে ভালোবেসেছো ছায়া!যে নিজের ভাইয়ের স্বার্থে তোমাকে বিয়ে করছে।'

'আব্বু এভাবে বলো না। আমি কি আর জানতাম ও দেখতে মানুষের মতো হলেও স্বভাব গিরগিটির মতো হবে!'

আহির ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালো।উফফ!সে মোটেও এমন নয়।এসব করতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে।তবে ছায়াকেও আগে থেকে ম্যানেজ করে নিয়েছে যাই হয়ে যাক সে যেন এই বিয়েটার বিপক্ষে চলে যা যায়।এখানে যা হচ্ছে সবটার জন্য দায়ি আদর।আহিরের বড় ভাই।ওর একটা বাচ্চা আছে সে বাচ্চার বয়স ৪ বছর মতো হবে।বাচ্চাকে জন্ম দেওয়ার সময় আহিরের স্ত্রী মারা যায় তারপর থেকে ৪ টা বছর একাই আছে।নতুন করে কিছুই শুরু করতে চায়নি।মেয়েকেও বড় করেছে সে একা হাতেই কিন্তু ইদানীং মেয়ের বায়না বেড়েই চলেছে।তার নাকি মা চাই।আদর মেয়েকে বোঝাতেই পারেনা তার মাকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব!সেদিন যখন আহিরের বিয়ের কথা বলতে ছোট্ট আমিরা এলো দাদা দাদির সাথে তখন সে ছোঁয়াকে দেখেছে।অদ্ভুত ভাবে ছোঁয়ার সাথে আদরের মৃত স্ত্রী এর মুখের আদলের অনেক মিল।যদিও মানুষ দুটো আলাদা।আমিরা যখন ছোঁয়াকে দেখলো তখন থেকেই কান্নাকাটি জুড়েছে ছোঁয়াকে ওর চাই।ও সবসময় ছোঁয়ার কাছে থাকতে চায়।কিন্তু এ কি করে সম্ভব?অবশেষে আদর নিজের এতোদিনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করল।ঠিক করল সে বিয়ে করবে।কিন্তু ছোঁয়া মেয়েটা নাচরবান্দা!সে এ বিয়ে করতে চাইছেনা।আদর মনে মনে কি যেন ভেবে উঠে গেলো।দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল,

"ছোঁয়া... আপনি একবার দরজাটা খুলুন।একবার আমার সাথে কথা বলুন।কথা দিচ্ছি.... আমি আপনাকে জোর করব না।একবার শুধু আমার সাথে কথা বলুন।আমার সব কথা শুনুন।তারপর বিয়েটা করবেন কিনা তা আপনার সিদ্ধান্ত!"

ভদ্রলোকের কথা শুনে অশান্ত ছোঁয়া শান্ত হলো।ঝড়ের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত হয় তেমন শান্ত।তার বুকের দরফরানি কমেছে ইতিমধ্যেই।সে কিছুসময় পায়চারি করল কি যেন ভাবলো তারপর গিয়ে দরজাটা খুললো।সামনের মানুষটাকে দেখে সে যেন অবাকের চুড়ান্ত সীমায় পৌঁছালো।ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা ছোঁয়ার অফিসের বস।ও যে কোম্পানিতে জব করে সে কোম্পানির সিইও উনি।মনে মনে লোকটাকে পছন্দ করে ছোঁয়া।আগে যদি জানতো উনিই সে তাহলে এমন বাঁদড়ামো করতো না।কিন্তু এখন কি হবে?লোকটা তো বিয়ে করবেই না সাথে চাকরিটাও বোধহয় হারাতে হবে।ছোয়া নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরুলো।সবাই অবাক হলো ছোঁয়ার কাজে।ছায়া আর ওর মা ওকে রেগে কিছু বলতে চাইলে আদর হাত উঁচিয়ে এমনটা করতে বারণ করল।বাইরে থাকা সবার উদ্দেশ্যে বলল,

"আহির আর ছায়ার গায়ে হলুদের কাজ কমপ্লিট করো।আমি ছোঁয়ার সাথে কথা বলে আসছি।"

বন্ধ রুমে একা দুটো ছেলে মেয়ে থাকলে কেমন যেন দেখায়।তাই ছোঁয়া বলল ছাদে আসতে।আদর তাই করল।ওরা দুজন মিলে ছাদে গেলো।ছাদের রেলিঙে হেলান দিয়ে বুকে দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে আদর।ওর পুরো নাম আদর আহসান।আদরের নিজের একটা বড়সড় কোম্পানি আছে।নিজ হাতে সে কোম্পানিকে বড় করে তুলেছে সে।ছোঁয়া সবটাই জানে আর জানে বলেই লোকটার প্রতি সামান্য ভালো লাগা আছে।

আদর আর ছোঁয়া দুজনের মধ্যেই নিরবতা বিরাজ করছে।সেই নিরবতা ভেঙে কথা বলল আদর,

"আমি বিবাহিত,আমার বাচ্চা আছে এটাই আপনার বিয়ে না করার কারণ?"

ছোঁয়া উপর নিচ মাথা নাড়ে।যার উত্তর হ্যাঁ।আদর বলে,

"এটাই স্বাভাবিক।আপনার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে থাকলেও এমনই করতো। আচ্ছা... শুনুন।আপনি আমার থেকে বয়েসে অনেক ছোট তুমি করেই বলি?"

ছোঁয়া উপর নিচ মাথা নাড়লো।আরও কিছু সময় কথা বলল দুজনে।অবাক হলো।লোকটা এতো ভালো?হুম অফিসের সবার থেকেই সে শুনেছে লোকটা অনেক ভালো আজ তার প্রমাণও পেলো।ছোঁয়ার ভাবনা ভুল প্রমাণিত হতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো মাত্র।আদর নিজের চিরচেনা স্বাভাবিক রূপ থেকে বেরিয়ে বলল,

"তোমার আব্বু তো অসুস্থ।চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে।শুনলাম তোমাদের বাড়িটার উপরেও অনেকের নজর।আচ্ছা তোমাদের বাড়িটা যদি না থাকে?চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে তোমার আব্বুর যদি কিছু একটা হয়ে যায়?যদি তোমার বোনকে আমার ভাই বিয়ে না করে?কেমন লাগবে একটু বলুন তো?"

ছোঁয়ার কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়ল।আদর সম্পর্কে নিজের ভাবনা ভুল হওয়ায় সে বড়সড় একটা ধাক্কাও খেলো।ছোঁয়া আদরকে বলল,

"আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?"

"ধরে নাও তাই!তবে... তুমি যদি বিয়েটা করো তাহলে ভয় পাওয়ার কিছুই থাকবে না।তুমি শুধু বিয়েতে রাজি হয়ে যাও।বাকি সব আমি সামলে নেব।তোমাকে রাণী বানিয়ে রাখব।করবে আমাকে বিয়ে?"

বিজ্ঞাপন