মন বোঝে না

পর্ব - ২১

🟢

ঘুম হালকা হয়ে আসতেই আশপাশ হাতড়ে সারাহকে খুঁজতে লাগল আবরার। নাগালে না পেয়ে চোখ মেলে তাকাল, সারাহ কিছুটা দূরেই ঘুমে বিভোর। এগিয়ে এলো সারাহর কাছে। পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মিশিয়ে নিলো বুকের সঙ্গে।

সারাহ নড়েচড়ে উঠল। আবরার আরও ভালোভাবে আবদ্ধ করল তাকে। সারাহর ঘুম ছুটে গেলো পুরোপুরি। সে ব্যস্ত হয়ে আবরারের কাছ থেকে দূরে সরতে চাইল, কিন্তু আবরার ছাড়ল না। ঘুম জড়ানো ভারী কন্ঠে বলল,

"চড়ুই পাখির মতন ছটফট করছো কেন এভাবে?"

সারাহর কন্ঠ দিয়ে আওয়াজ বের হতে চাইল না। কোনো রকমে বলল,

"ছাড়ুন।"

আবরার মুচকি হেসে বলল,

"গতকাল কী বলেছিলাম মনে নেই?"

"কী বলেছিলেন?"

আবরার সারাহর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,

"মৃ'ত্যুর আগে আর ছাড়ছি না।"

কথাগুলো বলেই কানের লতিতে ওষ্ঠ ছোঁয়াল। ঘাড়ে মুখ গুঁজতেই লজ্জায় আড়ষ্ট হলো সারাহ। জানালার দিকে চোখ পড়তেই বুঝতে পারল সকাল হয়ে গেছে। আবরারের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে বলল,

"সকাল হয়ে গেছে।"

আবরার ঘাড়ে মুখ গুঁজে রেখেই নেশালো কন্ঠে বলল,

"হউক।"

মন বোঝে না শেষ পর্ব - বাংলা সামাজিক গল্প -সানা শেখ

আবরারের সঙ্গে ড্রয়িংরুমে এলো সারাহ। বাড়িতে অনেক মেহমান। সবাই নতুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আমজাদ খানের কাছে এগিয়ে এসে সারাহ নিচু কন্ঠে সালাম দিলো,

"আব্বু, আসসালামু আলাইকুম।"

আমজাদ খান হাসি মুখে সালামের জবাব দিয়ে নিজের পাশে দেখিয়ে বললেন,

"বসো, মা।"

সারাহ আবরারের মুখের দিকে তাকাতেই আবরার চোখের ইশারায় বসতে বলল। সারাহ বসল শ্বশুরের পাশে। ছেলেকে সটান দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমজাদ খান আবার বললেন,

"আবরার তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?"

আবরার গাম্ভীর্য ভাব বজায় রেখে বলল,

"আপনি আপনার মাকে বসতে বলেছেন, আমাকে তো বসতে বলেননি।"

আমজাদ খান ফ্যালফ্যাল করে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, বাকিরা সশব্দে হেসে উঠেছে।

আমজাদ খান বললেন,

"আব্বু, বসুন দয়া করে।"

আবরার সরু চোখে বাবাকে দেখতে দেখতে সারাহর পাশে বসল। একজন মেইড চা আর কফি নিয়ে এলো সকলের জন্য। আবরার কফি নিলো, আমজাদ খান চা, সারাহ কিছুই নিলো না। চা কফি তার পছন্দ না।

.

ওয়ালিমার আয়োজন করা হয়েছে খান হাউজেই। চারদিকে মানুষ গিজগিজ করছে।

ফারিশ-রাও চলে এসেছে খান বাড়িতে। সবাইকে দেখে আবেগ প্রবন হয়ে পড়েছিল সারাহ।

আবরারের বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ ফারিশের নজর পড়ল একটা মেয়ের উপর। মেয়েটার পরনে ব্ল্যাক গাউন, চুলগুলো উচুঁ করে বাঁধা, লাইট মেকআপ, চেহারায় অদ্ভুত মায়া। গাউন ধরে হাঁটছে আর কাউকে খুঁজছে। ফারিশ নিজেকে ভুলে একভাবে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে।

জুনায়েদ ফারিশের কাঁধে চাপড় মে'রে বলল,

"কি ভাই, বাস্তব দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেলেন নাকি? ডাকছি সাড়া দিচ্ছেন না কেন?"

ফারিশের চমকে ওঠা দেখে মনে হচ্ছে সে সত্যি সত্যিই বাস্তব জগতের বাইরে ছিল। নিজেকে ধাতস্থ করতে বেশ কিছুটা সময় লাগল তার। পুনরায় মেয়েটার যাওয়ার পথে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা চোখের আড়ালে চলে গেছে। ফারিশ চোখ ফিরিয়ে নিলো। তার হার্টবিট বেড়ে গেছে অনেক। কী হয়ে গিয়েছিল তার? সে এভাবে একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল! সিরিয়াসলি?

মৃন্ময় বলল,

"আবার কোথায় হারিয়ে গেলেন?"

মৃন্ময়ের কথায় ফের ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো ফারিশ। সকলের অগোচরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

ছোটো ভাইকে নিয়ে স্টেজের দিকে এগোতেই ফারিশের নজর আবার পড়ল সেই মেয়েটার উপর। মেয়েটা চেয়ারে বসে আছে, পাশে বসে থাকা ছোটো মেয়েটার সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলছে।

ফারিশ দাঁড়িয়ে গেল, তার বুকের ভেতর কিছু একটা হচ্ছে। দৃষ্টি সরিয়ে নিলেও আবার তাকাল সে। বেশ অবাক হলো। আশ্চর্য! আজ তার মন তার কথা শুনছে না। তার অবাধ্য হয়ে বারবার মেয়েটাকেই দেখতে চাইছে। তার সঙ্গে তো এরকম কখনো হয়নি। মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো সে মেয়েটাকে আজকের আগেও দেখেছে, কিন্তু কোথায় আর কবে দেখেছে মনে পড়ছে না। কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর মনের বিরুদ্ধে গিয়ে চোখ ফিরিয়ে সরে এলো ফারিশ। সে আর তাকাবে না ওই মেয়েটার দিকে।

খাবার খাওয়ার সময়ও বারবার মেয়েটার দিকে চোখ চলে যাচ্ছে ফারিশের। সে তাকাবে না তাকাবে না করেও বারবার তাকাচ্ছে। পাশের টেবিলে বসে খাচ্ছে মেয়েটা। বসেছে তার দিকে মুখ করে। মেয়েটা অবশ্য তার দিকে একবারও তাকাচ্ছে না। সে নিজের খাওয়া আর গল্প নিয়ে ব্যস্ত।

আবরার বলল,

"ফারিশ, খাচ্ছিস না কেন?"

চমকে উঠল ফারিশ। তাকে এমন করতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সবাই। সারাহ বলল,

"ভাইয়া, কিছু হয়েছে আপনার?"

ফারিশ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

"না, কিছু না। খাও তোমরা।"

ফাইয়াজ জহুরীর চোখে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের মুখের দিকে। ফারিশ কিছু লুকাচ্ছে সে শিওর, কিন্তু কী লুকাচ্ছে?

সময় গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা রাত দশটার ঘরে চলে এসেছে। আবরার আর সারাহকে নিয়ে নিজেদের বাড়ির উদ্যেশ্যে রওনা দিবে ফারিশ-রা। গাড়ির কাছে চলে এসেছে সবাই।

মহুয়া কবীর নিতু সুলতানার কাছে এসে দাঁড়ালেন। তার পাশে দাঁড়াল তার ভাইয়ের মেয়ে ইভা। মায়ের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ফারিশ, সে তাকিয়ে আছে আবরার, বাবা আর মামার দিকে। পাশ ফিরতেই নিজের সামনে ইভাকে দেখতে পেলো। ইভাকে এত কাছে দেখেই তার বুকের ভেতর দামামা বাজতে লাগল। শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। এই মেয়ে বারবার তার চোখের সামনে কেন চলে আসছে এভাবে? যেদিকেই যায় সেদিকেই এই মেয়ে।

নিতু সুলতানা ইভার মুখের দিকে চেয়ে আবার মহুয়া কবীরের দিকে তাকালেন। হাসি মুখে বললেন,

"ওকে ঠিক চিনতে পারলাম না।"

মহুয়া কবীর নিজেও পূর্বের ভাব বজায় রেখে হাসি মুখে বললেন,

"ও ইভা, আমার ভাইয়ের মেয়ে।"

"ওহ। ভারী মিষ্টি মেয়েটা।"

নিতু সুলতানার কথা শুনে লাজুক হাসল ইভা।

ইভার নামটা শুনে শব্দহীন উচ্চারণ করল ফারিশ। নামটা তার ভীষণ চেনা। আর মহুয়া কবীরের ভাইয়ের মেয়ে মানে এটা সেই ছোটো ইভা। এই জন্যই তার বারবার মনে হচ্ছিল সে মেয়েটাকে আগেও বহুবার দেখেছিল। সেই পুঁচকে মেয়েটা এত বড়ো হয়ে গেছে! আগে মামার বাড়িতে যাওয়া আসা থাকায় প্রায়ই ইভাকে দেখতো এই বাড়িতে। কিছুদিন পর পরই ফুপির কাছে বেড়াতে আসতো ইভা। আবরার অবশ্য ইভাকে তেমন পছন্দ করতো না। শুধু ইভা নয়, মহুয়া কবীরের বাবার বাড়ির কাউকেই পছন্দ করতো না।

তবে ফারিশের কাছে ইভাকে ভালোই লাগতো। শান্তশিষ্ট নম্র ভদ্র একটা বাচ্চা। কখনো কোনো দুষ্টামি করতো না। শান্ত স্বভাবের হওয়ার কারণেই ফারিশের নজরে এসেছিল তখন।

একবার আবরার আর ফারিশ বাড়ির ভেতর প্রবেশ করেছে ঠিক সেই মুহূর্তে পোষা বিড়ালের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে ধপাস করে আছড়ে পড়েছিল ইভা। নাদুস নুদুস গোলুমোলু শরীর হওয়ায় শব্দটা একটু বেশি জোরেই হয়েছিল। নিচে পড়ে সেভাবেই রইল ইভা, ওঠার চেষ্টা করলেও উঠতে পারেনি। ড্রয়িংরুমে কেউ ছিলও না তখন। ফারিশ আবরারকে বলেছিল ইভাকে তোলার জন্য। কিন্তু আবরার সাফ সাফ মানা করে বলেছিল সে তুলতে পারবে না। ফারিশের যদি বেশি দরদ লাগে তাহলে যেন সে-ই গিয়ে তোলে। সত্যি সত্যিই যখন ইভাকে তোলার জন্য ফারিশ এগোতে লাগল তখন আবরার তার হাত টেনে ধরে যেতে বাধা দেয়। ফারিশ জোর করে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ইভার কাছে এগিয়ে এসে তাকে তোলে। ইভার ধবধবে ফরসা চেহারা পুরো লাল হয়ে গেছে। চোখ দুটো ভরা বিলের মতন টইটম্বুর। তেরো বছরের ফারিশ গম্ভীর গলায় যখন জিজ্ঞেস করেছিল ইভা বেশি ব্যথা পেয়েছে কি-না, তখন ছয় বছরের ইভা ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠেছিল। ইভার কান্না দেখে ফারিশ কী করবে বা বলবে বুঝতে পারছিল না তখন। এতক্ষণ উপুর হয়ে পড়ে ছিল কান্নার খবর ছিল না। আর সে শুধু জিজ্ঞেস করায় এভাবে কাঁদতে হবে?

পরে মহুয়া কবীর এসে ইভাকে শান্ত করান। শুধু জিজ্ঞেস করায় ইভা কেন কেঁদেছিল ফারিশ এখনো জানে না। হয়তো তাকে দেখে ভয় পেয়েছিল বা অন্য কোনো কারণে।

ইভার নজর পড়ল ফারিশের মুখের দিকে। ফারিশকে একভাবে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে তার চেহারা চুপসে গিয়ে আঁধার নেমে এলো। দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে আশপাশ দেখল ইভা। তাদের পেছনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এখান থেকে বের হতে চাইলে তাকে ঠেলাঠেলি করে বের হতে হবে। ফারিশের সামনে থেকে সরে এসে ফুপির পেছনে নিজেকে আড়াল করে দাঁড়াল। এই ছেলে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন তার দিকে?

ফারিশ অন্য দিকে তাকিয়ে নিজের ঘাড় চেপে ধরল। নিচের ওষ্ঠ কা'মড়ে ধরে মুচকি হাসি আড়াল করার চেষ্টা করল। ইভাও তাকে ভয় পায়? কিন্তু কেন? কীভাবে তাকিয়ে ছিল মেয়েটার দিকে! মেয়েটা তার ব্যাপারে কী ভাবছে কে জানে!

কিছুক্ষণ বাদে ফারিশ আবার তাকাল ইভার দিকে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখে চোখ পড়ল দুজনের। ইভাও তার দিকে তাকিয়ে ছিল। অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত উল্টো ফিরে দাঁড়াল ইভা।

আবরার ফারিশের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ এগিয়ে ফিসফিস করে বলল,

"বারবার ওদিকে দেখছিস কেন?"

ফারিশ মুখ ঘুরিয়ে আবরারের দিকে তাকাল। আবরার চোখের ইশারায় ইভাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল,

"অনেকবার দেখলাম তুই বারবার ওকেই দেখছিস।"

ফারিশ নিজেও ফিসফিস করে বলল,

"তোর রোগে ধরেছে, মন বোঝে না।"

"মন বোঝে না?"

"একদমই না। আমি তো দেখতে চাই না, কিন্তু মন বারবার ওদিকে চলে যাচ্ছে।"

"লাগবে?"

"হুম।"

"তাহলে আমার বোনের কী হবে যাকে আঠারো বছর পর বিয়ে করতে চাইলি?"

"এটাও তো তোরই বোন।"

"তুই না বললি তুই ধৈর্যহীন মানুষ না।"

"হ্যাঁ। কোনো সন্দেহ আছে তোর?"

"আঠারো বছর পর বিয়ে করবি।"

"তোর মামা আমার জন্য আঠারো বছর ঘরে বসিয়ে রাখবে?"

কথাগুলো বলে আবার তাকাল ইভার দিকে। ইভাও চোরা চোখে দেখছিল তাকে।

আবরার ফিসফিস করে বলল,

"মনে হয় রাখবে না।"

ফাইয়াজ ফিসফিস করে বলল,

"আমি কিন্তু সব জেনে গেছি।"

চমকে উঠে দুজন ফাইয়াজের দিকে তাকাল। এই ছেলে কখন এলো এখানে? ফাইয়াজ দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বাবার কাছ থেকে ফাহিমকে নিজের কোলে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। ফাহিমের গালে ঠেসে একটা চুমু খেয়ে বলল,

"খুব শীগ্রই আরেকটা বিয়ে খাবো আমরা। তুই আর আমি পানি ওয়ালা ডান্স গানে নাচবো ঠিক আছে?"

ফাহিম উচ্ছ্বসিত হয়ে মাথা নেড়ে বলল,

"ঠিক আছে, কিন্তু কার বিয়ে?"

"ভাইয়ার।"

ফাহিম অবাক হয়ে বলল,

"ভাইয়া বিয়ে করবে কেন?"

"কারণ ভাইয়া বড়ো হয়ে গেছে, তার বিয়ের বয়স হয়েছে।"

বিজ্ঞাপন

"তুমিও তো বড়ো হয়ে গেছো। তুমি কবে বিয়ে করবে?"

"যেদিন তুই বড়ো হবি সেদিন। তুই আর আমি একসঙ্গে বিয়ে করব, ঠিক আছে?"

"আচ্ছা। কিন্তু আমি কবে বড়ো হবো?"

"বিশ বছর পর।"

"বিশ বছর পর কত দিন পর আসবে?"

"আল্লাহ গো, এইডা কী পাঠাইছো? বিশ বছর পর কত দিন পর আসবে এটা কেমন প্রশ্ন? চুপ কর ভাই, আর একটাও কথা বলবি না। চোখ বন্ধ কর, ঘুমা।"

সারাহকে গাড়িতে বসিয়ে আবরার পাশে বসল। ফারিশ ড্রাইভিং সিটে বসে আরও একবার তাকাল ইভার দিকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার কী হয়ে গেল? সে নিজের মনকে কোনোভাবে কন্ট্রোলই করতে পারছে না।

ফ্রন্ট সিটে বসে থাকা ফাইয়াজ ছোটো ভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বড়ো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল,

"এভাবে না দেখে সামনে বসিয়ে দেখার ব্যবস্থা করো। অন্যের মেয়ে এভাবে দেখলে জুতা নিয়ে এসে মা'রবে।"

ফারিশ তড়িৎ গতিতে ফাইয়াজের মুখের দিকে তাকাল, তারপর তাকাল পেছনে বসা সারাহর দিকে। সারাহ মাথা নিচু করে বসে আছে। মনে হচ্ছে না সে কিছু শুনতে পেয়েছে। ফারিশ চোখ রাঙিয়ে ভাইকে শাসাল, তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ছুটল বাড়ির উদ্দেশ্যে।

.

ড্রয়িংরুম এখন প্রায় ফাঁকা। ক্লান্ত থাকায় সবাই যার যার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেছে ঘুমোনোর জন্য। ফারিশ পানির জগ হাতে নিচে নেমে এলো, সোফার দিকে তাকিয়ে দেখল ফাইয়াজ এখনো সোফায় বসে আছে। রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,

"ফাইয়াজ, রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।"

ফাইয়াজ ফোনের স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখেই বলল,

"হুম যাচ্ছি।"

পানি ভরতি জগ হাতে ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখল ফুয়াদ হাসান সোফার কাছে দাঁড়িয়ে ফাইয়াজের সঙ্গে কথা বলছেন। ফারিশ কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। ফাইয়াজ আর ফুয়াদ হাসানও তার পেছন পেছন এগোল।

কয়েকটা সিঁড়ি উঠতেই ফারিশ যেন শুনতে পায় এমনভাবে ফাইয়াজ বলল,

"আব্বু, ভাইয়া না প্রেমে পড়েছে।"

ফারিশের পা দুটো থেমে গেল। পিছু ফিরল সঙ্গে সঙ্গেই। ফুয়াদ হাসান ছোটো ছেলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বড়ো ছেলের দিকে তাকালেন। ফারিশ দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

"একদম না।"

"একদম মিথ্যা বলবে না, ভাইয়া। আমি সত্যি কথা বলছি, আব্বু।"

ফারিশ কটমট করে তাকিয়ে রইল। এটা তার ভাই নাকি শত্রু সে বুঝতে পারছে না। আগে সারাহর পেছনে লাগতো, এখন তার পেছনেও লাগে।

ফুয়াদ হাসান সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে দুজনকে অবাক করে দিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন,

"তোমার আগেই বুঝতে পেরেছি আমি। ফারিশ যখন বারবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছিল তখনই খেয়াল করেছি, আর যা বোঝার বুঝে গিয়েছি। ধৈর্য ধরো, ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয়।"

বাবার কথা শেষ হতেই ফারিশ চোখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলল। তার মনে হচ্ছে সিঁড়ি ফেটে দুভাগ হয়ে যাক আর সে ভেতরে ঢুকে পড়ুক, নয়তো এখান থেকে গায়েব হয়ে যাক।

ফাইয়াজ বলল,

"ধৈর্যের ফল মিষ্টি হয় বুঝলাম, কিন্তু ধৈর্য ধরতে ধরতে ধৈর্যের ফল যেন আরেকজন খেয়ে না ফেলে।"

ফুয়াদ হাসান একবার পিছু ফিরে চোখের আড়ালে চলে গেলেন। ফারিশ রাগী চোখে তাকিয়ে রইল ফাইয়াজের দিকে।

ফাইয়াজ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল,

"প্রেমে পড়লে মানুষ এমনই হয়ে যায়, দিন দুনিয়ার খোঁজ থাকে না। কে দেখল না দেখল সেসবেরও খোঁজ থাকে না।"

ফারিশ ধুপধাপ পা ফেলে উপরে উঠতে উঠতে বলল,

"ফাইয়াজ, বড়ো ভাই হই তোমার।"

ফাইয়াজ পিছু না ফিরেই বলল,

"আমি জানি তুমি আমার দুলাভাই না, বড়ো ভাই হও।"

ফারিশের পায়ের গতি বাড়াতেই ফাইয়াজ দৌড় শুরু করল নিজের রুমের দিকে।

.

শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সারাহ। সারাদিন অনেক ধকল গেছে, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে এখন। বিছানা ঝেড়ে ঠিক করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল আবরার। কেঁপে উঠলেও নিজেকে সামলে নিলো সারাহ। আবরার ঘাড়ে মুখ গুঁজে সারাহর নিজস্ব সত্তার ঘ্রাণ টেনে নিলো নিজের ভেতরে। কানের নিচে চুমু খেয়ে বলল,

"আমার ভীষণ হিংসা হচ্ছে, মায়াবিনী।"

সারাহ কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইল তারপর আবরারের মুখ দেখার চেষ্টা করে বলল,

"কেন? কী নিয়ে হিংসা হচ্ছে?"

"এই যে তুমি একটা সময় ওই বজ্জাত আবিরকে ভালোবাসি বলেছো তাই।"

আবিরের নাম শুনতেই সারাহর মুখে আঁধার নেমে এলো। বুকের ভেতর কোথাও একটা জ্বালা শুরু হলো। বলল,

"ওই লম্পট, বেইমান, অসভ্য, বজ্জাত লোকের নাম কোনোদিন উচ্চারণ করবেন না আমার সামনে।"

আবরার আরও নিবিড়ভাবে সারাহকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে গালে আলতো চুমু খেয়ে বলল,

"আমার তো ওর উপর হিংসা হচ্ছে।"

"তো এখন কী করতে হবে আমাকে?"

"বলো ওই আবিরের গালে জুতার বাড়ি।"

সারাহ কোনো রকম ভাবাভাবী ছাড়াই বলল,

"ওই শ'য়'তান আবিরের গালে ছেড়া জুতার বাড়ি।"

"ওকে সামনে পেলে কী করবে তুমি?"

"আব্বুর বন্দুক দিয়ে গুলি করে সোজা উপরে পাঠিয়ে দিবো।"

দাঁতে দাঁত চেপে বলল কথাগুলো।

আবরার বলল,

"বলো ওই আবিরের গালে একশো একটা জুতার বাড়ি, আবরার তোমাকে ভালোবাসি।"

সারাহ চুপ রইল। আবরার তাড়া দিয়ে বলল,

"কী হলো? বলো।"

"ওই আবিরের গালে একশো একটা জুতার বাড়ি, আবরার আপনাকে ভালোবাসি।"

"হয়নি। ওই আবিরের গালে একশো একটা জুতার বাড়ি, আবরার তোমাকে ভালোবাসি।"

"ওই আবিরের গালে একশো একটা জুতার বাড়ি, আবরার আপনাকে ভালোবাসি।"

"হচ্ছে না তো।"

"ঠিকই তো বলছি।"

"মনোযোগ দিয়ে শোনো। ওই আবিরের গালে একশো একটা জুতার বাড়ি, আবরার তোমাকে ভালোবাসি।"

"ওই আবিরের গালে একশো একটা জুতার বাড়ি, আবরার তোমাকে ভালোবাসি।"

ঝট করে সারাহকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ঘুরতে লাগল আবরার। সারাহ ভয় পেয়ে আবরারের গলা জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।

*****

হসপিটালের করিডোর ধরে হাঁটছে ডেইজি। তার পেট কিছুটা উঁচু হয়ে উঠেছে। প্রেগন্যান্সির চার মাস চলছে। চোখের নিচে গাঢ় কালি পড়ে গেছে, চেহারায় মলিনতা। দূর্বল পায়ে হাঁটছে ধীরে ধীরে, হাতে একটা হ্যান্ড ব্যাগ।

গত দুই মাসে আবির অনেকবার গিয়েছিল তার বাড়িতে। রাতের পর রাত দরজার বাইরে বসে থেকেছে একটাবার তার সঙ্গে কথা বলার জন্য। কত শত রিকুয়েস্ট ' ডার্লিং, একটাবার কথা শোনো আমার' ডেইজি কোনো সুযোগ দেয়নি তাকে। সামনাসামনি দেখা করা ছাড়া অন্য সকল যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে। সেদিনের পর এক মাস নিরুদ্দেশ ছিল ডেইজি। কোথায় চলে গিয়েছিল কেউ কিছু বলতে পারেনি। গত দুই মাস ধরে বাড়িতেই আছে। প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হয় না কখনো। তিন মাসে একবারের জন্যও আবিরের মুখোমুখি হয়নি। হ্যাঁ, সেই ঘটনার তিন মাস পেরিয়ে গেছে।

আজ আবিরের সঙ্গে দেখা করতেই হসপিটালে এসেছে ডেইজি। আবির অ্যাকসিডেন্ট করেছে শোনার পর বুকে পাথর চাপা দিয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেনি আর।

আবিরের কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল ডেইজি। দরজা ঠেলে দরজার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে রইল। বেডে চিত হয়ে শুয়ে আছে আবির। কপালে ব্যান্ডেজ, হাতে ব্যান্ডেজ, পায়েও ব্যান্ডেজ। ডেইজি শুনেছে আবিরের পেটের বাম পাশে কি যেন একটা ঢুকে গিয়েছিল প্রায় পাঁচ ইঞ্চির মতন। জীবন ম'রণের সঙ্গে লড়াই করেছে গতকাল।

টপটপ করে চোখজোড়া হতে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল আবার।

আবির চোখ মেলে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল দরজার দিকে। তার মনে হচ্ছিল আশপাশে ডেইজি আছে, তার ভালোবাসা, তার প্রথম প্রেম। সত্যি সত্যিই ডেইজিকে দেখতে পাবে বা ডেইজি তাকে দেখতে আসবে কল্পনাও করেনি।

আবিরের চোখজোড়া হতেও পানি গড়িয়ে পড়ল।

ডেইজি ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কী মায়া মেয়েটার চেহারায়! আবির শুধু অসহায়ের মতন তাকিয়ে রইল। তার গলা দিয়ে কেন যেন আওয়াজ বের হচ্ছে না। ডেইজির পেটের দিকে তাকিয়ে তার দৃষ্টি স্থির হলো। তার সন্তান।

ডেইজির ক্রন্দনরত মুখের দিকে তাকিয়ে আবিরের বুকে র'ক্তক্ষরণ শুরু হলো। গত আড়াই মাসে সে বুঝেছে ডেইজি তার কতটা জুড়ে রয়েছে। সে ভুল করেছিল, অন্যায় করেছিল। ডেইজিকে ঠকিয়ে সে মস্ত বড়ো অন্যায় করেছে, পাপ করেছে। তার শাস্তিও তো পাচ্ছে এতগুলো দিন ধরে।

সারাহর সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও তার এতটা কষ্ট হয়নি যতটা ডেইজির সঙ্গে বন্ধ হওয়ার পর হয়েছে। গত দিনগুলোতে সারাহকে তার মনে পড়েনি, পড়েছে শুধু ডেইজিকে। সারাহর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে জেনেও তার কষ্ট হয়নি।

ডেইজি তার কাছে থাকতে সে তার মূল্য বোঝেনি। হারিয়ে ফেলার পর বুঝেছে ডেইজি-ই তার সবকিছু, তার ভালো থাকার কারণ। সারাহ তো শুধু মোহ ছিল, ভালোবাসা তো ডেইজি।

ডেইজিকে একটাবার দেখার জন্য আর কথা বলার জন্য কতটা ছটফট করেছে শুধু সে আর আল্লাহ তায়ালা জানেন।

ডেইজির চোখের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলল,

"সুইটহার্ট, আই'ম সো সরি।"

কাঁদতে কাঁদতে তার দিকে তাকিয়ে রইল ডেইজি। আবির আবার বলল,

"প্লীজ ফিরে এসো।"

ডেইজি দুদিকে মাথা নাড়ল। সে ফিরবে না।

"একটা সুযোগ দাও, আমি পুরোপুরি বদলে গেছি। আর কোনো কষ্ট দিবো না তোমাকে। প্লীজ কাম ব্যাক, সুইটহার্ট।"

দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল ডেইজি। আবির ডাকলেও থামল না সে।

তাড়াহুড়ো করে শোয়া থেকে উঠতে চাইল আবির, কিন্তু পারল না। নিজে থেকে উঠে বসার ক্ষমতা তার নেই।

বুক ভরা শূন্যতা নিয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। ডেইজি কী চলে গেল? তাকে ক্ষমা করবে না? ফিরবে না তার কাছে?

কেবিনের বাইরে চেয়ারে বসে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে লাগল ডেইজি। আবিরকে এই অবস্থায় দেখে সে সহ্য করতে পারছে না। আবার আবিরের কৃত কর্মের জন্য তাকে মাফ করতেও পারছে না। কী করবে সে? আবিরকে কী একটা সুযোগ দেওয়া উচিত? আবির কি সত্যিই বদলে গেছে? বদলে না গেলে ওভাবে তার দরজার সামনে রাতের পর রাত পড়ে থাকতো না, কথা বলার জন্য অমন ছটফট করতো না। কী করবে এখন? দ্বিধায় ভুগতে লাগল ডেইজি।

কান্না দমিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল আবার। কেবিনের দরজা ঠেলে তাকাল বেডের দিকে। আবির এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে আছে অসহায়ের মতন। ডেইজিকে ফিরে আসতে দেখে আশা ফিরে পেলো আবার। ডেইজি দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল অশ্রুসিক্ত নয়নে। এখনই মাফ করে দিবে নাকি এভাবে আরও কিছুদিন চলতে দিবে?

বিজ্ঞাপন
মন বোঝে না গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভার্সিটি রিলেটেড পারিবারিক গল্প