পশ্চিম আকাশ লাল কমলা রঙে রাঙা। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে যাচ্ছে নিজ নিজ নীড়ে। জোরে জোরে হাওয়া বইছে অনেকক্ষণ ধরে।
ফাইয়াজ সারাহকে নিয়ে ছাদে এসেছে ঘুড়ি উড়ানোর জন্য। সারাহ আসতে রাজি না হলেও ফাইয়াজ ছাড়েনি। ফাইয়াজের জেদের সঙ্গে না পেরে সারাহকে আসতেই হলো।
ঘুড়ি উড়ানোর প্রস্তুতি নিতেই ছাদে উঠে এলো ফারিশ। ফাইয়াজ সারাহর দিকে তাকিয়ে বলল,
"যদি তুই হারিস তাহলে আমাকে ট্রিট দিবি, আর আমি হারলে তোকে দিবো।"
"আচ্ছা। আজকে তো তুমি হারবেই শিওর।"
ফাইয়াজ ঠোঁট বাঁকিয়ে ভাব নিয়ে বলল,
"আমাকে হারানোর মুরোদ তোর নেই, বাবু সোনা। গো হারা হারার জন্য প্রস্তুত হ।"
সারাহ নিজেও ভাব নিয়ে বলল,
"তোমার অহংকারকে আজ আমি ছাদ থেকে ঠাস করে নিচে ফেলে দিবো দেখে নিও।"
"দেখা যাক।"
ফারিশ ফাইয়াজের কাছে এগিয়ে এসে বলল,
"ফাইয়াজ, লাটাই আর ঘুড়ি দাও।"
"কেন?"
"আমি ঘুড়ি উড়াবো।"
"এ্যাহ!"
"এ্যাহ আবার কী?"
বলতে বলতে লাটাই নিজের হাতে নিয়ে নিল। ফাইয়াজ পুনরায় নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
"আমারটা আমাকে দাও, ভাইয়া।"
"তুমি আর চেরি, আমি একা। তোমরা যদি আমাকে হারাতে পারো তবে আমি তোমাদের ট্রিট দিবো তাও ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে। সঙ্গে শপিং-ও করাবো।"
ফাইয়াজের চোখজোড়া উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
"সত্যি?"
"একদম।"
"হেরে গেলে কিন্তু পল্টি নিতে পারবে না।"
"পরিস্থিতি ব্যতীত ফারিশ কখনো নিজের কথা থেকে নড়চড় করে না।"
"আচ্ছা, হারার জন্য প্রস্তুত হও।"
"আচ্ছা।"
সারাহ ফাইয়াজের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল,
"ভাইয়াকে হারাতে পারব আমরা?"
"পারব না কেন? অবশ্যই পারব।"
"ভাইয়ার সঙ্গে কখনো পেরেছি আমরা? ভাইয়া কত ভালো ঘুড়ি উড়ায় তুমি তো জানোই, ভাইয়া।"
"সবসময় জিতে বলে আজকেও জিতবে নাকি? আজকে আমরাই জিতবো ভরসা রাখ।"
সারাহর হাত থেকে ঘুড়ি নিয়ে হওয়ায় উড়িয়ে দিলো ফাইয়াজ। ফারিশ নিজেও উড়িয়ে দিয়েছে।
উড়তে উড়তে অনেকটা উপরে উঠে গেছে দুজনের ঘুড়ি। দুই ভাই একে অপরের ঘুড়ির সুতো কা'টার জন্য ম'রিয়া হয়ে উঠেছে।
সারাহ লাটাই হাতে ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে আর ফাইয়াজকে বলছে ফারিশের ঘুড়ির সুতো কে'টে দিতে।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর অবশেষে জিতে গেল ফাইয়াজ আর সারাহ। সারাহ আর ফাইয়াজ ভোকাট্টা বলে উল্লাস করে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই।
হেরে গিয়ে বাঁধনহারা ঘুড়ির দিকে তাকিয়ে রইল ফারিশ, এলোমেলোভাবে উড়ে চলে যাচ্ছে ঘুড়িটা।
ফাইয়াজ আর সারাহ একে অপরের হাত ধরে খুশিতে আত্মহারা হয়ে লাফালাফি করছে। আজ প্রথম তারা ফারিশকে হারিয়েছে।
ফারিশ হাসি মুখে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকদিন পর আজ সারাহর মুখে হাসি ফুটেছে। খুশি ধরে রাখতে না পেরে পাগলের মতন লাফাচ্ছে দুজন।
ফাইয়াজ সারাহকে ছেড়ে ফারিশকে ঝাপটে ধরল। বলল,
"চলো চলো, আগে শপিং করব তারপর খেতে যাব "
ফারিশ কিছু বলার আগেই ভেসে এলো নিতু সুলতানার গলার আওয়াজ। তিনজনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলছেন,
"নিচে চলো তোমরা, তোমাদের মামা এসেছেন।"
তিনজন একসঙ্গে তাকাল নিতু সুলতানার দিকে। ফাইয়াজ ভাইয়াকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
"কোন মামা, আম্মু?"
"আমজাদ ভাই।"
সারাহ ফারিশের মুখের দিকে তাকাল। ফারিশ-ও তার দিকে তাকিয়েছে। আমজাদ খান কেন এলেন এখন?
"চলো তোমরা।"
"আসছি।"
নিতু সুলতানা চলে গেলেন ছাদ থেকে। ফাইয়াজ উড়তে থাকা ঘুড়ি নিচে নামিয়ে ফেলল সুতো লাটাইয়ে গুটিয়ে। দ্বিতীয় লাটাইয়ের সুতোও গুটিয়ে ফেলল দ্রুত, তারপর তিনজন একসঙ্গে এগোল সিঁড়ির দিকে।
সারাহকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন আমজাদ খান। হসপিটালে তখন ভালোভাবে দেখা হয়নি মেয়েটাকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন এখন। সত্যিই ভীষণ সুন্দর আর মায়াবী মেয়েটা। তার ছেলের পছন্দের তারিফ করতেই হয়। তিনি কখনোই চাননি ছেলের অমতে গিয়ে নিজের পছন্দের মেয়ের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দিতে। ছেলে যাকে পছন্দ করবে তার সঙ্গেই বিয়ে দিবেন এমনটা ভেবে রেখেছেন অনেক আগে থেকেই। তিনি নিজেও তো নিজের পছন্দেই বিয়ে করেছেন দুবার, অবশ্য দুবারই তার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ ছিল। নিজে ভালো থাকার জন্য তো তখন ছেলের অপছন্দকে পাত্তা দেননি। মন যাকে চেয়েছিল তাকেই বিয়ে করেছিলেন। তাহলে তার ছেলের বেলায় কেন উল্টোটা হবে?
সারাহ কাচুমাচু ভঙ্গিতে বসে আছে। আবরারের বাবা তার দিকে এভাবে কেন তাকিয়ে আছেন?
সারাহ অসহায় বদনে বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। ফারিশ-ও কিছু বুঝতে পারছে না আসলে হচ্ছে টা কী? সে নিজেও অসহায় চোখে তাকাল বোনের মুখের দিকে।
ফুয়াদ হাসান সমন্ধির দিকে তাকিয়ে বললেন,
"ভাই, কিছু বলছেন না কেন? এভাবে চুপচাপ বসে থাকার জন্য এত তাড়া দিয়ে আমাকে অফিস থেকে বাড়িতে আনলেন?"
আমজাদ খান দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন,
"না। দরকারি কথা বলতে এসেছি।"
"বলুন তাহলে।"
আমজাদ খান হাসফাস করতে লাগলেন। কীভাবে বলবেন বুঝতে পারছেন না। তাকে এমন করতে দেখে ফারিশ বলল,
"মামা, কোনো সমস্যা?"
আবারও দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন,
"না। কোনো সমস্যা নেই। আমি আসলে— কীভাবে বলবো বুঝতে পারছি না।"
"এখানে তো আমরা আমরাই। বলে ফেলো যা বলতে চাও।"
"আমি আসলে আবরারের বিয়ের কথা বলতে এসেছি।"
আমজাদ খানের কথা শুনে বাড়ির সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতাকি করতে লাগল। সারাহর মুখ শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। সে কিছুটা বুঝতে পারছে আমজাদ খান কী বলতে চাইছেন। ফারিশ-ও আঁচ করতে পারছে মামার মনোভাব।
আমজাদ খান আবার বললেন,
"আমি চাইছি তোমাদের মেয়ে সারাহকে আবরারের বউ করে আমার ঘরে নিতে। আমি আশা করছি তোমরা আমাকে ফেরাবে না, আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছি তোমাদের কাছে।"
নিতু সুলতানা স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন। ফুয়াদ হাসান স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। সারাহ মাথা নিচু করে বসে আছে শক্ত হয়ে। ফুয়াদ হাসান বললেন,
"আম্মু, তুমি রুমে যাও।"
সারাহ মুখ তুলে তাকাল বাবার মুখের দিকে। তার করুণ চাহনি দেখে অসহায় বোধ করলেন ফুয়াদ হাসান। তবুও আবার বললেন,
"ফাহিমকে নিয়ে রুমে যাও।"
সারাহ উঠে দাঁড়িয়ে ফাহিমের হাত ধরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। কিছুটা যেয়ে পিছু ফিরে তাকাল আবার। ফারিশ এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। সারাহ দুদিকে মাথা নেড়ে না বুঝিয়ে চলে গেল।
ফুয়াদ হাসান বললেন,
"ভাই, এসব কী বলছেন আপনি?"
"বুঝতে পারোনি আমার কথা? আমি সারাহকে আবরারের বউ করতে চাইছি।"
"এরকমটা কেন চাইছেন?"
"আশ্চর্য! বাচ্চাদের মতন কী সব প্রশ্ন করছো, ফুয়াদ? সারাহকে পছন্দ হয়েছে তাই ছেলের বউ করতে চাইছি।"
ফাইয়াজ বলল,
"ভাইয়া সকালে অ্যাকসিডেন্ট করে হসপিটালে ভর্তি হলো, আর তুমি বিকেলেই এসেছো তার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে! আশ্চর্য তো আমি তোমাকে দেখে হচ্ছি, মামা "
"বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি বলে কী এখনই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে নাকি? আমি প্রস্তাব নিয়ে আসার আগে যদি অন্য কেউ নিতে চলে আসে তাই এসেছি।"
ফুয়াদ হাসান আর নিতু সুলতানার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"কিছু বলছো না কেন তোমরা?"
নিতু সুলতানা পুনরায় স্বামীর মুখের দিকে তাকালেন। ফারিশ গম্ভীর গলায় বলল,
"আমি রাজি।"
ফুয়াদ হাসান বললেন,
"তুমি তো আগের-বারও সবার আগে রাজি ছিলে।"
"আবরারকে তোমার কেমন ছেলে মনে হয়, আব্বু?"
"আবিরকেও তো ভালো ছেলেই ভেবেছিলাম।"
"আবির আর আবরার একজন নয়, আর না তো ওদের স্বভাব এক।"
আমজাদ খান বললেন,
"আবির! আবির ফুয়াদের বোনের ছেলে না? ওকে নিয়ে এখানে কথা উঠছে কেন?"
ফারিশ বলল,
"আবিরের ব্যাপারটা আমি তোমাকে বলতেই যাচ্ছিলাম। আবির আর সারাহর এনগেজমেন্ট হয়েছিল, কিন্তু কিছু কারণে আমরা এনগেজমেন্ট ভেঙে দিয়েছি।"
আমজাদ খান মনে মনে বললেন,
"তার মানে ওই কাউয়ার্ডটা আবির ছিল!"
ফারিশ আবার বলল,
"এই এনগেজমেন্ট ছাড়া আর কোনো খুঁত খুঁজে পাবে না সারাহর মধ্যে।"
"এনগেজমেন্ট নিয়ে কোনো সমস্যা নেই আমার। ফুয়াদ, নিতু, কিছু বলো তোমরা।"
নিতু সুলতানা নিচু কন্ঠে বললেন,
"আমার মেয়ে যেভাবে ভালো থাকবে আমি তাতেই রাজি।"
ফাইয়াজ বলল,
"কিন্তু সারাহ কী রাজি হবে?"
আমজাদ খান বললেন,
"রাজি হবে না কেন?"
"এত বড়ো একটা ধাক্কা খেয়ে নিজেকে এখনো সামলে উঠতে পারেনি।"
আমজাদ খান আবারও বললেন,
"আমি সারাহর সঙ্গে কথা বলবো, বুঝিয়ে বললে নিশ্চই রাজি হবে।"
.
সারাহ বসে আছে নিজের রুমে। আমজাদ খান তাকে এক ঘণ্টা সময় ধরে বুঝিয়েছেন। ছোটো বেলা থেকে আবরার কীসের মধ্যে দিয়ে কীভাবে বড়ো হয়েছে, কী কী হারিয়েছে সব বলেছেন। অনেক বছর পর ছেলে তার কাছে মুখ ফুটে কিছু চেয়েছে, তিনি ছেলের চাওয়াটা কীভাবে অপূর্ণ রাখবেন?
শেষ পর্যন্ত সারাহ কিছু বলেনি। আমজাদ খান তাকে সময় নিয়ে ভাবতে বলেছেন। দুদিন পর জানালেও হবে। সারাহ যদি সময় চায় তবে তিনি আর আবরার তাতেও রাজি। তবে শেষ পর্যন্ত সারাহর উত্তরটা যেন হ্যাঁ-ই হয়।
মামাকে বিদায় জানিয়ে সারাহর রুমে প্রবেশ করল ফারিশ। নিচে নিতু সুলতানা আর ফুয়াদ হাসান আমজাদ খানের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছেন।
ফারিশ সারাহর পাশে বসল নিঃশব্দে। সারাহর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে শান্ত কন্ঠে বলল,
"তুমি যাকে ভালোবেসেছো তাকে পাওনি, যে তোমাকে ভালোবাসে তাকে তো পেতে দাও, বোন আমার। একজন প্রতারকের জন্য কেন নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছো? তোমাকে এই অবস্থায় দেখে না আমি ভালো আছি, আর না তো আব্বু-আম্মু আর ফাইয়াজ ভালো আছে।"
সারাহ জড়ানো গলায় বলল,
"আমি উনার যোগ্য না, ভাইয়া।"
"নিজেকে কবে থেকে যোগ্য অযোগ্যের পাল্লায় মাপতে শুরু করলে?"
"আমি সত্যিই উনার যোগ্য না।"
কথাগুলো বলেই ফুঁপিয়ে উঠল সারাহ। ফারিশের পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। পকেট থেকে বের করে দেখল আবরারের কল। রিসিভ করে কানে ধরে বলল,
"কেমন আছিস?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালো। চেরি কাদঁছে কেন?"
"ওর ধারণা ও তোর যোগ্য না।"
"যোগ্য না ভাবার কারণ? আবিরের সঙ্গে এনগেজমেন্ট হয়েছিল বলে?"
"হয় তো।"
"ফোন স্পিকারে দে।"
ফারিশ ফোন স্পিকারে দিলো। আবরার বলল,
"চেরি, তুমি কি ভেবে নিজেকে আমার অযোগ্য ভাবছো আমি জানি না। তবে তুমি শুনে রাখো তুমি কখনোই আমার অযোগ্য ছিলে না, আর কোনোদিন হবেও না। যখন তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসতে, তখনো আমি তোমাকে ভালোবাসতাম আর চাইতাম। এখন তুমি কাউকে ভালোবাসো না, আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি, আর তোমাকেই চাই। যদি তোমার সময় লাগে তবে নাও—কয়েকদিন, কয়েকমাস, বা কয়েকবছর, তবুও শেষ পর্যন্ত তুমি শুধু আমারই হও।"
সারাহর কান্না বেড়ে গেল আবরারের কথাগুলো শুনে। আবির নামের অমানুষটা কেন তার জীবনে এসেছিল? প্রথমেই কেন আবরার এলো না?
ফারিশ আবরারকে বলল,
"সারাহ রাজি।"
সারাহ ফট করে মুখ তুলে চাইল। সে কখন রাজি হলো? আবরার বলল,
"সত্যিই রাজি হয়েছে?"
"হ্যাঁ।"
"কই? আমি তো শুনলাম না। শুধু তো কান্নাই শুনলাম।"
"সারাহ, জোরে বলো তুমি রাজি?"
সারাহর কান্না থেমে গেল আপনাআপনি। রীতিমত হাঁ করে তাকিয়ে রইল বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে।