ফারিশ উন্মাদের মতন বাইক চালিয়ে হসপিটালের সামনে এসে দাঁড়াল। সে পুরো রাস্তা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে করতে এসেছে যেন বডিটা আবরারের না হয়। জুনায়েদ, মৃন্ময় সহ আবরারের আরও কয়েকজন ভার্সিটি ফ্রেন্ড দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। মহুয়া কবীর আর আমজাদ খানও আসছেন, উনারা এখনো এসে পৌঁছাতে পারেননি।
ফারিশ বাইক পার্ক করে রেখে জুনায়েদ-দের দিকে তাকিয়ে অস্থির কন্ঠে বলল,
"অফিসাররা কোথায়?"
"ভেতরেই।"
"ভেতরে চলুন।"
বলেই ফারিশ ভেতরের দিকে হাঁটা ধরল। তার কেমন বাজে অনুভূতি হচ্ছে সে কাউকে বোঝাতে পারবে না। প্রথমে আবরার হারিয়ে গেল, এর মধ্যে আবার আবিরের এই জঘন্য রূপ সামনে এলো। সারাহ ভেঙে পড়েছে, তার উপর আবার এই সংবাদ। তার নিজেকে পাগল পাগল লাগছে। তার একটাই চাওয়া, বডিটা আবরারের না হোক। তারপর বাকিটা সে সামলে নিবে, এবার আর কোনো ভুল করবে না।
কাউন্টারে এসে মর্গ কোন দিকে জিজ্ঞেস করতেই লোকটা বলল,
"আপনারা আবরার সাহিল খানের বাড়ির লোক?"
ফারিশ বিস্মিত হয়ে বলল,
"আপনি আবরারকে চিনেন?"
"না। এই সামির।"
সামির নামের ছেলেটা এগিয়ে এলো। তার পরনে ওয়ার্ড বয়ের পোশাক। কাউন্টারের লোকটা সামির নামের ছেলেটাকে বলল,
"রাতে যেই বডিটা এসেছে এনারা ওই বডির আত্মীয়। এনাদের মর্গে নিয়ে যাও।"
ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল,
"আপনারা আসুন আমার সঙ্গে।"
ফারিশের বুক কাঁপছে। সে শ্বাস আটকে হাঁটা ধরল সামিরের পেছন পেছন। বাকিরাও দুজনের পেছনে এগোল।
মর্গের কাছাকাছি আসতেই ফারিশের পা থেমে গেল। তার পা চলতে চাইছে না। তাদের সঙ্গে এসে যুক্ত হলো একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি গমগমে গলায় বললেন,
"আপনারা আবরার সাহিল খানের বাড়ির লোক?"
ফারিশ বলল,
"আমি আবরারের ফুপাতো ভাই। মামারা এখনো এসে পৌঁছায়নি।"
"আচ্ছা, ভেতরে চলুন। বডি সনাক্ত করুন আগে তারপর বাকিটা দেখা যাবে।"
বডি বডি শুনে ফারিশের রাগ হচ্ছে, তবুও সে চুপচাপ পা বাড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরের পরিবেশ হিম শীতল। কয়েকটা স্ট্রেচারের উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে নিথর দেহ। সেগুলো সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা।
একটা নির্দিষ্ট স্ট্রেচারের সামনে এসে দাঁড়াল তারা। সামির লা'শের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে দিলো। ফারিশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল নির্জীব ফ্যাকাশে চেহারার দিকে। ফারিশ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
"এটা আবরার না।"
অফিসার আর সামির তার দিকে তাকাল। ফারিশ আবার বলল,
"এটা আবরার সাহিল খান না, এটা অন্য কেউ।"
"আপনি শিওর?"
"হ্যাঁ। আমি আবরারকে চিনতে ভুল করব এটা অসম্ভব।"
"তাহলে ওই ফোন?"
"ফোনটা কোথায়?"
অফিসার ফোনটা বের করে দিলেন। ফারিশ ফোনটা দেখেই বলল,
"এটা তো আবরারেরই ফোন। ওর ফোন এই লোকের কাছে এলো কীভাবে?"
জুনায়েদ বলল,
"ওর ফোন চুরি হয়েছিল বোধহয়। আর এই শা'লা চোর-ই বোধহয়।"
"এমন ভদ্র লোক চোর হয় নাকি? লা'শের পরনে ফরমাল শার্ট প্যান্ট আর সেগুলো যথেষ্ট দামি।"
"ফারিশ বলল,
"লা'শের কাছে ওয়ালেট বা অন্য কিছু ছিল না?"
"না। শুধু ফোনটাই ছিল।"
"মৃ'ত্যু হয়েছে কীভাবে?"
"ছিনতাইকারীর ছু'রিকাঘাতে।"
ফারিশ তাকিয়ে রইল লা'শটার দিকে। ফোনের রিংটোন ভাবনার সুতো ছিঁড়ে দিলো ফারিশের। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল মামার কল। দ্রুত রিসিভ করে কানে ধরে বলল,
"মামা, এটা আবরার না, অন্য মানুষের লা'শ।"
ফারিশের কথা শুনেই আমজাদ খানের কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেল। সে মৃদু স্বরে বলল,
"তুমি কোথায়?"
"মর্গেই আছি। এটা আবরার না, শান্ত থাকো তুমি, আমরা বাইরে আসছি।"
ফারিশ সকলকে নিয়ে মর্গ থেকে বেরিয়ে এলো। তার মনে হচ্ছে বুকের উপর থেকে কয়েক টন ওজনের পাথর নেমে গেছে। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া যে ওটা আবরার নয়।
.
ফারিশের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল। লা*শটার পরিচয় এখনো জানা যায়নি। আবরারের ফোন আমজাদ খানের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ যখন ফোনটা পেয়েছিল তখন ফোনটা বন্ধ ছিল।
সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে আবরারকে শেষবার মিরপুরেই দেখা গিয়েছিল। তারপর সে একটা সিএনজি থামিয়ে উঠে বসে। সিএনজি চালককে খুঁজে বের করে আবরারের ছবি দেখানো হয়েছে। সে আবরারকে চিনতে পারেনি, তবে সেই রাতে নয়টার সময় সে মিরপুর 10 থেকে একটা ছেলেকে সিএনজিতে তুলেছিল। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মাঝ রাস্তায় নেমে গিয়েছিল সে। পুলিশ যখন জানতে চেয়েছে ছেলেটা কোথায় যেতে চেয়েছিল সে জানিয়েছে সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ডে।
আবরার এমন একটা জায়গায় নেমেছে যেখানের সিসিটিভি ক্যামেরা সেদিনই নষ্ট হয়েছিল সন্ধ্যায়।
আবরারের কোনো খোঁজ খবর এখনো পাওয়া যায়নি।
নিতু সুলতানা সোফায় বসে ফাহিমকে খাওয়াচ্ছিলেন। তাকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন এখন। ফাহিম খাওয়া বাদ দিয়ে সোফা ছেড়ে নেমে ভাইয়ের কাছে ছুটে এলো। ফারিশ ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে মায়ের কাছে এগিয়ে এলো। সোফায় বসিয়ে দিয়ে মলিন স্বরে বলল,
"তুমি খাওয়া শেষ করো, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"
ফাহিম মাথা নাড়ল। ফারিশ সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করল। মায়ের মলিন মুখ দেখতে ভালো লাগে না তার।
সকালে ফ্রেশ না হয়েই বেরিয়ে গিয়েছিল। পরনে ছিল ট্রাউজার আর টি-শার্ট, যেগুলো পরে রাতে ঘুমিয়েছিল।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো আবার। খিদে পেয়েছে তার। মাথা ব্যথাও করছে।
ফাহিমের খাওয়া শেষ। নিতু সুলতানাকে আশপাশে দেখতে পেল না। ডাইনিং রুমের দিকে এগোতেই নিতু সুলতানা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ফারিশকে দেখে বললেন,
"খেতে দেই?"
ফারিশ মাথা নাড়ল। নিতু সুলতানা আগে আগে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করলেন, পেছন পেছন ঢুকল ফারিশ। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
"আপনি খেয়েছেন, আম্মু?"
"খাব, তুমি খেয়ে নাও।"
"সারাহ?"
নিতু সুলতানার চোখজোড়া হতে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ল। দ্রুত চোখজোড়া মুছে ধরা গলায় বললেন,
"কিচ্ছু খাচ্ছে না। আমি কয়েকবার খাইয়ে দিতে গিয়েছিলাম খায়নি। ক্ষণে ক্ষণে কাদঁছে। তোমার আব্বু আর ফাইয়াজ-ও না খেয়ে বেরিয়ে গেছে।"
ফারিশ কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে নিলো। মৃদু স্বরে বলল,
"সরি, আম্মু। আমি আসলে বুঝতে পারিনি আবির অমন হয়ে গেছে, বুঝতে পারলে আমি জীবনেও এই বিয়ের জন্য আপনাকে জোর করতাম না। আমার আরও খোঁজ খবর নেওয়া উচিত ছিল।"
"এভাবে বলছো কেন? আমি তো জানি তুমি কখনো চেরির খারাপ চাওনি আর কখনো চাইবেও না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা কোরো না। খাওয়া শুরু করো তুমি।"
ফারিশ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। খাবারের প্লেটটা হাতে নিয়ে বলল,
"আপনি খেয়ে নিন, আমি চেরিকে খাইয়ে আসছি।"
ফারিশ বেরিয়ে এলো। ফাহিম ট্যাবে গেমে ব্যস্ত।
ফারিশ সোজা উপরে চলে এলো। সারাহর রুমের সামনে এসে লম্বা শ্বাস টানল। দরজা অর্ধেক ভেজানো, ভেতরে লাইট অফ। ফ্যানের শো শো শব্দ হচ্ছে।
গলা খাকারি দিয়ে চেরি চেরি বলে ডেকে ভেতরে প্রবেশ করল। সারাহ শুয়ে আছে রুম অন্ধকার করে। ফারিশের আওয়াজ পেয়ে তার দিকে একবার তাকিয়ে আবার মুখ নামিয়ে নিয়েছে।
ফারিশ হাতের প্লেটটা রেখে লাইট অন করল।
"চেরি।"
"হুম।"
"ওঠো।"
গুমরে কেঁদে উঠল সারাহ। ফারিশ তাকে শোয়া থেকে টেনে তুলে বসাল। বোনের পাশে বসে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
"তোমার চোখের পানি এত সস্তা নয় যে একটা স্বার্থপর, হারামী, বেঈমানের জন্য এত বেশি ঝড়বে।"
সারাহ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আমি মনকে বোঝাতে পারছি না, ভাইয়া। উনি কেন আমার সঙ্গে এমন করল? আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে।"
ফারিশ সারাহর এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
"সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে, একটু কষ্ট হবে, তোমাকে ধৈর্য ধরতে হবে। ভুল মানুষগুলো শুধু শিক্ষা দিতে আসে, আর সঠিক মানুষ আসে জীবনটা সুন্দর করে সাজিয়ে দিতে। তোমার জীবনেও সঠিক মানুষ আসবে খুব শীগ্রই—যে তোমার সব দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে অনাবিল সুখ আর আনন্দে ভরিয়ে রাখবে।"
একটু থেমে আবার বলল,
"কান্না বন্ধ করো নয়তো কিন্তু এবার আমিই কেঁদে ফেলব।"