পরদিন ভার্সিটিতে এসে আবরারের দেখা পেল না সারাহ। আবরারের বন্ধুরা থাকতেও আবরার কোথাও নেই। আবরারকে খুঁজে না পেয়ে নিজ ডিপার্টমেন্টের দিকে এগোল সারাহ। সকালেও বেশ কয়েকবার আবরারের ফোনে কল করেছিল, ফোন বন্ধ। আজকে আবার ভার্সিটিতেও আসেনি। অপরাধ বোধ জেঁকে ধরেছে সারাহকে।
ফারিশ বোনকে ভার্সিটিতে রেখে মামার বাড়িতে এলো সোজা। দরজা খোলা পেয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়ল। সোফায় বসে আছেন আমজাদ খান, উনার হাতে আবরারের লেখা চিঠিটা এখনো রয়েছে। উনার পাশে বসে মহুয়া কবীর কিছু বলছেন।
ফারিশ দ্রুত পায়ে মামার কাছে এগিয়ে এলো। তাকে দেখেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন আমজাদ খান। ফারিশ মামার লাল টকটকে চোখজোড়া দেখল, চেহারায় দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতা বিরাজ করছে।
"কী হয়েছিল, মামা?"
মহুয়া কবীর বললেন,
"আবরার গতকাল বিকেলে বাড়ি ফিরে নিজের রুমে চলে গিয়েছিল, তারপর আর নিজের রুম থেকে বের হয়নি। আমি খাওয়ার জন্য ডাকলেও কিছু বলেনি। বিরক্ত হবে বলে আমিও আর বেশি কিছু বলিনি। রাতে আটটার দিকে আমাদের রুমে যায় আর আমাকে সরি বলে। রুম থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি থেকেই বেরিয়ে গেছে, তারপর থেকে ওর আর কোনো খোঁজ খবর নেই। সকালে তোমার মামা ওর রুমে এসে দেখে রুমে কেউ নেই, মেইড জানায় আবরার রাতে বাড়িতে ফেরেনি। কল করছি ফোন বন্ধ। ওর বন্ধু, পরিচিত মানুষজন কেউ ওর খোঁজ খবর জানে না। সবাই একই কথা বলছে গতকাল রাত থেকে ওর ফোনে কল ঢুকছে না।"
"খালি হাতে গেছে?"
"মেইড আর দারোয়ান বলল খালি হাতে বেরিয়েছে। আমরা ফুটেজ চেক করেও দেখেছি, ব্যাগপত্র কিছু নেয়নি। গাড়ি বা বাইকও নেয়নি। পুরোপুরি খালি হাতে বেরিয়ে গেছে। কোথায় যাচ্ছে কিছু বলেনি।"
ফারিশ মামার মুখের দিকে তাকাল। একমাত্র ছেলের শোকে কাতর হয়ে পড়ছেন তিনি।
মামার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ফারিশ নিজেও পড়ল। হাতের লেখা দেখে বোঝা যাচ্ছে চিঠিটা লেখার সময় আবরার স্বাভাবিক ছিল না। কোথায় যাচ্ছে বা যাবে এমন কিছু লেখা নেই চিঠিতে।
গত পরশু থেকে আবরার তার কাছে সারাহকে নিয়ে কোনো কথা বলেনি।
শক্ত হৃদয়ের মানুষ আমজাদ খান ধরা গলায় বললেন,
"গত পরশু রাতে আবরার আমাকে বলেছিল ও দেশের বাইরে চলে যাবে, আমি যেন যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা করে দেই। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলেছিল এখানে ওর ভালো লাগছে না, এখানে আর থাকতে চায় না। আর পরের রাতে কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গেল! ওর কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। এভাবে মাফ চেয়ে কোথায় চলে গেল আমার ছেলেটা!"
ফারিশ মামার মুখের দিকে রইল। তিনি পুরুষ বলে কাঁদতে পারছেন না, নারী হলে এতক্ষণে হাউমাউ করে কাঁদতেন ছেলের জন্য। কত কষ্টে যে নিজেকে শক্ত রেখেছেন সেটা উনার চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
আবরার এভাবে কাউকে কিছু না বলে কোথায় হারিয়ে গেল? সারাহকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে আবার দেশ ছাড়তে চেয়েছিল কেন?
"পুলিশকে জানিয়েছো?"
"হুম।"
"কী বলল?"
"চব্বিশ ঘণ্টা দেখবে।"
ক্লাস শেষ করে ক্যাম্পাসে আবরারকে খুঁজতে লাগল সারাহ। কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না। আবরারের কোনো বন্ধুকেও খুঁজে পেল না। সবাই গেল কোথায়? ক্লাস না থাকলেও তো এরা ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকে। গেইটের বাইরে বেরিয়ে আসতেই জুনায়েদের বাইক এসে দাঁড়াল, তার পেছনে বসে আছে মৃন্ময়। আর কাউকে দেখতে পেল না সারাহ। সারাহ আশপাশে নজর বুলিয়ে দেখল আজ ফারিশও এখনো এসে পৌঁছায়নি।
সারাহ জুনায়েদের কাছে এগিয়ে এসে বলল,
"ভাইয়া, একটু শুনবেন?"
সারাহকে চিনতে অসুবিধা হলো না জুনায়েদ আর মৃন্ময়ের। জুনায়েদ বলল,
"জি বলো।"
সারাহ ইতস্তত করে বলল,
"আপনাদের বন্ধু আবরার সাহিল খান কোথায়?"
"ওকে কেন খুঁজছো?"
"একটু দরকার ছিল।"
"আবরারকে গতরাত থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"
জুনায়েদের কথা শুনে বিস্মিত হলো সারাহ। বিস্ময় নিয়েই বলল,
"খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে?"
মৃন্ময় বলল,
"খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে আবরার হঠাৎ করে গায়েব হয়ে গেছে কাউকে কিছু না জানিয়ে। কোথায় গেছে আমরা কেউ জানি না।"
"ওহ।"
সারাহ নিজের ব্যাগ থেকে একটা চিঠি বের করে জুনায়েদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
"উনি এলে এটা উনাকে দিয়ে দিবেন।"
জুনায়েদ চিঠিটা হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে বলল,
"লাভ লেটার?"
মৃন্ময় বলল,
"ওই তিতা করলা নিরামিষের উপর এত মেয়ে ক্রাশ খায় কেন?"
সারাহ মিনমিন করে বলল,
"এটা লাভ লেটার নয়।"
"তাহলে কীসের লেটার, আপা?"
সারাহ জুনায়েদের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল,
"আপনাদের দিতে হবে না, আমিই দিয়ে দিবো।"
বলেই উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরল। পেছন থেকে মৃন্ময় হাত তুলে বলল,
"এই এই আপা, কই যান?"
জুনায়েদ বলল,
"আরে রাখ তো এসব। ওই শা'লা কই চলে গেল এভাবে? টেনশনে ভাল্লাগছেনা কিছু। ও তো কখনো এমন করে না।"
"গতকাল এসে বলল এখানে আর পড়বে না, ক্লাসও করবে না আর, খুব শীগ্রই দেশের বাইরে চলে যাবে। আর রাত হতেই ব্যাটা গায়েব হয়ে গেছে। ওর হয়েছেটা কী?"
"ও এলেই জানতে পারব। এই রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ওকে খুঁজতে খুঁজতে আমার মাথা ধরে গেছে।"
সারাহ ফারিশকে কল করার পর ফারিশ তাকে আর পাঁচ মিনিট দাঁড়াতে বলল, সে আসছে।
সারাহকে বাড়ির গেইটের সামনে নামিয়ে দিয়ে ফারিশ বলল,
"তুমি ভেতরে যাও, আমি আসছি।"
সারাহ মাথা নেড়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই ফারিশ বাইক নিয়ে চলে গেল।
সাড়ে চারটা বাজতেই সারাহর ফোন একনাগাড়ে বাজতে লাগল বিরতিহীন। কল কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার কল আসছে। সারাহ হন্তদন্ত হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো। সে জানে আবির কল করছে। কল রিসিভ করে বিছানায় বসতে বসতে সালাম দিলো স্ক্রিনে তাকিয়ে। আবির সালামের জবাব দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
"কেমন আছো, চেরি ব্লসম?"
আবিরের গম্ভীর গলার আওয়াজ শুনে সারাহ স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল। আবিরের চেহারা গম্ভীর থমথমে হয়ে রয়েছে। মনে হচ্ছে কিছুটা রেগেও আছে। সারাহ মৃদু স্বরে বলল,
"ভালো, আপনি কেমন আছেন?"
"ভালো।"
"কিছু হয়েছে? আপনাকে এমন লাগছে কেন?"
"ভার্সিটিতে কেমন কা'টলো সারাদিন?"
"অন্যদিন যেমন কা'টে তেমনই।"
"আসলেই?"
"কী হয়েছে?"
"কী হয়েছে সেটা তো তুমিই জানো।"
"আমি কী জানবো?"
"জানো না কিছু?"
"কী জানার কথা বলছেন?"
"ভার্সিটিতে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছো কেন?"
সারাহ অবাক হলো আবিরের কথা শুনে। সে ভার্সিটিতে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছে এটা আবির জানলো কীভাবে? আবির আগের ভাব বজায় রেখে বলল,
"কথা বলছো না কেন? ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছো কেন?"
"সাধারণ কথা ছিল, আবির। এভাবে রিঅ্যাক্ট করার মতন কোনো ব্যাপার নেই।"
আবির চেঁচিয়ে উঠল, বাজখাঁই গলায় বলল,
"রিঅ্যাক্ট করার মতন কোনো ব্যাপার নেই? তুমি আমার বাগদত্তা হয়ে আরেক ছেলেকে চিঠি দাও কীভাবে?"
আবিরের গলার আওয়াজ শুনে হতভম্ব সারাহ। এ কেমন আচরণ?
"কথা বলছো না কেন এখন?"
সারাহ নিজেকে সামলে চোখজোড়া মুছে নিল। আবিরের আচরণে তার চোখ দিয়ে পানি চলে এসেছে। ধরা গলায় বলল,
"আবির চিঠিটা কোনো ভালোবাসার চিঠি ছিল না। আমি সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলেছি এটা সত্যি কথাই। আমি শুধু উনাদের দুজনকে আবরার—
সারাহকে থামিয়ে আরও বেশি চেঁচিয়ে উঠল আবির। চিৎকার করে বলল,
"আবরার আবরার আবরার! এই আবরারের মধ্যে কী আছে? ওর নাম মুখে নিতে নিষেধ করেছি না তোমাকে? ওর নাম মুখে নিবে না তুমি।"
সারাহ স্তব্ধ হয়ে গেল। এ কোন আবিরকে দেখছে সে? এটা তো সেই আবির না। আবির তো এমন নয়। আবির শান্ত, ভদ্র, মিষ্টভাষী মানুষ।
"আবির, আপনি আমার পুরো কথা তো শুনবেন নাকি? এভাবে চিৎকার করছেন কেন? ওই দুজনকে আমি শুধুমাত্র আবরার সাহিল খানের কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। আবরার সাহিল খানের সঙ্গে আমি বাজে আচরণ করেছিলাম তাই সরি বলার জন্যই তার খোঁজ করছিলাম। চিঠিতে আমি শুধু তার কাছে মাফই চেয়েছি, এর বেশি কিছু নয়। চিঠিটা আমি আবার ফিরিয়েই এনেছি।"
আবির রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
"আমি কিচ্ছু জানতে চাই না, শুনতে চাই না। তুই ভার্সিটিতে যাবি না আর, ওই আবরারের সামনে তো আরও না। আজকের পর তুই আমার অনুমতি ছাড়া বাড়ির বাইরেও বের হবি না। কোনো ছেলের সামনে যেতে পারবি না। তোর দুই সৎ ভাইয়ের সামনেও যাবি না।"
আবিরের কথা শুনে আর ব্যবহার দেখে কেঁদে ফেলল সারাহ।
"একদম ন্যাকা কান্না করবি না আমার সামনে।"
সারাহ কাঁদতে কাঁদতে বলল,
"আবির, এমন করছেন কেন আপনি?"
আবির কল কে'টে দিলো কিছু না বলে। সারাহর বুক ফেটে যেতে চাইছে কষ্টে। এমন ব্যবহার তার সঙ্গে আজ পর্যন্ত কেউ করেনি। আবির তার সঙ্গে এভাবে কথা বলল তার বিশ্বাস হচ্ছে না। যেই আবিরের প্রত্যেকটা কথায় আদর মিশে থাকতো সেই আবিরের কথা এমন জঘন্য হলো কীভাবে? তাকে বোঝার চেষ্টাই করল না। আবার কী বিশ্রী ভাবে তাকে তার ভাইদের সামনে যেতে নিষেধ করল!