মন বোঝে না

পর্ব - ৮

🟢

ফারিশ ডাকতে ডাকতে পেছন পেছন এসেও আটকাতে পারেনি আবরারকে। আবরার তার কোনো বাঁধাই না মেনে চলে গেছে। ফারিশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে গেইটের দিকে। আবরার কেন এসেছিল আর কেনই বা এভাবে চলে গেল কিছুই বুঝতে পারছে না ফারিশ। সে ঘুরে দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এলো। ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল,

"ফাইয়াজ, সারাহর ফোন কোথায়?"

ফাইয়াজ সোফায় বসতে বসতে বলল,

"আমি দেখিনি।"

ফারিশ এগিয়ে এসে ফাইয়াজের হাত থেকে তার ফোন কেড়ে নিয়ে সারাহর ফোনে কল করল। রিং হচ্ছে তবে আওয়াজ হচ্ছে না। ফোন কোথায় রেখেছে? ফারিশ স্থির হয়ে কান খাড়া করল। ভাইব্রেশনের শব্দ হচ্ছে। কল কে'টে গেলে ফারিশ আবার ডায়াল করল। সোফায় হন্যে হয়ে ফোন খুঁজতে খুঁজতে দেখল কুশনের ভেতরে ভরে রেখেছে ফোন। আর এই আকামটা কে করেছে বুঝতে তার একটুও সময় লাগল না। ফারিশ কটমট চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দুটো ফোন নিয়েই সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল। ফাইয়াজ লাফিয়ে উঠে ভাইয়ের পিছে দৌড়ে এসে নিজের ফোন নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,

"আমার ফোন দাও।"

"আগামীকাল সকালে পাবে। যাও, গিয়ে পড়তে বসো।"

"কী করেছি আমি?"

"কিছুই করোনি, কিন্তু এখন করবে। পড়তে বসো, যাও।"

ভাইয়ের ঠান্ডা গলার স্বর শুনে আর কিছু বলতে পারল না ফাইয়াজ। আগে আগে ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।

ফারিশ সারাহর রুমের সামনে এসে সারাহর নাম ধরে ডাকল। সারাহ ব্যালকনি থেকে রুমে ফিরে এসে বলল,

"জি, ভাইয়া?"

"এই যে তোমার ফোন।"

ওপাশ থেকে আবির বলল,

"সমন্ধি কী বলে?"

"আমার ফোন দিতে এসেছে।"

"ফোন ওর কাছে দাও।"

সারাহ নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে ফারিশের ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,

"আপনার সঙ্গে কথা বলবে।"

ফারিশ ফোন কানে চেপে দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে এগোল। ব্যস্ত গলায় বলল,

"বল কি বলবি।"

আবির লম্বা শ্বাস টেনে বলল,

"তোর বোন বলল আবরার এসেছে তোদের বাড়িতে।"

"এসেছিল চলে গেছে আবার।"

"কেন এসেছিল?"

"জানি না, ইয়ার। কিছু না বলেই চলে গেছে।"

"ওকে একবার সরি বলা উচিত।"

"তোকে আমি আগেই বলেছিলাম একবার কথা বলতে।"

"কোন মুখে যেতাম ওর সামনে? আর ওর সামনে যাওয়ার সাহসও হয়নি আমার। যেখানে তোর মুখ দেখে না—কথা বলে না সেখানে আমার সঙ্গে তো আরও বলতো না।"

"তবুও একবার চেষ্টা করে দেখতি।"

"এবার দেশে ফিরলে মাফ চেয়ে নিব।"

"আচ্ছা পরে কথা হবে, আমি বের হবো।"

"কোথায় যাবি?"

"মামার বাড়িতে।"

"ওখানে যাবি কেন?"

"আবরার কেন এলো আর কেন এভাবে কিছু না বলে চলে গেল এটা না জানা পর্যন্ত আমার শান্তি লাগবে না। ওর কিছু একটা হয়েছে, ওর চোখমুখ যেন কেমন হয়ে ছিল।"

"আচ্ছা, ভালো থাকিস।"

কল কে'টে ফারিশ দ্রুত তৈরি হলো। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে বাবা-মায়ের রুমের দরজায় এসে কড়া নাড়ল। নিতু সুলতানা ভেতর থেকে সাড়া দিতেই ফারিশ বলল,

"ছোটো আম্মু, আমি বের হচ্ছি। ফিরতে একটু দেরি হতে পারে।"

"আচ্ছা যাও। রাস্তায় সাবধানে চলাচল কোরো।"

"আচ্ছা।"

ভেতর থেকে ফাহিমের গলার আওয়াজ ভেসে আসছে। সে ভাইয়ের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার জন্য মায়ের সঙ্গে বায়না শুরু করেছে।

ফারিশ পুরো আটটা বছর পর মামার বাড়িতে এলো। দারোয়ান প্রথমে তাকে ভেতরে ঢুকতে দিতে চাইছিল না। ফারিশ বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে এটা তার মামার বাড়ি কিন্তু দারোয়ান তার কথা বিশ্বাস করছিল না। সে পাঁচ বছর ধরে এখানে আছে অথচ আজকের আগে কোনোদিন ফারিশকে দেখেনি, আর না তো আমজাদ খানের বোনের বাড়ির কেউ কোনোদিন এখানে এসেছে। আজকে হঠাৎ করে বোনের ছেলের উদয় হলো কোথা থেকে?

শেষমেশ ফারিশ না পেরে তার মামা নয়তো আবরারকে কল করে তার নাম বলতে বলেছে। দারোয়ান আমজাদ খানকে কল করে ফারিশের নাম বললে তিনি ফারিশকে ভেতরে আসতে দিতে বলেন।

ফারিশ বাইক থেকে নেমে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কলিং বেল বাজানোর আগেই দরজাটা খুলে গেল। সামনে তাকিয়ে দেখল তার মামা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখমুখ যেন কেমন হয়ে রয়েছে। ফারিশ মামাকে সালাম দিলো প্রথমে। আমজাদ খান সালামের জবাব দিয়ে বললেন,

"কেমন আছো, ফারিশ?"

"ভালো আছি, মামা। আপনি কেমন আছেন?"

"আলহামদুলিল্লাহ।"

"মামা, আবরার বাড়িতে আছে?"

আমজাদ খান মলিন মুখে বললেন,

"ওর রুমেই রয়েছে। ভেতরে এসো। ওর কী হয়েছে কিছু জানো? ওর সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে? কথা বলে এখন তোমার সঙ্গে?"

মামার কথা শুনতে শুনতে ভেতরের দিকে পা বাড়িয়েছিল ফারিশ। ড্রয়িংরুমের অবস্থা দেখে তার পা-জোড়া থেমে গেল আপনাআপনি। বিস্মিত হয়ে চারদিকে নজর বুলাল। ড্রয়িংরুমের এই অবস্থা কেন? আট বছর আগে শেষবার ড্রয়িংরুমটা যেমন দেখেছিল আজ তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা। পুরো ড্রয়িংরুমে তাণ্ডব চালিয়েছে কেউ। মামার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,

বিজ্ঞাপন

"মামা, ড্রয়িংরুমের এই অবস্থা কেন?"

"আবরার বাইরে থেকে এসেই যা সামনে পেয়েছে ভেঙেছে, একটা জিনিসও আস্ত রাখেনি। ওর রাগ দেখে কিছু বলার সাহসও হয়নি। সবসময় এমন করে। বাইরে কার সঙ্গে কি হয় না হয়, বাড়িতে এসেই ভাঙচুর শুরু করে।"

ফারিশ মামার কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর এগোল সিঁড়ির দিকে। পেছন থেকে আমজাদ খান বললেন,

"তোমাকে কিছু বলেছে আবরার?"

ফারিশ পিছু ফিরে বলল,

"না। ও আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল সন্ধ্যার পরই, কিছু না বলেই আবার চলে এসেছে। ওর চোখমুখ দেখে আমার হয়েছিল কিছু হয়েছে ওর। কি হয়েছে এটা জানার জন্যই এসেছি, আর এসে দেখছি ঘূর্ণিঝড় শুরু করে দিয়েছিল বাড়ি ফিরে।"

"ও নিজেই আস্ত একটা প্রলয়।"

ফারিশ কিছু বলল না। দ্রুত পায়ে এসে দাঁড়াল আবরারের রুমের সামনে। রুমের দরজা কিঞ্চিৎ ফাঁকা হয়ে রয়েছে, বোঝা যাচ্ছে ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজা ঠেলে ভেতরে পা রেখে শান্ত গলায় বলল,

"আবরার।"

"—

"আবরার, আছিস?"

"—

"কথা বলছিস না কেন, ভাই?"

কথা বলতে বলতে সুইচ বোর্ডের দিকে এগোতেই কিছু একটার সঙ্গে হোঁচট খেলো ফারিশ। পাত্তা না দিয়ে লাইট জ্বালিয়ে আশপাশে তাকিয়ে আবরারকে খুঁজতে লাগল। ফ্লোরের দিকে নজর পড়তেই দেখল আবরারের অতি শখের নীল রঙের গিটারটা ভেঙে পড়ে আছে ফ্লোরে। আবরারের প্রথম গিটার ছিল এটা, ফারিশ নিজে পছন্দ করে দিয়েছিল গিটারটা। ফারিশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল গিটারটার দিকে। গিটারটা এভাবে ভেঙেছে কেন? সে পছন্দ করে দিয়েছিল বলে? তাহলে এতকাল ভাঙেনি কেন? আজকেই কেন ভাঙলো? এলোমেলো চিন্তা ভাবনা ঝেড়ে ফেলে আবরারকে খুঁজতে খুঁজতে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। চাঁদের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে আবরার মাথা নিচু করে বসে আছে বেতের চেয়ারে। ফারিশ তাকে ডাকল আবার। আবরার মুখ তুলে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে বসে রইল।

ফারিশ তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে বলল,

"আবরার, কী হয়েছে তোর? কোনো সমস্যা?"

আবরার গম্ভীর গলায় বলল,

"তেমন কিছু না।"

"তাহলে কেমন কিছু?"

"কিছু না।"

"কিছু না হলে এমন করছিস কেন? জড়বস্তুর উপর নিজের রাগ ঝেড়েছিস কেন?"

আবরার চুপ করে রইল। তার কিছু ভালো লাগছে না। তার ভালোবাসা তার শত্রুর হবু স্ত্রী এটা সে কিছুতেই মানতে পারছে না। ওই আবিরের বোন তার কাছ থেকে তার কাছের মানুষদের দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, এখন আবার আবির তার ভালোবাসাকেও নিয়ে নিচ্ছে।

তার সবকিছু ধ্বংস করে দিতে ইচ্ছে করছে।

"আবরার, তাকা আমার দিকে।"

আবরার না তাকিয়েই বলল,

"কি বলবি বল।"

"বাড়িতে গিয়েছিলি কেন?"

"এমনি।"

"ভাঙচুর করেছিস কেন?"

"ইচ্ছে হয়েছিল।"

"ইচ্ছে হলেই করবি?"

"তুই জানিস আমার যা ইচ্ছে হয় আমি তাই করি।"

"গিটারটা ভেঙেছিস কেন? আমি পছন্দ করে দিয়েছিলাম তাই?"

আবরার তড়াক করে মাথা তুলে চাইল ফারিশের মুখের দিকে। দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

"এমন কিছু না।"

"তাহলে?"

"মহুয়া কবীরের গেস্ট এসেছিল, একটা মেয়ে সকালে আমার পারমিশন ছাড়া আমার রুমে ঢুকে গিটারটা ধরেছিল। রাগের মাথায় ভেঙে ফেলেছিলাম, সারাদিন ধরেই আফসোস হচ্ছে।"

"ওঠ এখান থেকে।"

"তুই চলে যা এখন।"

ফারিশ কথা না বলে তাকিয়ে রইল। আবরার আবার বলল,

"আমাকে একটু সময় দে, আমি নিজেই তোর সঙ্গে যোগাযোগ করব।"

"হয়েছেটা কী তোর? এমন ভাব করছিস মনে হচ্ছে তোর গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য কারো সঙ্গে।"

আবরার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

"এমনটা সত্যি হলে তুই বিশ্বাস করবি?"

ফারিশ চোখ বড়ো বড়ো করল। বিস্মিত হয়ে বলল,

"সত্যিই তোর গার্লফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য কারো সঙ্গে?"

"আমার কপাল এত বড়ো নাকি যে—

"যে কী? থেমে গেলি কেন?"

"বাদ দে এসব। তুই এখন যা, আমাকে একা থাকতে দে।"

ফারিশ শুনল না আবরারের কথা। আবরারকে টেনে তুলে রুমে নিয়ে এলো। আবরারের চোখের দিকে তাকিয়ে আতকে উঠল ফারিশ। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে, ফরসা চেহারা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

"সত্যি করে বল কি হয়েছে তোর।"

"কিছু হয়নি।"

আবরার দুহাতে চুলগুলো ঠিক করতে নিতেই ফারিশ দেখল আবরারের ডান হাতে কব্জির কাছে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে। রক্ত জমাট বেঁধে শুকিয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমে তাণ্ডব চালানোর সময় হাতে আঘাত পেয়েছে বুঝতে পারল।

মন বোঝে না - বাংলা সামাজিক গল্প -সানা শেখ

বেশ ফুরফুরে মেজাজে ঘুম থেকে উঠেছে আবরার। জিম থেকে ফিরে গোসল সেরে বের হলো।

মনের সুখে গান গাইতে গাইতে একপ্রকার নাচতে নাচতে রেডি হতে লাগল। তার বেশ সুখ সুখ অনুভব হচ্ছে এখন। গতকাল শুধু শুধু অত কষ্ট পেল সে। তার ব্রেইনটার গতকাল কী হয়েছিল? ঠিকঠাক মতো কাজ করল না কেন? তাকে ছেড়ে পালিয়েছিল নাকি? নাকি রাস্তাও কোথাও খুলে পড়ে গিয়েছিল? যাই হোক এখন তার বেশ আনন্দ হচ্ছে।

রেডি হয়ে ডাইনিংরুমে আসতেই মহুয়া কবীর আর আমজাদ খানের সঙ্গে দেখা হলো। তাদের পাত্তা না দিয়ে চেয়ার টেনে বসল আয়েশ করে। মেইড দ্রুত হাতে নাশতা সামনে দিলো তার।

আবরার মাথা নিচু করে খেতে খেতে মুচকি হাসল কয়েকবার। ব্যাপারটা খেয়াল করলেন মহুয়া কবীর। তিনি স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন আমজাদ খান খেতে ব্যস্ত। হাত দিয়ে ইশারা করতেই আমজাদ খান স্ত্রীর দিকে তাকালেন। মহুয়া কবীর চোখের ইশারায় তাকে আবরারের দিকে তাকাতে বললেন। ছেলের দিকে তাকাতেই আমজাদ খানের চেহারায় বিস্ময় খেলে গেল। রগচটা জেদখোর ছেলেটা এভাবে হাসছে কেন একা একা? রাতে বাড়ি ফিরে কী তাণ্ডবটাই না চালাল, আর এখন হাসছে!

বিজ্ঞাপন
মন বোঝে না গল্পটি সানা শেখ-এর লেখা একটি জনপ্রিয় ভার্সিটি রিলেটেড পারিবারিক গল্প