মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানের মাটি আজ বড্ড নরম। গত রাতের একটানা বৃষ্টির জল এখনো ঘাসের ডগায় জমে আছে। আকাশটা এখনো গুমোট, যেকোনো সময় আবার অঝোর ধারায় কান্না শুরু করবে।
মৃত্তিকা একটা ছাইরঙা ওড়না গায়ে জড়িয়ে ধীর পায়ে হেঁটে চলেছে সারি সারি কবরের মাঝ দিয়ে। তার চোখে এখন আর কোনো জল নেই, কারণ গত চব্বিশ ঘণ্টায় কান্নার সমস্ত উৎস শুকিয়ে গেছে। তার বুকে এখন শুধুই একটা জমাট বাঁধা পাথর। ফাহিম তাকে ব্লক নম্বরটা দিয়ে আর আসেনি। সে বলেছিল, "শাফায়াত হয়তো চাইত না তুমি আসো, কিন্তু তোমার হয়তো এই আসাটা খুব দরকার ছিল।"
৬ নম্বর ব্লকের একদম শেষ মাথায় একটা নতুন কবর। কাঁচা মাটি এখনো ভেজা। কবরের ওপর কয়েকটা বাঁশের কঞ্চি আর একটা ছোট অস্থায়ী নেমপ্লেট।
মৃত্তিকা থমকে দাঁড়াল। নেমপ্লেটটার ওপর কালো কালিতে লেখা— 'শাফায়াত আহমেদ'।
মৃত্তিকার পা দুটো আর শরীরের ভার নিতে পারল না। সে ধপ করে কাঁচা মাটির ওপর বসে পড়ল। তার পোশাক কাদায় মাখামাখি হয়ে গেল, কিন্তু সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে তার কাঁপা কাঁপা দুই হাত রাখল কবরের ভিজে মাটির ওপর। মনে হলো যেন অনেক দিন পর শাফায়াতের বুকে হাত রেখেছে।
"এতটা অভিমান নিয়ে কেউ যায়, শাফায়াত?" মৃত্তিকার গলাটা ভেঙে ফিসফিসানিতে পরিণত হলো। "তুমি আমাকে অন্তত একবার বলতে পারতে! একবার অন্তত আমাকে সুযোগ দিতে পারতে তোমার পাশে থাকার!"
মাটি কোনো উত্তর দিল না। শাফায়াত এখন এমন এক জগতে, যেখানে মৃত্তিকার কোনো অভিযোগ, কোনো অনুশোচনা বা কোনো কান্না পৌঁছাবে না।
মৃত্তিকার মনে পড়ে গেল সেই নীল ডায়েরির শেষ পাতাটার কথা। 'আমি ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। ও এখন ওর আকাশে নির্ভয়ে উড়তে পারবে।'
"কিন্তু তুমি ছাড়া যে আমার কোনো আকাশ নেই শাফায়াত!" মৃত্তিকা ডুকরে কেঁদে উঠল, কাঁচা মাটি খামচে ধরল নিজের দুই হাতে। "তুমি আমাকে যে মুক্তি দিয়ে গেলে, সেটা তো মুক্তি নয়, সেটা আমার সারাজীবনের জন্য একটা খাঁচা! তুমি আমাকে এই অনুশোচনার খাঁচায় চিরকালের জন্য বন্দি করে দিয়ে গেলে!"
হঠাৎ আবার টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মৃত্তিকার চোখের জলের সাথে মিশে কবরের মাটিতে পড়তে লাগল। মৃত্তিকা তার বুকের সাথে চেপে রাখা সেই নীল ডায়েরিটা বের করল। ডায়েরিটা সে শাফায়াতের কবরের মাথার কাছে খুব সাবধানে রেখে দিল। যে কথাগুলো শাফায়াত কখনো তাকে মুখে বলতে পারেনি, সেই কথাগুলো আজ তার মাথার কাছেই থাক।
মৃত্তিকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তাকে এখন ফিরে যেতে হবে সেই শহরে, যেখানে তার জন্য প্রমোশন অপেক্ষা করছে, নতুন কেবিন অপেক্ষা করছে, সফলতার হাতছানি অপেক্ষা করছে... কিন্তু দিন শেষে তার জন্য অপেক্ষা করার মতো কোনো মানুষ আর নেই।
সে যখন গোরস্থানের গেটের দিকে পা বাড়াল, তখন তার কানে কেবল একটা কথাই বাজতে লাগল। শাফায়াতের সেই শান্ত, মায়াবী গলার স্বর—
"তুমি খুঁজবে আমায় সেদিন... যেদিন আমি আর থাকবো না।"
মৃত্তিকা জানে, তার এই খোঁজার কোনো শেষ নেই। তার জীবনের প্রতিটি অর্জনে, প্রতিটি একাকিত্বের মুহূর্তে সে ছায়ার মতো শাফায়াতকে খুঁজবে। আর এই না-পাওয়ার অসীম হাহাকার নিয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হবে বাকিটা জীবন।