বৃষ্টির দাপট বাইরে কিছুটা কমেছে, কিন্তু মৃত্তিকার বুকের ভেতরের ঝড়টা যেন আরও শক্তিশালী হয়ে আছড়ে পড়ছে। সে বিছানায় পড়ে থাকা নীল ডায়েরিটা আবার দুই হাতে তুলে নিল। চোখের জলে কাগজের কয়েকটা জায়গা ভিজে কালির অক্ষরগুলো সামান্য লেপ্টে গেছে।
ডায়েরির পরের পাতাগুলো যেন এক একটা নিঃশব্দ আত্মহত্যার দলিল। শাফায়াত কীভাবে তিলে তিলে নিজেকে মৃত্তিকার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল, তার নিখুঁত বর্ণনা।
পাতা: সাতাশ
"আজ ডাক্তার বলেছে, আমার বাঁ হাতের আঙুলগুলো মাঝে মাঝে অবশ হয়ে যেতে পারে। এটা রোগের একটা প্রাথমিক লক্ষণ। আজ বিকেলে মৃত্তিকা আমাকে ফোন করেছিল। সে খুব রেগে ছিল, কারণ গত তিন দিন আমি তাকে কল করিনি। সে জানতে চাইল, আমার কী হয়েছে। আমি তাকে বলিনি যে, গত তিন দিন আমি ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারিনি। আমি শুধু রুক্ষ গলায় বললাম, 'আমি একটু ব্যস্ত, মৃত্তিকা। সারাক্ষণ কি ফোনে কথা বলা যায়?' ও পাশ থেকে আর কোনো শব্দ আসেনি, শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া। আমি জানি, আমি ওকে কষ্ট দিচ্ছি। কিন্তু বিশ্বাস করো মৃত্তিকা, আমার এই কষ্ট দেওয়ার কারণটা যদি তুমি জানতে, তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পারতে না।"
পাতা: পয়ত্রিশ
"আজ মৃত্তিকার প্রমোশন সেলিব্রেশনের পার্টি ছিল। ও আমাকে যাওয়ার জন্য অনেক জোরাজুরি করেছিল। আমি জানি, আমি গেলে ওর বন্ধুদের সামনে হয়তো আমার হাত কাঁপার ব্যাপারটা ধরা পড়ে যেত। তাই আমি একটা মিথ্যে অজুহাত দিয়ে যাইনি। ও খুব কেঁদেছিল ফোনে। বলেছিল, 'তুমি বদলে গেছ শাফায়াত। তুমি আর আগের মতো নেই।' আমি শুধু নিরুত্তর ছিলাম। আমি চাই ও আমাকে ভুল বুঝুক। ও আমাকে স্বার্থপর ভাবুক। ওর এই রাগ, ওর এই ঘৃণা—এটাই আমাকে ধীরে ধীরে ওর জীবন থেকে মুছে ফেলবে। মৃত্যুর চেয়েও এই মুছে যাওয়াটা আমার কাছে বেশি জরুরি। কারণ আমি মারা গেলে ও কাঁদবে, কিন্তু আমি দূরে সরে গেলে ও বাঁচবে।"
মৃত্তিকা ডায়েরিটা বুকের ওপর চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
শাফায়াত ইচ্ছে করে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিল! ইচ্ছে করে দূরত্ব বাড়িয়েছিল! আর সে? সে কি অন্ধ ছিল? সে কি একবারও বুঝতে পারেনি শাফায়াতের ওই রুক্ষ কথার পেছনের হাহাকারটা?
মৃত্তিকার মনে পড়ে গেল সেই রাতের কথা। আজ থেকে ঠিক তিন মাস আগের একটা রাত।
সেদিন মৃত্তিকার অফিসে ভীষণ ঝামেলা হয়েছিল। বসের সাথে কথা কাটাকাটি, প্রজেক্ট ক্যানসেল—সব মিলিয়ে তার মন মেজাজ চরমে। সে শাফায়াতকে কল করেছিল তার ফ্রাস্ট্রেশনটা শেয়ার করার জন্য। শাফায়াত তখন হয়তো যন্ত্রণায় ছটফট করছিল, কিন্তু মৃত্তিকা তো সেসব জানত না।
"শাফায়াত, তুমি কি আমাকে একটু সময় দিতে পারো? আমার খুব খারাপ লাগছে," মৃত্তিকা সেদিন প্রায় কেঁদে ফেলেছিল।
ওপাশ থেকে শাফায়াতের গলাটা অদ্ভুত রকম শান্ত আর ঠান্ডা শোনাল। "মৃত্তিকা, আমি একটা জরুরি কাজে আছি। এখন কথা বলতে পারব না।"
"জরুরি কাজ? আমার চেয়েও জরুরি? তুমি আজকাল এমন কেন করছ শাফায়াত? তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলছ?" মৃত্তিকা চিৎকার করে উঠেছিল।
"তুমি সবসময় সব কিছু নিজের মতো করে ভাবো, মৃত্তিকা। পৃথিবীর সব মানুষ তোমার ইমোশন নিয়ে বসে নেই। আমারও নিজের একটা জীবন আছে।" শাফায়াতের এই কথাটা মৃত্তিকার বুকে চাবুকের মতো আছড়ে পড়েছিল।
"ফাইন! তাহলে তুমি তোমার জীবন নিয়েই থাকো! আমাকে আর কখনো কল করবে না!" মৃত্তিকা সেদিন রাগে ফোনটা ছুড়ে ফেলেছিল।
তারপর থেকে... তারপর থেকে তাদের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছিল। মৃত্তিকা তার ইগো নিয়ে বসেছিল, আর শাফায়াত তার মৃত্যু নিয়ে। কেউ কাউকে আর বুঝতে চায়নি।
মৃত্তিকা ডায়েরিটা আবার খুলল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। সে একটা নির্দিষ্ট তারিখ খুঁজছে। একত্রিশ দিন আগের সেই দিনটা। যেদিন সে শেষবারের মতো শাফায়াতের সাথে কথা বলেছিল।
পাতা: আটান্ন
"আজ আমার বাঁ চোখটা প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। নার্ভগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। ডাক্তার বলেছে, এটা লাস্ট স্টেজ। আজ হয়তো মৃত্তিকার সাথে আমার শেষ কথা হবে। আমি ওকে কল করেছিলাম। ও ফোন ধরে বিরক্ত গলায় বলল, 'কী চাই?' আমি শুধু ওর গলার স্বরটা শুনতে চেয়েছিলাম। আমি বলতে চেয়েছিলাম, 'মৃত্তিকা, আমি আর হয়তো কয়েকটা দিন আছি। তুমি কি একবার আমাকে দেখতে আসবে?' কিন্তু আমি বলিনি। আমি শুধু বললাম, 'কিছু না। ভালো থেকো।' ও ফোনটা কেটে দিল। আমি জানি, ও এখন আমাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে। আর এটাই আমার জয়। আমি ওকে মুক্ত করে দিয়েছি। ও এখন ওর আকাশে নির্ভয়ে উড়তে পারবে।"
ডায়েরির লেখাটা এখানেই শেষ। এরপর আর কোনো পাতা লেখা নেই।
মৃত্তিকার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। সে বিছানা থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়াল। না, সে এটা মেনে নিতে পারেবিধা পারে না! শাফায়াত এমন একটা অবস্থায় একা থাকতে পারে না! সে তাকে খুঁজে বের করবেই।
মৃত্তিকা তার ফোনটা হাতে নিল। সে শাফায়াতের নম্বরে ডায়াল করল। নম্বরটা এখনো বন্ধ। সে শাফায়াতের কিছু কমন বন্ধুদের কল করতে শুরু করল। কিন্তু কেউ শাফায়াতের খোঁজ জানে না।
অবশেষে সে শাফায়াতের ছোটবেলার বন্ধু ফাহিমকে কল করল। ফাহিম শাফায়াতের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল।
"ফাহিম ভাই, শাফায়াত কোথায়? আমাকে প্লিজ বলুন!" মৃত্তিকা প্রায় চিৎকার করে উঠল ফোন ধরতেই।
ওপাশে কিছুক্ষণ একটা ভারী নিস্তব্ধতা। তারপর ফাহিমের গলাটা শোনা গেল। গলাটা খুব গম্ভীর, আর সেখানে কোনো আবেগ নেই।
"তুমি ওকে খুঁজছ কেন, মৃত্তিকা? ও তো তোমার জীবনে একটা বোঝা ছিল।" ফাহিমের কথাগুলো তীরের মতো বিঁধল মৃত্তিকার গায়ে।
"ফাহিম ভাই, আমি ডায়েরিটা পড়েছি! আমি সব জানতে পেরেছি! প্লিজ আমাকে বলুন ও কোথায়! আমি ওকে একবার দেখতে চাই!" মৃত্তিকা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
"অনেক দেরি হয়ে গেছে, মৃত্তিকা।" ফাহিমের গলাটা কেঁপে উঠল। "শাফায়াত গতকাল রাতে... চলে গেছে। আমরা আজ সকালে ওকে মিরপুর বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে দাফন করে এসেছি।"
মৃত্তিকার হাত থেকে ফোনটা মেঝেতে খসে পড়ল।
পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। মৃত্তিকার মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। সে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের সামনে নীল ডায়েরিটা, আর সেই ডায়েরির পাতায় লেখা লাইনগুলো যেন তাকে উপহাস করছে—
"তুমি খুঁজবে আমায় সেদিন... যেদিন আমি আর থাকবো না।"