কফির মগটা কখন যে পুরোপুরি জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেছে, মৃত্তিকার সেদিকে খেয়াল নেই।
সে তার এগারো তলার অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে ঢাকার চেনা আকাশটা আজ গাঢ় মেঘে ঢাকা। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টিতে পুরো শহরটাকে একটা ধূসর ক্যানভাসের মতো লাগছে, ঠিক মৃত্তিকার বুকের ভেতরের শূন্যতাটার মতো।
আজ নিয়ে ঠিক একত্রিশ দিন।
একত্রিশ দিন ধরে শাফায়াতের ফোন নম্বরটা বন্ধ। কোনো মেসেজ নেই, ইনবক্সে কোনো নক নেই, এমনকি অফিসের নিচে সেই পরিচিত ছায়াটারও কোনো আনাগোনা নেই।
প্রথম কয়েকদিন মৃত্তিকার বেশ ভালোই লেগেছিল। মনে হয়েছিল, যাক, মানুষটা অবশেষে বুঝতে পেরেছে যে মৃত্তিকার নিজস্ব একটা স্পেস দরকার। শাফায়াতের ওই অতিরিক্ত কেয়ারিং, সবসময় 'কোথায় আছো', 'কী করছো', 'খেয়েছো কি না'—এই প্রশ্নগুলো মৃত্তিকার কাছে একসময় পাহারাদারের মতো মনে হতো। সে নিজের ক্যারিয়ার, নতুন প্রোমোশন আর বন্ধুদের নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিল যে, শাফায়াতের এই নিঃশব্দ প্রস্থানটাকে সে তার স্বাধীনতা ভেবে উদ্যাপন করেছিল।
কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে মৃত্তিকার বুকের ভেতরটায় অদ্ভুত একটা দমবন্ধ করা অনুভূতি হচ্ছে।
সে বুঝতে পারছে, শাফায়াত তার জীবনে শুধু একজন মানুষ ছিল না; শাফায়াত ছিল তার একটা দীর্ঘদিনের 'অভ্যাস'। এমন একটা অভ্যাস, যাকে সে কোনোদিন সম্মান করেনি, কিন্তু যে অভ্যাসটা ছাড়া সে এখন এক পা-ও চলতে পারছে না। জ্বর এলে এখন আর কেউ মাঝরাতে কল দিয়ে ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেয় না। মন খারাপ করে কাঁদলে কেউ আর ফোনটা শুধু কানে ধরে রেখে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনে না।
মৃত্তিকা কফির মগটা রেলিংয়ের ওপর রেখে ঘরে ফিরে এল।
বিছানার ঠিক মাঝখানে একটা বাদামি রঙের খাম পড়ে আছে। আজ সকালেই কুরিয়ার সার্ভিসের একটা ছেলে এটা দিয়ে গেছে। প্রেরকের জায়গায় লেখা— 'শাফায়াত'।
খামটা হাতে নিতেই মৃত্তিকার আঙুলগুলো সামান্য কেঁপে উঠল। একত্রিশ দিন পর শাফায়াতের কোনো অস্তিত্ব তার হাতের মুঠোয়। সে খুব সাবধানে খামটা ছিঁড়ল।
ভেতরে কোনো চিঠি নেই। আছে শুধু পুরনো একটা নীল রঙের ডায়েরি। ডায়েরিটার মলাট বেশ মলিন, দেখলেই বোঝা যায় এটা অনেকবার খোলা হয়েছে, অনেকবার বন্ধ করা হয়েছে।
মৃত্তিকা বিছানায় বসল। বুকের ভেতরটা কেন যেন ঢিপঢিপ করছে। সে কি ভয় পাচ্ছে? কিসের ভয়? শাফায়াতের কোনো অভিমানের কথার? নাকি চিরচেনা সেই অভিযোগের—"তুমি আমাকে সময় দাও না, মৃত্তিকা।"
ডায়েরির প্রথম পাতাটা উল্টাতেই মৃত্তিকার চোখ আটকে গেল।
পাতার ঠিক মাঝখানে শাফায়াতের সেই পরিচিত, গোছানো হাতের লেখায় মাত্র কয়েকটা লাইন লেখা। কোনো তারিখ নেই।
"মৃত্তিকা,
আমি জানি এই ডায়েরিটা যখন তোমার হাতে পৌঁছাবে, তখন তুমি হয়তো অফিসে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করছো, অথবা কফিতে চুমুক দিয়ে ভাবছো— 'শাফায়াত আবার কী নতুন নাটক শুরু করল!'
বিশ্বাস করো, আমি আর কোনো নাটক করব প্রতিনিয়ত। আমি জানি, আমার উপস্থিতি তোমাকে ক্লান্ত করে। আমার ভালোবাসা তোমার কাছে একটা অদৃশ্য শেকলের মতো মনে হয়। তুমি উড়তে চাও, আর আমি বোকামি করে বারবার তোমার আকাশটা নিজের হাতে আগলে রাখতে চাই।
তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোমাকে তোমার আকাশটা দিয়ে যাওয়ার। এই ডায়েরিতে আমার কিছু না-বলা কথা আছে। এগুলো কোনো অভিযোগ নয়, মৃত্তিকা। এগুলো কেবলই একজন পরাজিত মানুষের দিনলিপি।
তুমি আমাকে খুঁজতে যেও না। কারণ তুমি যখন বুঝতে পারবে যে তোমার অভ্যাসের নামই ছিল শাফায়াত, তখন হয়তো বড্ড দেরি হয়ে যাবে। তুমি খুঁজবে আমায় সেদিন... যেদিন আমি আর থাকবো না।"
লাইনগুলো পড়ার সাথে সাথে মৃত্তিকার গলার কাছে একটা বিশাল দলা পাকিয়ে এল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল এক লহমায়।
'থাকবো না' মানে কী? শাফায়াত কোথায় গেছে? সে কি শহর ছেড়েছে? নাকি... না, এমন কিছু হতেই পারে না! শাফায়াত তো ওকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারে না। সে ফিরে আসবে। ঠিক ফিরে আসবে।
মৃত্তিকা পাগলের মতো ডায়েরির পরের পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে, চোখের জল টপটপ করে পড়ছে পুরোনো কাগজগুলোর ওপর।
পাতা উল্টাতেই সময়টা যেন পেছনের দিকে ছুটতে শুরু করল। বর্তমানের এই দমবন্ধ করা ফ্ল্যাট থেকে মৃত্তিকা ছিটকে গিয়ে পড়ল আজ থেকে ঠিক আট মাস আগের এক বর্ষার বিকেলে... যেখান থেকে শাফায়াতের এই নিঃশব্দ মৃত্যুর শুরু হয়েছিল।
প্রতিটি পর্বে এত সুন্দর ইমোশন আর বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শেষ পর্বটা পড়ার পর অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
আপনার লেখার হাত মাশাআল্লাহ অসাধারণ। এমন গল্প আরও চাই। আল্লাহ আপনার কলমে আরও বারাকাহ দান করুন। ❤️