আট মাস আগের সেই বর্ষার বিকেল।
ধানমন্ডির পুরোনো ক্যাফেটার কাঁচের দেয়াল বেয়ে অঝোরে বৃষ্টির জল নামছে। শাফায়াত জানালার ধারের টেবিলটায় বসে আছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে। তার সামনের কফিটা অনেকক্ষণ আগেই জুড়িয়ে গেছে। শাফায়াতের দৃষ্টি বাইরের ঝাপসা রাস্তার দিকে, কিন্তু তার মন পড়ে আছে টেবিলের ওপর রাখা একটা হালকা নীল রঙের খামের ভেতর।
আজ শাফায়াতের জন্মদিন। আর তার চেয়েও বড় কথা, আজ সকালে হাসপাতাল থেকে তার কিছু টেস্টের রিপোর্ট এসেছে। নীল খামটার ভেতর কয়েক টুকরো সাদা কাগজ, আর সেই কাগজগুলোতে লেখা আছে এমন একটা সত্যি—যা শাফায়াতের পুরো পৃথিবীকে এক লহমায় তছনছ করে দিয়েছে। ডাক্তার খুব শান্ত গলায় বলেছিলেন, "শাফায়াত সাহেব, আপনার ব্রেইনের টিস্যুগুলোতে যে ডিজেনারেশন শুরু হয়েছে, তা রেয়ার এবং আনকিউরেবল। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।"
শাফায়াত ভয় পায়নি। সে শুধু ভেবেছিল মৃত্তিকার কথা। এই খবরটা শোনার পর মেয়েটা কীভাবে সামলাবে নিজেকে? সে কি ভেঙে পড়বে?
হঠাৎ ক্যাফের কাঁচের দরজাটা ঠেলে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ভেতরে ঢুকল মৃত্তিকা। পরনে তার প্রিয় মেরুন রঙের শাড়ি, চুলগুলো বৃষ্টির ছাঁটে সামান্য ভেজা। তবে তার চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং একটা অদ্ভুত উত্তেজনা। কানে ধরা মোবাইল ফোনে সে অনর্গল কথা বলে চলেছে।
শাফায়াত নীল খামটা দ্রুত নিজের ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। সে চায় না মৃত্তিকা এসেই মন খারাপ করা কোনো খবর শুনুক। আগে সে মৃত্তিকার হাতটা ধরবে, তাকে শান্ত করবে, তারপর গুছিয়ে বলবে কথাটা।
মৃত্তিকা ধপ করে শাফায়াতের সামনের চেয়ারটায় বসে পড়ল। ফোনের ওপাশের মানুষটাকে বলল, "আরে হ্যাঁ রাতুল, আমি ক্যাফেতে পৌঁছে গেছি। তুই বসের সাথে কথা বলে আমাকে কনফার্ম কর। ওকে, বাই!"
ফোনটা টেবিলে রেখে মৃত্তিকা একটা বড় শ্বাস ফেলল। "উফ! সরি শাফায়াত। এই বৃষ্টির মধ্যে জ্যামে যে কী অবস্থা! তুমি কি অনেকক্ষণ ওয়েট করছো?"
"এই তো, একটুক্ষণ।" শাফায়াত তার সেই চিরাচরিত শান্ত হাসিটা হাসল। আড়াই ঘণ্টার অপেক্ষাকে সে এক নিমিষেই 'একটুক্ষণ' বানিয়ে দিল।
"শাফায়াত, ইউ ওন্ট বিলিভ দিস!" মৃত্তিকা কফির মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, "আজকের প্রেজেন্টেশনটা এত ভালো হয়েছে! এমডি স্যার নিজে আমার প্রজেক্টের প্রশংসা করেছেন। আর রাতুল বলছিল, এই প্রজেক্টটা সাকসেসফুল হলে নেক্সট মাসেই আমার প্রমোশন কনফার্ম!"
"তাই নাকি? এটা তো দারুণ খবর!" শাফায়াতের চোখের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা কত বড় স্বপ্ন দেখে, আর আজ সে তার স্বপ্নের খুব কাছাকাছি।
মৃত্তিকা অনর্গল কথা বলে চলেছে—অফিসের পলিটিক্স, তার নতুন কেবিন, বসের মুড, সব কিছু নিয়ে। শাফায়াত শুধু মুগ্ধ হয়ে শুনছে। কিন্তু একটা সময় পর তার বুকের ভেতরটায় চিনচিনে একটা ব্যথা শুরু হলো। শুধু শারীরিক ব্যথা নয়, এক অদ্ভুত শূন্যতা। মৃত্তিকা একবারও জিজ্ঞেস করল না, শাফায়াত কেমন আছে। একবারও জানতে চাইল না, আজ শাফায়াতের বিশেষ দিনটিতে তার কোনো প্ল্যান আছে কি না।
"মৃত্তিকা," শাফায়াত একটু ইতস্তত করে ডাকল। "আমার... আমার একটা কথা ছিল।"
"বলো না," মৃত্তিকা নিজের ফোনটা চেক করতে করতে অন্যমনস্কভাবে বলল।
"আজকের দিনটা... মানে, আজ তো আমার..."
শাফায়াতের কথা শেষ হওয়ার আগেই মৃত্তিকার ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনে 'বস' নামটা জ্বলজ্বল করছে। মৃত্তিকা এক লাফে উঠে দাঁড়াল।
"শিট! বসের কল।" মৃত্তিকা দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল। "ইয়েস স্যার... হ্যাঁ, আমি ফ্রি আছি... এখন? আচ্ছা, আমি আসছি।"
ফোনটা কেটে মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো করে নিজের পার্সটা গুছিয়ে নিল। "শাফায়াত, আই অ্যাম সো সরি। আমাকে এখনই অফিসে ব্যাক করতে হবে। ক্লায়েন্টরা হঠাৎ চলে এসেছে, একটা ইমার্জেন্সি মিটিং আছে। মিটিং শেষে পুরো টিম মিলে সেলিব্রেট করতে যাব। তুমি বরং আজ বাসায় চলে যাও, হ্যাঁ? কাল কথা হবে।"
মৃত্তিকা একবারও শাফায়াতের চোখের দিকে তাকালচ্ছ না। সে টেবিল ছেড়ে ক্যাফের দরজার দিকে পা বাড়াল।
"মৃত্তিকা!" শাফায়াত ডাকল। গলাটা সামান্য কেঁপে গেল তার।
মৃত্তিকা দরজার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়াল। "কী হলো?"
শাফায়াতের ব্যাগের ভেতর রাখা নীল খামটা যেন তার আঙুলগুলোকে স্পর্শ করছে। সে বলতে চাইল, 'আজ আমার জন্মদিন ছিল মৃত্তিকা। আর আজই আমি জেনেছি, আগামী জন্মদিনে হয়তো আমি আর পৃথিবীতে থাকব না। তুমি কি আর পাঁচটা মিনিট আমার পাশে বসবে?'
কিন্তু শাফায়াত মৃত্তিকার তাড়াহুড়ো করা বিরক্তিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল। সে তার ব্যাগের চেইনটা টেনে বন্ধ করে দিল।
"কিছু না।" শাফায়াত ম্লান হাসল। "সাবধানে যেও। আর... কংগ্রাচুলেশনস।"
মৃত্তিকা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। কাঁচের দরজা ঠেলে সে বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে গেল।
শাফায়াত একা বসে রইল সেই টেবিলে। তার মনে হলো, মৃত্তিকার ওই উজ্জ্বল, গতিশীল পৃথিবীতে সে আসলেই একটা বেমানান পুরোনো আসবাবের মতো। সে যদি আজ তার অসুস্থতার কথাটা বলত, মৃত্তিকা হয়তো থেকে যেত। কিন্তু সেটা হতো নিছকই দায়িত্ববোধ বা করুণা থেকে, ভালোবাসা থেকে নয়। শাফায়াত কারো করুণা নিয়ে বাঁচতে চায় গান্ধা চায় না, বিশেষ করে মৃত্তিকার।
শাফায়াত ব্যাগ থেকে একটা নতুন কেনা নীল রঙের ডায়েরি বের করল। কলমটা হাতে নিয়ে সে প্রথম পাতাটায় তারিখ লিখল। তারপর খুব ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করল—
"আজকের দিনে আমি দুটো জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি। প্রথমত, আমার আয়ু ফুরিয়ে আসছে। আর দ্বিতীয়ত, মৃত্তিকার জীবনে আমার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে আরও অনেক আগেই। আমি যদি এখন আমার অসুখের কথাটা তাকে বলি, সে হয়তো মায়ার টানে আমার পাশে বসে থাকবে। কিন্তু একটা উড়ন্ত পাখিকে শেকলে বেঁধে রেখে আমি শান্তি পাব না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি তাকে মুক্তি দেব। সে ভাবুক আমি স্বার্থপর, সে ভাবুক আমি বদলে গেছি। আমার মৃত্যুর চেয়েও আমার অবহেলা তাকে বেশি দূরে সরিয়ে দেবে। আর সেটাই ভালো। আমার মৃত্যুর দিন তাকে কাঁদতে দেখার চেয়ে, আমার অনুপস্থিতি তাকে স্বস্তি দিক—এটাই আমার শেষ চাওয়া।"