রাত্রির মনে হলো, মাথার ওপরের আকাশটা হঠাৎ ভেঙে চুরমার হয়ে তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। চারপাশের নিস্তব্ধ গ্রাম্য রাতটা যেন এক নিমেষে জ্যান্ত কবর হয়ে তাকে গিলে ফেলল। কলিজার ভেতর যে একটু আগে মেঘনা নদীর জোয়ার এসেছিল, মুহূর্তেই তা তপ্ত মরুভূমির লু-হাওয়ায় শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
মেয়েটির পরনে লাল রঙের দামী জামদানি, কপালে বড় একটা লাল টিপ। নিহাল ভাইয়ার কাঁধের ওপর খুব অধিকার নিয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে। নিহাল ভাইয়া আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছে না, সে মাটির দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় আবার বলল, "ওর নাম মীরা। মাসখানেক আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে। তোকে সারপ্রাইজ দেব বলে জানানো হয়নি।"
সারপ্রাইজ! শব্দটা রাত্রির কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। যে মানুষটাকে পাওয়ার কামনায় সে বছরের পর বছর নিজের ভেতর একটা মন্দির গড়ে তুলেছিল, আজ সেই মন্দিরের বিগ্রহ নিজ হাতে কুড়াল দিয়ে তাকে কুপিয়ে শেষ করে দিল।
রাত্রি টলমলে পায়ে দুপা পিছিয়ে গেল। দরজার চৌকাঠটা খপ করে ধরে না ফেললে হয়তো সে ওখানেই আছাড় খেয়ে পড়ত। ভেতরের ঘর থেকে অসুস্থ আব্বা খকখক করে কাশছেন। সেই কাশির শব্দ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক মিলেমিশে এক নারকীয় আবহ তৈরি করল।
মীরা হাসিমুখে বলল, "তুমিই বুঝি রাত্রি? নিহাল তোমার কথা অনেক বলেছে। খুব সুইট তো তুমি!"
রাত্রির ইচ্ছে করল চিৎকার করে বলতে হ্যাঁ, আমি সেই রাত্রি, যাকে নিয়ে নিহাল ভাইয়া রমনা পার্কে ঘুরেছিল। আমি সেই রাত্রি, যার নীল শাড়ি পরা দেখে নিহাল ভাইয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। আমি সেই রাত্রি, যাকে নিহাল ভাইয়া নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল।' কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। কলিজাটা যেন কেউ জ্যান্ত অবস্থায় ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে।
নিহাল ভাইয়া ঘরে ঢুকে ব্যাগটা মেঝেতে রাখল। তারপর খুব স্বাভাবিক স্বরে বলল, "মীরা আমার ভার্সিটির ফ্রেন্ড, আমরা একে অপরকে পছন্দ করতাম তিন বছর ধরে।"
পছন্দ করত? অনেকদিন ধরে? তাহলে সেই বিকেলগুলো কী ছিল? সেই রিকশায় পাশাপাশি বসা, সেই চড় মারার পর মায়াবী গলায় ক্ষমা চাওয়া সব কি তবে অভিনয় ছিল? আম্মা যেমন আব্বার প্রতারণা সহ্য করতে না পেরে বিষের বোতল তুলে নিয়েছিল, রাত্রির আজ ঠিক তেমনটাই করতে ইচ্ছে করছে। তার মনে হলো, প্রতারণা বোধহয় এই পরিবারের রক্তে মিশে আছে। আব্বা দিয়েছিল আম্মাকে, আর নিহাল ভাইয়া দিল তাকে।
আবার মনের কোণে ছোট একটি ধাক্কা খেলো- নিহাল তো কখনো তাকে ভালোবাসি বলেনি ।
সারা রাত রাত্রি এক ফোঁটা ঘুমাতে পারল না। পাশের ঘরে নিহাল ভাইয়া আর তার নতুন বউয়ের ফিসফাস হাসির শব্দ দেয়াল ফুঁড়ে তার কানে আসছিল। প্রতিটি হাসির শব্দ যেন রাত্রির বুকে এক একটা পেরেক ঠুকছিল। জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে ভাবল ভালোবাসা কি তবে শুধুই একটা মরীচিকা?
সকালে যখন সূর্য উঠল, রাত্রির চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে। নিহাল ভাইয়া বারান্দায় বসে পেপার পড়ছে। রাত্রি ধীর পায়ে নিহাল ভাইয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
নিহাল ভাইয়া পেপার থেকে চোখ সরিয়ে চশমাটা ঠিক করতে করতে বলল, "উঠেছিস?
রাত্রি শান্ত গলায় বলল, "ভাইয়া, তুমি আমাকে একটা নীল শাড়ি দিয়েছিলে মনে আছে?"
নিহাল ভাইয়া একটু থতমত খেয়ে গেল। মীরা রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে তাকাল। নিহাল ভাইয়া আমতা আমতা করে বলল, "হ্যাঁ... ওটা তো অনেক আগের কথা। কেন বল তো?"
রাত্রি তার ঘরের ভেতর থেকে একটা প্যাকেট নিয়ে এল। সেই নীল শাড়িটা, যেটা একদিন পড়েছিল আর পড়েনি , শুধু বুকের ভেতর আগলে রেখেছিল। প্যাকেটটা নিহাল ভাইয়ার পায়ের কাছে রেখে রাত্রি বলল, "এটা তোমার আমানত, তুমিই রাখো। হয়তো তোমার মীরার নীল রঙ খুব পছন্দ।"
বলেই রাত্রি আর দাঁড়াল না। ব্যাগ গুছিয়ে সোজা স্টেশনের দিকে হাঁটা দিল। পেছনে অসুস্থ আব্বা ডাকছিলেন, খালা ফোন দিচ্ছিলেন কিন্তু রাত্রি আজ আর কারো জন্য থামল না।
ট্রেনের জানালার পাশে বসে যখন গ্রামটা দ্রুত পেছনে সরে যাচ্ছিল, তখন রাত্রির দুচোখ ফেটে কান্না এল। মনে মনে ভাবলো আম্মা বিষ খেয়ে মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছে, কিন্তু সে আজ বেঁচে থেকে তিলে তিলে মরার বিষ পান করল। বড় বড় শহরের ভিড়ে সে হারিয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর বয়ে বেড়াবে এক আজন্ম 'ছ্যাঁকা'র দগদগে ক্ষত।
ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দের সাথে সাথে রাত্রির মনের ভেতর শুধু একটা কথাই বাজতে লাগল-"কেন মেঘ আসে হৃদয়ও আকাশে,তোমারে দেখিতে দেয় না।"