চোরাবালি

পর্ব - ২

চোরাবালি বাংলা গল্প - লেখিকা আজেরিন হিরানুর

সেদিন সারা বিকেল নিহাল ভাইয়ার সাথে ঘুরলাম ।

মা মরা যাওয়ার পর আজ একটু ভালো লাগলো। মায়ের অভাব কোন কিছুতেই পূর্ণ করা সম্ভব নয়। তবুও নিহাল ভাইয়ার সাথে ঘুরে মনটা কিছুটা ফ্রেশ হয়ে গেল।

ভাইয়া আমাকে বোঝালো নিয়মিত স্কুলে যেতে হবে।ভালোভাবে পড়াশোনা করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।

ভাইয়ার কথায় আমি শুধু মাথা নেড়ে গেলাম।

এরপর থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী হতে শুরু করলাম । নিয়মিত স্কুলে গেলাম। পরিক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলাম নাইন থেকে টেনে তারপর কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম ।

মাঝে মাঝে ভাইয়া আমাকে নিয়ে ঘুরতে বের হতো । মাঝে মাঝে আবার খালার সাথেও ঘুরতে যেতাম।

কয়েক বছর পর হঠাৎ খবর এলো আব্বা অসুস্থ। খালার সাথে গ্রামে গিয়ে দেখি, আব্বা সেই সৎ মায়ের হাতে নিগৃহীত হচ্ছেন। সেই মহিলা এখন অন্য এক লোকের সাথে ঘর করছে, আর আব্বা ঘরের এক কোণে পড়ে ধুঁকছেন। আম্মার সেই অভিশাপ যেন আজ সত্যি হয়েছে।

আব্বাকে দেখে ঘৃণা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কেন জানি সেদিন মানুষটাকে দেখে শুধু কষ্ট হলো।

তাই থেকে গেলাম মধুপুর গ্রামে। কয়েকটা দিন থেকে আবার চলে যাবো শহরে।

গ্রামে আসার পর জীবনের ছন্দটা যেন হুট করেই বদলে গেল। প্রথম দিন নিহাল ভাইয়ার সাথে কথা হলো কিন্তু তারপর থেকে ফোন বন্ধ।

শহরে থাকতে যে মানুষটার সাথে দিনের অর্ধেকটা সময় খুনসুটিতে কাটত, গ্রামে এসে সেই নিহাল ভাইয়া যেন একদমই অচেনা এক জগতের বাসিন্দা হয়ে গেলেন। কোনো যোগাযোগ নেই, নেই আগের মতো সেই অকারণে ঘুরা ঘুরি। নিস্তব্ধ দুপুরগুলোতে যখন চারপাশ খাঁ খাঁ করে, তখন নিহাল ভাইয়ার অভাবটা বড্ড বেশি টের পাই। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে; মনে হয় একটা বিশাল শূন্যতা আমাকে ঘিরে ধরেছে। কোনো কিছুতেই মন বসে না, এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা সারাদিন ছায়ার মতো পিছু লেগে থাকতো।

বুকের ভেতরটা সারাক্ষণ এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়। নিহাল ভাইয়ের স্মৃতিগুলো এখন বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধছে কলিজায়।

একদিন আননোন নাম্বার থেকে ফোন এলো দৌড়ে গিয়ে ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নিহাল ভাইয়ার কণ্ঠ শোনার সাথে সাথেই আমার মরুভূমির মতো ফেটে চৌচির হয়ে যাওয়া কলিজায় যেন হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টির ছোঁয়া লাগল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পৃথিবীটা থেমে গেল। যে শূন্যতায় আমি এতদিন ডুবে ছিলাম, সেখানে মুহূর্তেই আছড়ে পড়ল এক বিশাল সমুদ্রের উত্তাল জোয়ার।

বুকের ভেতরটা এতক্ষণ পাথরের মতো ভারী হয়ে ছিল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই সেই পাথর গলে জল হয়ে দুচোখ দিয়ে নামতে চাইল। মনের কোণে জমে থাকা সবটুকু অভিমান এক লহমায় ধুয়ে-মুছে গেল। মনে হলো, এই একটি ফোন কল যেন আমার মৃতপ্রায় অস্তিত্বে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে দিল। মরুভূমির তপ্ত বালুতে দাঁড়িয়ে থাকা এক তৃষ্ণার্ত পথিক যেন হঠাৎ এক শীতল সমুদ্রের মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে।

ভাইয়া বলল আজ রাতে সে নাকি আমাদের গ্রামে আসবে আর কয়েকদিন থাকবে ।

তারপর ফোন কেটে দিল।

মনের ভেতর যে আনন্দ আর উত্তেজনার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল, তা সামলাতে না পেরে আমি যেন এক অদ্ভুত ঘোরে সারা বাড়ি মুছতে শুরু করলাম। প্রতিটি কোনা ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছিলাম, যেন বাড়ির ধুলিকণার সাথে সাথে আমার মনের সব ধুলো জমা বিষণ্ণতাও মুছে ফেলছি। হাত দুটো থামছিল না, বুকটা দুরুদুরু করছিল অপেক্ষা কখন শেষ হবে।

রাত যত বাড়তে লাগল, আমার বুকের ভেতর ছটফটানি তত তীব্র হতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা যেন আর সরতেই চায় না। অবশেষে, ঠিক রাত বারোটার দিকে দরজায় টোকা পড়লো।

দরজার টোকাটা যেন সরাসরি আমার হৃৎপিণ্ডে এসে লাগল। এক মুহূর্তও দেরি না করে, প্রায় রুদ্ধশ্বাসে আমি দরজাটা খুলে দিলাম। সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে আমার সব বিরহ আর হাহাকার এক নিমেষে শেষ হয়ে গেল। চোখের সামনে নিহাল ভাইয়াকে দেখে আমার সারা শরীরের ভেতর দিয়ে যেন এক শীতল সমুদ্রের জোয়ার বয়ে গেল। মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না, শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এতদিন যে মরুভূমির তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল, তার সামনে যেন হঠাৎ আস্ত এক মেঘনা নদী এসে দাঁড়াল।

আমার সবটুকু অপেক্ষা, সবটুকু অভিমান আর একাকীত্ব যেন ওই এক পলকেই সার্থক হয়ে গেল। মনে হলো, এই মধ্যরাতে পৃথিবীর সব আলো যেন নিহাল ভাইয়ার মুখটাতেই এসে পরুক।

হঠাৎ পেছন থেকে একটা মেয়ে মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে নিহাল ভাইয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো - ভেতরে চলো নিহাল?

আমি মেয়েটাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম কে আপনি?

পাশ থেকে নিহাল ভাইয়া উত্তর দিলো - এটা তোর ভাবি।

বিজ্ঞাপন