তোমার আব্বা আরেকটা বিয়ে করে আনছে রাত্রি আপা! আর তোমার নতুন আম্মাকে দেইখা তোমার আগের আম্মা বিষ খাইছে । পাড়ার লোকেরা তোমার আম্মাকে হাসপাতালে নিয়া গেছে।
সাত বছর বয়সী জুঁইয়ের মুখে এমন কথা শুনে রাত্রির পা দুটো থমকে গেল। স্কুল ব্যাগটা ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল।
রাত্রি টলমলে পায়ে জুঁইয়ের কাঁধ দুটো খপ করে চেপে ধরে চিৎকার করে বলল, ‘এসব কী বলছিস তুই?’
জুঁই ভয় পেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাত্রির দিকে। ছোট ছোট চোখে জল টলমল করছে। সে আবার অস্ফুট স্বরে বলল, "রাত্রি আপা, তোমার আম্মা খুব বমি করছিল। মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছিল..."
রাত্রি জুঁইয়ের কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে দিয়ে অস্ফুটন স্বরে বললো-"আব্বা আরেকটা বিয়া করে আনছে? আর আম্মা বিষ খাইছে?"
-" হ রাত্রি আপা .. আসো তোমার আম্মার ঘরে আসো ,দেখো বিষের বোতল পইরা আছে ।"
ছোট জুঁইয়ের কথা শুনে রাত্রি জুঁইকে নিয়ে তার মায়ের ঘরে গেলো । গিয়ে দেখে জুঁই সত্যিই বলেছে। বালিশের পাশে ছোট একটা poison এর বোতল পরে আছে । সারা ঘরময় বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে । মেঝেতে আম্মা বমি করেছে সেগুলো এখনও কেউ পরিষ্কার করেনি।
রাত্রি কাঁপা কাঁপা হাতে বোতল টা তুলে নিতে যেতেই জুঁই বাঁধা দিয়ে বললো - "রাত্রি আপা ঐ বোতলে হাত দিতে নিষেধ করেছে আমার আম্মা।"
কান্না জড়িত কন্ঠে রাত্রি বলল- কেনো তোর আম্মা এই বোতলে হাত দিতে নিষেধ করেছে জুঁই?
-ঐ বোতলে হাত দিলে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে আপা।
জুঁইয়ের বারণ না মেনে আমি সেদিন ওই poison এর বোতলটা হাতে নিয়েছিলাম। সিপি খুলে দেখি বোতল খালি । আম্মা সব খেয়ে নিয়েছে। ভালোবাসার মানুষ কে অন্য কারো সাথে সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো আম্মার ছিলো না । তাই সবটা খেয়ে নিয়েছে।
একটু পরে অ্যাম্বুলেন্স এর শব্দ শুনে বোতলটা রেখে দৌড়ে বাইরে গেলাম । গিয়ে দেখি কয়েকজন মহিলা আম্মাকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামাচ্ছে। আব্বাও আছে সেখানে । আব্বাকে দেখে আমার প্রচুর রাগ হয়েছিল সেদিন , কিন্তু আম্মার মৃতদেহ সামনে রেখে কিছু বলিনি। দৌড়ে গিয়ে আম্মার মুখের কাপড় সরাতেই আম্মার মুখটা ভেসে উঠল। আমি একমনে সেদিন আম্মাকে দেখেছিলাম আর বলেছিলাম - আম্মা কেন তুমি মরতে গেলে । একবারও কি আমার কথা ভাবলে না ?
কিন্তু আম্মা কোন উত্তর দেয়নি।
জুঁইয়ের মা চাচি আমাকে আম্মার কাছে থেকে সরে নিয়ে যেতে চাইলে আমি গেলাম না ।
সব আত্নীয় স্বজন আমার পাশে এসে বসলো - মাথায় হাত রেখে বলল এই মাইটার কি হইবে ? মাইয়াটা কার কাছে থাকবে ? বড় খালা আদর করে আম্মার কাছে থেকে তুলে নিয়ে গেল আমাকে।
ঘরে এসে আমার সব কাপড় গুছিয়ে নিলো খালা।
আমি বললাম - আম্মাকে ছাড়া আমি কোথা যেতে পারবো না খালা ।
কিন্তু খালা আমার কথা শুনলো না। আম্মার দাফন সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে আমাকে নিয়ে শহরে চলে এলো।
চিরচেনা সেই গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে মানসিক ভাবে আরো বেশি অস্বস্তি বোধ করছিলাম।
একদিন খালা আমাকে স্কুলে নিয়ে গিয়ে ক্লাস নাইনে ভর্তি করে দিলো । এই স্কুল আমাকে একদম ভালো লাগতো না । এখানে আমার পরিচিত কোন বন্ধু ছিল না।
স্কুলের নাম করে রোজ রোজ নিহাল ভাইয়ার ভার্সিটিতে যাইতাম । কেন যাইতাম নিজেও জানি না ।
একদিন নিহাল ভাইয়া আমাকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। পুরো ভার্সিটির সবার সামনে গালে কষে একটা থাপ্পর মেরে বাড়িতে নিয়ে এলো ।
-দেখো তোমার আদরের ভাগ্নি । স্কুলে না গিয়ে ভার্সিটিতে গেছে।
খালা দৌড়ে এসে আমার গালে হাত রেখে বলল -তাই বলে মেয়েটাকে এভাবে মারবি তুই?
শক্তি খুব বেড়ে গেছে তাইনা? মা মরা মেয়েটাকে পেয়ে যা ইচ্ছা তাই করবি আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখবো ।
এই বলে খালা নিহাল ভাইয়ার গালেও চড় মেরে দিল।
আমি মিটিমিটি করে হাসতে লাগলাম।
নিহাল ভাইয়া আমার হাসি দেখে দাঁত কটমট করতে করতে চলে গেল।
রাতে আমি সিরিয়াস দেখছিলাম হঠাৎ নিহাল ভাইয়া আমাকে ডাক দিলো ।
-রাত্রি এদিকে একটু আয় তো ।
ভেবেছিলাম আবার হয়তো মারবে নয়তো বকবে তাই ভয়ে ভয়ে নিহাল ভাইয়ার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম ।
আমার হাত ধরে বললো - ক্ষমা করে দিস রাত্রি , তখন রাগের মাথায় তোকে চড় মারা একদম ঠিক হয়নি রে।
আমি বললাম আচ্ছা ঠিক আছে । কিন্তু পরবর্তীতে যদি এমন হয় তাহলে আর ক্ষমা করবো না কিন্তু ।
নিহাল ভাইয়া মুচকি হেসে বলল - কাল রমনা পার্কে যাবি?
আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে বললাম হুম যাবো । তুমি আমাকে নিয়ে যাবে?
নিহাল ভাইয়া আমার দিকে একটা শাড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল কালকে বিকেলে এটা পড়ে রেডি হয়ে থাকবি।
সেই রাতে আমার আর ঘুম এলো না দুচোখে।
সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিলাম। মনের মধ্যে শুধু নিহাল ভাইয়া হাসিমাখা মুখ ভেসে উঠছে। রাত বারোটায় উঠে গিয়ে নিহাল ভাইয়ার দেওয়া শাড়িটা বের করে আরেকবার দেখলাম। নীল রঙের শাড়ি । জীবনে প্রথম কেউ আমাকে শাড়ি দিয়েছে। এটা ভেবে মুচকি হেসে শাড়িটা আবার যথাস্থানে রেখে শুয়ে পড়লাম ।
সকালে খালা বললো - রাত্রি স্কুলে যাবি না?
আমি বললাম না।
সেদিন আর কোথাও যাইতে মন চাইলো না । শুধু বিকেল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলাম । কিন্তু সময় কিছুতেই যাচ্ছিল না আমার। বারবার ঘড়ি দেখতেছি ।
আমার যেন আর তর সইছে না । কখন নিহাল ভাইয়ার সাথে রমনা পার্কে যাবো! আচ্ছা নিহাল ভাইয়া কি আমার হাত ধরে ঘুরবে?তার হাতের ছোঁয়ায় আমার হাতের আঙুলগুলো যখন শিহরিত হবে, তখন কি আমি ঠিকঠাক কথা বলতে পারব?
কল্পনাগুলো আমাকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছিল। আচ্ছা, নিহাল ভাইয়া কি আমাকে ফুচকা খেতে নিয়ে যাবে? আর দশটা সাধারণ প্রেমিকের মতো কি সেও একটা ফুচকা তুলে আমার মুখের সামনে ধরবে? তার চোখের দিকে তাকিয়ে সেই ফুচকাটা খাওয়ার মুহূর্তটা কেমন হবে? ভাবতেই আমার গাল দুটো লজ্জায় গরম হয়ে উঠছিল।
এসব ভাবতে ভাবতে দুপুর হয়ে এলো । বিকেল হতে আরো দুই তিন ঘন্টা! এই সময়টা আমার কাছে বছরের মতো মনে হতে লাগল।
সময় কাটছে না দেখে টিভি চালু করে দিলাম । টিভি চালু করতেই দেখলাম নিহাল ভাইয়ার কলেজের একটা মেয়ে সুইসাইড করতে গিয়েছিল । কিন্তু কেউ একজন দেখে ফেলার জন্য মেয়েটা বেঁচে গিয়েছে।
মেয়েটার জন্য আমার বড্ড বেশি মায়া হলো।
নিউজ শেষ হতেই আমি চ্যানেল পাল্টালাম ।। দেখি সব চ্যানেলে একই নিউজ। এক জিনিস বারবার দেখতে আমার ভালো লাগে না । তাই টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে নিহাল ভাইয়ার দেওয়া শাড়িটা পড়ে নিলাম । ছিমছাম করে সাজলাম ।কড়া সাজ আমার পছন্দ নয়।
আমাকে সাজতে দেখে খালা এসে বললো - শাড়িটা পছন্দ হয়েছে রাত্রি?
আমি হাসি মুখে বললাম হুম খালা খুউউউব পছন্দ হয়েছে।
খালা আমার গাল দুটো টেনে বললো- আজ তোর নিহাল ভাইয়ার সাথে ঘুরে আয় । মনটা ফ্রেশ হবে।
খালা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ক্লান্ত শরীরে নিহাল ভাইয়া বাড়িতে এলো । আমি দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে একগ্লাস পানি এনে নিহাল ভাইয়াকে দিলাম ।
আমার হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে সব পানি শেষ করে দিলো নিহাল ভাইয়া । গ্লাসটা রেখে এক ধ্যানে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
নিহাল ভাইয়াকে অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমার ভীষণ লজ্জা হলো , ওখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে হলো না । দৌড়ে ঘরে চলে এলাম । নিজেকে আরো একবার আয়নায় দেখলাম।
তারপর হাত ভর্তি চুড়ি পরে বাইরে আসতেই দেখি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিহাল ভাইয়া । আমাকে দেখে বললো চল ।
ভাইয়ার পেছন পেছন হেঁটে এলাম রাস্তা পর্যন্ত। তারপর একটা রিকশায় উঠলাম। রিকশায় উঠতে গিয়ে আরেকটা বিপত্তি ঘটে গেল । আমি কিছুতেই নিহাল ভাইয়ার পাশে বসতে চাইলাম না ।
রাত থেকে যার কথা ভাবলাম , যাকে কল্পনা করে সারাটা দিন কাটিয়ে দিলাম । আর যখন সে কাছে এলো তখন লজ্জাবতীর পাতার মতো নুইয়ে গেলাম।
কিন্তু লাভ হলো না শেষ পর্যন্ত নিহাল ভাইয়ার পাশে বসতেই হলো । ভাইয়ার পাশে বসতেই ভাইয়ার গা থেকে মাতাল করা একটা গন্ধ আমাকে পাগল করে দিলো।
কিন্তু জড়তা কিছুতেই কাটলো না । হাত পা হালকা করে কাঁপছে।
আমার এমন অবস্থা দেখে নিহাল ভাইয়া বলল - কাঁপা কাঁপি বন্ধ কর রাত্রি!