অভাগীনির সুখ

পর্ব - ২

অভাগীনির সুখ বাংলা গল্প - লেখক নিলয় মাহমুদ রাকিব

তালাক প্রাপ্ত হওয়ার পর শারমিন বাপের বাড়ি ফিরে আসে।

এসএসসি পরীক্ষার পর ওর বিয়ে হয়ে যায়। আর শশুরবাড়িতে সব মিলিয়ে ২ বছর এর মতো ছিলো। ফিরে এসে আবার কলেজ এ ১ম বর্ষে ভর্তি হয়। বাপের বাড়িতে এসে ও আত্মীয় স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীরা অনেক রকম কথা শুনাতো। শারমিন এর নিজের মা বাবা ও দিন দিন অনেক কথা শুনাতো। ডিভোর্স এর পর নিজের বাপ মা ও জাহান্নাম হয়ে গেলো। কলেজে গেলে

সবাই বলতো ‘ডিভোর্সী মেয়ে এসেছে, নানা ধরনের ঠাট্টা করতো।’

ঘরের সব কাজ করার পর পড়তে বসতো আর ওর মা বড়বড় কথা শোনাত।

ওর বাবা ওর জন্য বিয়ের প্রস্তাব আনতো ডিভোর্সী বাচ্চা ওয়ালা লোক। এমনকি ওর বাপের বয়সী লোকের প্রস্তাব আনতো।

ও শুধু বলতো, “আপনাদের পছন্দে একবার বিয়ে করেছিলাম আমাকে জাহান্নামে দিয়েছেন আর না।”

এভাবে কোনো রকম ভাবে এইচএসসি পরীক্ষাটা দিয়ে ভালো একটা রেজাল্ট করে। এবার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে। কিন্তুু, ওকে পড়তে দিবে না আর ওর বাবা বিয়ে দিবে। ও তারপরে ও ভর্তি হয় নিজের বিয়ের সময়ের গহনা বিক্রি করে। ওখানে পড়াকালীন ওদের ডিপার্টমেন্ট এই ওর প্রবাসী স্বামীর ফুফাতো ভাই আজাদের সাথে দেখা হয়। ২ জনেই সহপাঠী ছিলো। ১ম ১ম কথা হতো না। এড়িয়ে চলতো। আর শারমিন অনুরোধ করেছিলো ক্লাসের কাউকে বিষয় টা যেনো না বলে।

ছেলেটা ভীষণ ভদ্র এবং ভালো হওয়াই কাউকে বলে না।

ছেলেটা একদিন ভীষণ অসুস্থ হওয়াতে অনেক দিন ক্লাসে আসতে পারে না। তাই আজাদ পড়াশোনা থেকে অনেক পিছিয়ে পড়ে। সুস্থ হওয়ার পর ক্লাসে আসলে কয়েকজনের থেকে নোট চায় কিন্তুু কেউ দেয় না। কারণ সামনে পরীক্ষা তাই সবাই নিজের নোট নিয়ে পড়তে ব্যাস্ত।

শারমিন বিষয় টা খেয়াল করে নিজে থেকেই তার সব নোট দেয়। এখান থেকেই তাদের বন্ধুত্ব হওয়া শুরু হয় এবং আজাদ শারমিনকে পছন্দ করতে থাকে দিন দিন।

শারমিন কে সব বিষয়ে সাহায্য করতো। এমনকি একবার শারমিন সেমিস্টারে ফি দিতে পারেনি। তখন আজাদ দিয়ে দিছে ফি। শারমিন অবশ্য কয়েকমাস পর ফেরত দিতে চেয়েছিল কিন্তুু আজাদ নেই নি।

শারমিন প্রায় সময়ই ক্লাসে মন মরা হয়ে থাকতো। আজাদ তাকে জিজ্ঞেস করতো এবং সে অতীত বিষয়টা নিয়ে সবসময় তাকে বুঝাতো,

“যা হওয়ার হয়ে গেছে, এসব আর ভেবোনা। এখন তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করো।”

শারমিন সবসময় ক্লাসে আসতে পারতো না। কারণ ঘরের কাজ থাকতো। আর তার কলেজে আসা এটা তার পরিবার পছন্দ করতো না। একদিন নবীণ বরণ অনুষ্ঠানের জন্য শারমিন শাড়ী পড়ে সুন্দর করে রেডি হয়ে ভার্সিটিতে আসার জন্য বের হয়, ঘর থেকে বের হওয়ার সময় ওর বাবা ওকে চুলের মুঠি ধরে অনেক মারে আর বলে,

-ডিভোর্সী মেয়ের এত সাজগোজ কিসের জন্য। ফুটানি করা লাগবে এখন, লোকজন কি বলবে, এমনিতেই তাদের কথায় থাকা অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।”

সেদিন এর মাইর এর ঘটনা’র পর অনেক দিন শারমিন ভার্সিটিতে যায় নি। তখন আজাদ ওর ডিপার্টমেন্ট এর বান্ধবীদের বাড়িতে পাঠিয়ে শারমিন এর খবর নেয়।

শারমিনের পরীক্ষা আর কিছু দিনের মধ্যেই, তখন

শারমিন অনেক কান্না কাটি আর অনুরোধ এর পর ওর বাবা মা ওকে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে দেয়। ফাইনাল পরীক্ষার সময় আজাদ ওকে অনেক সাপোর্ট দেয় এবং পরীক্ষার সময় টুকিটাকি সাহায্য করতো। ওকে রিকশা ভাড়া পর্যন্ত দিয়ে দিত। অনেক কলম বই খাতা ও গিফট হিসাবে দিতো। শারমিন রাজী হতো না নিতে কিন্তুু আজাদ জোর করেই দিতো।

বিজ্ঞাপন

ফাইনাল পরীক্ষার পর আজাদ উচ্চ শিক্ষার জন্য ফিনল্যান্ড এ পড়তে যাবে। ওর পরিবার উচ্চবিত্ত আর আজাদ নিজেও মেধাবী ছাত্র ছিলো। প্রায় সব প্রস্তুতি শেষ বিমানের টিকেট ও কাটা হয়ে যায় আজাদের। আর দেশে আছে মাত্র ১৭ দিনের জন্য।

শারমিনেরও বিয়ে ঠিক করে ফেলে ওর বাবা কারণ ওর বাবার বয়স হয়েছে। আর সমাজের মানুষদের কথা গুলো অনেক তিক্ত হয়ে যাচ্ছিল দিন দিন। আর ডিভোর্সীদের জন্য দুনিয়াটা জাহান্নাম এর মতো। শারমিন এর ফোন ওর বাবা নিয়ে ফেলে।

আজাদ অনেক চেষ্টা করে শারমিনের সাথে দেখা করে বিদায় জানানোর জন্য। এ কারণে আজাদ ওর বান্ধবীকে পাঠায় একটু দেখা করতে বলার জন্য। আজাদ শারমিন এর বিয়ের বিষয় টা জানতো না। শারমিন কে ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছিলো না ওর মা। কিন্তুু ওর বান্ধবী মিথ্যা টিথ্যা বুঝিয়ে ওকে সাথে করে নিয়ে আসে।

আজাদ আর শারমিন ওদের ভার্সিটিতেই দেখা করে।

আজাদ বলল “আমি কিছু দিনের মধ্যেই চলে যাবো বিদেশে পড়ার জন্য। ভালো থাকিও।”

শারমিন বলল, “তুমিও ভালো থাকিও আমারও বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে কিছুদিনের মধ্যেই।”

আজাদ শুনে বলে, “এটা কি বলো তুমি।”

শারমিন বলে, “ডিভোর্সী মেয়েকে নিয়ে বাবা মায়ের চিন্তার শেষ থাকে না। প্রতিবেশীরা দিন দিন অনেক কথা শোনায় যেগুলো শুনে ঠিক থাকা যায় না।”

আজাদ কিছু না ভেবে বলে বসে, “শারমিন আমি তোমাকে ভালোবাসি বিয়ে করবে আমাকে।

শারমিন রাজি হয়না, সোজা বলে দেয় “এটা সম্ভব না।” কারণ ওর কাজিন এর সাথেই ডিভোর্স হয়েছে। আর আজাদকে কিভাবে বিয়ে করবে। শারমিন পাত্তা দেয় না। বাড়ি ফিরে আসে।

আজাদ এর পর বার বার শারমিনের সাথে যোগাযোগ করতে চেয়েও হতাশ হয়। ওর বাবা ডিভোর্সী এক বাচ্চার বাপের সাথে আবার বিয়ে ঠিক করে। কিন্তুু ছেলেটার যে একটা বাচ্চা আছে তা জানাই না শারমিন কে। বিয়ের ২ দিন আগে শারমিন সেটা জানতে পারে। আর ও বিয়ে করবে না সোজা বলে বসে।

আর ঠিক তখনি শুরু হয় ওর উপর অত্যাচার।

শারমিন বলে “একবার জীবন নষ্ট করছেন আর করিয়েন না দয়া করে।”

কিন্তুু ওর কথা কেউ শুনে না।

শারমিন ওর সার্টিফিকেট গুলো নিয়ে বাড়ি থেকে লুকিয়ে বের হয়ে আসে। ওর এক বান্ধবীর বাসায় এসে ওঠে। আর ওর বান্ধবী কাবিলাতি করে বিষয় টা আজাদ কে জানাই। আজাদ এর হাতে আর মাত্র ৪ দিন বাকি সময়। আজাদ তখনই ছুটে আসে। আজাদ এসেই শারমিন এর হাত ধরে বলে

-তোমাকে ছাড়া ভালো থাকা সম্ভব না। আমাকে শুধু বিয়েটা করো তোমার ভালো থাকার দায়িত্ব শুধু আমার। আমি কষ্ট পেতে দিবো না।

শারমিন ও কিছু টা আজাদকে পছন্দ করে। কিন্তুু ওর আফসোস হয় কেন যে আজাদ অতীতের আত্মীয় হতে গেলো। শারমিন চুপচাপ শুনছিলো আর কান্না করছিলো, কিছুক্ষণ পর শারমিন বলে - সমাজের মানুষজন, আত্মীয় স্বজন কি বলবে।

আজাদ বলে - আমি কিছু জানি না যা হওয়ার হবে, যে যা ভাবার ভাব্বে। আজ রাতটা থাকো আমি বাসায় গিয়ে আমার বাবাকে জানাচ্ছি। আজকের রাতটা শুধু অপেক্ষা করো সকালে আসবো আমি তোমাকে নিতে।

এই বলে আজাদ চলে যায় নিজের বাড়িতে।

বিজ্ঞাপন